মরিয়মকে দেশে ফেরত আনার উদ্যোগ নিল সরকার

ঢাকা, রবিবার, ২৬ জানুয়ারি ২০২০ | ১৩ মাঘ ১৪২৬

মরিয়মকে দেশে ফেরত আনার উদ্যোগ নিল সরকার

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি ৯:৫০ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ০৫, ২০১৯

মরিয়মকে দেশে ফেরত আনার উদ্যোগ নিল সরকার

সৌদি আরবের জেদ্দার আলহুজা থান তাবুক শহর থেকে বাংলাদেশি দুই সন্তানের জননী গৃহকর্মী মরিয়ম বেগম (৪০) কে দেশে ফেরত আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

বুধবার ‘আমারে সৌদি থেকে লইয়া যাও,মরিয়মের আর্তনাদ’ শিরোনামের একটি সংবাদ পরিবর্তন ডটকমে প্রকাশিত হওয়ার পর মরিয়মের সর্বশেষ অবস্থা জানতে উপজেলা প্রশাসন, পররাস্ট্র মন্ত্রণালয় ও সৌদি আরবের বাংলাদেশ দূতাবাস দ্রুত উদ্যোগ নেয়।

সৌদি আরবে বাংলাদেশি দূতাবাস মরিয়মের অবস্থান নিশ্চিত হয়েছে এবং তাকে উদ্ধার করে দেশে ফেরত পাঠাতে ব্যবস্থা নিচ্ছে বলে মুঠোফোনে নিশ্চিত করেছেন শ্রীমঙ্গল উপজেলা অফিসার নজরুল ইসলাম।

তিনি জানান, বৃহস্পতিবার সকালে দেশে থাকা মরিয়মের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সন্ধ্যায় তিনি পরিবারের স্বজনদের কাছে থাকা মরিয়মের সৌদি আরব থেকে পাঠানো বিভিন্ন সময়ের নির্যাতনের বিবরণ সম্পর্কিত বর্ণনার সকল অডিও-ভিডিও সংরক্ষণ করেন।

এছাড়া ঢাকা থেকে যে রিক্রুটিং এজেন্ট মরিয়মকে সৌদি আরব পাঠিয়েছে বনানীর আতার্তুক টাওয়ার ২২ নাম্বার বিল্ডিং ‘আহমেদ আল আমিন লিমিটেড’ (আর  এল ১৬০) তাদের সাথে যোগাযোগ করে মরিয়মের পাসপোর্ট, সৌদি পৌঁছার ইমিগ্রশন পেপার এবং মরিয়মের বর্তমান অবস্থান সংরক্ষণ করেন এবং তা বৈদেশিক ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করে ই-মেইল যোগে পাঠান। মরিয়ম বর্তমানে গৃহকর্মী হিসেবে সৌদির জেদ্দার আলহুজা তাবুক শহরের কফিল ফাতেমা মো. আরিফ হাসানের বাসায় রয়েছে বলে প্রেরিত তথ্য থেকে জানা গেছে।

এদিকে মরিয়মের বোন উমর চাঁন বেগম বৃহস্পতিবার বিকেলে মুঠোফোনে জানান,‘দুই-তিনদিন ধরে আমার বোন মরিয়মের সাথে যোগাযোগ করতে পারছি না। তার মোবাইল নাম্বর ও ভিডিও ইমু অ্যাপটি বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে কি অবস্থায় আমার বোন রয়েছে তা আমরা বলতে পারছি না।’

মরিয়মকে সৌদিতে পাঠানো দালাল শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভুনবীর ইউনিয়নের আঐ গ্রামের মৃত আহছান উল্যাহর ছেলে আতিক উল্যা মুঠোফোনে বলেন, মরিয়মকে পাঠানোর সকল কাগজপত্র রিক্রুটিং এজেন্সির সকল কাগজপত্র ই-মেইলের মাধ্যমে এনে ইউএনও স্যারকে দিয়েছি।

ঢাকার বনাননীর রিক্রুটিং এজেন্সি ‘আহমেদ আল আমিন লিমিটেড’ (আর  এল ১৬০) মার্কেটিং ম্যানেজার মাসুদ রানা বাবলু মুঠোফোনে বলেন, মরিয়মের দালাল আতিক উল্যাহ আমাদের স্টাফ। মরিয়ম সৌদি যাওয়ার পর দুইবার বাসা পাল্টে দেয়া হয়েছে। পরবর্তী এখন যে তৃতীয় বাসায় আছে। তৃতীয় বাসায় থাকাকালীন অবস্থায় বলছে যে সে এখন ভালো আছে। গত সপ্তাহে আতিক উল্যাহ আমাদের অফিসে এসে আমাদের জানিয়েছে, মরিয়ম মনে হয় অসুস্থ এর জন্য একটু কথা বইলেন। তখন তাকে বলছি মরিয়ম যদি অসুস্থ হয়ে থাকে কাজ করার অনুপোযোগী হয় তাহলে এমনিতেই তাকে দেশে পাঠিয়ে দেবে। কেউ বসাইয়ে রেখে বেতন দেবে না।

মরিয়মের কফিল কর্তৃক নির্যাতনের ভিডিও ও ভয়েস অডিও রেকর্ড সম্পর্কে তিনি বলেন,‘আমরা বিদেশ পাঠানোর সময়ে তাদের সিস্টেম শিখিয়ে দেই। যদি কোনো কারণে বিপদে পড়ে যাও যদি সংবাদ দিতে না পারো তাহলে বাসা থেতে বের হয়ে পর পর তিনটা মিসকল দিবা। রাত চারটা বাজলেও আমি সাথে সাথে মিসকল ঘুরাবো। এরকম মাসে দুই চারাটা মিসকল ঘুরাইতে হয়।

তিনি জানান, মরিয়মের কথা মতো এ পর্যন্ত দুই বাসা পাল্টিয়ে দিয়েছি। সে গত রমজান মাসে সৌদি আরব যায়। দালাল আতিক উল্লাহ ২৭ নভেম্বর বলছে, মরিয়ম বেশি অসুস্থ। যৌন নিপীড়ন করলে তো আমরা চ্যালেঞ্জ করব। তবে ওদের ফ্যামেলি থেকে কেউ যোগাযোগ করেনি।

শ্রীমঙ্গল উপজেলা অফিসার নজরুল ইসলাম বলেন, স্থানীয় দালাল আতিক উল্যার মাধ্যমে রিক্রুটিং এজেন্সি যারা মরিয়মকে সৌদি আরব পাঠিয়েছে, এগুলোর কপি এবং মরিয়মের প্রবাস থেকে পাঠানো অডিও-ভিডিও’র সকল কপি সব বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সৌদি দূতাবাসে পাঠানো হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, সরকার এ বিষয়ে তড়িৎ পদক্ষেপ নিয়েছে। আমাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানিয়েছে, আমাদের কাছ থেকে ম্যাসেজ পাওয়ার পর সৌদি আরবের দূতাবাসের লোকজন মরিয়মের লোকেশন ট্রেস করতে পেরেছে। সে কোথায় আছে, তারা নিশ্চিত হয়েছে এবং তারা মরিয়মের কাছে যাচ্ছে।

উল্লেখ্য, আঐ গ্রামের আতিক উল্যাহ দালালের মাধ্যমে গত রমজান মাসে পরিবারের স্বচ্ছলতার জন্য জীবিকার তাগিদে দুই ছেলেকে দেশে রেখে সৌদি আরব পাড়ি জমান মরিয়ম আক্তার। সেখানে মরিয়ম একটি বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করতেন।

সম্প্রতি তার নির্যাতন ও যৌন হয়রানির কথা জানিয়ে একটি ভিডিও ও একাধিক ভয়েস রেকর্ড কান্নাজড়িত কণ্ঠে পরিবারে সদস্যদের পাঠায়। পরিবারের সদস্যরা দালাল, গ্রামের মেম্বার, মুরুব্বিদের জানিয়েও দেশে ফেরাতে পারছে না মরিয়মকে।

এদিকে, মৃত আবুল হোসেনের মেয়ে মরিয়ম আক্তারের সাথে যোগাযোগের পর তিনি জানান, যে সৌদিতে মরিয়মের ওপর অমানুষিক, শারীরিক মানসিক ও যৌন নির্যাতন চালানো হচ্ছে। তাকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, রিয়াদ বাংলাদেশ দূতাবাসের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেন নির্যাতিত মরিয়ম আক্তারের মা জামিলা বেগম।

মরিয়মের মা জমিলা বলেন, ‘আমার মেয়েরে বিদেশে নিয়ে বেছে দিয়েচ্ছে আতিক উল্যাহ দালালে। তার কাছে গেলে সে দেশে ফেরত আনবার জন্য ২ লাখ টাকা চায়। আমার মেয়েরে কফিল তারা খানি দেয় না, ডাক্তার দেখায় না, কামের লাইগা মারে। যৌন নির্যাতন করে। দেশে না আনলে আমার মাইয়া মইরা যাইব। সরকারের কাছে দাবি আমার মেয়েটা বাইচ্চা থাকতে যেন দেশে আইন্যা দেয়।’

নির্যাতনের বিষয়ে দালাল আতিকুলে সঙ্গে যোগাযোগ করলে জানায়, আমারে নির্যাতনের ভিডিও, রেকর্ড দেখাইছে। তারা বলছে আমি দেশে ফিরাই আইনা দিতাম। আমার পক্ষে দেশে আনা সম্ভব না। আমি ঘর পাল্টাই দিতে পারবো।

এইচআর
আরও পড়ুন...
আমারে সৌদি থেকে লইয়া যাও: মরিয়মের আর্তনাদ

 

সিলেট: আরও পড়ুন

আরও