'আমাদের ক্রিকেট একটা জায়গায় এসে থেমে আছে'

ঢাকা, শনিবার, ১৯ আগস্ট ২০১৭ | ৪ ভাদ্র ১৪২৪

'আমাদের ক্রিকেট একটা জায়গায় এসে থেমে আছে'

রামিন তালুকদার ৭:২৫ অপরাহ্ণ, জুলাই ১০, ২০১৭

print
'আমাদের ক্রিকেট একটা জায়গায় এসে থেমে আছে'

মেয়ে ক্রিকেটার হোক। এখনো এই দেশে বেশির ভাগ বাবা-মা তা চাননা। রক্ষণশীল পরিবার থেকে উঠে এসেও রুমানা আহমেদ এখন বাংলাদেশ জাতীয় নারী দলের অধিনায়ক। নিয়মিত পারফর্মার। ব্যাটে ও বলে। বাবা-মা ও পরিবার তাকে তার ইচ্ছেটা পূরণ করতে দিয়েছে বলেই না! সেই রুমানার আক্ষেপ, চোখের সামনে কদিন আগেও তাদের সমশক্তির দলগুলো কিভাবে দ্রুত উন্নতির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। আর যখন চলমান বিশ্বকাপে তাদের খেলার কথা তখন দর্শক হয়ে মন খারাপ করে খেলা দেখতে হচ্ছে। রুমানার মনে হয়, নারী ক্রিকেট একটা জায়গায় এসে আর এগুতে পারছে না। কেন? রামিন তালুকদার পরিবর্তন ডটকমের জন্য ক্যাপ্টেনের বিশেষ এই সাক্ষাৎকারে তুলে এনেছেন আরো দারুণ কিছু।

পরিবর্তন : বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটে ইতিহাসে প্রথম হ্যাটট্রিক আপনার। আয়ারল্যান্ডে। ২০১৬ সালে। এটা তো অমরত্ব পেয়ে যাওয়া। সেদিন কি অনুভূতি ছিল আর এখন ওটা ভাবলে কেমন লাগে?

রুমানা : তখন এবং এখন দুই ক্ষেত্রেই আমার অনুভূতি একইরকম। এটা আমার অন্যরকম রেকর্ড। নিজেই অবাক হয়ে যাই যে আমি হ্যাটট্রিক করেছি একটা। সবচেয়ে বড় কথা ওদের দেশে ওদের আম্পায়ার আমাকে পর পর তিনটা এলবিডাব্লিউ দিয়েছে। এটা আসলে ভাবতেই পারিনি। এটা আসলেই আমাকে অবাক করেছে।

পরিবর্তন : ১০৬ রান করেও ওই ম্যাচ ১০ রানে জিতেছিলেন। এমন টাফ ম্যাচ কি ২০১১ সালে অভিষেক হওয়ার পর আর খেলেছেন?

রুমানা : হ্যাঁ, আরও বেশ কিছু ম্যাচেই আমরা কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছি। দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়েছি। ভারতের বিপক্ষে একটা ম্যাচে খুব কাছে গিয়ে অল্পের জন্য হেরেছিলাম। ওদের মাঠে গিয়ে খুব কাছে গিয়ে হেরেছিলাম।

পরিবর্তন : আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে আপনার হ্যাটট্রিকের ম্যাচে স্পিনাররা নিয়েছিলেন ৮ উইকেট। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি স্পিন, পিছিয়ে পেসাররা। এটা কি আমাদের দেশের নারীদের শারীরিক সামর্থ্যের কারণে ঘটছে?

রুমানা : আসলে পেস বা স্পিন ব্যাপার না, ব্যপারটা হচ্ছে যত্ন নেওয়ার। যাদের যত্ন নেবেন তারাই ভালো করবে। আমাদের পেসাররা দুর্বল এটা ঠিক না। বলতে পারেন আমাদের পেসার সংখ্যার স্বল্পতা। এটাই কারণ। আমাদের জাহানারা আর পান্না ছাড়া তেমন ভালো কোন পেসার নেই। ওরা নিয়মিত বল করে যাচ্ছে। ওয়ানডেতে ওরা ২০ ওভার করে আবার টি-টয়েন্টি ৮ ওভার করছে। পেসার বের করার জন্য একটা পেসার হান্ট হয়েছে, এরপর তেমন যত্ন নেওয়া হয়নি। এবার কিছু টুর্নামেন্টে আমাদের পেসাররা ভালো করেছে। তাদের যদি যত্ন নেওয়া যায় দেখা যাবে স্পিনারদের চেয়ে পেসাররাই ভালো করবে।

পরিবর্তন : পেসার তো খুব উঠেও আসছে না। বিশেষ কোনো পেসার হান্ট এবং তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিচর্যা করা জরুরি নাকি?

রুমানা : আমাদের বোর্ড থেকে আশ্বাস দিয়েছে গেম ডেভেলপমেন্টের অধীনে কাজ করবে। সেখানে যদি পেসারদের জন্য আলাদা করে কাজ করা হয় খুব ভালো হয়।

পরিবর্তন : হঠাৎ করে অধিনায়ক হয়েছিলেন। তার কিছুদিন আগেই অধিনায়ক হয়েছিলেন জাহানারা। এভাবে আচমকা নেতৃত্ব পেয়ে কেমন অনুভূতি হয়েছিল?

রুমানা : আসলে এটা খুব অবাক করা একটা ব্যপার ছিল। এটা শোনার পর থেকেই আমার গা হাত পা কাঁপছিল। আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না যে হঠাৎ এমন একটা পরিবর্তন আসবে। জাহানারার অধিনায়কত্ব তখন এক বছরও যায়নি। তাও দুই সংস্করণেই পরিবর্তন। আশা ছিল পেতে পারি তবে এভাবে হঠাৎ পাবো আশা করতে পারিনি।

পরিবর্তন : দক্ষিণ আফ্রিকাকে শেষ সিরিজে একটি ম্যাচে কক্সবাজারে হারিয়েছিলেন। কিন্তু ওদের সাথে আমাদের পার্থক্য আসলে কতোটা?

রুমানা : পার্থক্যতো আমরা ওদের দিকে তাকালেই দেখতে পারি। এবারের বিশাকাপে ওরা কিন্তু খুব ভালো করছে। ওরা খুব ইতিবাচক ক্রিকেট খেলে। অনেক নিশ্চিন্তে খেলে। আমরা বছরে চার পাঁচটা ম্যাচ বা যাই খেলি তা দেখা যায় বিশেষ কোন টুর্নামেন্ট। ধরেন বিশ্বকাপ বা বাছাই পর্ব কিংবা এশিয়া কাপ। আমাদের প্রস্তুতিটা কম থাকে। নিজেদের তৈরি করতেও ঠিকমতো পারি না। এদিক থেকে ওরা অনেক এগিয়ে। শুধু দক্ষিণ আফ্রিকা না অন্য প্রায় সব দল থেকেই।

পরিবর্তন : জাহানারা বলেছেন, চলমান ২০১৭ বিশ্বকাপেই আমাদের খেলার যোগ্যতা ছিল। আপনি কি তা বিশ্বাস করেন? আর বিশ্বাস করলে কেন হলো না?

রুমানা : তাতো অবশ্যই। আমাদের দলের প্রশংসা অন্য সব দলই করে। অনেক দলের ম্যানেজাররা এসে বলে তোমাদের বোলিং লাইন আপ অনেক ভালো।

পরিবর্তন : আগামী বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে খেলতে হলে কি জাতীয় ভুল শুধরে কি কাজ করে যেতে হবে?

রুমানা : দেখেন আপনারা যাচাই করলেই দেখবেন আমরা খেলা পাই কয়টা। আন্তর্জাতিক ম্যাচ না পেলেও আমাদের ঘরোয়া ক্রিকেট দিয়ে এগিয়ে থাকতে হবে। একদিক না পেলে আরেক দিক থাকতে হবে। যদি দুইটাই বন্ধ থাকে তাহলে উন্নতি হবে কি দিয়ে।

পরিবর্তন : বিশ্বকাপ বাছাইয়ে আমাদের দুর্বলতা ব্যাটিংকে সবল বলা হয়েছিল। কিন্তু তা হয়নি। বোলিংই টেনে নিয়ে গেছে। ব্যাটিংয়ে এই নিয়মিত ব্যর্থতার কারণ কি?

রুমানা : আসলে ব্যাটাররা ব্যর্থ এটা আমি বলবো না কারণ আমি নিজেও একজন ব্যাটার। আর একজন ব্যাটার যতো খেলবে ততো তার খেলার ধার বাড়বে। ব্যাটিং একটা সাধনার ব্যপার। এটা ম্যাচ খেলার উপর অনেকটা নির্ভর করে। বোলিং কিন্তু ওইভাবে করা যায়। কারণ একটা ভুল হলেও ফিরে আসার সুযোগ থাকে। কিন্তু ব্যাটারদের একটাই সুযোগ। ভুল হলেই শেষ।

পরিবর্তন : লেগ স্পিন সবচেয়ে কঠিন আর্ট। এমন কঠিন বোলিংয়ে আসার পেছনে গল্প কি?

রুমানা : হ্যাঁ, এটা আসলেই একটা গল্প। আমি কিন্তু প্রথমে লেগ স্পিনার ছিলাম না। ২০০৯ সালে আমি দল থেকে বাদ পরি এরপর আমি অনেক কষ্ট পেয়েছিলাম। নিজে নিজে অনুভব করেছিলাম আমার অনেক ঘাটতি আছে। দলে ফিরতে হলে আমাকে সেরা হয়েই ফিরতে হবে। এই মনোবল নিয়ে তখন আমি নিজে নিজে লেগ স্পিন শুরু করি পাশাপাশি ব্যাটিং। বাংলাদেশে তখন লেগ স্পিনার তেমন ছিলো না তাই আমার স্যারেরাও অনেক উৎসাহ দিয়েছেন। যার কারণে আস্তে আস্তে আত্মবিশ্বাসী হয়ে গেছি।

পরিবর্তন : বাংলাদেশের ক্রিকেট এখন কোথায় আছে? দ্রুত উন্নতি করতে হলে কি করতে হবে?

রুমানা : আমাদের ক্রিকেট আসলে একটা জায়গায় এসে থেমে আছে। আমরা কিন্তু শুরুটা ভালো করেছিলাম। কিন্তু এরপর একটা জায়গায় এসে থেমে গিয়েছি। আমাদের পাশের সবাই এগিয়ে গেছে।  আমরা সেই আগের জায়গাই আছি। ২০১১ সালে ওয়ানডে স্ট্যাটাস পাওয়ার পর আমরা কয়টা ম্যাচ খেলেছি। এই ছয় বছরে দেখেন আমরা কয়টা ম্যাচ খেলেছি আর অন্যরা কয়টা। তবে আমাদের মেধা কিন্তু কম নেই। আমাদের বেশ ভালো কিছু খেলোয়াড় আছে। অনেক রেকর্ডও আছে। কুবরা কিংবা পিঙ্কির কথাই ধরেন, খুব ভালো খেলছে। আমাদের আসলে প্রতিভার বিকাশ হচ্ছে না।

পরিবর্তন : এই দেশে মেয়ে ক্রিকেটারদের ঘাটতি। আরো মেয়ে ক্রিকেটার পাইপলাইনে আনতে কি করা দরকার?

রুমানা : আমাদের কিন্তু হাতে গোনা কয়েকটা জায়গায় মেয়েদের অনুশীলন করানো হয়। গুনে গুনে বলে দেওয়া যাবে কোথায় কোথায়। খুলনায় আমাদের পিলু স্যার, বগুড়ায় মোসলেম স্যার আর বিকেএসপি। অন্য জায়গায় মেয়েদের সুযোগ নেই। ছেলেরা যে কোন জায়গায় এমনকি রাস্তায়ও খেলতে পারে। ছেলেদের বিভিন্ন এলাকায় বোর্ড থেকে কোচও আছে। বয়সভিত্তিক দল আছে। তেমন করে যদি মেয়েদের কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হতো তাহলে ভালো হতো। অনেক মেয়েরা খেলায় এসে আবার নিরাশ হয়ে ফিরে যায় কারণ মাঠে খেলা থাকে না। মেয়েদের ‘এ’ দলের কাজ যদি শুরু হতো। মেয়েদের অনুশীলনের সুযোগ ও খেলার মাঠ বাড়িয়ে দেওয়া যায়।

পরিবর্তন : ক্যারিয়ার শেষে নিজেকে কোথায় দেখতে চান? মানে নির্দিষ্ট সংখ্যক উইকেট?

রুমানা : আমি নিজেকে একজন সফল অল-রাউন্ডার হিসেবে দেখতে চাই। সেরা ১০ অল-রাউন্ডারের তালিকায় থাকতে চাই। আর আমার এখন প্রথম লক্ষ্য আমাদের দলকে র্যায়ঙ্কিংয়ের সেরা আটে এনে আমাদের মেয়েদের সুযোগ সুবিধা বাড়ানো।

পরিবর্তন : আপনার দলের সবচেয়ে বেশি শক্তি আর দুর্বলতা কোথায়?

রুমানা : আমরা কিন্তু নিজেদের প্রকাশ করার সুযোগ খুব কম পাচ্ছি। আমরা যে উন্নতি করেছি এটা দেখানোর জায়গাটা কম। আমাদের ব্যাটিং এবং বোলিং ঠিক আছে। আমার মনে ফিল্ডিংয়ে আরও কিছু কাজ করা দরকার। ফিল্ডিংটায় আমরা একটু পিছিয়ে আছি। ফিল্ডিং যে খুব খারাপ ছিল তা না হঠাৎ করে কিছুদিন থেকে আমাদের এখানে ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

পরিবর্তন : পুরুষ দল এখন যে অবস্থানে আছে সেই অবস্থানে আপনাদের যেতে কতো বছর লাগতে পারে বা কি কি উদ্যোগ নিলে আরো দ্রুত আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শক্তি হিসেবে দ্রুত নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করা যায়?

রুমানা : দিন গুনে আসলে কিছু হয় না। সব দলেই কিছু শক্তিশালী দিক থাকে। আমাদের ছেলেদের দলে যেটা আছে সেটা হলো আত্মবিশ্বাস। এই আত্মবিশ্বাসে আমরা অনেক এগিয়ে যাচ্ছি। এই আত্মবিশ্বাসটা আমাদের অনেক কম। আমরা যদি বিশ্বাস করি যে আমি কারো চেয়ে খারাপ না তাহলে অনেক ভালো করতে হবে। আমাদের বোলিং বিশ্বের যে কোনও দলের চেয়ে ভালো। আমার যদি ম্যাচের পরিমাণ বাড়াতে পাড়ি তাহলে খেলতে খেলতে আমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়বে। তাহলে খুব বেশি দেড়ি হবে।

পরিবর্তন : কোন খেলোয়াড়কে আপনি ফলো করেন কিংবা আপনার আদর্শ কে?

রুমানা : আদর্শ বলতে আমি অনেক আগে থাকতেই শেন ওয়ার্নকে ফলো করি। ওনার বল আমার কাছে ম্যাজিক বল বলে মনে হয়। ওনার বল যত দেখি তত অবাক হই। এখন উনি নাই সত্যি বলতে কি অনেক মিস করি উনাকে।

পরিবর্তন : বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার লেগি ড্যান নিকার্ক ০ রানে ৪ উইকেট নিয়ে বিশ্বরেকর্ড গড়লেন। তার সাথে খেলেছেন। তাকে কি নিজের চেয়ে ভালো লেগ স্পিনার মনে হয় আপনার?

রুমানা : সে তো অবশ্যই ভালো বোলার। অনেক বড় একটা রেকর্ড করেছে। অর থেকে আমার যেটা কম সেটা হলো আমার ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতাটা কম। গড় দেখলে দেখবেন ওর থেকে আমি এগিয়ে আছি। আমার ২৩ ম্যাচে উইকেট আছে ৩০টা।

পরিবর্তন : বাবা-মায়েরা তো মেয়েদের ক্রিকেটার হতে দিতে আগ্রহী না। আপনি কি কি বাধা পার করছেন আর ক্রিকেটার হওয়ার গল্পটা বলবেন কি?

রুমানা : এই দিক থেকে আমি একটু ভাগ্যবতী। আমার পরিবার আমাকে সবসময় সমর্থন করেছে। ছোটবেলা থেকেই আমার খেলাধুলার প্রতি অনেক আকর্ষণ ছিল। কিন্তু তেমন সুযোগ ছিলোনা। আর আমাদের পরিবারও একটু কঞ্জারবেটিভ ছিল। আমাদের বড় উঠান ছিল ওইখানেই আমরা খেলতাম। এসএসসির পর আমি আমার ভাইকে বললাম আমি খেলতে চাই। বাসা থেকে বলছে তুমি যদি ভালো করো তাহলে খেলবে। ভালো না করলে পড়াশুনা করতে হবে। তবে আসেপাশের লোকজন নানা কথা বলতো। এরপর আমাদের খুলনার পূর্বাঞ্চল পত্রিকায় দেখি মেয়েরা খেলা শুরু করেছে। ওইখানে গিয়ে খেলার পর স্যাররা অনেক প্রশংসা করলো। প্রথম সপ্তাহেই বলেছিল তুমি যদি ক্রিকেটে লেগে থাকো তাহলে একদিন জাতীয় দলে খেলতে পারবে। স্যারদের এ কথাতেই মুগ্ধ হয়ে খুব পরিশ্রম করা শুরু করলাম। তখনই পণ করেছিলাম আমাকে ক্রিকেটার হতে হবে জাতীয় দলে খেলতে হবে। তারপর জেলা পর্যায়ের খেলা ও ক্লাব কাপ থেকে জাতীয় দলে সুযোগ পাই। এখন পর্যন্ত হাল ছাড়িনি।

আরটি/ক্যাট

print
 
nilsagor ad

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad