লুকা মড্রিচ, উদ্বাস্তু শিবির থেকে বিশ্বসেরা

ঢাকা, শনিবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৭ | ১ পৌষ ১৪২৪

লুকা মড্রিচ, উদ্বাস্তু শিবির থেকে বিশ্বসেরা

খলিলুর রহমান ৬:০৪ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৮, ২০১৭

print
লুকা  মড্রিচ, উদ্বাস্তু শিবির থেকে বিশ্বসেরা

ফুটবলের রাজা পেলের ছোটবেলার গল্পটা সবার জানা। দরিদ্র ঘরে জন্ম নেওয়া ছোট্ট পেলের ফুটবল খেলার শুরুটা রাস্তায়। ব্রাজিলের পূর্ব-দক্ষিণাঞ্চলের প্রদেশ মিনাস গেরাইসের নোংরা রাস্তায় ফুটবল খেলতেন খড় দিয়ে বল বানিয়ে! সেই পেলে পরবর্তী জীবনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন সর্বকালের অন্যতম সেরা হিসেবে। ফুটবলার হিসেবে কিংবদন্তি পেলের সঙ্গে লুকা মড্রিচের তুলনা হয় না। তবে রিয়াল মাদ্রিদের ক্রোয়েশিয়ান মিডফিল্ডারের ছোটবেলার গল্পটা পেলের গল্পের চেয়েও করুণ।

.

সন্দেহাতীতভাবেই বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার লুকা মড্রিচ। রিয়াল মাদ্রিদের সাম্প্রতিক শিরোপা সাফল্যের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন মড্রিচ। সম্প্রতি নির্বাচিত হয়েছেন ফিফা ১৮ প্রোগ্রামের বিশ্বের সেরা রাইট-মিডফিল্ডার।

আজকের বিশ্বসেরা মড্রিচের সঙ্গে ছোটবেলার মড্রিচের গল্পটা একদমই মেলে না! কেমন যেন অবিশ্বাস্য মনে হয়। জন্মের কয়েক বছর পরই যাকে আশ্রয় নিতে হয় উদ্বাস্তু শিবিরে, ফুটবলার হওয়ার স্বপ্নের চারা লাগাতে গিয়ে শুরুতেই খেতে হয় অমানবিক ধাক্কা, শারীরিক আকৃতির কারণে যাকে দলে নিতে অস্বীকৃতি জানায় ক্লাব, সময়ের পথ বেয়ে সেই লুকা মড্রিচ এখন বিশ্বসেরা।

হিসাবটা মেলাবেন কি করে? অন্যরা না পারলেও সব প্রতিবন্ধকতা এবং প্রতিকূল পরিবেশকে জয় করে হিসাবটা মিলিয়েছেন লুকা মড্রিচ। কিভাবে হিসাবটা মিলিয়েছেন মড্রিচই তা ভালো জানেন। জানেন তার বন্ধু, শুভাকাঙ্খিরাও। ফুটবলের জনপ্রিয় ওয়েবসাইট গোল ডট কমের সঙ্গে বিশ্বসেরা মড্রিচের গল্প করতে গিয়ে তার ছোটবেলার কষ্টের গল্পটাই খুলে বলেছেন তার বন্ধু গ্রগুরোভিচ।

আধুনিক যুগে জন্ম বলেই হয়তো পেলের মতো মড্রিচকে খড় দিয়ে বল বানিয়ে খেলতে হয়নি। তবে তারও শুরুটা হয়েছে রাস্তায়। রাস্তায় রাস্তায় ফুটবল খেলেই মনের গহীনে বুনে ফেলেন ফুটবলার হওয়ার স্বপ্নের বীজ। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথে পা বাড়াতে গিয়ে প্রথম পদক্ষেপেই ছোট্ট মড্রিচকে খেতে হয় অনেক বড় এক ধাক্কা। কচি বয়সেই হতে হয় তাচ্ছিল্যের শিকার!

মড্রিচের জন্ম ১৯৮৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর, ক্রোয়েশিয়ার জাদারের মড্রিচি গ্রামে। ক্রোয়েশিয়ানদের রীতি গ্রাম আর পরিবারের পূর্বসূরিদের নামানুসারেই রাখা হয় নাম। লুকার ক্ষেত্রে দুটো নিয়মই মানা হয়েছে। তার দাদার নাম ছিল লুকা, ১৯৯১ সালে যাকে মেরে ফেলে সার্বিয়ান সেনাবাহিনীর সদস্যরা। তো দাদা এবং গ্রামের নামের সঙ্গে মিলিয়েই তার নাম রাখা হয় লুকা মড্রিচ।

কিন্তু খুব বেশিদিন নিজ গ্রামে থাকতে পারেননি লুকা মড্রিচ। দাদা লুকাকে মেরে ফেলার পরই তার বাবা তাকে নিয়ে আশ্রয় নেন উদ্বাস্তু শিবিরে। ছোট্ট মড্রিচ উদ্বাস্তু হোটেলে থাকেন আর ফুটবল খেলে বেড়ান রাস্তায় রাস্তায়। এভাবে খেলতে খেলতেই একদিন মনের কোণে বাসা বাধে স্বপ্ন। হবেন ফুটবলার।

এই স্বপ্ন বুকে নিয়েই মাত্র ১০ বছর বয়সে মড্রিচ যান ক্রোয়েশিয়ান ক্লাব হাজদুকে। লক্ষ্য হাজদুকের স্কাউট দলে ভর্তি হবেন। এই স্বপ্নযাত্রায় সঙ্গী ছিল তার বন্ধু গ্রগুরোভিচও। কিন্তু বন্ধু গ্রগুরোভিচের স্বপ্ন পূরণ হলেও কাচের টুকরোর মতো টুকরো টুকরো হয়ে যায় মড্রিচের স্বপ্ন। শারীরিক আকৃতির কারণে তাকে দলেই নেয়নি হাজদুক।

ছোটখাট গড়ন। শরীর লিকলিকে হাড্ডিসার। এই ছেলে ফুটবল খেলবে, ফুটবলার হবে? ছোট্ট মড্রিচকে দেখে এভাবেই তাচ্ছিল্য-ভাব দেখিয়ে তাকে দলে নিতে অস্বীকৃতি জানায় হাজদুক। বড় ফুটবলার স্বপ্ন নিয়ে বন্ধু গ্রগুরোভিচ হাজদুকের স্কাউট দলে শুরু করেন খেলা। হতাশায়, অপমানে তাচ্ছিল্যের বেদনা নিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে হয় মড্রিচকে।

হাজদুকের স্কাউট দলের কর্তারা নাকি মড্রিচের চেয়ে গ্রগুরোভিচকেই বেশি প্রতিভাবান হিসেবে রায় দেন। অথচ সেই গ্রগুরোভিচ ফুটবলার হিসেবে ক্যারিয়ারই গড়তে পারেননি। আর ‘প্রত্যাখ্যাত’ মড্রিচ নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন অন্য উচ্চতায়। খেলেন রিয়াল মাদ্রিদের মতো বিশ্বসেরা ক্লাবে। ক্রোয়েশিয়া জাতীয় দলেরও অধিনায়ক।

বন্ধু গ্রগুরোভিচ তাই আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘আমি বলছি না যে, সে হাজদুকে ব্যর্থ হয়েছিল। আপনি খুব অল্প সময়ে একটা ছেলের মান যাচাই করতে পারবেন না। তবে যে কারণেই হোক, সে জাদারে ফিরে যায়। ওই সময়ে আমিই বেশি প্রতিভাবান হিসেবে বিবেচিত হয়েছিলাম। ফুটবল আসলে এমনই। লুকার চেয়ে বেশি প্রতিভাবান হওয়া সত্ত্বেও আমি ফুটবলে ক্যারিয়ার গড়তে ব্যর্থ। আর লুকা এখন কোথায়!’

হাজদুকে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর কয়েক বছর ফুটবলার হওয়ার বাসনাটা চেপেই রেখেছিলেন। তবে ২০০০ সালে ১৫ বছর বয়সে ঠিকই নাম লেখান ডায়নামোতে। সেখানেই তার ফুটবলার হওয়ার শুরু। ছোট মড্রিচের বর্ণনা করতে গিয়ে গ্রগুরোভিচ বলেছেন, ‘ছোটবেলায় সে ছিল খুবই শান্ত একটা ছেলে। মাঠের বাইরে সে কিছুই করত না। একমাত্র ফুটবলের প্রতিই আগ্রহ ছিল তার। আমি অবাক হই যে, যারা বলেন, সেই ছোটবেলাতেই তারা বুঝতে পারেন লুকা একদিন বড় ফুটবলার হবে। এটা ফালতু কথা! একমাত্র ডায়নামোর অধিনায়ক হওয়ার পরই পরিস্কার হয়ে যায়, সে সত্যিই বড় খেলোয়াড় হবে।’

ছোট্ট মড্রিচকে দলে নিতে ডায়নামোকে সুপারিশ করেছিলেন টমিস্লাভ বাসিক। এই ভদ্রলোককেই মনে করা হয় মড্রিচের ‘ফুটবল পিতা।’ মড্রিচ সময় উপলক্ষ্য পেলেই কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন বাসিকের কথা। শুধু ডায়নামোতে যোগ দেওয়ার ব্যাপারেই নয়, ২০১৪ সালে ইংলিশ ক্লাব টটেনহাম থেকে রিয়ালে যোগ দেওয়ার পেছনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন বাসিক।

ক্লাবের হয়ে হোক বা জাতীয় দল, মাঠে মড্রিচের ভূমিকা কেমন, সেটা দারুণভাবেই ফুটিয়ে তুলেছেন ক্রোয়েশিয়ান ক্লাব ইন্টার জাপ্রেসিকের সাবেক কোচ স্রিকো বোডান। ২০০৪-২০০৫ মৌসুমে ডায়নামো জাগরেব থেকে ধারে খেলেছেন ইন্টার জাপ্রেসিকোতে। ওই সময়ে ক্লাবটির কোচের দায়িত্বে ছিলেন বোডান। কাছ থেকে দেখার সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি বলেছেন, ‘আজও সে একই রকম। যদি সে তার মানের চেয়ে খারাপ খেলে, পুরো দলই খারাপ খেলে।’

ভদ্রলোকের কথা, লুকা মড্রিচ নিজেই খেলেন না, পুরো দলকেই খেলান। রক্ষণভাগের সঙ্গে আক্রমণভাগ গেথে ফেলেন এক সুতোয়। এ জন্যই তো তিনি বিশ্বসেরা।

কেআর

print
 

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad