সরকারি ওয়েবসাইট থেকে গায়েব আসাম এনআরসির তথ্য!
Back to Top

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল ২০২০ | ১৯ চৈত্র ১৪২৬

সরকারি ওয়েবসাইট থেকে গায়েব আসাম এনআরসির তথ্য!

পরিবর্তন ডেস্ক ৪:০৩ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২০

সরকারি ওয়েবসাইট থেকে গায়েব আসাম এনআরসির তথ্য!

ভারতের আসামে হওয়া জাতীয় নাগরিক পঞ্জির (এনআরসি) সমস্ত তথ্যই সরকারি ওয়েবসাইট থেকে গায়েব হয়ে গিয়েছে।

বিরোধীদের দাবি, এনআরসির সমস্ত তথ্যই গায়েব করে দেওয়া হয়েছে।

যদিও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি, গোটাটাই প্রযুক্তিগত ত্রুটি।

দেশটির আনন্দবাজার পত্রিকার খবরে বলা হয়, রাজ্যে এই এনআরসি করতে সময় লেগেছিল ৬ বছর। খরচ হয়েছিল প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি রুপি। প্রচুর মানুষের হেনস্থা হয়, মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।

এনআরসি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সাম্প্রতিক পরস্পর বিরোধী মন্তব্যে দেশ জুড়ে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে।

এরই সঙ্গে বিভ্রান্তি বাড়িয়েছে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) এবং জাতীয় জনসংখ্যা পঞ্জি (এনপিআর)।

এই তিনের জেরে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন দেশের একটা বড় অংশের মানুষ। সেই আতঙ্কের আবহে এবার সরকারি ওয়েবসাইট থেকে আসামের এনআরসি সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য উধাও হয়ে গেল।

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশেই ওই তথ্য অনলাইনে প্রকাশ করা হয়েছিল। কিন্তু, গত দু’মাস ধরে তা দেখা যাচ্ছে না।

প্রযুক্তিগত কারণে এই সমস্যা দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

কিন্তু, এর পেছনে রহস্যের গন্ধ পাচ্ছে বিরোধী শিবির কংগ্রেস। আচমকা সমস্ত তথ্য উধাও হয়ে গেল কী ভাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে তারা।

এনআরসির চূড়ান্ত তালিকায় কাদের নাম রয়েছে এবং কাদের বাদ গিয়েছে তা জানতে এতদিন একটি ওয়েবসাইটে (www.nrcassam.nic.in) গিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় ক্লিক করলেই সে সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য দেখা যেত।

কিন্তু ইদানিং ওই ওয়েবসাইটের নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে ক্লিক করলে ‘এরর’ দেখাচ্ছে। প্রায় দু’মাস ধরে এই সমস্যা চলছে। তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থা ‘উইপ্রো’র সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যাওয়াতেই এমন সমস্যা দেখা দিয়েছে বলে দাবি করেছেন আসামে এনআরসির বর্তমান কো-অর্ডিনেটর হিতেশ দেব শর্মা। এই সমস্যার জন্য তার পূর্বসূরি প্রতীক হাজেলাকেই দায়ী করেছেন তিনি।

সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হিতেশ বলেন, ‘গত বছর ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত ক্লাউড পরিষেবা এবং ওয়েবসাইট সংক্রান্ত সব কিছুর দায়িত্ব ছিল বেসরকারি সংস্থা উইপ্রোর হাতে। কিন্তু আমার আগে যিনি দায়িত্বে ছিলেন, তিনি চুক্তি পুনর্নবীকরণ করেননি। সে জন্য গত ১৫ ডিসেম্বর থেকে ওয়েবসাইটে কোনও তথ্যই পাওয়া যাচ্ছে না।’

তার দাবি, বিষয়টি নিয়ে উইপ্রোর সঙ্গে নতুন করে কথাবার্তা চলছে এবং খুব শিগগিরই একটা সুরাহা হবে।

হিতেশ বলেন, ‘আমি ২৪ ডিসেম্বর দায়িত্ব পেয়েছি। ফেব্রুয়ারির শুরুতেই এ নিয়ে উইপ্রোকে চিঠিও দেওয়া হয়েছে। ওরা কাজে হাত লাগালেই, ফের সমস্ত তথ্য ওয়েবসাইটে ফিরে আসবে। আগামী দু’-তিন দিনের মধ্যেই তা ফের দেখতে পাবেন সাধারণ মানুষ।’

সুপ্রিম কোর্টের নজরদারিতেই আসামে এনআরসি হয়েছিল। চূড়ান্ত তালিকায় বাদ পড়েছিল প্রায় ১৯ লক্ষ মানুষের নাম। তার মধ্যে অন্তত ১৩-১৪ লক্ষ হিন্দু। তালিকা প্রকাশ হতেই অস্বস্তিতে পড়ে যায় রাজ্যের শাসক দল বিজেপি।

চূড়ান্ত তালিকায় বেশির ভাগ হিন্দুদের নাম বাদ পড়ায় ভোট ব্যাঙ্কে বিরূপ প্রভাব পড়বে বলে শীর্ষ নেতৃত্বকে জানিয়েছিল আসাম বিজেপি। এমনকি সঙ্ঘ পরিবারের তরফেও চাপ বাড়ছিল বলে জানা যায়।

সেই আবহে গত নভেম্বরে রাজ্যসভায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ জানিয়ে দেন, গোটা দেশের সঙ্গেই আসামে নতুন করে এনআরসি হবে।

রাজ্য বিজেপিও দাবি তোলে, আসামের এনআরসি পুরোপুরি বাতিল করে সারা দেশের সঙ্গে নতুন করে এনআরসি হোক।

সেই সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুক্তি ছিল, আসাম চুক্তি অনুযায়ী ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চকে এনআরসি তৈরির ভিত্তিবর্ষ বলে ধরা হয়েছিল। ভবিষ্যতে দেশের সব রাজ্যে যখন এনআরসির কাজ শুরু হবে তখন অতীতের একটি নির্দিষ্ট দিনকে ধরে তার ভিত্তিতে তালিকা তৈরি হবে।

কোন বছরের কোন তারিখের ভিত্তিতে ওই কাজ শুরু হবে তা এখনও ঠিক হয়নি। তবে ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ ভিত্তিবর্ষ হবে না বলেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়। কারণ, এক দেশে দু’টি ভিত্তিবর্ষ হতে পারে না। তাই গোটা দেশে যে ভিত্তিবর্ষ ধরা হবে, সেটির হিসাবে আসামেও নতুন তালিকা তৈরি করা হবে।

অমিত শাহ সেই কারণেই রাজ্যসভায় ওই মন্তব্য করেছিলেন বলে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গিয়েছিল।

সেই সময় বিরোধীরা প্রশ্ন তুলেছিল, এনআরসিতে হিন্দুরা বাদ যাচ্ছে বলে যে প্রচার শুরু হয়েছে তা আটকাতেই ১ হাজার ৬০০ কোটি রুপি জলাঞ্জলি দিতে চান নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহেরা।

তাদের আরও প্রশ্ন ছিল, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে করা তালিকা এ ভাবে বাতিল করা কি শীর্ষ আদালতের অবমাননা নয়?

এখন জানা যাচ্ছে এনআরসির কোনও তথ্যই আর অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে না, তখন বিরোধীদের প্রশ্ন, ১৬০০ কোটি রুপি খরচ হল, কোটি কোটি মানুষ হয়রান হলেন, বহু আত্মঘাতী হলেন, সেই ক্ষতিপূরণ কে দেবে?

বিষয়টিকে একেবারেই হালকা ভাবে নিতে রাজি নয় আসাম প্রদেশ কংগ্রেসও। এ নিয়ে ভারত সরকারের রেজিস্ট্রার জেনারেল ও সেনসাস কমিশনারকে ইতিমধ্যেই অভিযোগপত্র পাঠিয়েছে তারা।

সেখানে বলা হয়েছে, ‘এনআরসির ওয়েবসাইট থেকে আচমকাই সমস্ত তথ্য উড়ে গিয়েছে। তালিকায় কার নাম রয়েছে, কার নাম বাদ গিয়েছে, কিছুই দেখা যাচ্ছে না। সাধারণ মানুষ যাতে সব কিছু হাতের কাছে পান, তার জন্য সুপ্রিম কোর্টই ওই সমস্ত তথ্য অনলাইন প্রকাশ করতে নির্দেশ দিয়েছিল। আচমকা সব কিছু কী ভাবে উড়ে গেল, তা রহস্যজনক ঠেকছে।’

আসাম বিধানসভার বিরোধী দলনেতা কংগ্রেসের দেবব্রত সাইকিয়া ওই চিঠিতে লিখেছেন, ‘যাঁদের নাম বাদ গিয়েছে, এখনও তারা নাগরিকত্ব পেতে আবেদনই করে উঠতে পারেননি। তার মধ্যে সমস্ত তথ্য উড়ে যাওয়ার পিছনে ষড়যন্ত্র রয়েছে।’

এসবি

 

আন্তর্জাতিক: আরও পড়ুন

আরও