ঢাকার ‘ডন’ তানভীরই কি কানাডার বিখ্যাত ব্যবসায়ী তারেক!

ঢাকা, রবিবার, ২৬ জানুয়ারি ২০২০ | ১৩ মাঘ ১৪২৬

ঢাকার ‘ডন’ তানভীরই কি কানাডার বিখ্যাত ব্যবসায়ী তারেক!

পরিবর্তন ডেস্ক ৬:০৪ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ০৭, ২০১৯

ঢাকার ‘ডন’ তানভীরই কি কানাডার বিখ্যাত ব্যবসায়ী তারেক!

বাংলাদেশের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড ডন’ খন্দকার তানভীর ইসলাম ওরফে জয়ের সঙ্গে কলকাতা থেকে পালানো তারেক রানার সাথে মিল খুঁজে পেয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ। এরপর কানাডা থেকেও পালিয়ে গিয়েছেন তিনি। বর্তমানে তিনি মালয়েশিয়ায় আত্মগোপনে আছেন বলে দাবি করেছে বাংলাদেশের পুলিশ।

কে এই জয়? কে-ই বা তারেক?

ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড ডন’ খন্দকার তানভীর ইসলাম ওরফে জয় সেদেশে কয়েক ডজন খুন, চাঁদাবাজি, অপহরণ মামলায় অভিযুক্ত। ২০০৫ সালে বাংলাদেশের অনুরোধে ইন্টারপোল ‘রেড এলার্ট’ জারি করে তার বিরুদ্ধে। তাকে ধরতে সেই সময়েই পুলিশ ৫০ হাজার টাকা পুরস্কারও ঘোষণা করে।

বাংলাদেশ পুলিশ বলছে, বাংলাদেশের কুখ্যাত সেভেন স্টার গ্যাংয়ের গডফাদার জয়। ঢাকার ব্যাবসায়ীদের কাছ থেকে মোটা অংকের চাঁদা আদায় করে ‘সেভেন স্টার গ্যাং’। টাকা না দিলে খুনও করতে পিছপা হত না তারা।

ঢাকা পুলিশের দাবি, এখনও মহানগরীর বুকে জয়ের দলবল চাঁদাবাজি করে একই রকম ভাবে। বাংলাদেশি টাকায় ৫ কোটি পর্যন্ত চাঁদা দাবি করে জয়ের গ্যাং! এক সময়ে নিজেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ছেলে হিসাবেও পরিচয় দিতেন তিনি!

কিন্তু, জয়কে সেই সময় কেউ ধরতে পারেনি।

এর পরের ঘটনা কলকাতায়। ২০০৭ সাল। বাগুইআটির চিনার পার্কের একটি বাড়ি থেকে জয়কে গ্রেফতার করে এ রাজ্যের সিআইডি। দেখা যায় নাম বদলে তারেক রানা নামে তিনি গা ঢাকা দিয়েছিলেন বাগুইআটির ওই ভাড়াবাড়িতে। ভুয়া নথির মাধ্যমে তারেক রানা নামে তিনি তত দিনে ভারতীয় পাসপোর্ট থেকে শুরু করে ড্রাইভিং লাইসেন্স— সবই জোগাড় করে ফেলেছেন। এদেশে তার পরিচয় তখন ‘জি ফ্যাশন’ নামে একটি পোশাক সংস্থার মালিক! সিআইডি তার বিরুদ্ধে পাঁচটি আলাদা আলাদা মামলা দায়ের করে।

এই মামলাগুলো যখন চলছে, তখনই জয়কে ফেরত পেতে ভারতকে চিঠি দেয় বাংলাদেশ।

সেই সময়ে স্পেশাল অপারেশন গ্রুপের এক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য জানান, ওই প্রত্যর্পণ নিয়ে কোনও সিদ্ধান্ত হওয়ার আগেই জামিন পেয়ে যান জয়। তারপর প্রায় কর্পূরের মতো উবে যান তিনি কলকাতার বুক থেকে।

এরপর জয়ের আর কোনও ‘খোঁজ’ পাওয়া যায়নি।

কানাডার অভিবাসন দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০১১ সালে পর্যটক ভিসা নিয়ে সেদেশে তারেক রানা নামে এক ব্যক্তি যান। সেই তারেক রানাকেই ২০১৪ সালে কানাডার অভিবাসন দফতর ১০ বছরের ভিসা দেয়। তখন থেকেই তিনি সেখানে আছেন। ইতোমধ্যে কলকাতা থেকে কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে কানাডার টরোন্টোর শহরতলি আয়াক্সে ওই ‘ভারতীয়ের’ নাম একজন সফল ব্যবসায়ী হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

তারেকের দাবি, তার জন্ম থেকে বড় হওয়া— সবটাই কলকাতায়। আয়াক্সের অভিজাত এলাকায় তার ‘এসজে ৭১’ সংস্থার বিশাল অফিস রয়েছে। নিয়মিত তাকে সেখানকার ক্ষমতাশালী রাজনীতিবিদদের সঙ্গে দেখা যায়। বিভিন্ন সেবা প্রতিষ্ঠানকে নিয়মিত মোটা অঙ্কের অর্থসাহায্য করেন তিনি। এমনকি সেখানকার রাজনৈতিক দলগুলোর তহবিলেও দেন মোটা চাঁদা।

কলকাতার উদ্যোগপতি হিসাবে আয়াক্সে থাকা তারেক রানার সঙ্গে কলকাতায় গ্রেফতার হওয়া বাংলাদেশি ডনের একের পর এক সা়দৃশ্যর খোঁজ পান কানাডার পুলিশ কর্তারাও। ২০১১ সালে প্রথম বার কানাডা যান তারেক রানা। ২০১৪ তে তৈরি করেন সম্পত্তি কেনাবেচার ‘এসজে ৭১’ সংস্থা। সম্প্রতি ‘এসজে ৭১’-এর ডিরেক্টর তারেক রানার সঙ্গে বাংলাদেশের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড ডন’ তানভীরের সঙ্গে সব রকম মিল খুঁজে পেয়েছে কানাডা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ। কী রকম? গোয়েন্দারা নির্দিষ্ট ভাবে কয়েকটি পয়েন্ট উল্লেখ করছেন—

১) ২০০৫ সালে খোন্দকার তানভীর ইসলাম ওরফে জয়ের যে ছবি ইন্টারপোলের রেড কর্নার নোটিসে রয়েছে, তার সঙ্গে ২০০৭ সালে কলকাতায় গ্রেফতার হওয়া জয়ের ছবি এবং তারেক রানার সাম্প্রতিক ছবিতে সাদৃশ্য রয়েছে।

২) খোন্দকার তানভীরের বাবার নাম এবং তারেক রানার বাবার নাম এক— খন্দকার নজরুল ইসলাম।

৩) খন্দকার তানভীর এবং তারেক রানার জন্মসাল এক— দু’জনেরই ১৯৬৭ সালে জন্ম।

৪) অতীতে দু’জনেরই দু’পায়ে অস্ত্রোপচার হয়েছে। তার চিহ্নও দু’জনের শরীরে রয়েছে।

শুধু কানাডার অভিবাসন দফতর নয়, সিআইডির কর্মকর্তারা, যারা জয়কে ২০০৭ সালে কলকাতায় গ্রেফতার করেছিলেন, তারাও কানাডার তারেক রানার ছবি দেখে এক মুহূর্তে চিনতে পারছেন। তারা নিশ্চিত, বাংলাদেশের কুখ্যাত ডন খন্দকার তানভীর ইসলামই আসলে এই তারেক রানা।

আর এখানেই প্রশ্ন উঠছে, জয়ের বিরুদ্ধে ব্যারাকপুর, কসবা, দমদম, তিলজলা এবং কাঁকসা থানায় পাঁচটি মামলা থাকার পরেও তিনি কী ভাবে জামিন পেলেন? জামিন পাওয়ার পর কী ভাবেই বা দেশ ছেড়ে পালালেন? জবাব দিতে চাননি সিআইডির কর্মকর্তারা।

কানাডার এই উদ্যোগপতি প্রথমে এ বিষয়ে কোনও কথা বলতেই রাজি হননি। গত অক্টোবরে শেষ বার যখন কথা হয়, তখনও তিনি কানাডাতে। এই সময়ে বলেছিলেন, ‘সম্প্রতি এটা আমারও অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছে। ওই অপরাধীর সঙ্গে আমার মুখের অদ্ভুত সাদৃশ্য রয়েছে। এখানকার পুলিশ আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে।’

একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছিলেন, ‘তবে, আমি তানভীর ইসলাম জয় নামে কাউকে চিনি না।

তাকে কি কখনও কলকাতায় গ্রেফতার করা হয়েছিল? তারেক দাবি করেন, তার জীবনে কখনও কোনও অপরাধের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না। ফলে গ্রেফতারের প্রশ্নই ওঠেনা।

অক্টোবরে তারেকের সঙ্গে যেদিন কথা হয়, তার কয়েকদিনের মধ্যেই কানাডার অভিবাসন দফতর একাধিকবার তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। এর পর হঠাৎ করেই অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহ তিনি ‘উধাও’ হয়ে যান। কানাডায় তার পরিচিতদের তারেক জানিয়েছিলেন, তিনি কলকাতায় যাচ্ছেন। ২৮ নভেম্বরের মধ্যে তিনি ফিরবেন আয়াক্সে। ডিসেম্বরের ৬ তারিখ পর্যন্ত তিনি কানাডায় ফেরেননি। তিনি কোথায় আছেন জানতে তারেকের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয়। তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি।

তবে ওই মোবাইল নম্বরের সূত্র ধরে বাংলাদেশ পুলিশের দাবি, তারেক রানা বর্তমানে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে রয়েছেন।

কানাডা পুলিশ জানাচ্ছে, তার আয়াক্সের অফিস তালা বন্ধ। পাওনাদাররা টাকা না পেয়ে আদালতে মামলা দায়ের করেছেন।

তবে তারেকের পক্ষে সম্ভব হয়নি জয়ের সঙ্গে মিলগুলোকে মুছে ফেলা। অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকেই তার মোবাইল বন্ধ। ই-মেলও অকার্যকরী হয়ে রয়েছে। আর সেখানেই প্রশ্নটা উঠছে, তারেক যদি মোস্ট ওয়ান্টেড জয় না-ই হন, তবে নিজের এত বড় ব্যবসা ফেলে কেন ‘ভ্যানিশ’ হয়ে গেলেন!

এসবি

 

দক্ষিণ এশিয়া: আরও পড়ুন

আরও