একটি অন্যরকম ভালোবাসার গল্প

ঢাকা, সোমবার, ২৫ জুন ২০১৮ | ১১ আষাঢ় ১৪২৫

একটি অন্যরকম ভালোবাসার গল্প

পরিবর্তন ডেস্ক ৮:২৩ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০১৮

print
একটি অন্যরকম ভালোবাসার গল্প

আমাদের সমাজের প্রায় ৯০ ভাগ বিবাহ-পূর্বকালীন সম্পর্কের একটি কমন গল্প দিয়ে শুরু করছি-

‘Love at first sight’ বা ‘প্রথম দেখায় কোনো কিছু না ভেবেই প্রেমে পড়ে যাওয়া’ বলে প্রচলিত একটা কথা আছে। নাবিলের ঠিক তা-ই হলো। সে প্রথম দেখায় মেয়েটির প্রেমে পড়ে গেল। অবশ্য এর কারণও আছে যথেষ্ট। কোমর পর্যন্ত ঢেউ খেলানো চুলের অধিকারী অসম্ভব সুন্দরী মেয়েটা যখন সামনে দিয়ে হেঁটে যায়, তখন তার উপর থেকে চোখ ফেরানো বেশ কষ্টসাধ্য। ছেলেটা হঠাৎ আবিষ্কার করে এই একজন সামনে এলেই সে প্রচণ্ড নার্ভাস হয়ে যায়, হার্টবিট প্রচণ্ড বেড়ে যায়। এমনকি অতিমাত্রায় নার্ভাসনেসের কারণে তার হাঁটুও কাঁপতে থাকে।

নাবিলের মনে হতে লাগলো এই মেয়েটাকে ছাড়া তার বাঁচা কঠিন। যে করেই হোক তাকে তার পেতেই হবে। অনেক কষ্টে সে মেয়েটার ফোন নম্বর জোগাড় করে। চেষ্টা করে মেয়েটার হৃদয়ে একটু হলেও জায়গা করে নিতে। কিন্তু মেয়েটা কিছুতেই রাজি হয় না। কিছু সময় চলে যায়- এক মাস, দুই মাস, তিন মাস। মানব চরিত্রের আজন্ম প্রকৃতি একসময় দুজনকেই একে অপরের দিকে ঝুঁকে পড়তে বাধ্য করে। জীবন সম্পর্কে প্রচণ্ড উদাসীন ছেলেটা হঠাৎই জীবনে নতুন এক প্রেরণা খুঁজে পায়। অসম্ভব শান্তি লাগে তার অপর পাশে মিষ্টি একটা গলা শুনতে পেরে। সারা রাত কথা বলার পরেও তার মনে হয় রাতটা এত দ্রুত কেন শেষ হয়ে গেল?

আবারো কিছু সময় খুব দ্রুতই কেটে যায়। এক, দুই বা তিন বছর। এরপর ছেলেটা হঠাৎ করে আবিষ্কার করে তার আকর্ষণে কেন যেন ভাটা পড়ে গেছে। আগের মতো আর তার মেয়েটাকে দেখলে হার্টবিট বাড়ে না। হৃদয়ের সেই প্রশান্তিও কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। মেয়েটাও বুঝতে পারে সবকিছু আগের মতো নেই। মনোমালিন্য শুরু হয়, একসময় সবকিছু শেষ হয়ে যায়। খুব বিষণ্ন কাটে কিছু দিন। তারপর? তারপর আবার ছেলেটার চোখে নতুন কাউকে ভালো লাগতে শুরু করে। তারপর আবার...

এমনই হয় আমাদের চারপাশে ঘটা প্রায় ৯০ ভাগ বিবাহ-পূর্বকালীন সম্পর্কের কমন গল্পগুলো। বেশিরভাগ সময়েই সম্পর্কগুলো বিয়ে পর্যন্ত পূর্ণতা পায় না। আর বিয়ে পর্যন্ত গড়ালেও আবেগের সাথে সাথে যখন সীমাহীন দায়িত্ব এসে ভর করে কাঁধে, তখন আবেগগুলো ফিকে হওয়া শুরু করে। ‘একে অপরকে পুরোপুরি বুঝতে পারে’ এমন দাবি করা প্রেমিকযুগল বিয়ের পর আবিষ্কার করে সম্পূর্ণ নতুন আরেকজনকে। এ কারণেই হয়তো love marriageগুলোতে ‘rate of divorce’ অস্বাভাবিক রকমের বেশি। কারণ, এ বিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা হয়নি। তাই এতে আল্লাহর কোনো রহমত থাকে না। প্রথম প্রেম থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত পাশে থাকার যে ফ্যান্টাসি সমকালীন সাহিত্যে দেখানো হয়, তা কেবল উপন্যাস কিংবা রূপালী পর্দাতেই সীমাবদ্ধ। বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলে। ‘কাছে আসার গল্প’গুলোতে দূরে সরে যাবার আশঙ্কা থাকে অনেক বেশি। তাই আজ আমি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা কাছে আসার গল্প বলবো।

আমাদের গল্পের নায়ক মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ (সা.)। শান্ত-স্থির বিচক্ষণ যুবক। চাচার ঘরে মানুষ হয়েছেন। সমাজের কলুষতা থেকে দূরে নির্জনে থাকতেই বেশি পছন্দ করেন। প্রচণ্ড সৎ ও সত্যবাদী হবার কারণে সবাই তাঁকে ‘আল-আমিন’ নামে ডাকে। সম্ভবত এ কারণেই তিনি সে সময়ে মক্কার অন্যতম ধনাঢ্য ব্যবসায়ী খাদিজার (রা.) চোখে পড়েন। তিনি মুহাম্মদকে (সা.) তাঁর হয়ে ব্যবসা করার জন্য প্রস্তাব পাঠান।

‘একজন সৎ ও সত্যবাদী মানুষের বড় প্রয়োজন আমার। আপনার আল-আমিন খ্যাতি আমাকে আকৃষ্ট করেছে আপনার প্রতি। যদি এ বিশ্বাসের মর্যাদা আপনি রক্ষা করেন এবং আমার ব্যবসা-বাণিজ্যের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তাহলে সন্তুষ্টচিত্তে আমি দ্বিগুণ লভ্যাংশ দিতে রাজি। এ প্রস্তাব মনঃপূত হলে আমি আপনাকে স্বাগত জানাই।’

মুহাম্মদ (সা.) এ প্রস্তাব গ্রহণ করলেন। তিনি খাদিজার (রা.) দাস মাইসারাহ ও পণ্যসামগ্রী নিয়ে সিরিয়ার পথে রওনা দিলেন। সিরিয়ায় পৌঁছে তিনি গির্জার কাছে এক গাছের নিচে বিশ্রাম নিলেন। তখন গির্জা থেকে এক পাদ্রী বের হয়ে মাইসারাহকে জিজ্ঞেস করলো-

‘গাছটির নিচে যিনি বিশ্রাম নিচ্ছে উনি কে?’ মাইসারাহ বললেন, ‘তিনি হারামের অধিবাসী।’ পাদ্রী বললো, ‘এই গাছে নবী ছাড়া আর কেউ কখনো বিশ্রাম নেয়নি।’

পাদ্রীর এই কথাটি সিরিয়া থেকে ফিরে মাইসারাহ খাদিজা (রা)-কে অবহিত করেন। ঘটনাটি খাদিজার (রা.) মনে দাগ কাটে। তিনি তাঁর চাচাতো ভাই ওয়ারাকা বিন নওফেলকে, যিনি ছিলেন সে সময় তাওরাত ও ইঞ্জিলের একজন বিজ্ঞ পণ্ডিত, পাদ্রীর কথাটি জানান। সব শুনে ওরাকা বললেন-

‘যদি এ ঘটনাগুলো সত্য হয় তবে মুহাম্মদ অবশ্যই এ উম্মতের নবী। আর আমি ভালোভাবেই জানি আমরা যার অপেক্ষা করছি, তার সময় খুব কাছেই।’

ওরাকা বিন নওফেলের এ কথা খাদিজা (রা)-কে ভীষণভাবে আলোড়িত করে। এদিকে ব্যবসাতেও মুহাম্মদ (সা.) রেকর্ড পরিমাণ লাভ করে আসেন। মুহাম্মদ (সা.)-এর সততা তাঁকে মুগ্ধ করে। তিনি মুহাম্মদ (সা.)-কে বিয়ে করতে আগ্রহবোধ করেন। বাংলাদেশের কিছু বিজ্ঞানমনষ্ক(!) লেখক প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে  রাসূল (সা.) সম্পদের লোভে খাদিজা (রা.)কে বিয়ে করেছিলেন। অজ্ঞ (নাকি মিথ্যুক?) লোকগুলো এ কথা কখনোই বলবে না যে ব্যবসা এবং বিয়ের প্রস্তাব কিন্তু খাদিজা (রা.) স্বয়ং রাসূল (সা)কে দিয়েছিলেন। চাচা আবু তালিবের সাথে পরামর্শ করে মুহাম্মদ (সা.) বিয়েতে রাজি হন। তখন তাঁর বয়স ছিল ২৫ আর খাদিজা (রা.)-এর বয়স ছিলো চল্লিশ। তাঁদের বিয়েতে আবু তালিব খুতবা পাঠ করেন।

বিয়ের পর কি খাদিজা (রা.)-এর মোহ কাটতে শুরু করেছিল? না, ঘটনাটি আমাদের বর্তমান সময়ের মতো এগোয়নি। বরং তাঁর মুগ্ধতা বহুগুণে বেড়েছিল। মুহাম্মদ (সা.), খাদিজার (রা.) সম্পদের কোনো অপব্যবহার না করে আগের মতোই সাদাসিধে জীবনযাপন করতে থাকেন। বিয়ের পর মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে খাদিজা (রা)-এর দৃষ্টিভঙ্গি কেমন ছিল তা আমরা সহজেই বুঝতে পারি নবুওয়্যাতের ঘটনা থেকে। মুহাম্মদ (সা.) যখন প্রথম ওহীপ্রাপ্ত হন এবং জীবনের আশঙ্কা করে কাঁপতে কাঁপতে ঘরে প্রবেশ করেন, তখন খাদিজা (রা.) তাঁকে বস্ত্রাবৃত করে আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেন,

‘অসম্ভব! আপনাকে কখনো আল্লাহ তাআলা অপমান করবেন না। আপনি আত্মীয়-স্বজনের হক আদায় করেন। বিপদগ্রস্ত লোকদের সাহায্য করেন। মেহমানদারী ও সত্যের পথে বিপদাপদে সহায়তা করেন।’

রাসূল (সা.) আর খাদিজা (রা.) এতটাই পরিপূরক ছিলেন যে তাঁর জীবদ্দশায় তিনি দ্বিতীয় কোনো বিয়ে করেননি। ইবরাহীম (রা.) ব্যতীত রাসূলের (সা.) সকল সন্তান-সন্ততি খাদিজার (রা.) গর্ভেই হয়েছিল। খাদিজার (রা.) মৃত্যু রাসূলকে (সা.) এতটাই ব্যথিত করে যে, তিনি যে বছর মারা যান সে বছরকে সীরাতকারকেরা “দুঃখ ও বিষণ্নতার বছর’ নামে অভিহিত করেছেন।

রাসূলের (সা.) ভালোবাসাও আমাদের ভালোবাসার মতো ঠুনকো ছিল না। তাই মৃত্যুর পরেই তা শেষ হয়ে যায়নি। পরে দ্বীনের স্বার্থে ও ওহীর ইশারায় তিনি বেশ কয়েকটি বিয়েতে আবদ্ধ হন, কিন্তু খাদিজা (রা.) সবসময়ই তাঁর স্মৃতিতে অমলিন ছিলেন।

খাদিজার (রা.) মৃত্যুর পর একবার তাঁর বোন হালাহ (রা.) রাসূলের (সা.) সাথে দেখা করতে আসেন এবং ভেতরে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা করেন। তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল অনেকটা খাদিজার (রা.) মতোই। সে স্বর শুনতে পেরেই রাসূলের (সা.) খাদিজার (রা.) কথা মনে পড়ে গেলো। তিনি বললেন, ‘হালাহ হবে হয়তো’। আয়েশা (রা.) সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এ কথা শুনে তার মনে ঈর্ষার উদয় হলো। তিনি বললেন, ‘আপনি এখনো সে বৃদ্ধার কথা মনে করেন, তার এমনি প্রশংসা করেন, আল্লাহ যে আপনাকে তার চেয়ে উত্তম বদলা দিয়েছেন।’ এ কথা শুনে রাসূল (সা) খুব রাগ করে বললেন,

‘আল্লাহর শপথ ! আল্লাহ তাআলা আমাকে তার চেয়ে উত্তম বদলা দেননি। মানুষ যখন আমার উপর ঈমান আনতে অস্বীকার করেছিল, তখন সে আমার উপর ঈমান এনেছিল। যখন সবাই আমাকে মিথ্যুক বলেছে, তখন সে আমাকে সত্যবাদী বলেছে।’

নবী করীম (সা.) যখনই কোনো ছাগল জবাই করতেন, তখন খাদিজার (রা.) ভালোবাসার স্মরণে সে ছাগলের গোশত খাদিজার (রা.) বান্ধবীদের উপহারস্বরূপ পাঠিয়ে দিতেন।

বদর যুদ্ধে বন্দীদের মধ্যে ছিলেন রাসূলের (সা.) জামাতা আবুল আস। তিনি রাসূলকন্যা যায়নাব (রা.)-এর স্বামী ছিলেন। মুসলিমগণ যখন বন্দীদের মুক্তির জন্য পণ পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন, তখন যায়নাব নিজ গলার হার স্বামীর মুক্তির জন্য পাঠিয়ে দেন। এ হার খাদিজা (রা.) যয়নাবের বিয়ের সময় নিজের গলা থেকে খুলে দিয়েছিলেন। রাসূল (সা.) এ হার দেখে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলেন না। তাঁর চোখ পানিতে ভিজে গেলো। তিনি সাহাবীদের বললেন,

‘তোমরা যদি রাজি থাকো, তাহলে এই হার ফিরিয়ে দাও এবং বন্দীকে পণ ব্যতীতই মুক্ত করে দাও।’

আমাদের বর্তমান সময়ে বিয়ের একটা প্রধান কারণ থাকে সাময়িক মোহ ও উদ্দাম যৌবিক চাহিদা। ৪০ বছরের একজন প্রৌঢ়ার সাথে ২৫ বছরের এক যুবকের বিয়েতে এসবের কিছুই ছিল না। ছিল আল্লাহর জন্য ভালোবাসা এবং পারস্পরিক অপার্থিব পবিত্রতম স্থায়ী মুগ্ধতা।

তাহেরাহ (অর্থ পবিত্র। এটি খাদিজার (রা)-এর উপনাম ছিল) ও আল-আমিনের ভালোবাসা তাই একজনের মৃত্যুতেই শেষ হয়ে যায়নি।

আমাদের বর্তমান প্রজন্মের ভালোবাসা ‘আনা উহিব্বুকি’ বা ‘i love you’ তেই শেষ হয়ে যায়, সেখানে ‘ফিল্লাহি’ বা ‘for Allah’ কথাটি থাকে না। মহান আল্লাহ তাআলা এসব চোখ-ধাঁধানো তবে অন্তঃসারশূন্য প্রেম-ভালোবাসা থেকে আমাদের দূরে রাখুন। কিশোর বয়সে আমার মনে হতো হুজুরদের জীবন ভালোবাসাশূন্য, প্রেমহীন। কিন্তু এখন আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম ও পবিত্রতম ‘লাভ স্টোরি’ হুজুররাই লিখে গেছেন। আমরা বর্তমান প্রজন্ম স্বল্প আলোতে চোখ ধাঁধিয়ে অধিক আলোতে অন্ধ হয়ে যাই। এ কারণেই হয়তো রোমিও-জুলিয়েট নিয়ে হাহাকার করা প্রজন্ম খাদিজা (রা.)-মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে কিছুই জানে না।

মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের সেই পবিত্র ভালোবাসার সাথে যুক্ত করুন, যে ভালোবাসাতে সততার সাথে মুগ্ধতা থাকবে, থাকবে বিপদে আশার বাণী, যে ভালোবাসার কণ্ঠস্বর মৃত্যুর পরেও আবেগতাড়িত করবে।

যে ভালোবাসার কারণেই স্ত্রী গভীর রাতে একসাথে তাহাজ্জুদ পড়ার জন্য স্বামীর মুখে পানি ছিটিয়ে দেয়, অসম্ভব সুন্দর একটা তারাভরা রাতে গভীর মমতায় আর্দ্র এককণ্ঠ বলে উঠে- ‘আনা উহিব্বুকি ফিল্লাহ।’

গ্রন্থসূত্র:

সীরাতে মোস্তফা (বাংলা)-মাওলানা ইদরীস কান্ধলভী, সীরাতে ইবনে হিশাম, তোমাকে ভালবাসি হে নবী-গুরুদত্ত সিং, আর রাহীকুল মাখতুম (বাংলা), সাহাবী চরিত-মাওলানা যাকারিয়া (রহ.), সীরাতুল হাবীব-সাইফুদ্দিন বেলাল, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ-আব্দুল হামিদ মাদানি।

এফএস/এএল

 
.




আলোচিত সংবাদ