খলিফা হযরত উমর (রা.) ও ইসলামি খিলাফত

ঢাকা, সোমবার, ২৫ জুন ২০১৮ | ১১ আষাঢ় ১৪২৫

খলিফা হযরত উমর (রা.) ও ইসলামি খিলাফত

ফয়জুল্লাহ সাইফ ৯:২৮ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ০৪, ২০১৮

print
খলিফা হযরত উমর (রা.) ও ইসলামি খিলাফত

হযরত উমর (রা.)-এর খিলাফত ইসলামের ইতিহাসে এক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ও স্মরণীয় অধ্যায়। এ সময়ে সভ্যতার অভিযান যেভাবে এবং যে গতিতে জরাজীর্ণ ঘুণেধরা পৃথিবীকে ওলটপালট করে দিয়েছিল, তার তুলনা ইতিহাসে বিরল।

যে ইসলামি সমাজ প্রতিষ্ঠার কাজ রাসূল (সা.)-এর সময় থেকে শুরু হয়েছিল, তা হযরত আবু বকর (রা.)-এর খিলাফতের পর হযরত উমর (রা.)-এর স্কন্ধেই ন্যস্ত হয়। দেশ বিজয়ের সাথে যেসব নতুন নতুন সামাজিক সমস্যার উদ্ভব হয়েছিল, হযরত উমর (রা.)-কে সেই সব সমস্যা মোকাবিলা করতে হয়। তিনি ইসলামের মাধ্যমে এগুলোর সমাধান খুঁজেছিলেন; আর তার প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছিলেন সমাজকল্যাণে। সূক্ষ্মভাবে বিচার করলে ইসলামি সমাজ দর্শনের পরিপূর্ণ প্রতিষ্ঠা না হলেও সেই মধ্যযুগেও যে এক সুষ্ঠু, নৈতিক ও সামাজিক বাস্তব সমাজ ব্যবস্থার গোড়াপত্তন হয়েছিল, তা ইতিহাসের কোথাও খুঁজে পাওয়া কঠিন। খোলাফায়ে রাশেদা বা প্রথম চার খলিফার সম্বন্ধেও একথা বলা চলে তবে সংগঠনের দিক দিয়ে হযরত উমর (রা.)-এর খিলাফতের ভিতরে পাওয়া যায় এক চমকপ্রদ পৌর ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইতিহাস। ঐতিহাসিক ওয়েল (Weil) হযরত উমর (রা.)-কে তাই ‘The Guiding Spirit of Islam’ বলে অভিহিত করেছিলেন।

নিম্নের শিরোনামগুলোতে উমর (রা.)-এর খিলাফতকাল সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরা হলো:

সাম্যের অনুপম বিকাশ

হযরত উমর (রা.)-এর শাসনামলে মানুষের মধ্যে সাম্যের অভূতপূর্ব দৃশ্য চোখে পড়ে। সামাজিক জীবনে প্রতিটি মানুষ মানুষ হিসাবেই বিবেচিত হতো সেই সমাজে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক- সব ব্যাপারেই মানসিক মূল্যবোধের অনুপম বিকাশ ঘটেছিল। স্বনামধন্য মুসলিম বীর সেনানায়ক খালিদকে পদচ্যুত করার সময় খালিদের পক্ষে জনৈক মুসলিম বিভিন্ন যুক্তি দ্বারা হযরত উমর (রা.)-এর সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের চেষ্টা করেন। হযরত উমর (রা.) সেজন্য তাকে তিরস্কার করেননি। শুধু বলেছিলেন, ‘ভাই, তুমি তোমার বন্ধুর পক্ষে বলতে গিয়ে আবেগের মোহে পড়েছ।’ যখন এক মহিলা বলেছিলেন- ‘হে উমর আল্লাহকে ভয় করো।’ উপস্থিত আর সবাই যখন তাকে বাধা দিতে গিয়েছিল, খলিফা বললেন, ‘ওকে বলতে দাও।’ তায়েফের সময়ে জাবালার কাপড় মাড়িয়ে দেবার জন্য এক নিরীহ মানুষকে চড় মারবার পাল্টা শাস্তি হিসেবে খলিফার ধমক শুনতে হয়েছিল জাবালাকে। মিসরের শাসনকর্তা আমর বিন আস মসজিদে উঁচু মিনার তৈরির অনুমতি পর্যন্ত পাননি। সামাজিক বিচারে আত্মীয়, অনাত্মীয় শাসক শাসিতকে একই পর্যায়ে ফেলা হতো। ‘তোমাদের ভেতরে যে সব চাইতে বেশি কর্তব্যপরায়ণ সে-ই হবে সর্বাপেক্ষা সম্মানিত— কুরআনের এই বাস্তব প্রকাশ হয়েছিল তখনকার ইসলামি রাষ্ট্র ও সামাজে। খলিফা শুধু সংগঠনের মারফতই নয়, নিজের হাতেও সমাজের সেবা করেছেন। আমওয়াছের প্লেগের সময় খলিফা নিজেই সাধারণ স্বেচ্ছাসেবকের মতো সেবা শুশ্রূষায় রত ছিলেন।

খেলাফতি রাষ্ট্র ও সমাজ

শাসন ব্যাপারে দুটি মন্ত্রণা সভা ছিল। সাধারণ সভায় সব সমস্যার সাধারণ আলোচনা করা হতো। এখানে জনগণ তাদের মতামত ব্যক্ত করতে পারত। প্রাদেশিক শাসনকর্তা ও বিভিন্ন কর্মকর্তাদের নিয়োগ, কর্মচ্যুতি ও অন্যান্য বিশেষ সমস্যার ভার এক একটি কমিটির ওপর ছেড়ে দেয়া হতো। মফস্বল থেকে মাঝে মাঝে প্রতিনিধিদল এসে দেশের অবস্থা সম্বন্ধে খলিফাকে খবর জানিয়ে যেতেন ও তাদের দাবি-দাওয়া পেশ করতেন। প্রাদেশিক শাসনকর্তার নিয়োগের সময় এদেশের অধিবাসীদের মতামত নেয়া হতো। কুফা, বসরা ও সিরিয়ার অধিবাসীরা এই মতামত ব্যক্ত করে শাসনকর্তা নিয়োগের ব্যাপারে শরিক হয়েছিলেন। মাঝে মাঝে শাসন বিষয়ে তদন্ত হতো। এই ধরনের এক তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় কুফার শাসনকর্তা সাদকে পদচ্যুত করা হয়েছিল। সাধারণ কর্মচারীর বেতন ও খলিফার বেতনে কোনও তারতম্য ছিল না। বিচারালয়ে ছিল শাসক-শাসিতের একই মর্যাদা। উবাই ইবনে কাবের সঙ্গে মোকদ্দমায় খলিফা উমর (রা.) কাজী জায়েদ বিন সাবিতের আদালতে হাজির হয়েছিলেন। কাজী যাতে অবিচার না করেন সে বিষয়ে কঠোর দৃষ্টি রাখা হতো। পরিষদের অনুমতি ব্যতীত এতটুকু জিনিসও খলিফা গ্রহণ করতেন না। নিজের শরীরের ক্ষতস্থানে মধু লাগাবার দরকার হলে পরিষদের অনুমতি নিয়ে তারপর অল্প একটুখানি মধু খলিফা গ্রহণ করেন। খলিফা হযরত উমর (রা.) রাসূল (সা.)-এর সালমান নামে এক বিশিষ্ট সাহাবিকে জিজ্ঞাসা করেন, তিনি খলিফা না বাদশা? সালমান বললেন- যদি জোর জুলুম করে জনসাধারণের কাছ থেকে আপনি টাকা-পয়সা আদায় করেন আর বায়তুল মালের টাকা আত্মসাৎ করেন তবে আপনি বাদশা, নতুবা আপনি খলিফা।

বিচার খুব সহজলভ্য ছিল। এ জন্য কোনো ফি দিতে হতো না। উকিল-মোক্তার ছিল না। রাষ্ট্র নিযুক্ত মুফতিরা ‘একতা নামক বিভাগের সাহায্যে জনসাধারণকে আইনের খুঁটিনাটি বিষয় সম্বন্ধে অবহিত করতেন। অমুসলিমের ধর্ম ও তমদ্দুনে হাত দেয়া তো দূরের কথা, তাদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখবার মতো অনুকূল পরিবেশ গড়ে তুলতে তাদেরকে সরাসরি সাহায্য করা হতো। জেরুজালেমের পতনের পর সেখানকার খৃস্টান অধিবাসীদের কোনও জিনিসেই হাত দেওয়া হয়নি— তাদের বিবেক ও উপাসনার স্বাধীনতাও পুরোপুরিভাবে অটুট রাখা হয়েছিল। ইরাকে শাসনের ব্যাপারে পারসী দলপতিদের ও মিসরের মুকাউকিদের (অমুসলিম) কথা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হতো। একজন মুসলিম যতি একজন অমুসলিমকে হত্যা করত তার জন্য এতটুকু ক্ষমা ছিল না। হত্যা করার শাস্তি হিসাবে মৃত্যুদণ্ডই ছিল তার জন্য বিধান।

অমুসলিমের অধিকার

জেরুজালেমের সন্ধি অমুসলিমদের প্রতি মানবিক উদার ব্যবহারের এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। বিজিতের প্রতি এই ধরনের সন্ধি-চুক্তি দুনিয়ার ইতিহাসে বড় একটা নেই। এই সন্ধিতে খৃস্টানদের জানমাল, গির্জা, ত্রুশ রক্ষিত হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলো। চার্চের উপাসনা বন্ধ করে দেয়া যাবে না, ত্রুশ সরানো যাবে না। কোনও চার্চকে আবদ্ধ পরিণত করা যাবে না। তাদের চার্চের জিনিসপত্রও কোনো মতেই নষ্ট করা যাবে না। ধর্ম ও বিশ্বাসের ব্যাপারে তাদের ওপর কোনো জোর করা চলবে না। তাদের ওপরে কোনও ধরনের অবিচার ও জুলুম করা চলবে না। খৃস্টান ঐতিহাসিকদের লেখা থেকেই আমরা পেয়েছি যে, তখন খৃস্টানদের ধর্মগুরু খলিফা উমরকে প্রাচীনকালের দর্শনীয় দালান প্রভৃতি দেখাচ্ছিলেন তখন আসরের নামাযের ওয়াক্ত হয়। তখন তারা ছিলেন কন্সট্যান্টাইনের গির্জার ভেতরে। ধর্মগুরু সেখানেই তাকে নামায পড়তে বললেন।

কন্সট্যান্টাইনের গির্জায় তার জন্য জায়নামাজের কাপড় বিছানো হয়েছিল। কিন্তু তিনি এই দুই জায়গার কোথায়ও নামায আদায় করেননি। ‘আজ যদি আমি এখানে নামায পড়ি, তবে কাল মুসলমানরা হয়তো এখানে মসজিদ তৈরির দাবি জানাবে।’ এভাবে তিনি অমুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতার পথ সুগম করে গেলেন।

মুসলিমদের মতো অমুসলিমদেরকে দেশ রক্ষার্থে যুদ্ধ করানো তাদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের শামিল। এ অবস্থায় তারা যুদ্ধ করতে না চাইলে সবল-সুস্থ পুরুষ অমুসলিমের কাছ থেকে জিজিয়া আদায় করা হতো। হযরত উমর (রা.) এর আমলে যেসব অমুসলিম মুসলিমের সঙ্গে একযোগে যুদ্ধ করেছিলেন তাদের জিজিয়া দিতে হয়নি। জুরজান ও বাব নামক স্থানদ্বয়ে অমুসলিমদের নাম এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। ইয়ারমুকের যুদ্ধের সময় যখন হিমস নামক জায়গাটা মুসলিম সৈন্যরা ছেড়ে আসে তখন সেখানকার অধিবাসীদের কাছ থেকে আদায় করা জিজিয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কারণ, অমুসলিমদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যে জিজিয়া নেয়া হয়েছিল, সে রক্ষণাবেক্ষণ যেহেতু সম্ভব হয়নি, তাই এই পন্থা অনুসরণ করা হয়েছিল। সিরিয়া থেকে পশ্চাদপসরণের সময়েও সিরিয়া বিজয়ী আবু ওবায়দা (রা.)  সিরিয়ার অমুসলিমদেরকে সমস্ত জিজিয়া ফিরিয়ে দেন।

ভন ক্রেমার (Von Kramer) বলেন, ‘অমুসলিম সম্প্রদায়ের লোকেরা সম্পূর্ণ স্বাধীনতাই ভোগ করতেন।’ সরকার প্রত্যেক সম্প্রদায়ের হাতে হাতেই তাদের অভ্যন্তরীণ শাসনভার ছেড়ে দিতেন, ধর্ম সম্বন্ধীয় বিচারে ধর্মগুরুগণ কার্যের স্বাধীনতা ভোগ করতেন।

বায়তুল মাল থেকে অমুসলিমরাও দরকার মতো অর্থ সাহায্য পেতেন। এ বিষয়ে মুসলিম ও অমুসলিমে কোনো পার্থক্য ছিল না।

শিক্ষার স্বরূপ

শিক্ষার দিকেও বিশেষ নজর দেয়া হতো। ইসলামি ও অইসলামি শিক্ষার ভেতরে কোনও পার্থক্য নির্দেশ করা হতো না। কুরআন-হাদিসের নীতির মারফত শিক্ষার্থীর দৃষ্টিভঙ্গি গঠন করে সমস্ত বিষয় অধ্যয়ন করাই ছিল ইসলামি শিক্ষার স্বরূপ। বিজিত দেশগুলোতে ছেলেমেয়ে উভয়ের জন্য শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। বিজিত দেশগুলোতে শিক্ষা বিস্তারের উদ্দেশ্যে শিক্ষক নিযুক্ত করা হতো ও তাদের বেতন বায়তুল মাল থেকেই দেওয়া হতো। বেদুইনদেরকে বাধ্যতামূলকভাবে কুরআন শিক্ষা দেওয়া হতো। শিক্ষার তদারক করার জন্য পরিদর্শক নিযুক্ত করা হতো। তারা শিক্ষা সম্বন্ধীয় রিপোর্ট পেশ করতেন। আবু আইয়ুব, আবু দারদা ও হযরত উবাদা (রা.)- এসব প্রসিদ্ধ সাহাবির ওপর শিক্ষা সংগঠনের দায়িত্বভার অর্পণ করেছিলেন হযরত উমর (রা.) নিজে।

ইসলামি সমাজে ভূমি ব্যবস্থা

অর্থনীতির দিকেও খলিফা উমর (রা.) চেয়েছিলেন ইসলামের সামাজিক নীতিগুলোর বাস্তবায়ন। ইরাক বিজয়ের পর যেভাবে তিনি ও তার অধীনস্থ শাসকরা প্রদেশের সর্বাঙ্গীন উন্নতির জন্য চেষ্টা করতে লাগলেন— তার ভেতর যেমন একদিকে খলিফার শাসন দক্ষতা, কর্মকুশলতা ও বিচক্ষণতার পরিচয় পাওয়া যায়, অপর দিকে ইসলামের সামাজিক বিধানগুলো আদর্শের উঁচু তলা থেকে বাস্তব সমস্যা সমাধানের পথে নেমে আসে। হযরত আলী (রা.)-এর পরামর্শ অনুযায়ী ভূমি জরিপের ব্যবস্থা করা হয়, খাজনা আদায়ের নতুন উপায় উদ্ভাবন করে চাষিদের নানা প্রকার অসুবিধা দূর করার চেষ্টা করা হয়। প্রত্যেক চাষিই (অধিকাংশই খৃস্টান ছিল) যাতে করে জমি পায় সে বন্দোবস্ত করা হয়। জমির উন্নতির জন্য খাল খনন করা হয়। অর্থ দিয়ে সাহায্য করার জন্য পর্যন্ত শাসকদেরকে নির্দেশ দেওয়া হতো। চাষিদের আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যের খাতিরে জমি বিক্রি বিশেষভাবে নিষেধ করা হয়েছিল।

পারস্য সম্রাটদের বাদশাহী জমিজমা, শিকারের বন, খাতক আমীর ওমারাদের জমিজমা, অগ্নি-মন্দিরের পাশের জমি— এসব রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিতে পরিণত করা হয়েছিল এবং মদিনা থেকে নিযুক্ত পরিচালকদের হাতে এর পরিচালনার ভার দিয়ে জনগণের কল্যাণে তা ব্যবহার করা হয়েছে। সিরিয়া ও মিসর বিজয়ের পরেও এই একই নীতি অনুসৃত হয়েছিল। এইভাবে ইসলামের বিজয়ের সাথে সাথে সামন্তবাদের শেষ চিহ্নগুলো ভেঙে পড়েছিল।

অনেকের এ ধারণা বদ্ধমূল হয়ে আছে যে, ‘হযরত মুহাম্মদ (সা.) ও প্রথম দুই খলিফা জায়গির প্রথা সমর্থন করেছেন। ‘আরবের বাইরে জমি কিনতে দেওয়া হতো বা চুক্তির ভিত্তিতে ইজারা দেওয়া হতো। উমর এইসব বেশি না দিলেও তার পূর্ববর্তীরা দিয়েছিলেন, দেশের শত্রু ছাড়া অন্য সব জমিদার স্বীকার করেছিল।’ কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই বর্ণনা সঠিক নয়। খলিফা উমর (রা.)-এর পরবর্তী যুগে এটা হয়েছিল সত্য, কিন্তু প্রথম দুই খলিফার আমলে বরং উল্টোটাই ঘটেছিল। সৈনিক বা সাধারণ নাগরিক কাউকেই বিজিত বেশে জমি ভোগ করতে দেওয়া হয়নি। ভন ক্রেমার, গোল্ডজিহার ও ওয়েলহাইযেনের গবেষণা থেকে এটা স্পষ্টভাবেই পাওয়া যায়।

কোনো মুসলমানকেই বিজিত দেশে জমি কিনে জায়গির গড়ে তুলতে দেওয়া হয়নি। চাষিদের ওপর কোনও দিক থেকেই যাতে অত্যাচার করা না হয় সেদিকে কঠোর দৃষ্টি রাখা হতো। আর যেসব জমি যুদ্ধের ফলে দখলে আসত সেগুলো বায়তুল মালের সম্পত্তি হিসেবে সমগ্র ইসলামি সমাজের পক্ষ থেকে পরিচালনা করা হতো ও তার মঙ্গলার্থে নিয়োগ করা হতো। ফলে বিজিত দেশে বিজয়ী মুসলমানদের এক ইঞ্চি পরিমাণ জমিও ছিল না। যাইদ বিন সাদ নামে এক মুসলিম মিসরে জমি কিনেছিলেন। তাকে শেষ পর্যন্ত সে জমি ফিরিয়ে দিতে হয়। কুফাতে তালহা নামে আর এক মুসলিমকে তার কেনা জমিজমা হযরত উমরের আদেশে ফিরিয়ে দিতে হয়।

এই নীতির তিনটি ফল আমরা দেখতে পাই। (১) মুসলিম ফৌজদের ভেতরে সংহতি; (২) বিজিত দেশে অমুসলিম কৃষকদের স্থায়ী বসবাস ও জমিতে অধিকার, (৩) কৃষি উন্নতি- যার ওপরে শাসন ব্যবস্থার নির্ভর করত। যে সামাজিক নিপীড়নের ভেতরে তারা বাস করতো, একে একে তার অবসান হলো। ‘জেরুজালেম অধিকারের পর সেখানকার সব গোলাম-বাদিকেই মুক্ত করে দেওয়া হয়েছিল। ঐতিহাসিক হ্যালাম বলেন, পৃথিবীর শুরু থেকে মুহম্মদ (সা.) পর্যন্ত যে শোচনীয় অবস্থায় এসব বিজিত জাতি বাস করতো, তার থেকে ইসলাম তাদের মুক্তি দিল। আর উম্মথ বলেন: ‘Two blades of grass were found growing where one had grown before’ দেড়শ বছর পরে যখন মুসলমানরা ক্রুসেড যুদ্ধের ফলে জেরুজালেম পরিত্যাগ করতে বাধ্য হন তখন ‘প্রাচ্যের খৃস্টানগণ আরব খলিফাদের উদার শাসনের জন্য আক্ষেপ করেছিলেন।’ অমুসলমানরা পর্যন্ত খলিফাকে এত ভালোবাসতেন যে, তার কামিজ পর্যন্ত এক বিশপ নিজ হাতে মেরামত করে দেন।

অধিকৃত সম্পত্তি সবার মধ্যে ভাগ করে দেবার সপক্ষে যুক্তি দিয়ে এক চিঠিতে খলিফা উমর (রা.) সাদ বিন ওয়াক্কাস (রা.)কে লিখেছিলেন- ‘যদি তোমরা বর্তমানেই সব ভাগ করে দাও তবে আগামী দিনের মুসলিম কিছুই ভোগ করতে পাবে না। শাসনকর্তারা যাতে বিশেষভাবে এই নীতি মেনে চলেন, খলিফা সে দিকে কঠোর দৃষ্টি রাখতেন। মিসর বিজয়ী আমর ইবনুল আস (রা.)-এর অর্ধেক সম্পত্তি ও খালিদ (রা.)-এর অনেক অধিকৃত মাল রাষ্ট্রায়ত্ত করা হয়। হযরত উমর (রা.)-এর অধিকৃত জমি থাকায় সেগুলো রাষ্ট্রায়ত্ত করেন, তারপর যাদের জমি দরকার তাদের ভেতর ভাগ করে দেন। কারণ জনসাধারণের মঙ্গলজনক কাজে সাহায্যকালে ইমাম বলপ্রয়োগও করতে পারেন। ইবনে হাজামও এই মত সমর্থন করেন।

অনেক ঐতিহাসিক হযরত মুহাম্মদ (সা.) জায়গির প্রথা সমর্থন করেন বলে অভিযোগ করেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই অপবাদ সত্য নয়। ইহুদিদের কবল থেকে রাষ্ট্রকে বাঁচাবার জন্য অনেক সময় কিছু কিছু জমি দিয়ে তাদেরকে নতুন জায়গায় সরে বসবাস করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এই বিশেষ কারণেই খায়বারের যুদ্ধের অধিকৃত সম্পত্তি হযরত মুহাম্মদ (সা.) বণ্টন করেছেন। অমুসলিমদের খুশি করা ছাড়া পতিত জমি কৃষির অধীনে আনবার জন্যও কখনো কখনো এ ব্যবস্থা করা হতো। কাজেই এতে করে রাষ্ট্রের আয় বাড়ত এবং অমুসলিম প্রজাদেরকে সন্তুষ্ট রাখা যেত। কিন্তু এটা সাধারণ নিয়ম ছিল না। শ্রম ছাড়া জমিতে যে অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় না তা আমরা কুরআন মজিদে (৩:১৩৫, ৫২:৩৯) ও ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভি (রহ.)-এর মতামত থেকেও জানতে পারি।

বাইতুল মাল ও জনগণের অধিকার

হযরত আবু বকর, হযরত উমর ও হযরত আলী (রা.)-এর আমলে বাইতুল মাল কার্যক্ষেত্রে জনগণের সম্পত্তিরূপে বিবেচিত হতো এবং ইসলামি রাষ্ট্রের প্রতিটি ব্যক্তি এর থেকে প্রয়োজন অনুসারে ভাতা পেতেন। রাষ্ট্রের আয় বাইতুল মালে জমা হতো, সেখান থেকে সবাই ইনসাফপূর্ণ বণ্টনে সুবিধা ভোগ করতেন।

যাকাত ধনীদের কাছ থেকে আদায় করে গরিবদের দেওয়া হতো এবং এটা ছিল বাধ্যতামূলক আইন। ইসলামের প্রথম যুগে সরকারি কর্মচারী মারফত যাকাত আদায় করা হতো এবং তা মসজিদ নির্মাণ, যুদ্ধের ব্যয় ও রাষ্ট্রীয় অন্যান্য উপযুক্ত কাজে ব্যয় করা হতো। অধিকৃত সম্পদও এইভাবে সবার মাঝে বণ্টন করা হতো। যুবক, বৃদ্ধ, নারী, পুরুষ, আজাদ ও দাস সবাই এই সম্পত্তির ভাগ পেত। (বদরে যারা যুদ্ধ করেন-৫০০০ দিরহাম; মুহাজিরিন ও আনসার-৪০০০ দিরহাম, তাদের ছেলেরা-২০০০ দিরহাম; অন্যরা ৬০০/২০০।) অধ্যাপক নোল ভেকে বলেছেন যে, সব চাইতে উল্লেখযোগ্য নীতি ছিল এই যে, যা কিছু অধিকৃত হতো তা সামগ্রিকভাবে সবারই হয়ে যেত; তারপর খরচের ব্যতীত যা কিছু থাকত সবই ভাগ করে দেওয়া হতো। খলিফা দেখতেন যে, রাষ্ট্রে কোনো ভিক্ষুক বা অসহায় ব্যক্তি না থাকে, কেউ কারোর উপর জুলুম না করে। শাসনকর্তারা পদ গ্রহণের সময় বিলাসিতা বর্জনের প্রতিশ্রুতি দিতেন।

এসব ব্যাপারে মুসলিম ও অমুসলিমে কোনো পার্থক্য ছিল না। রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত অমুসলিমরাও এই সুবিধা পেতো। মদিনায় এক অন্ধ ইহুদি জিজিয়া দেবার জন্য ভিক্ষা করছিল। হযরত উমর (রা.) তাকে দেখতে পেয়ে বললেন যে, ‘এইসব মানুষের যৌবনকে কাজে লাগিয়ে বৃদ্ধ অবস্থায় অবহেলা করা সুবিচার নয়। যাকাত গরিব ও অভাবগ্রস্ত লোকদের জন্য, অভাবগ্রস্ত বলতে এদেরকেও বুঝতে হবে।’ গরিব অমুসলিমদেরকে জিজিয়া থেকেও রেহাই দেওয়া হতো। কারণ রাষ্ট্রে যেনো কোনো অসহায় ব্যক্তি না থাকে এটা দেখা ইমামের পক্ষে ফরয। মুর বলেন- একটা বড় জাতি বিজয়ে অধিকৃত সম্পত্তি সাম্যের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেদের ভেতরে ভাগ করে নেয়- এমন দৃশ্য পৃথিবীর ইতিহাসে আর চোখে পড়ে না।

ইসলামি সমাজ– মানব স্বাধীনতার চূড়ান্ত বিকাশ

সেই মধ্যযুগেও ইসলাম মানব স্বাধীনতার এমন এক অনুপম চিত্রের বাস্তবরূপ দেখিয়েছিল যা আজকের দুনিয়াতেও পুরোপুরি পাওয়া কঠিন। নৈরাশ্যের অন্ধকারে নিমজ্জিত বহু জাতিকে ইসলাম মুক্তির মশাল হাতে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। এর ফলে এমন এক সুসংহত সমাজ প্রতিষ্ঠা হয়েছিল যেখানে প্রত্যেকের পক্ষেই তার কার্যদক্ষতা দেখিয়ে সর্বোচ্চ স্থান অধিকার করার পূর্ণ সুযোগ ছিল। এই জন্যই সিরিয়ার অধিবাসী, মিসরের কপট উত্তর আফ্রিকার খৃস্টান ‘বাববার’ ও প্যালেস্টাইনের ‘সামারীয়গণ’ মুসলিম সেনাদেরকে অভ্যর্থনা করেছিল। ইসলামের দেয়া মানবিক সাম্য ও সুবিচারের ভাবটুকু সে যুগের শাসকরা বেশ বুঝতে পেরেছিলেন।

মিসর বিজয়ী আমর ইবনুল আস (রা.) খলিফাকে তার রিপোর্টে জানিয়েছিলেন, কিভাবে মিসরের চাষিরা পিঁপড়ার মতো সারাদিন খাটছে, মালিকের বেতের ঘা সহ্য করছে, অথচ ফসলের সমান ভাগ ভোগ করতে পারছে না। ওয়ালিদ বিন মুগিরা (রা.) তার পাশেই বসেছিলেন; এবং এতে উপস্থিত সকলে বিস্ময় প্রকাশ করলে, তিনি বলেন; ‘কেউ পূজা পাবার জন্য উপরে সিংহাসনে বসবে আর কেউ নিচে মাথা নিচু করে বসবে আমাদের ভেতরে এ রেওয়াজ নেই।’ আবার সিরিয়ার দরবারে মুয়াজ (রা.)কে যখন সুদৃশ্য কার্পেটে বসতে দেওয়া হলো, তিনি সেখানে বসলেন না- আর বললেন, ‘গরিবদের লুট করে যে কার্পেট তৈরি হয়েছে, সেখানে আমি বসতে চাই না।’ জেরুজালেমের সন্ধির সময় খলিফাকে তার ছেঁড়া কাপড় ছেড়ে ভালো কাপড় পরতে অনেকে অনুরোধ করে। খলিফা জবাব দেন, ‘একজন মুসলিমের সম্মান পোশাকের ওপর নির্ভর করে না।’

এই ছিল একজন মুসলিম খলিফা ও ইসলামি খিলাফত। আমাদের পূর্বসূরি ও আমাদের ইতিহাসের সোনালি অধ্যায়। অনাগত ইসলামি সমাজ বিনির্মাণে আমরা যেন এখান থেকে জীবনের পথনির্দেশ খুঁজে নেই।

সূত্র: ইসলামি ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রকাশিত গ্রন্থ-‘উমর ফারুক ও ইসলামি সমাজ’ অবলম্বনে লিখিত

এফএস/এএল

 
.




আলোচিত সংবাদ