বৈদিক রাজা বিরাটের দৃষ্টিনন্দন ‘নীলসাগর’
Back to Top

ঢাকা, শুক্রবার, ২৯ মে ২০২০ | ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

বৈদিক রাজা বিরাটের দৃষ্টিনন্দন ‘নীলসাগর’

প্রীতম সাহা সুদীপ, নীলফামারী থেকে ফিরে ৫:৪৫ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ০৪, ২০১৯

নীলসাগর, নামটি শুনলেই হয়তো চোখের সামনে ভেসে উঠবে সমুদ্রে নীল জলের ঢেউয়ের চিত্র। তবে না এটি কোন সমুদ্র নয়, একটি বিশাল দীঘি যার পেছনে রয়েছে চমৎকার বৈদিক কাহিনী।

 

যারা ‘মহাভারত’ পড়েছেন অবশ্যই বৈদিক রাজা বিরাটের নামও শুনেছেন। হিন্দুশাস্ত্রমতে, খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দীর কোন এক সময় পঞ্চপান্ডব যখন কৌরবদের চক্রান্তের শিকার হয়ে ১২ বছরের বনবাস ও ১ বছরের অজ্ঞাতবাসে যেতে বাধ্য হয়, তখন মৎস্য দেশের রাজা বিরাট তাদের আশ্রয় দেন। বলা হয়ে থাকে, পান্ডবদের তৃষ্ণা মেটাতে সে সময় রাজা বিরাট এই দীঘি খনন করেন।

কালক্রমে এ দীঘিটি বিরাট দীঘি, বিল্টা দীঘি এবং অবশেষে বিন্না দীঘি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। কারো কারো মতে, রাজা বিরাট তার বিশাল গরুর পালের জন্য পানির সংস্থান করতেই এ দীঘি খনন করেন এবং তার কন্যা বিন্নাবতীর নামে এর নামকরণ করেন বিন্নাদীঘি।

পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালে নীলফামারীর তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক ও অবসরপ্রাপ্ত সচিব এম.এ জব্বার এই দীঘিকে পর্যটনক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত করতে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তখন বিন্না দীঘির পরিবর্তে এর নামকরণ করা হয় নীলসাগর দীঘি। ১৯৯৮ সালে এ এলাকাকে পাখির অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয়। ১৯৯৯ সালে তৎকালীন ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলহাজ রাশেদ মোশারফ এ অভয়ারণ্যের উদ্বোধন করেন।

নীলফামারী জেলার সদর উপজেলার জিরো পয়েন্ট চৌরঙ্গী মোড় থেকে উত্তর-পশ্চিম কোণে ১৪ কিলোমিটার দূরে গোড়গ্রাম ইউনিয়নের ধোবাডাঙ্গা মৌজায় এই নীলসাগরের অবস্থান।

শীত আরেকটু জেকে বসলেই এই দীঘিটি হয়ে উঠবে অতিথি পাখিদের অভয়ারণ্য। দেখা মিলবে বিভিন্ন দেশের রাজহাঁস, মার্গেঞ্জার, মাছরাঙা, ভুবনচিল, সবুজ চান্দি ফুটকি, বাচাল নীল ফুটকিসহ নাম জানা না জানা অনেক অতিথি পাখির।

অনেকের মতে এই দীঘির পানি দেখতে নীল বলেই এ নামকরণ। আবার অনেকে মনে করেন নীলফামারী নামের সঙ্গে মিলিয়ে নীলসাগর নামকরণ করা হয়েছে।  দীঘিটির অবস্থান ৫৩.৯০ একর জমি জুড়ে। এর জলভাগ ৩২.৭০ একর এবং চারদিকের পাড়ের জমির পরিমাণ ২১ একরের মতো। পানির গভীরতা ২৭ থেকে ৩২ ফুট। নীলসাগর দীঘির গড় আয় বার্ষিক ৬ লাখ টাকার ওপর। দূর দুরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা এখানে এসে টিকিট কেটে মাছ ধরেন।

‘নীলসাগর’ দীঘিটি জেলার সবচেয়ে জনপ্রিয় একটি স্থান। যে কারণে এই নীল সাগরের নামেই নামকরণ করা হয়েছে ঢাকা-নীলফামারীগামী আন্ত:নগর ট্রেনের। এছাড়া এই স্থানের নামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, পত্রিকা, যানবাহনেরও নামকরণ হয়েছে।

বিনোদন কেন্দ্রটি জেলা শহর থেকে ১৭ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে নীলফামারী-দেবীগঞ্জ-পঞ্চগড় পাকা সড়কের পাশে অবস্থিত। জেলা শহর থেকে ভ্যান, অটোরিকশা, বাস, মাইক্রোবাস, ট্রেনে যোগাযোগের সুব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া আকাশপথে সৈয়দপুর বিমানবন্দর থেকে বাস বা ট্রেনে আসা যায়।

এই দীঘির সৌন্দর্য্য খুব সহজেই মানুষের মন কেড়ে নেয়। মনোরম পরিবেশ, বিভিন্ন গাছপালা, মাছ, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য, মুক্ত হাওয়া, অতিথি পাখির কলতান, প্রাচীন গাছ, মন্দির, মসজিদ, গেস্ট হাউসসহ সব কিছু দেখলেই হৃদয়ে অনাবিল শান্তি এনে দেয়।শীতকালে বিদেশি বিভিন্ন প্রজাতির অতিথি পাখির কলতানে মুখর থাকে এখানকার পরিবেশ।

বর্তমানে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় এখানে মাছ ও অতিথি পাখির অভয়ারণ্য গড়ে তোলা হয়েছে। শিশুদের জন্য রয়েছে বিনোদনের ব্যবস্থা। পর্যটকদের জন্য আবাসিক সুবিধাসহ বিভিন্ন ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া নীলফামারী মিউজিয়ামের কাজ নির্মাণাধীন রয়েছে। এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর।

নীল সাগরে রয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের আরাধ্য ভগবান শিব ও দেবী কালীর মন্দির। প্রতি বছর চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে এই দীঘিতে হিন্দু সম্প্রদায় বারুণী স্নান উৎসবের আয়োজন করে থাকে। দীঘির পাশেই সরকারের অনুদানে নীলসাগর রেস্টহাউস স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে টিকিট নিয়ে সুন্দর নিরীবিলি পরিবেশে পর্যটকরা থাকতে পারেন।

নীলসাগর দীঘির ম্যানেজার নির্মল চক্রবর্তী বলেন, প্রতিদিন এখানে শতশত লোক ভ্রমণে আসেন। আমরা এত বড় দীঘি মাত্র ৫ জন ব্যক্তি দেখাশুনা করি। নীলসাগর দীঘির চারিদিকে সীমানা প্রাচীরের উচ্চতা কম হওয়ায় দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা কিছুটা বিঘ্নিত হচ্ছে।

তিনি জানান,সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে নীল সাগরের পাশেই নীলফামারী জাদুঘরের জন্য স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে জাদুঘর নির্মাণের কাজ চলছে।

পিএসএস

 

: আরও পড়ুন

আরও