শবে-কদরের তাৎপর্য

ঢাকা, রবিবার, ২৫ জুন ২০১৭ | ১১ আষাঢ় ১৪২৪

শবে-কদরের তাৎপর্য

পরিবর্তন ডেস্ক ১:০০ অপরাহ্ণ, জুন ১৭, ২০১৭

print
শবে-কদরের তাৎপর্য

শবে কদরে পবিত্র কুরআন নাজিল হয়েছে। মূলত এজন্যই রমজান মাস কিংবা এ রাতের এত গুরুত্ব ও তাৎপর্য। শবে কদরের এক রাতের ইবাদতকে পবিত্র কুরআনে হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। অন্যদিকে রমজানের শেষ শুক্রবার জুমাতুল বিদা’ পালিত হয়।

শবে-কদর
পবিত্র কুরআনে ‘কদর’ নামে স্বতন্ত্র একটি সূরা নাজিল করে আল্লাহতায়ালা শবে-কদরের গুরুত্ব অল্প কথায় বুঝিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেছেন ‘আমি একে নাজিল করেছি শবে-কদরে। শবে-কদর সম্বন্ধে আপনি কি জানেন? শবে-কদর হলো হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। এতে প্রত্যেক কাজের জন্য ফেরেশতাগণ ও রুহ অবতীর্ণ হয় তাদের পালনকর্তার নির্দেশে। এটা নিরাপত্তা- যা ফজর উদয় পর্যন্ত অব্যাহত থাকে’। (সূরা কদর।)

কদরের শাব্দিক অর্থ মর্যাদা ও মাহাত্ম্য। অফুরন্ত মর্যাদা ও মাহাত্ম্যের পরিপ্রেক্ষিতে এ রাতকে লাইলাতুল কদর বলা হয়।

কদরের আরেক অর্থ হলো তাকদির ও হুকুম। সৃষ্টির প্রথম দিনে প্রত্যেক মানুষের ভাগ্যে যা কিছু লেখা থাকে, এক রমজান হতে অপর রমজান পর্যন্ত তার সরবরাহের হুকুম ও দায়দায়িত্ব আল্লাহপাক এ রাতেই ফেরেশতাদের দিয়ে দেন।

হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) এর বর্ণনা মতে, শবে-বরাতে আল্লাহ এক বছরের জন্য বান্দার রুজি-রিজিক, হায়াত-মউত ও অন্যান্য তকদীরী ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। আর শবে কদরে সে সকল সিদ্ধান্তের প্রয়োগ ও রুজি-রিজিক প্রভৃতি সরবাহের দায়িত্ব আল্লাহ ফেরেশতাদের দিয়ে দেন (কুরতুবী)।

মুহাদ্দিস ইবনে আবি হাতেম (রহঃ) তাফসীরের ইমাম মুজাহিদ (রহঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলল্লাহ (সাঃ) একদিন সাহাবায়ে কিরামদের বৈঠকে বনী ইসরাইলের এক মুজাহিদের কথা উল্লেখ করেন। তিনি এক হাজার মাস নিরবচ্ছিন্নভাবে আল্লাহর সাধনায় লিপ্ত ছিলেন। এ কথা শুনে সাহাবায়ে কিরামের আফসোস হয় যে, এক হাজার মাস অর্থাৎ তিরাশি বছর চার মাস তো-এ যুগের অনেকে জীবনও পায় না। তাই হযরত মূসা (আঃ)-এর উম্মত বনী ইসরাইলের মতো এতো অধিক সাওয়াব লাভের অবকাশও উম্মতে মুহাম্মদী (সাঃ)-এর নেই।

সাহাবায়ে কিরামের এ আফসোস-অনুশোচনাকালে হযরত জিবরাইল (আঃ) আল্লাহর পক্ষ হতে কুরআন মজিদের সূরা কদর নিয়ে রাসুল (সাঃ)-এর কাছে আগমন করেন।

তাফসীরে মাআরিফুল কুরআনে ইবনে জারির (রহঃ) কর্তৃক অপর একটি ঘটনা এভাবে উল্লেখ রয়েছে, বনী ইসরাইলের জনৈক ইবাদতকারী ব্যক্তি সমস্ত রাত ইবাদতে মশগুল থাকতো ও সকাল হতেই জিহাদের জন্য বের হয়ে যেতো এবং সারাদিন জিহাদে লিপ্ত থাকতো। সে এক হাজার মাস এভাবে কাটিয়ে দেয়। এর প্রেক্ষিতেই আল্লাহতায়ালা সূরা কদর নাজিল করে এ উম্মতের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন। এ থেকে এ কথা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, শবে-কদর শুধু উম্মতে মুহাম্মদীরই বৈশিষ্ট্য। -(মাযহারী)

বরকতময় রাত
আল্লাহ তায়ালা বলেন: ‘নিশ্চয় আমি ইহা (কুরআন)কে অবতীর্ণ করেছি একটি বরকতময় রাতে।’ (সূরা দুখান: ৩)।

শবে কদরে রাত জেগে ইবাদত-বন্দেগী করলে আগের সকল ছোট গুনাহ মোচন হয়ে যায়।

রাসূল (সা.) বলেন: ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সওয়াবের আশায় শবে কদরে রাত জাগরণ করে নফল নামায ও ইবাদত বন্দেগী করবে তার আগের সকল (ছোট) গুনাহ মোচন করে দেয়া হবে।’

শবে কদর কখন হবে?
শবে কদর হবে রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতে।
আয়েশা (রা:) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন: ‘তোমরা রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতে শবে কদর অনুসন্ধান কর।’

আবু হুরায়রা (রা:) হতে বর্ণিত। রাসূল (সা.)বলেন: ‘স্বপ্নে আমাকে লাইলাতুল ক্বদ্‌র দেখানো হল। কিন্তু আমার এক স্ত্রী আমাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে দেয়ায় আমি তা ভুলে গিয়েছি। অতএব, তোমরা তা রমজানের শেষ দশকে অনুসন্ধান কর।’

কোনো কোনো বর্ণনায় রয়েছে, দু ব্যক্তির বিবাদের কারণে রাসূল (সা.)তা ভুলে গেছেন।

আমাদের দেশে সাধারণত: মানুষ শুধু রমজানের সাতাশ তারিখে রাত জেগে ইবাদত বন্দেগী করে এবং ধারণা করে এ রাতেই শবে কদর অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু এ ধারণা, সুন্নতের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কারণ, আয়েশা (রা:) হতে বর্ণিত রাসূল (সা.)বলেন: ‘তোমরা রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাত্রিগুলোতে লাইলাতুল ক্বদর অনুসন্ধান কর।’

আবু হুরায়রা (রা:) হতে বর্ণিত। রাসূল (সা.)বলেন: ‘স্বপ্নে আমাকে লাইলাতুল ক্বদ্‌র দেখানো হলো। কিন্তু আমার এক স্ত্রী আমাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে দেয়ায় আমি তা ভুলে গিয়েছি। অতএব, তোমরা তা রমজানের শেষ দশকে অনুসন্ধান কর।’

তবে শেষ সাত দিনের বেজোড় রাতে শবে কদর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
ইবনে উমর (রা:) হতে বর্ণিত যে, কয়েকজন সাহাবী রমজানের শেষ সাত রাত্রিতে স্বপ্ন মারফত শবে কদর হতে দেখেছেন। সাহাবীদের এ স্বপ্নের কথা জানতে পেরে নবী (সা.)বলেন: ‘আমি দেখছি তোমাদের স্বপ্নগুলো মিলে যাচ্ছে শেষ সাত রাত্রিতে। অত:এব কেউ চাইলে শেষ সাত রাত্রিতে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করতে পারে।’ (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)।
কোনো কোনো সালাফে-সালেহীন সাতাশ রাত শবে কদর হওয়ার অধিক সম্ভাবনাময় বলে উল্লেখ করেছেন।

সাহাবীগণের মধ্যে ইবনে আব্বাস (রা:), উবাই ইবনে কা’ব (রা:) এর মতামত থেকে এটাই বুঝা যায়।

কিন্তু নবী (সা.) থেকে এভাবে নির্দিষ্ট করে লাইলাতুল কদর হওয়ার কোনো হাদিস নাই। তাই উপরোক্ত সাহাবীদের কথার উপর ভিত্তি করে বড় জোড় সাতাশের রাতে শবে কদর হওয়াকে অধিক সম্ভাবনাময় বলা যেতে পারে।

তবে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। সঠিক কথা হল, শবে কদর কখনো ২১, কখনো ২৩, কখনো ২৫, কখনো ২৭ আবার কখনো ২৯ রাতে হতে পারে।
সুতরাং শুধু সাতাশ তারিখ নয়, বরং কেউ যদি রমজানের শেষ দশকের উপরোক্ত চটি রাত জাগ্রত হয়ে ইবাদত-বন্দেগী করে তবে নিশ্চিতভাবে শবে কদর পাবে। কিন্তু শুধু সাতাশ রাত জাগলে শবে কদর পাবে তার কোনো নিশ্চয়তা নাই।

শবে কদরের বিশেষ দুয়া
উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা:) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা.) আমি যদি জানতে পারি যে, কোন রাতটি লাইলাতুল কদর তাহলে তখন কোন দুয়াটি পাঠ করব? তিনি বললেন, তুমি বল: ‘হে আল্লাহ, আপনি মহানুভব ক্ষমাশীল। আপনি ক্ষমা করা পছন্দ করেন। অত:এব আপনি আমাকে ক্ষমা করুন।’ (তিরমিযী, অনুচ্ছেদ, কোন দুয়াটি শ্রেষ্ঠ। তিনি বলেন: হাদিসটি হাসান, সহীহ)।

print
 

আলোচিত সংবাদ