আল্লাহর বাণী বুঝতে তরজমা ও তাফসিরের ভূমিকা

ঢাকা, শনিবার, ২০ জানুয়ারি ২০১৮ | ৭ মাঘ ১৪২৪

আল্লাহর বাণী বুঝতে তরজমা ও তাফসিরের ভূমিকা

আবু আফিফা ৮:৪০ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ৩১, ২০১৭

print
আল্লাহর বাণী বুঝতে তরজমা ও তাফসিরের ভূমিকা

ইসলাম কোনো আচারসর্বস্ব ধর্ম নয়। এর প্রকৃতি হলো প্রচারধর্মী। এর আবেদন শ্বাশত এবং বিশ্বজনীন। অতএব কুরআনের বাণীও গোটা বিশ্বমানবতার জন্য। এক গতিশীল, প্রাণোচ্ছল, ঋব্ধ ও সমৃদ্ধ ভাষা আরবি। এ ভাষাকেই বিশ্বনিয়ন্তা আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর সর্বশেষ গ্রন্থ আল-কুরআনের জন্য নির্বাচিত করেছেন। অনাগতকালের মানুষ যাতে মূল আরবি ভাষা থেকেই কুরআনের পথনির্দেশ লাভ করতে পারে। সেহেতু মহান রব আল্লাহ কুরআন নাজিল করে তাকে কিয়ামত অবধি সংরক্ষণ ও অবিকৃত রাখার দায়িত্বও গ্রহণ করেছেন। তিনি ইরশাদ করেন,   ‘আমি কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই এর সংরক্ষক।’ {সূরা আল-হিজর, আয়াত : ৯}

আরবি ভাষায় অবতীর্ণ হলেও কুরআনের আবেদন বিশ্বজনীন হওয়ায় বিশ্বমানবতার সামনে এর বাণী পৌঁছে দেয়া মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্যতম অবশ্য কর্তব্য ছিল। সেহেতু তিনি তাঁর প্রতিবেশী রাষ্ট্রের শাসনকর্তাদের নামে পত্রাদির মাধ্যমে ইসলামের দাওয়াত পাঠান। এ ব্যাপারে ভাষার বিভিন্নতাকে অন্তরায় সৃষ্টি করতে দেন নি। ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে আরবি না জানা মানুষের কাছে কুরআনের বাণী পৌঁছে দেবার তাগিদে অনারবী ভাষায় কুরআনের অনুবাদের ধারা মহানবীর জীবদ্দশায় সূচিত হয়ে আজো অব্যাহত আছে।

তবে এ কথা মুসলমানরা ভালোভাবে জানেন, অনুবাদ কোনো অবস্থাতেই মূল কুরআনের বিকল্প হতে পারে না। তাই কুরআনের বাংলা অনুবাদকে কোনো অবস্থায় ‘বাংলা কুরআন’ বলার অবকাশ নাই। কেননা কুরআন হলো জিবরাঈল মারফত প্রেরিত ভাষা ও অর্থের সমন্বয়ে আল্লাহর বাণী। সুতরাং মূল আরবি ভাষায় কুরআন পাঠ করতে এবং কুরআনের মূল বাণী বুঝতে সক্ষম হওয়া পর্যন্ত কুরআনের অনুবাদের মাধ্যমে উপকৃত হওয়ার জন্য অনুমতি দেয়া হয়। এমন চেতনা মাথায় রেখেই নানাভাষী মুসলিম মনীষী ও পণ্ডিতবর্গ স্বতস্ফূর্তভাবে পবিত্র কুরআন অনুবাদে এগিয়ে এসেছেন। পাশাপাশি অনেক অমুসলিম পণ্ডিতও ধর্ম প্রচারের অভিপ্রায়ে এ মহাগ্রন্থ অনুবাদে হাত দেন। বিশ্বের প্রায় ৭০টি প্রধান ভাষায় আল কুরআন অনূদিত হয়েছে। অমুসলিমদের ভাষাতেও পর্যাপ্ত অনুবাদ হয়েছে।

আমাদের বাংলাভাষী মানুষদের আরবি ভাষাজ্ঞান কম থাকায় আমরা আল্লাহ তা‘আলার কালাম কুরআন মাজিদ বুঝতে পারি না। এ কারণেই বাংলাভাষী মুসলিমদের মধ্যে কুরআনের জ্ঞান প্রায় নেই বললেই চলে। অনুবাদ পড়ে কুরআনে বর্ণিত আলোচনা সম্পর্কে জানার প্রবণতাও আমাদের মধ্যে খুবই কম। আর এ কারণে শিরক, বিদ‘আত ও অন্যান্য পাপে লিপ্ত হয়েছে বাংলার মুসলিম সমাজ।    

শুধু অনুবাদ পড়ে এর মর্ম বুঝা খুবই কঠিন। তবে আল্লাহ তা‘আলার বাণীর তরজমার সঙ্গে তাফসির পাঠ করলে সে সম্পর্কে আমরা জ্ঞান লাভ করতে পারি। এ পবিত্র গ্রন্থ আমরা যত বেশি পড়ব এবং বুঝতে চেষ্টা করব, দ্বীন ইসলাম সম্পর্কে আমাদের ধারণা ততই পরিষ্কার হবে। আমরা হিদায়াতের সন্ধান পাব। আমাদের পক্ষে সহজতর হবে আল্লাহ তা‘আলার দেয়া সরল ও সঠিক পথে চলা।  

বলাবাহুল্য, আল্লাহ তা‘আলার পবিত্র কালামকে আমরা মাতৃভাষার মাধ্যমে যেভাবে বুঝতে পারব, অন্য কোনো ভাষায় তা সম্ভব নয়। কারণ মানুষ তার মনের ইচ্ছা একমাত্র আপন মাতৃভাষায়ই পূর্ণাঙ্গরূপে প্রকাশ করতে পারে। যে কোনো বিষয় বুঝতে সহজ হয় এ মাতৃভাষায়। এ কারণেই তো আল্লাহ প্রতিটি নবীকে নিজ ভাষায় দাওয়াতের দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর আমি প্রত্যেক রাসূলকে তার কওমের ভাষাতেই পাঠিয়েছি, যাতে সে তাদের কাছে বর্ণনা দেয়, সুতরাং আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে ইচ্ছা সঠিক পথ দেখান। আর তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ {সূরা ইবরাহীম, আয়াত : ০৪}

বর্তমানে মুসলিম বিশ্বের যে হতাশা, অস্থিরতা ও নৈতিক অধঃপতন প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে, তাতে কুরআনের অনুসরণ ছাড়া এ সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। প্রাচ্যের শ্রেষ্ঠ দার্শনিক কবি ইকবালের একটি উর্দূ কবিতার কথা এখানে প্রণিধানযোগ্য। তাঁর কবিতার চরণের অনুবাদ করেছিলাম আমি এভাবে :

‘কুরআন ছেড়ে মুসলমানে ছেড়ে তো আল্লাহকে,

তাই অপমান হচ্ছে নিজে করছে হেয় ধর্মকে।’

কুরআনই আমাদের সত্যের পথে এবং শান্তির রথে পরিচালিত করতে পারে। এজন্য আমাদের কুরআন পড়তে হবে, বুঝতে হবে এবং কুরআনের নির্দেশিত পথে চলতে হবে। অথচ দুর্ভাগ্য আমাদের, আমরা কুরআনকে বুঝতে চেষ্টা করি না, তাই আমাদের ছেলে-মেয়েরা শুধু কুরআন তিলাওয়াত করে আনন্দ পায় না। কারণ, তারা তা বুঝে না। তার মর্ম তার স্পর্শ করে না। এ জন্যই প্রয়োজন সহজবোধ্য কুরআনের অনুবাদ এবং তাফসির।

আল-কুরআন আরবি সাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম অবদান। আর কিছুর সঙ্গে এর  তুলনা চলে না। আর এটা আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে নাজিলকৃত মহাগ্রন্থ। মানব রচিত কোনো উক্তি, গদ্য বা কাব্য নয়। তাই তো উমর (রা.) ইসলাম গ্রহণের আগে খোলা তরবারি নিয়ে আপন ভগ্নি ও ভগ্নিপতিকে হত্যা করতে গিয়ে সূরা ত্বহার আয়াত তিলাওয়াত শুনে অবাক হয়ে বলে উঠেছিলেন, কোথায় মুহাম্মাদ?  আমাকে নিয়ে চল তাঁর কাছে। অতপর তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে কালিমা শাহাদাহ পাঠ করে ইসলাম কবুল করেছিলেন। তাই কুরআনের সে অনুপম ভাষার সৌন্দর্য কোনো মানুষ অনুবাদে আনবে কী করে? সে সাধ্য কোনো মানুষেরই নেই। তাই অনুবাদকগণ চেষ্টা করেছেন কেবল কুরআনের অনুবাদকে সহজবোধ্য করার।

আল-কুরআন মানব জাতির জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ আসমানী কিতাব। এ কিতাব কিয়ামত পর্যন্ত মানব জাতির একমাত্র হিদায়াত তথা পথনির্দেশক গ্রন্থ। মানুষকে সত্য ও সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য এ কিতাব আল্লাহ তা‘আলার এক অশেষ অবিনশ্বর নি‘আমানত। তাই সকল মুসলিমেরই উচিত পবিত্র কুরআনের তিলাওয়াত এবং এর অর্থ উপলব্ধির চেষ্টা করা। পবিত্র কুরআনের শিক্ষা এবং তদনুযায়ী জীবন গঠন করতে হলে সকলকেই নিজ নিজ মাতৃভাষায় আল-কুরআন বুঝতে হবে। সে চিন্তায়ই বাংলা ভাষায় স্বার্থক ও নির্ভরযোগ্য অনুবাদের প্রয়োজনীয়তা অমলিন থাকবে।   

এএইচটি

print
 
.

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad