কুরআন বোঝার চার ভূমিকা

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৭ জুলাই ২০১৮ | ২ শ্রাবণ ১৪২৫

কুরআন বোঝার চার ভূমিকা

মাহফুয আহমদ ৩:২৯ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২২, ২০১৭

print
কুরআন বোঝার চার ভূমিকা

পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত যেমন একটি মহান ইবাদত ও অশেষ সওয়াবের কাজ, তেমনি মুসলমানের জন্য কুরআনের মর্ম অনুধাবনও একটি বিশেষ ইবাদত, আকর্ষণীয় কর্ম এবং ঈমান, আমল ও এলেম বৃদ্ধির অন্যতম উপায়। মোমিন কুরআন তেলাওয়াত করে, মর্ম বুঝতে চেষ্টা করে- এটা তার ঈমানের জ্যোতি আরও প্রস্ফুটিত করে। আল্লাহ বলেন, 'আর যখন তাদের সামনে পাঠ করা হয় কালাম, তখন তাদের ঈমান বেড়ে যায়।' (সূরা আল আনফাল, আয়াত : ২) 'এটি একটি বরকতময় কিতাব, যা আমি আপনার প্রতি বরকত হিসেবে অবতীর্ণ করেছি, যাতে মানুষ এর আয়াতসূহ লক্ষ্য করে এবং বুদ্ধিমানগণ যেন তা অনুধাবন করে।' (সূরা ছোয়াদ, আয়াত : ২৯)

আলেমগণ বলেন, কুরআনের সামগ্রিক শিক্ষার্জন যদিও ফরজে কেফায়া, মানে কিছুসংখ্যক মুসলমান তা করে নিলে সকলের দায়িত্ব আদায় হয়ে যাবে, তদুপরি সকল মুসলমানকেই কুরআন অনুধাবনের চেষ্টা করা উচিত। কুরআন অনুধাবনের আগে কিছু বিষয় আমাদের মনে রাখা দরকার। এখানে কতিপয় বিষয়ের প্রতি আলোকপাত করা হলো :

এক. আল্লাহর কালাম বুঝতে হলে এবং সেই কালামের মর্ম উপলব্ধি করতে চাইলে সর্বপ্রথম আল্লাহকে চিনতে হবে, তাঁর পরিচয় লাভ করতে হবে এবং তাঁর সঙ্গে একান্ত সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। এজন্য সাহাবায়ে কেরাম কুরআন শিখার আগে ঈমান শিখেছেন। ফলে কুরআন তাদের সেই ঈমানে আরও শক্তি জুগিয়েছে। কেউ যখন আল্লাহর মারেফাত লাভে এক বিঘত অগ্রসর হলো, তবে সে কুরআন অনুধাবনেও এক ধাপ এগিয়ে গেল। কুরআনি জ্ঞানভাণ্ডারের নতুন নতুন দ্বার তার সামনে উন্মুক্ত হতে থাকবে। আল্লাহ নামগুলোর প্রকৃত মর্ম ও মাহাত্ম্য উদ্ভাসিত হতে থাকবে এবং বান্দা আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে থাকবে। সেজন্য আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনের অনেক জায়গায় তাঁর নামের সঙ্গে কুরআন নাজিলের কথাও উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই, তিনি চিরঞ্জীব, সবকিছুর ধারক। তিনি আপনার প্রতি কিতাব নাজিল করেছেন সত্যতার সাথে ‘ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত : ২-৩) আল্লাহ বলেন, ‘এতে মিথ্যার প্রভাব নেই, সামনের দিক থেকেও নেই এবং পেছন দিক থেকেও নেই। এটা প্রজ্ঞাময়, প্রশংসিত আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ।’ (সূরা হা-মিম সেজদাহ, আয়াত : ৪২) ‘এটা তাঁর কাছ থেকে অবতীর্ণ, যিনি ভূমণ্ডল ও সমুচ্চ নভোমণ্ডল সৃষ্টি করেছেন। তিনি পরম দয়াময়, আরশে সমাসীন হয়েছেন।’ (সূরা ত্বোয়া-হা, আয়াত : ৪-৫)

দুই. পবিত্র কুরআনের মর্মার্থের দুয়ার খুলতে এবং কুরআনি হেদায়ত গ্রহণ করতে চাইলে তেলাওয়াতকারীকে কুরআন নাজিলের মহান লক্ষ্য সামনে রাখতে হবে। সেই লক্ষ্য- যার জন্য আল্লাহ তায়ালা মানবজাতি সৃষ্টি করেছেন, নবীদের প্রেরণ করেছেন এবং আসমানি কিতাবাদি নাজিল করেছেন। আর তা হলো আল্লাহর দাসত্ব স্বীকার এবং জীবনে তা বাস্তবায়ন করা। তাঁর যাবতীয় আদেশ-নিষেধ এবং বিধি-বিধান মতো জীবন পরিচালনা করা। কুরআন থেকে উপকৃত হতে চাইলে তেলাওয়াতের সময় এসব লক্ষ্য স্মরণ রাখতে হবে। বস্তুত এমন মনোযোগ ও মানসিকতা নিয়ে তেলাওয়াতে মগ্ন হলে অবশ্যই সেই তেলাওয়াত দ্বারা কুরআন থেকে কিছু সংগ্রহ করা তথা কুরআনের মূল বাণী ও বক্তব্য অনুধাবন করার আশা করা যায়। স্বচ্ছ হৃদয়ে কুরআনি জ্ঞানের ঝর্ণাধারা প্রবাহিত হবে, হৃদয় ও আত্মা পরিচ্ছন্ন হবে এবং তথ্যজ্ঞানের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ হবে।

তিন. আল্লাহ তায়ালার নিকট কুরআনের যে মর্যাদা ও অবস্থান এবং আল্লাহ নিজ কিতাবে সেই কিতাবের যে বিশেষণগুলো উল্লেখ করেছেন- এসব জানা এবং উপলব্ধি করা। আল্লাহ বলেন, ‘আমি আপনাকে সাতটি বার বার পঠিতব্য আয়াত এবং মহান কোরআন দিয়েছি।’ (সূরা হিজর, আয়াত : ৮৭) ‘এই কোরআন এমন পথ প্রদর্শন করে, যা সর্বাধিক সরল এবং সৎকর্ম পরায়ণ মুমিনদেরকে সুসংবাদ দেয় যে, তাদের জন্যে মহা পুরস্কার রয়েছে।’ (সূরা বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৯) 'যদি কোনো কোরআন এমন হত, যার সাহায্যে পাহাড় চলমান হয় অথবা জমিন খণ্ডিত হয় অথবা মৃতরা কথা বলে, তবে কি হত? বরং সব কাজ তো আল্লাহর হাতে।' (সূরা রা’দ, আয়াত : ৩১) ‘যদি আমি এই কোরআন পাহাড়ের ওপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি দেখতে যে, পাহাড় বিনীত হয়ে আল্লাহ তাআলার ভয়ে বিদীর্ণ হয়ে গেছে। আমি এসব দৃষ্টান্ত মানুষের জন্যে বর্ণনা করি, যাতে তারা চিন্তা-ভাবনা করে।’ (সূরা আল হাশর, আয়াত : ২১)

চার. কুরআন অনুধাবনের এই মহৎ কর্ম শুরুর আগে আরেকটি বিষয় জরুরি। তা হলো, যেই মহামানবের ওপর কুরআন নাজিল হয়েছে- তাঁর জীবনী এবং তাঁর থেকে বর্ণিত হাদিস ও সুন্নাহ অনুসন্ধান ও অনুসরণ করতে হবে। নতুবা আর যাইহোক, কুরআন অনুধাবন কিছুতেই সম্ভব হবে না। কেননা আল্লাহ তায়ালা কুরআন নাজিল করে এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে দেয়ার জন্য সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘তিনিই নিরক্ষরদের মধ্য থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের কাছে পাঠ করেন তাঁর আয়াতসমূহ, তাদেরকে পবিত্র করেন এবং শিক্ষা দেন কিতাব ও হিকমত। ইতিপূর্বে তারা ছিল ঘোর পথভ্রষ্টতায় লিপ্ত।’ (সূরা আল জুমুআহ, আয়াত : ২)
অন্যত্র আল্লাহ বলেন, 'এবং আপনার কাছে আমি স্মরণিকা অবতীর্ণ করেছি, যাতে আপনি লোকদের সামনে ওইসব বিষয় বিবৃত করেন, যেগুলো তোদের প্রতি নাজিল করা হয়েছে, যাতে তারা চিন্তা-ভাবনা করে।' (সূরা আন নাহল, আয়াত : ৪৪) বস্তুত নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কথা ও কর্মে আমাদের কুরআন বুঝিয়ে গেছেন। সাহাবায়ে কেরাম নবীজি থেকে সেসব আহরণ করেছেন এবং পরবর্তীদের নিকট পৌঁছিয়ে গেছেন। সুতরাং কুরআনের সঠিক অর্থ, মর্ম, ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ- এসব অনুধাবন করতে হলে নববি শিক্ষা তথা হাদিস ও সুন্নাহ এবং সিরাতে নববির কোনো বিকল্প নেই।

 
.



আলোচিত সংবাদ