নবী ইউসুফ ও ইয়াকুব (আ) : পিতা-পুত্রের সবর ও আল্লাহর পুরস্কার

ঢাকা, শুক্রবার, ২৫ মে ২০১৮ | ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫

নবী ইউসুফ ও ইয়াকুব (আ) : পিতা-পুত্রের সবর ও আল্লাহর পুরস্কার

শাইখ আতিক উল্লাহ ১:১১ অপরাহ্ণ, মে ১৩, ২০১৮

print
নবী ইউসুফ ও ইয়াকুব (আ) : পিতা-পুত্রের সবর ও আল্লাহর পুরস্কার

১. একটা প্রশ্ন প্রায়ই তাড়া করে ফিরত। ইয়া‘কূব আ. কেন চুপ করে ছিলেন। ছেলেদের কথা শুনে তিনি যথাযথ তদন্তের ব্যবস্থা নিলেন না কেন? তিনি দেখলেন ইউসুফের জামায় মিথ্যা রক্ত লাগানো আছে,

وَجَاءُوا عَلَىٰ قَمِيصِهِ بِدَمٍ كَذِبٍ ۚ

আর তারা ইউসুফের জামায় মেকি রক্ত মাখিয়ে এনেছিল!

তার জামাটাও অক্ষত। ছেলেদের কারসাজি ধরে ফেললেন। তার কথাতেও বোঝা যায়, ফাঁকিবাজির জারিজুরি তার কাছে ফাঁস হয়ে গেছে। ইয়া‘কূব বলেই ফেলেছেন,

بَلْ سَوَّلَتْ لَكُمْ أَنفُسُكُمْ أَمْرًا ۖ

(এটা সত্য নয়) বরং তোমাদের মন নিজের পক্ষ থেকে একটা গল্প বানিয়ে নিয়েছে।

২. যখন বুঝতে পারলেন, তাহলে ইয়া‘কুব কেন সশরীরে অকুস্থলে চলে গেলেন না? সরেজমিনে বিষয়টা তদন্ত করে দেখার জন্যে। আসলে ঘটেছিল কি? ইউসুফকে ওরা কোথায় রেখে এসেছে? কী হালতে রেখে এসেছে? একজন পিতা হিশেবে এমন কিছু করাটাইতো স্বাভাবিক আচরণ ছিল। অথবা ইয়াকুব ছেলেদেরকে কেন চেপে ধরলেন না, তাদের কৃত অপরাধ স্বীকার করার জন্যে? জেরার মুখে ছেলেরা অবশ্যই মুখ খুলতে বাধ্য হতো! কিন্তু সমস্যা সমাধানের এই সহজ পথে না হেঁটে ইয়াকুব কঠিন পথে পা বাড়ালেন,

فَصَبْرٌ جَمِيلٌ ۖ وَاللَّهُ الْمُسْتَعَانُ عَلَىٰ مَا تَصِفُونَ

সুতরাং আমার জন্যে ধৈর্যই শ্রেয়। আর তোমরা যেসব কথা তৈরি করছ, সে ব্যাপারে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করি (ইউসুফ ১৮)।

৩. সবরের পথ কঠিন। একটু জিজ্ঞাসাবাদ করলেই প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা ছিল। তা না করে তিনি কেন দুর্গম পথে পা বাড়ালেন? শুধু এবারই নয়, আরো একবার তিনি কঠিন পথে পা বাড়িয়েছেন। প্রথমবার সবরের পথে হেঁটেছেন ইউসুফকে হারিয়ে। দ্বিতীয়বারও সবর করেছেন সন্তান হারিয়ে। তাও এবার একসন্তান নয়, একসাথে দুই সন্তান। ভাইয়েরা ছোট ভাই বিন ইয়ামীনকে নিয়ে মিসরে এল। খাবার সংগ্রহ করতে। ইউসুফ ছোট ভাইকে নিজের কাছে আটকে রেখে দিলেন। বাবার কাছে কী জবাব দেবেন, এই লজ্জায় বড় ভাইও মিসরে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। তখন হুবহু একই কথা বললেন,

بَلْ سَوَّلَتْ لَكُمْ أَنفُسُكُمْ أَمْرًا ۖ فَصَبْرٌ جَمِيلٌ ۖ

(ভাইয়েরা মিসর থেকে ফিরে, ইয়াকুব আ.-এর কাছে গেল। এবং বড় ভাই যা শিখিয়ে দিয়েছিল সে কথাই তাকে বলল)। ইয়াকুব (তা শুনে) বললেন, না, বরং তোমাদের মন নিজের তরফ থেকে একটি কথা বানিয়ে নিয়েছে। সুতরাং আমার পক্ষে সবরই শ্রেয় (৮৩)।

৪. এসব দেখে মনে হয়, ইয়াকুব নিশ্চিত ছিলেন, তার সবরের ফল কী হবে। তিনি সুনিশ্চিত ভঙ্গিতে বলেছিলেন,

عَسَى اللَّهُ أَن يَأْتِيَنِي بِهِمْ جَمِيعًا ۚ

কিছু অসম্ভব নয় যে, আল্লাহ তাদের সকলকে আমার কাছে এনে দেবেন (৮৩)।

নিজে একীনের উপর থাকলেও সন্তানদের কাছে সেটা প্রকাশ করলেন না। মনের ভাবটা প্রকাশ করলেন সবকিছু আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করার ভঙ্গিতে। সেই শুরু থেকেই তিনি আল্লাহর রহমতের উপর শতভাগ বিশ্বাস স্থাপন করে আসছেন। তবে প্রকাশটা হয়েছে সবরের মোড়কে তাওয়াক্কুল করার মাধ্যমে। এবার দুই সন্তান একসাথে হারিয়েও তিনি বলেছেন,

إِنَّهُ هُوَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ

নিশ্চয়ই তিনিই সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময় (৮৩)।

৫. আল্লাহ তা‘আলা সম্পর্কে দু’টি বিষয় বলেছেন

ক: তিনি ‘আলীম’। আমার ছেলেরা কোথায় আছে, তিনি তা জানেন। আমার জানার প্রয়োজন নেই। তিনি জানলেই চলবে।

খ: তিনি হাকীম। তার কাজে অবশ্যই হিকমত আছে। আমি বুঝলেও আছে, না বুঝলেও আছে। আমার কাজ হল তার প্রতি ভরসা রাখা।

৬. আরেকটা অবাক করা বিষয় হল, তিনি একের পর এক দুঃখ পাওয়ার পরও, কষ্টের কথা প্রকাশ করতে চাননি। সযত্নে নিজের কষ্ট লুকিয়ে রেখেছেন,

وَتَوَلَّىٰ عَنْهُمْ

সে (ইয়াকুব) মুখ ফিরিয়ে নিল (৮৪)।

ছেলেদেরকে ঘুণাক্ষরেও জানতে দিলেন না, তিন সন্তান হারানোর বেদনার কথা। ছেলেদেরকে জেরা না করে, তাদের কাছে কৈফিয়ত না চেয়ে, একদিকে ফিরে আড়ালে বললেন,

يَا أَسَفَىٰ عَلَىٰ يُوسُفَ

আহা ইউসুফ!

সন্তান হারানোর বেদনা ইয়াকুব আলাইহিস সালামকে কত গভীরভাবে পেয়েছিল? পরের বাক্যটা পড়লে সহজেরই অনুমেয় হবে,

وَابْيَضَّتْ عَيْنَاهُ مِنَ الْحُزْنِ

আর তার চোখ দু’টি দুঃখ-দুশ্চিন্তায় (কাঁদতে কাঁদতে) সাদা হয়ে গিয়েছিল!

বারধক্যে নুব্জ্য মানুষটা এত কষ্ট সত্ত্বেও ভেঙে পড়েননি। আশপাশের মানুষকে বুঝতে দেননি। কুরআন বলছে-

فَهُوَ كَظِيمٌ

আর তার হৃদয় চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছিল!

৭. ছেলেরাও কম অবাক হয়নি। সেই কতকাল আগে ইউসুফ হারিয়ে গেছে, আজ এত বছর পরও বাবা তার স্মরণ করে চলেছেন। শুধু কি তাই, ইউসুফকে ফিরে পাওয়ার আশাবাদও ব্যক্ত করছেন? বিস্ময়টা তারা চেপে রাখতে না পেরে, সরাসরি প্রশ্ন করে বসেছে,

تَاللَّهِ تَفْتَأُ تَذْكُرُ يُوسُفَ حَتَّىٰ تَكُونَ حَرَضًا أَوْ تَكُونَ مِنَ الْهَالِكِينَ

আল্লাহর কসম! আপনি তো ইউসুফকে ভুলবেন না, যতক্ষণ না আপনি সম্পূর্ণ জরাজীর্ণ হয়ে পড়বেন কিংবা মারাই যাবেন (৮৫)।

৮. ছেলেদের উষ্মায় ইয়াকুব মুখ খুলতে রাজি হলেন না। ধৈর্যচ্যুত হয়ে তাদেকে বকাবকি শুরু করলেন না। শুধু বললেন,

إِنَّمَا أَشْكُو بَثِّي وَحُزْنِي إِلَى اللَّهِ وَأَعْلَمُ مِنَ اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ

আমি আমার দুঃখ ও বেদনার অভিযোগ ( তোমাদের কাছে নয়) কেবল আল্লাহর কাছেই করছি। আর আল্লাহর পক্ষ থেকে আমি যা জানি, তোমরা জান না (৮৬)।

শেষের বাক্যটা বিশেষ লক্ষ্যণীয়। ইয়াকুবকে অবশ্যই আল্লাহর পক্ষ থেকে কিছু জানানো হয়েছিল। সন্তানদের কাছে তা তিনি প্রকাশ করতে চাননি। চুপ থাকার জন্যে আল্লাহ তা‘আলাই হয়তো তাকে নিষেধ করে দিয়েছিলেন। তাই দীর্ঘকাল দুঃখকষ্ট শুধু নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে পেরেছিলেন। দৃষ্টিশক্তি হারিয়েও কারো কাছে কিছু খোলেননি।

৯. পাশাপাশি বোধ করি এটা অনুমান করাও ভুল হবে না, ইউসুফকেও ওহীর মাধ্যমে কিছু দিক-নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। সেই কূপে পড়ার সময় থেকেই। ওহীর মাধ্যমেই তিনি জানতে পেরেছিলেন, ভাইদের এই ষড়যন্ত্রের পেছনে আল্লাহর হেকমত আছে। নবুওয়াতের আগে ওহী আসে না, আসে ইলহাম। এটাকেও কুরআনে ওহী বলে প্রকাশ করেছেন। কূপে ফেলার পরের ঘটনা আল্লাহ তা‘আলা এভাবে বলেছেন,

وَأَوْحَيْنَا إِلَيْهِ لَتُنَبِّئَنَّهُم بِأَمْرِهِمْ هَٰذَا وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ

তখন আমি ইউসুফের কাছে ওহী পাঠালাম, (একটা সময় আসবে, যখন) তুমি তাদেরকে অবশ্যই জানাবে যে, তারা এই কাজ করেছিল আর তখন তারা বুঝতেই পারবে না (যে, কে তুমি?) ইউসুফ ১৫।

১০. আল্লাহর পক্ষ থেকে এই আশ্বাস পাওয়ার কারণে, ছোট্ট ইউসুফও বাবার মতো সবর করতে পেরেছিলেন। বন্দীত্বকে মেনে নিয়েছেন। দেশ ও দশ থেকে দূরে থাকার কষ্ট সহ্য করেছেন। কয়েক বছরের কারাবরণও করেছেন। জানতেন একসময় এর অবসান ঘটবেই। ইয়াকুব যেমন সন্তানের তালাশে বের হননি, ইউসুফও বড় হয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা লাভ করার পর বাবার সন্ধানে বের হননি। অন্তত কুরআনে এ-ব্যাপারে কিছু বলা হয়নি। উভয়েই সবর করেছেন। কষ্টের কথা নিজের মধ্যে গোপন রেখেছেন। উভয়েই আল্লাহ তা‘আলার আদেশই বোধ হয় বাস্তবায়ন করে গেছেন। আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত রিসালতের দায়িত্ব পালন নিয়েই ব্যস্ত থেকেছেন। মানুষকে হেদায়াতের পথে তুলে আনার ফিকির করেছেন। যখন আল্লাহর নির্ধারিত সময় হয়েছে, ঠিক ঠিক ঘটনা ঘটেছে,

ক: ইয়াকুব আ. দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়েছেন।

খ: ইউসুফ আ. তার হারানো পরিবার-পরিজন ফিরে পেয়েছেন।

গ: ভাইয়েরাও কৃতকর্মের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন।

ইউসুফ আ. সেই শৈশবের স্বপ্নের প্রসঙ্গ টেনে এনে বলেছেন,

يَا أَبَتِ هَٰذَا تَأْوِيلُ رُؤْيَايَ مِن قَبْلُ قَدْ جَعَلَهَا رَبِّي حَقًّا ۖ

পিতাজি! এই হল আমার স্বপ্নের ব্যাখ্যা, যা আমার প্রতিপালক সত্যে পরিণত করেছেন (১০০)।

এতদিন সবরের পুরষ্কার কী পেলেন, তাও বলতে ভুললেন না,

وَقَدْ أَحْسَنَ بِي إِذْ أَخْرَجَنِي مِنَ السِّجْنِ وَجَاءَ بِكُم مِّنَ الْبَدْوِ

তিনি আমার প্রতি বড়ই অনুগ্রহ করেছেন যে, আমাকে কারাগার থেকে মুক্তি দিয়েছেন এবং আপনাদেরকে দেহাত থেকে এখানে নিয়ে এসেছেন।

১১. ভাইদের অপকর্মের জন্যে কোনও রাগ দেখালেন না। প্রতিহিংসা পরায়ণ হলেন না। প্রতিশোধ নেয়া তো দূরের কথা। ভাইয়েরা অনুতপ্ত হল। ইউসুফের সম্মানার্থে,

وَخَرُّوا لَهُ سُجَّدًا ۖ

তারা সিজদায় লুটিয়ে পড়ল।

১২. ইউসুফ আ. মহত্ত্বের পরিচয় দিয়ে, ভাইদের অতীত অপকর্মের দায়ভার শয়তানের কাঁধে চাপিয়ে দিলেন,

مِن بَعْدِ أَن نَّزَغَ الشَّيْطَانُ بَيْنِي وَبَيْنَ إِخْوَتِي ۚ

ইতঃপূর্বে আমার ও আমার ভাইদের মধ্যে শয়তান অনর্থ সৃষ্টি করেছিল।

আল্লাহ তা‘আলার প্রতিও কোনও অভিযোগ প্রকাশ করলেন না। কেন তাকেই এত ভোগান্তি পোহাতে হল, তা নিয়ে বিন্দুমাত্র টুঁ-শব্দ করলেন না। উল্টো কৃতজ্ঞতায় নুয়ে পড়ে বললেন,

إِنَّ رَبِّي لَطِيفٌ لِّمَا يَشَاءُ ۚ

বস্তুত আমার প্রতিপালক যা ইচ্ছা করেন, তার জন্যে অতি সূক্ষ্ন ব্যবস্থা করেন।

১৩. বাবার অনুগত সুযোগ্য সন্তানের মতো, হুবহু বাবার ভাষাতেই বললেন,

إِنَّهُ هُوَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ

নিশ্চয়ই তিনিই সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।

বাবার মতোই আল্লাহর উপর নিঃশর্ত আনুগত্য প্রদর্শন করলেন। বাবার কাছ থেকে পাওয়া আদর্শ থেকে চুলমাত্র এদিক-ওদিক করলেন না। কাজে যেমন বাবার আদর্শ ধরে রেখেছেন, কথায়ও হুবহু বাবার ভাষা আয়ত্ত করে নিয়েছিলেন।

১৪. কত বিপদ গুজরেছে, আজ পুনর্মিলনীতে সেদিকে কোনও ভ্রুক্ষেপই নেই। মন শুধু কৃতজ্ঞই হতে চাইছে। মন শুধু অনুগতই হতে চাইছে। মন শুধু রবের অনুগ্রহের কথাই স্মরণ করতে চাইছে, ইউসুফ যেন রবের অপার কৃপা বলে আঁশ মেটাতে পারছেন না। আবারও শুরু করলেন,

رَبِّ قَدْ آتَيْتَنِي مِنَ الْمُلْكِ وَعَلَّمْتَنِي مِن تَأْوِيلِ الْأَحَادِيثِ ۚ

হে আমার প্রতিপালক! আপনি আমাকে রাজত্বেও অংশ দিয়েছেন এবং স্বপ্ন-ব্যাখ্যার জ্ঞান দান করেছেন (১০১)।

১৫. এমন দিকে কি কাউকে ভর্ৎসনা করা শোভা পায়? অভিযোগ করা উচিত? আর কোনও অনুগত বান্দা মুনিবের প্রতি অভিযোগ করতে পারে? মনিবের নিঃশর্ত স্বীকৃতি প্রদান করাই দাসের কর্তব্য, সে কর্তব্যকর্ম পালন করতেই ইউসুফ ঘোষণা দিলেন,

فَاطِرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ

হে আকাশম-ল ও পৃথিবীর স্রষ্টা!

১৬. শুকনো ভাষায় স্বীকৃতি নয়, অত্যন্ত বিনয় আর নম্রতার সাথে, নিজেকে তুচ্ছাতিতুচ্ছ মনে করে বলছেন,

أَنتَ وَلِيِّي فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ ۖ

দুনিয়া ও আখেরাতে আপনিই আমার অভিভাবক!

হে দয়াময় প্রতিপালক আল্লাহ! শুধু এটুকু চাওয়া,

تَوَفَّنِي مُسْلِمًا وَأَلْحِقْنِي بِالصَّالِحِينَ

ক: আপনি আমাকে দুনিয়া থেকে এমন অবস্থায় তুলে নিবেন, যখন আমি থাকি আপনার অনুগত।

খ: আর আমাকে পুণ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত করুন।

১৭. আল্লাহ তা‘আলা প্রতিটি মানুষকে পরীক্ষায় ফেলেন। সবচেয়ে বেশি আর কঠিন পরীক্ষায় ফেলেন নবীগনকে। সর্বযুগেই কাফের-মুশরিকরা মুমিনগনকে কষ্টে ফেলেছে। চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে। নবীগনের উপর তার চেয়েও বেশি কষ্ট এসেছে। তারা পরিবার-পরিজন হারিয়েছেন। সন্তান হারিয়েছেন। শত চেষ্টাতেও জাতি ঈমান আনেনি। আল্লাহ তা‘আলা একবার নবীজিকে সান্ত্বনাও দিয়েছেন,

وَمَا أَكْثَرُ النَّاسِ وَلَوْ حَرَصْتَ بِمُؤْمِنِينَ

এতদসত্ত্বেও অধিকাংশ লোক ঈমান আনার নয়। তাতে আপনার অন্তর যতই কামনা করুক না কেন (১০৩)।

১৮. সবর একটি শক্তিশালী মাদরাসা। প্রতিটি নবীকে আল্লাহ তা‘আলা এই মাদরাসায় ভর্তি করিয়েছেন। প্রতিটি নবীই এই পরীক্ষায় পাস করে বের হয়েছেন। সবরের পরীক্ষায় পাস করার পরই আল্লাহর সাহায্য এসেছে। সবরের একেবারে চূড়ান্ত সীমা অতিক্রম করার আগে, আল্লাহর নুসরত আসেনি,

حَتَّىٰ إِذَا اسْتَيْأَسَ الرُّسُلُ وَظَنُّوا أَنَّهُمْ قَدْ كُذِبُوا جَاءَهُمْ نَصْرُنَا فَنُجِّيَ مَن نَّشَاءُ ۖ

(পূর্ববর্তী নবীদের ক্ষেত্রেও এমনই হয়েছিল যে, তাদের সম্প্রদায়ের উপর আযাব আসতে কিছুটা সময় লেগেছিল) পরিশেষে যখন নবীগণ মানুষের ব্যাপারে নিরাশ হয়ে গেল এবং কাফেররা মনে করতে লাগল, তাদেরকে মিথ্যা হুমকি দেওয়া হয়েছিল, তখন নবীদের কাছে আমার সাহায্য পৌঁছল (অর্থাৎ কাফেরদের উপর আযাব এল) এবং আমি যাকে ইচ্ছা করেছিলাম তাকে রক্ষা করলাম (১১০)।

১৯. শুধু মুমিনদের জন্যেই নুসরত এল, তা নয়, কাফেরদেরও ছাড়া হয়নি। নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে যাওয়ার পর,

وَلَا يُرَدُّ بَأْسُنَا عَنِ الْقَوْمِ الْمُجْرِمِينَ

অপরাধী সম্প্রদায় হতে আমার শাস্তি টলানো যায় না।

২০. এসব ঘটনা কি শুধু গল্প বলার জন্যে? জ্বি না, কেয়ামত পর্যন্ত যত মানুষ আসবে, সবার জন্যেই এতে শিক্ষার উপকরণ রয়েছে। যখন কেউ বিপদে পড়বে, সবর শক্তি নিঃশেষ হয়ে আসবে, তারা এই ঘটনা থেকে পাথেয় গ্রহণ করতে পারে। কারণ,

لَقَدْ كَانَ فِي قَصَصِهِمْ عِبْرَةٌ لِّأُولِي الْأَلْبَابِ ۗ

নিশ্চয়ই তাদের ঘটনায় বোধসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্যে শিক্ষা গ্রহণের উপাদান আছে (ইউসুফ ১১১)।

২১. এসব ঘটনা এমনি এমনি বলা হয়নি,

مَا كَانَ حَدِيثًا يُفْتَرَىٰ وَلَٰكِن تَصْدِيقَ الَّذِي بَيْنَ يَدَيْهِ

এটা এমন কোনও বাণী নয়, যা মিছেমিছি গড়ে নেওয়া হয়েছে। বরং এটা এর পূর্ববর্তী কিতাবসূহের সমর্থক।

২২. ঘটনা একটা, কিন্তু কেয়ামত পর্যন্ত মানুষের জন্যে এই একটা ঘটনাই চূড়ান্ত পাথেয় হিশেবে কাজ করে যাবে। কুরআন কারীমের পর, আর কোনও কিতাব নেই। কুরআন কারীমই চূড়ান্ত সমাধান,

فَبِأَيِّ حَدِيثٍ بَعْدَهُ يُؤْمِنُونَ

সুতরাং এরপর আর এমন কী কথা আছে, যার উপর তারা ঈমান আনবে? (মুরসালাত ৫০)।

২৩. কুরআন কারীমেই আছে সমস্ত সমস্যার সমাধান,

وَتَفْصِيلَ كُلِّ شَيْءٍ وَهُدًى وَرَحْمَةً لِّقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ

এবং যারা ঈমান আনে, তাদের জন্যে হিদায়াত ও রহমতের উপকরণ।

আমি কুরআন কারীমকে নিছক একটি বই ভেবে নিলে কঠিন ভুল করব। আমার জীবনের প্রতিটি সমস্যার সমাধান কুরআন কারীমে আল্লাহ তা‘আলা দিয়ে দিয়েছেন। এটা কি আমি বিশ্বাস করি? বিশ্বাস করলেও কার্যক্ষেত্রে কি তার প্রতিফলন ঘটাই?

এমএফ/

 
.

Best Electronics Products



আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad