বারেক সাহেবের রোহিঙ্গা দর্শন

ঢাকা, শনিবার, ২৬ মে ২০১৮ | ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫

বারেক সাহেবের রোহিঙ্গা দর্শন

ড. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল) ৪:৫৬ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২০, ২০১৮

print
বারেক সাহেবের রোহিঙ্গা দর্শন

সকালে ঘুম থেকে উঠে ব্রেকফাস্টে বসে বারেক সাহেবের চক্ষু চড়ক গাছ। কক্সবাজারের অভিজাত হোটেলের রেস্তোরাঁ ব্রেকফাস্টে গমগম করছে। বিশাল রেস্তোরাঁয় বসার জায়গা নেই বললেই চলে। একেবারে যেন, ‘ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই ছোট যে তরী, আমারই সোনার ধানে গিয়াছে ভরি’ টাইপ অবস্থা। সাদা চামড়া-কালো চামড়া, দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ধরনের মানুষে ভরা রেস্তোরাঁটি। দেশের পর্যটনেরও কি বর্তমান সরকারের সময় এমনি শনৈ শনৈ উন্নতি? গা-টা জ্বলে যায় বারেক সাহেবের। আর কাহাতক সহ্য করা যায়? ধীরে ধীরে ধাতস্থ হন তিনি। কথায় আর পোশাক-আশাকে বোঝেন এরা সবাই পর্যটক নন। তারা অনেকেই দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থায় কর্মরত। রোহিঙ্গাদের সাথে সংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে সংশ্লিষ্টতা তাদের। কক্সবাজারে আসাটাও সে কারণেই। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির কিছু নেতৃস্থানীয় লোকজন দেখে একটু অস্বস্থিও বোধ করেন বারেক সাহেব। রাজাকারদের বিচারে জনমত গঠন, তার দলকে বিপদে ফেলা আর স্বাধীনতার স্বপক্ষের লোকগুলোকে একটা জায়গায় নিয়ে আসায় এই লোকগুলোর ভূমিকাতো কম না। এদের আবার কি কাজ কক্সবাজারে? কথাবার্তা শুনে বুঝতে পারেন মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের উপর সংগঠিত মানবতাবিরোধী অপরাধ তদন্তে গঠিত গণতদন্ত কমিশনের সাথে এখানে তাদের আসা। কিছুই কি বাদ দিবে না এরা? ভাবেন বারেক সাহেব।

তার দলের আরো অনেকের মতই বারেক সাহেবেরও ধারণা ছিল রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে ভাল গ্যাড়াকলে পড়বে সরকার। চাই কি উল্টে যেতে পারে গদিও। অন্তত দেশের ভিতরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি হবে, বাড়বে চীনের সাথে দূরত্ব আর চিড় ধরবে ভারতের সাথে সু-সম্পর্কে- এ নিয়ে তার কোনো সংশয় ছিল না। যেমন সংশয় ছিল না তুরষ্ক, সৌদিআরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে সরকারের সম্পর্ক লাটে ওঠার আর রোহিঙ্গাদের দেখভাল করতে গিয়ে দেশের অর্থনীতির বারোটা বাজার ব্যাপারেও। তাই আগস্ট-সেপ্টেম্বরে যখন রোহিঙ্গারা দলে-দলে ঢুকছিল তখন এর চেয়ে ভাল আর কোনো কিছু বারেক সাহেব টিভির পর্দায় খুঁজে পাননি।

কিন্তু সরকার যেন সবকিছু ঠিকঠাক সামলে ফেলল। এরা পারেও বটে। তাদের বাড়াভাতে আবারো একবার ভাল করে ছাই মাখিয়ে দিয়েছে সরকার। তবে এবারের কক্সবাজার যাত্রায় পুরোপুরি আশাভঙ্গ হয়নি বারেক সাহেবের। হাজার হোক তিনি রাজনীতির লোক। কিছুটা হলেও বোঝেন মানুষের অসন্তোষের জায়গাগুলো। সংখ্যাগুরুর দেশে টেকনাফ-উখিয়ার ছয় লাখের মত মানুষ হঠাৎ দশ লাখের বেশি রোহিঙ্গার কাছে সংখ্যালঘু হয়ে একটু বেকায়দাতেই আছে। এলাকার স্কুল-কলেজগুলোর অনেকগুলোতেই এখন প্রশাসনিক দপ্তর। শিকায় উঠছে লেখাপড়া। পাশাপাশি উজাড় হচ্ছে সংরক্ষিত বনাঞ্চল। পাশাপাশি রোহিঙ্গারা কাজে-কামে জড়িয়ে পড়ায় কমছে দৈনিক মজুরি কিন্তু দেশি-বিদেশি মৌসুমী পর্যটকের চাপে বাড়ছে জিনিষের দাম।

রোহিঙ্গাদের নিয়ে এই পরিস্থিতি তৈরিতে আন্তর্জাতিক আর দেশীয় অনেক চক্রই সক্রিয় ছিল। বারেক সাহেবদের ভূমিকাও একেবারে উড়িয়ে দেয়ার মত ছিল না। তাদের সবার মূল লক্ষ্য হয়ত অর্জিত হয়নি, কিন্তু একটু হলেও আশা টিকে আছে। ভয় শুধু প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে। কিভাবে যেন ঠিক ঠিক সবকিছু ঠিকঠাক করে ফেলেন তিনি। এবারও হয়ত তাই করবেন। স্বস্তি-অস্বস্তির এক অদ্ভুত দোলাচালে দুলতে দুলতে ব্রেকফাস্টের টেবিল ছেড়ে হোটেল রুমের পথ ধরেন বারেক সাহেব। এর চেয়ে হোটেলের ইনফিনিটি পুলে ডুব দিয়ে বরং বঙ্গোপসাগরের ঢেউ গোনা ঢেড় ভালো।

লেখক: বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।
 
.

Best Electronics Products



আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad