‘এয়সা বাড়ে নেহি বান্তে বাড়ে মিয়া’!

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ মে ২০১৮ | ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫

‘এয়সা বাড়ে নেহি বান্তে বাড়ে মিয়া’!

ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল) ১১:০০ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ১৭, ২০১৮

print
‘এয়সা বাড়ে নেহি বান্তে বাড়ে মিয়া’!


বাংলা ভাষায় প্রবাদ প্রবচনের প্রচলন অনেক। এই যেমন খনার বচন। জীবন থেকে নেয়া এইসব বচন। প্রতিদিনের জীবন থেকে নেয়া যে অভিজ্ঞতা তাই উঠে আসে বাঙালির প্রবাদে, প্রবচনে। সেই কোন ছোট বেলা থেকে শুনে আসছি, ‘চোরের মায়ের বড় গলা’। স্কুলে পড়ার সময় বাংলা ব্যাকরণ পরীক্ষার প্রশ্নে কতবার যে দেখেছি এই প্রবাদটি। তখন ভাবতাম সম্ভবত বাংলা শিক্ষকদের খুব প্রিয় একটি প্রবাদ এটি। এর শানে নুজুল বুঝেছি অনেক পরে, ইদানিং চোখের সামনে জ্বলন্ত উদাহরণ দেখে। তবে আমার কাছে বরাবরই মনে হয়েছে, এই প্রবাদটি লিঙ্গ বৈষম্যের দোষে দুষ্ট। কেন, চোরের বাপের কি বড় গলা হতে পারে না? শুধু শুধু মহিলাদের বদনাম করা।

সময়ের সাথে কত কিছুই তো বদলায়। এই প্রবাদটি বদলে দেয়ায় দোষের কি? তবে তার জন্য চাই উদাহরণ, চাই যুক্তি। পানামা পেপারসে এদেশের চেনা-অচেনা অনেকের অন্তর্ভুক্তি, ঢাকা উত্তরের জনপ্রিয় মেয়রের অকাল প্রয়াণ, অতঃপর সিটি কর্পোরেশনের উপ-নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা এবং সর্বশেষ সদ্য প্রকাশিত মনোনয়ন তালিকা দেখে বুঝতে পারছি, চোরের বাপের গলাও কম বড় হয় না। এরপর যদি আর কেউ আমার সামনে কখনো বলেন যে, চোরের মায়ের গলা বড়, তবে তার জন্য থাকবে আমার তীব্র প্রতিবাদ। চোরের শুধু মায়েরই নাম বরং মা-বাবা দুইজনের গলাই অনেক বড়।

তবে চোরের মায়ের বড় গলা সংক্রান্ত প্রবাদটির কথা মনে পড়ছিল আসলে অন্য একটা কারণে। পাকিস্তানের সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ সম্প্রতি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কিছু মন্তব্য করেছেন। কথাবার্তা বলেছেন একাত্তর নিয়েও। বলেছেন, বঙ্গবন্ধু বিদ্রোহী ছিলেন না। তৎকালীন পাক শাষকগোষ্ঠীই নাকি বঙ্গবন্ধুকে বিদ্রোহী বানিয়েছিল।
‘বড় মিয়া’তিন তিন বার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছিলেন, কিন্তু কোনোবারই মেয়াদ শেষ করতে পারেননি। প্রথম দুই বার গলা ধাক্কা দিয়েছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী আর এবার পানামা পেপারসে নাম থাকায় তাকে ডিসকোয়ালিফাইড করেছে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট। পাকিস্তানের মতো ‘আধা সভ্য’ দেশের জন্য এটা অবশ্য তেমন অদ্ভুত কিছু না। যদি ভুল না জেনে থাকি, দেশটির কোনো নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীই তার মেয়াদ শেষ করতে পারেননি।

পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তটি আমার কাছে ভালই লেগেছে। তারা তো অন্তত ‘পানামা পেপারস সার্টিফাইড’চোরকে চোর বলার সৎ সাহস দেখিয়েছে। আমরা তো উল্টো পুরস্কার দিচ্ছি।
নওয়াজ শরীফ তার বক্তব্যে বঙ্গবন্ধুর পাশাপাশি বাংলাদেশে পাকিস্তানিদের পরিচালিত নৃশংস গণহত্যার বিষয়টিও তুলে এনেছেন। বলেছেন, সে সময় গঠিত হামুদুর রহমান কমিশনের রিপোর্ট যদি পাকিস্তান সরকার আমলে নিতো তাহলে দেশটির আজকের এই দেউলিয়া দশা হতো না।
উল্লেখ্য, হামুদুর রহমান কমিশন রিপোর্টে একাত্তরের ঘটনাবলীর জন্য পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সরাসরি দায়ী করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল।

নওয়াজ শরীফ পাকিস্তানের রাজনীতিতে প্রভাবশালী শরীফ পরিবারের ‘বড় মিয়া’, জ্যেষ্ঠ সদস্য। পাঞ্জাব প্রাদেশিক পরিষদও এই পরিবারের কুক্ষিগত। দেশটির ব্যবসা-বাণিজ্যও অনেকখানি নিয়ন্ত্রণ করে তারাই। বড় মিয়ার এই বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ প্রীতি কোনো আকস্মিক বিষয় নয়। আমরা অনেকেই এসব বক্তব্য প্রচার করছি, হচ্ছি বড় মিয়ার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। পাকিস্তানের বিচারহীনতার সংষ্কৃতির যে নির্লজ্জ চর্চা, হামুদুর রহমান কমিশনকে আলোচনায় তুলে এনে ধূর্ত বড় মিয়া সেই বিষয়টিকেই সামনে নিয়ে এসেছেন। কারণ এই সংষ্কৃতির সর্বশেষ শিকার তিনি নিজেই। অন্যদিকে তিনি বঙ্গবন্ধুর উদাহরণ দিয়ে নিজেকে যেমন একদিকে বঙ্গবন্ধুর উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ধৃষ্টতা দেখিয়েছেন, তেমনি অন্যদিকে তিনি বঙ্গবন্ধুকে নামিয়ে আনতে চেয়েছেন সাধানরণ বিদ্রোহীর কাতারে।
বড় মিয়া সম্ভবত বোঝেননি ধূর্ততা সব কিছুর উত্তর না। ‘এয়সা বাড়ে নেহি বান্তে বাড়ে মিয়া’! বড় হতে হলে সত্যি সত্যি বড় হতে হয়। ধূর্ত শিয়ালের শেষ ঠিকানা ইতিহাসের আস্তাকুড়।

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।
 
.

Best Electronics Products



আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad