বগুড়া ইয়ূথ কয়্যার, আমার হৃদয়ের তার (শেষ পর্ব)

ঢাকা, শনিবার, ২৬ মে ২০১৮ | ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫

বগুড়া ইয়ূথ কয়্যার, আমার হৃদয়ের তার (শেষ পর্ব)

লে. কর্ণেল শহীদ আহমেদ (অব.) ১:৩৩ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১৬, ২০১৮

print
বগুড়া ইয়ূথ কয়্যার, আমার হৃদয়ের তার (শেষ পর্ব)

বিএ পরীক্ষার পড়াশোনার চাপে কিছুদিন আমার গান বন্ধ রাখতে হয়েছিল। কোন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারিনি। পরীক্ষা শেষ হলো ১৯৭৬ এর জুন মাসে। আবার ঝাঁপিয়ে পড়লাম গান নিয়ে।

ইতোমধ্যে বাংলাদেশ টেলিভিশন থেকে বগুড়ার আঞ্চলিক গানের একটি অনুষ্ঠানের ডাক এলো। বগুড়া ইয়ূথ কয়্যার তখন সদ্যজাত শিশু মাত্র। অতএব ‘বগুড়া সংস্কৃতি সংসদ’-এর টেলিভিশনে প্রথম অনুষ্ঠান বলে কথা! তখন সেটা ছিল বিরাট গর্বের ব্যপার! আমরা দলে বলে রিহার্সাল করতে লাগলাম।

রিহার্সাল হতো কাটনার পাড়ায় তামান্না আপাদের বাসায়। বেশির ভাগ গান ছিল বগুড়ার বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগৃহীত। চল্লিশ মিনিটের সেই প্রোগ্রামে প্রথমবারের মতো ‘বগুড়ার আঞ্চলিক গান’ আলাদাভাবে পরিচিতি পেল। তবে আমার যতদূর মনে পড়ে, সেই অনুষ্ঠানটি ‘বগুড়া ইয়ূথ কয়্যার’-এর ব্যানারে প্রচার হয়নি। অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিল টিপু ভাই, লাল ভাই, তামান্না, লেবু, রূপ, সিদ্দিক, আমি, বেশ ক’জন মেয়ে শিল্পী (এই মুহূর্তে নাম মনে করতে পারছি না)। আরও কে কে যেন ছিল, ঠিক মনে নেই।

আমাদের পরিবেশিত গানগুলোর মধ্যে দু-একটির কথা মনে আছে। যেমন, ‘শাম দ্যাশের কমেলা রে’ ও ‘দাদা কইও গো কইও গো, বুধবারে যান লাইওর লিয়া যায়’। আরও একটি গান ছিল যাতে গ্রামের মেয়েরা একে অপরের চুলের উকুন বেছে দিতে মজা করে গায়। সে গানটিও সংগৃহীত ছিল। কিন্তু অনুষ্ঠানের প্রযোজক আপত্তি করলেন যে, ‘উকুন মারা’ ব্যপারটা কেমন যেন একটু লাগে। অর্থাৎ একটু ঘেন্না ঘেন্না লাগে। আমরা আপত্তি করলেও পরে সেই গানটা আর রাখা হয়নি। খুব জনপ্রিয় হয়েছিল অনুষ্ঠানটি। সেই প্রোগ্রামটিতে লাল ভাইয়ের এক বন্ধু (ঢাকা বেতারের সংগীত প্রযোজক) এবং বেতারের ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিসের একজন কর্তা ব্যক্তি যথেষ্ট সাহায্য করেছিলেন। বগুড়া থেকে আসা শিল্পীদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল তেজগাঁও শিল্প এলাকার বিটাকে। বিটাকের তখনকার পরিচালক (নাম সম্ভবত আজগর সাহেব) ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। তার মেয়েও আমাদের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছিল।

বগুড়ায় ফিরে আবার বগুড়া ইয়ূথ কয়্যার নিয়ে ব্যস্ত হলাম। জানি না কী কারণে রূপ, মুকুল ও সিদ্দিক ভাই বগুড়া ইয়ূথ কয়্যারে যোগ দিলেন না। এতদিনের সঙ্গ ছেড়ে তারা যোগ দিলেন নবগঠিত শিল্পীগোষ্ঠী ‘কলতান’-এ। এখন যেখানে এশিয়া সুইটমিটের দোকান, সেখানে আগে ছিল একটি ঔষধের দোকান। এলএমএফ ডাক্তার নূরুল হক বসতেন সেখানে। তার দোকানের পেছনের একটি ঘরে কলতান গোষ্ঠী চর্চা করত। নূরুল হক সাহেবের একটি মেয়েও সেখানে গান গাইত।

যাই হোক, আমাদের জন্য সুখবর ছিল যে, উদীচীর বেশির ভাগ শিল্পীই আমাদের সাথে যোগ দিল। লাল ভাই ও তামান্না প্রথমে কিছুটা ইতস্তত করেও শেষ পর্যন্ত যোগ দিয়ে আমাদের শক্তিবৃদ্ধি করলেন। বিভিন্ন সময়ে অনেক পুরুষ ও নারী শিল্পী আমাদের দলে যোগ দিয়েছিল। এতদিন পর ঠিক নাম মনে পড়ছে না। তবে পারুল, কমল, রাজু, শিখা, শিপ্রা, স্বপন সিংহ, নওগাঁর কুইন, সোমা লাহিড়ী— এই ক’জনের নাম মনে আছে।

সেই শুরু। তারপর একের পর এক অনেক অনুষ্ঠান করেছি আমরা। বগুড়ায় স্থানীয়ভাবে বেশ পরিচিতি পেলাম আমরা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়’সহ আরও অনেক জায়গা থেকে অনুষ্ঠানের ডাক আসতে থাকল। আমরা তখন মহাব্যস্ত। তারপর বাংলাদেশ টেলিভিশনে দ্বিতীয় অনুষ্ঠানের ডাক এলো। এবার বগুড়া ইয়ূথ কয়্যারের ব্যানারে। পুরো একমাস পরিশ্রম করে আমরা তৈরি হলাম। কিছু সংগৃহীত, কিছু টিপু ভাইয়ের লেখা ও সুর দেয়া গান নিয়ে সাজানো হল প্রোগ্রাম। আমরা ঢাকা রওয়ানা হলাম।

ঐ অনুষ্ঠানের বিখ্যাত কিছু গান এখনও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। যেমন, ‘ক্যারে বড় বউ তুই নিন্দত হিনি উঠিস ন্যা ক্যারে?, ‘ঐ কালো ছুঁড়ি ডা হামাক দেওয়ানা করিছে’ ও ‘তুমি হামার ঘাঁটা ছাইড়া দেও, তোমার সাঁতে করম না তো আও’। আমি গেয়েছিলাম সংগৃহীত ‘তোমার আবালকাল গেল হাসিতে খেলিতে, জৈবন গেল রঙে। তোমার বৃদ্ধকাল যাবে ভাবিতে ভাবিতে মিছেই ধান্দাবাজি গো সাঁইজী, কোন রঙ্গে।’

এখানে একটি কথা উল্লেখ করতে চাই। সম্প্রতি বিদেশি টেলিভিশনের চ্যানেলে (কোক স্টুডিও) আসামের শিল্পী পাপনের গাওয়া ‘দিনে দিনে খসিয়া পড়িবে রঙ্গিলা দালানের মাটি গো সাঁইজী, কোন রঙ্গে’ গানটি বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। সেই গান আর আমার গাওয়া গানটি প্রকারান্তরে একই গান। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল ও আসাম এলাকার অত্যন্ত প্রাচীন বাউল গান এটি। শুধু এলাকা ভেদে ভাষা বা কথার কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে মাত্র। পাপনের প্রায় ৪২ বছর আগে আমি গানটি গেয়েছিলাম। এজন্য একটু গর্ব তো করতেই পারি!

বিটিভির এই অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন টিপু ভাই, লাল ভাই, তামান্না, কুইন, লেবু, আমি, সব্যসাচী, সোমা, শিশুশিল্পী সীমা, প্রদীপ, রণজিৎ’সহ আরও কয়েকজন, যাদের নাম মনে করতে পারছি না।

বাংলাদেশ জাদুঘরের তৎকালীন মহাপরিচালক জনাব এনামুল হক বগুড়ার মানুষ, শিল্প-সাহিত্যে উৎসাহী। তাকে প্রস্তাব দেয়া হলে তিনি সানন্দে রাজি হলেন আমাদের অনুষ্ঠানের সঞ্চালক হতে। তার উপস্থাপনায় বিটিভির প্রচারিত অনুষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম সফল ও জনপ্রিয় অনুষ্ঠান হিসেবে নাম করেছিল। প্রচারিত হয়েছিল ১৯৭৭ সালের ২২ জুলাই সন্ধ্যায়। দর্শকদের অনুরোধে বিটিভি অনুষ্ঠানটি কমপক্ষে চারবার পুনঃপ্রচার করেছিল। এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই ‘বগুড়া ইয়ূথ কয়্যার’ বাংলাদেশে সকলের নজরে এলো।

নওয়াজিশ আলী খানের প্রযোজনায় ‘বর্ণালী’ অনুষ্ঠানটি ধারণ করা হয়েছিল ১৯৭৭ সালের ২১ জুলাই। কিন্তু কোনরকমে অনুষ্ঠান শেষ করে পরদিনই আমি সকালের ট্রেনে চট্টগ্রাম রওয়ানা হলাম। আমি সেনাবাহিনীতে কমিশন পাবার জন্য মনোনীত। তার ট্রেনিংয়ের জন্য মিলিটারি একাডেমিতে যোগ দিতে চললাম। সেদিন অর্থাৎ ২২ জুলাই সন্ধ্যায় যখন টেলিভিশনে আমাদের অনুষ্ঠান প্রচারিত হচ্ছিল, তখন আমাকে আমার অন্যান্য সহকর্মীদের সঙ্গে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির গভীর নর্দমায় চুবিয়ে বরণ করা হচ্ছিল! আমি দেখেছিলাম ৬ মাস পর যখন পুনঃপ্রচার হয়েছিল, তখন।

আমার নেশা ও পেশার দ্বন্দ্বে পেশাই জয়যুক্ত হলো। একই সঙ্গে আমার হৃদয়ের তার প্রায় ছিঁড়ে গেল। তারপর থেকে গান গাওয়া আর সম্ভব হলো না বাস্তব কারণেই। কিন্তু বগুড়া ইয়ূথ কয়্যার টিকে রইল আর সবাইকে নিয়ে। সেই থেকে অসংখ্যবার টেলিভিশন’সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অনেক অনুষ্ঠান করেছে প্রতিষ্ঠানটি। বিটিভির অনুষ্ঠানমালায় বগুড়া ইয়ূথ কয়্যারের নাম দেখলে দর্শকরা আগ্রহের সঙ্গে অপেক্ষা করতেন। আমার কাছে অনেকেই মাঝে মাঝে যখন বগুড়া ইয়ূথ কয়্যারের প্রশংসা করতেন, তখন গর্বে বুক ভরে উঠত।

দেখতে দেখতে অনেকগুলো বছর পার হয়ে গেছে। এখনকার ব্যান্ড সংগীতের যুগে দেশীয় সংগীত বা প্রতিষ্ঠানগুলি প্রায় বন্ধ হবার পথে। এখন গান শোনা হয় না, ‘দেখা’ হয়। বর্তমান প্রজন্মের বেশির ভাগ মানুষ বিদেশি সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ এবং তার মাধ্যমে নিজেদেরকে আধুনিক বা স্মার্ট ভাবতে ভালোবাসে। কিন্তু তাদের জানার জন্যই বলি যে, আমেরিকার যত ধরনের সংগীত আছে, তার মধ্যে এখনও মানুষের কাছে সর্বাধিক প্রিয় হচ্ছে তাদের ‘কান্ট্রি সং’। অতএব একটি দেশের মাটি ও মানুষের যে গান, তা চিরকালই মানুষের হৃদয়ের কাছাকাছিই থাকবে। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে খুবই সমৃদ্ধশালী। বাংলার মাটির গান ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, জারি-সারি, দেহতত্ব ও বিভিন্ন এলাকার স্থানীয় সুর এত বেশি সমৃদ্ধ যে, তা অন্যান্য দেশের কাছে ঈর্ষার বিষয়। তাই আমাদের নিজস্ব পরিচয় নিয়েই আমাদের এগিয়ে যাওয়া উচিত।

বলছিলাম বগুড়া ইয়ূথ কয়্যারের কথা। এই প্রতিষ্ঠানও নিজ অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে প্রাণপণ চেষ্টা করছে। কয়েক প্রজন্মের শিল্পী ও কলাকুশলী বদল বা এদিক-সেদিক চলে গেলেও আজও হাল ধরে আছেন সেই এক ও অকৃত্রিম তওফিকুল আলম টিপু ভাই। তার একাগ্রতা, চেষ্টা ও অপরিসীম ভালোবাসাই আজও ধরে রেখেছে একদল নবপ্রজন্মের শিল্পীদেরকে; যারা শত প্রতিকূলতা ও তথাকথিত আধুনিক সস্তা গান বা বিজাতীয় সংস্কৃতির প্রচণ্ড আগ্রাসনের মধ্যেও নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে যুদ্ধ করছে। তাদের সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।

টিপু ভাইকে শুধু ধন্যবাদ জানালে অপমান করা হবে। তিনি বগুড়াবাসীর গর্বের ধন, একজন কৃতি সন্তান। বগুড়া জেলার ইতিহাসে তার স্থান ইতোমধ্যেই সংরক্ষণ করেছেন। তাকে প্রাপ্য সম্মান থেকে কেউ কোনদিন বঞ্চিত করতে পারবেন না। তার লেখা ও সুর করা গান ‘পুঁটি মাছ মারব্যার যাইয়্যা মার্যার আনি বোল, হামরা বোগড়ার ছোল’ এখন বগুড়ার নিজস্ব পরিচয় ও স্লোগান! টিপু ভাই দীর্ঘজীবী হোন, আরও অনেক বছর বগুড়া ইয়ূথ কয়্যারের হাল ধরে থাকুন, সৃষ্টিকর্তার কাছে এই প্রার্থনা করি।

বগুড়ার নিজস্ব পরিচয়কে ধরে রাখার লড়াইয়ে আগে যারা ছিলেন এবং আছেন, তাদের সঙ্গে যৎসামান্য অংশগ্রহণের জন্য আমি নিজেকে ধন্য ও গর্বিত মনে করি। বর্তমান প্রজন্মের সকলের কাছে আহ্বান জানাই— আসুন সবাই মিলে নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াই। নিজ পরিচয় বিস্মৃত কোন জাতি বা জনগোষ্ঠী কখনো সম্মান নিয়ে টিকে থাকতে পারেনি। স্বাধীনতার মূল কথাই তো তা-ই! তাই দল-মত নির্বিশেষে আমাদের এইসব প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখতে এগিয়ে আসুন, সকলের কাছে এটাই আমার আবেদন।

‘বগুড়া ইয়ূথ কয়্যার’ টিকে থাকুক সগৌরবে, নিজস্ব মহিমায়। আমার হৃদয়ের তার যেন না ছেঁড়ে!

পুনশ্চ : আমি ইয়ূথ কয়্যারের সঙ্গে ২১ জুলাই ১৯৭৭ সালে পর্যন্ত সক্রিয় ছিলাম। তাই পরবর্তীকালের ঘটনা সম্পর্কে কোন বর্ণনা দিতে পারলাম না। আশা করি, টিপু ভাই কিংবা অন্য কেউ তা লিখলে আমরা অনেক অজানা কথা জানতে পারব। তাছাড়া আমার কাছে কোন ছবি নেই। কেউ ছবি পোস্ট করলে ভালো হবে।

(সমাপ্ত)

আরও পড়ুন...
বগুড়া ইয়ূথ কয়্যার, আমার হৃদয়ের তার (১ম পর্ব)
বগুড়া ইয়ূথ কয়্যার, আমার হৃদয়ের তার (২য় পর্ব)

বগুড়া ইয়ূথ কয়্যার, আমার হৃদয়ের তার (৩য় পর্ব)
বগুড়া ইয়ূথ কয়্যার, আমার হৃদয়ের তার (৪র্থ পর্ব)
বগুড়া ইয়ূথ কয়্যার, আমার হৃদয়ের তার (৫ম পর্ব)
বগুড়া ইয়ূথ কয়্যার, আমার হৃদয়ের তার (৬ষ্ঠ পর্ব)

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।
 
.

Best Electronics Products



আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad