ব্রহ্মপুত্রও হাঁটছে তিস্তার পথেই

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ | ৯ ফাল্গুন ১৪২৪

ব্রহ্মপুত্রও হাঁটছে তিস্তার পথেই

ইয়াসির আরাফাত বর্ণ ৪:৪৫ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১৫, ২০১৮

print
ব্রহ্মপুত্রও হাঁটছে তিস্তার পথেই

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোর কৃষি কাঠামো বহুকাল ধরে দাঁড়িয়ে আছে দুটি নদীর ওপর, একটি হলো হিমালয়ের মানস সরোবর থেকে বয়ে আসা ব্রহ্মপূত্র নদ এবং অন্যটি হিমালয়ের সিকিম অঞ্চল থেকে তৈরি হয়ে প্রবাহমান তিস্তা নদী। দেশের সবচেয়ে উত্তরের জেলা পঞ্চগড় থেকে আরম্ভ করে নাটোর-সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত পুরো অঞ্চলের এবং অন্যদিকে শেরপুর-জামালপুর থেকে আরম্ভ করে ময়মনসিংহ পর্যন্ত এলাকার ভৌগলিক নাগরিক জীবন এবং কৃষি ব্যবস্থা এখন পর্যন্ত খুব শক্তভাবে এই দুই প্রধান জলপ্রবাহের ওপর নির্ভরশীল। ভারত-বাংলাদেশের কূটনৈতিক রাজনীতির দৈন্যতা তিস্তাকে কোন পথে নিয়ে গেছে গত কয়েক দশকে তা আমরা বেশ ভালোভাবেই আঁচ করতে পেরেছি।

১৯৮৩ সালে ভারত ও বাংলাদেশের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে পানির সুষ্ঠু বণ্টন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, তিস্তার মোট পানির ৩৬ শতাংশ পাবে বাংলাদেশ এবং ৩৯ শতাংশ পাবে ভারত। বাকি ২৫ শতাংশ নদীতে সংরক্ষণ করা হবে। কিন্তু এই পানির ভাগাভাগির সঠিক নীতিমালা পরবর্তী ২৫ বছরেও দই দেশ ঠিকঠাক করতে পারেনি। বরঞ্চ পানির সম্ভাব্য ভাগাভাগি নিয়ে বেশ রেষারেষিই চলেছে দুই দেশের কূটনৈতিক মহলে। ২০০৭ সালে আবারো একই ইস্যুতে দুই দেশ এক সাথে বসেছিল। সে সময় সিদ্ধান্ত হয় ৮০ শতাংশ পানি দুই দেশ সমান ভাগ করে নেবে আর ২০ শতাংশ পানি থাকবে নদীকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। কিন্তু তার কিছু দিন পর বেঁকে বসে ভারত, তারা দাবি করে, বাংলাদেশের মতো এমন ছোট আয়তনের দেশের জন্য কোনোভাবেই এত পানি লাগার কথা না, তাই বাংলাদেশ কখনোই ভারতের সমান পানি পেতে পারে না। আরো বড় সংকট তৈরি হয় যখন দেখা যায় ভারত সরকার জলপাইগুড়ি জেলার মালবাজারে ভারতের তিস্তায় গজলডোবা বাঁধ তৈরি করে প্রায় চল্লিশ বছর ধরে চলমান রাষ্ট্রীয় অমীমাংসিত মালিকানার মুখে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে তিস্তার জলপ্রবাহ পুরোপুরিভাবে নিজেরা নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করেছে । ২০১৩ সাল পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে পানি দেয়া হলেও ২০১৪ সাল থেকে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার পানি প্রবাহ পুরোপুরিভাবে বন্ধ করে দেয় ভারত। তীব্র সংকটে পড়ে যায় তিস্তার ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠী, অচল হয়ে যায় নদীর ওপর নির্ভরশীল কৃষি কাঠামো।

তিস্তার পানির ব্যাপারে ভারত আন্তর্জাতিক আইন ও মামলার উদাহরণ মানেনি কোনোভাবেই। ফলে এক রোখাভাবে বাঁধের নিয়ন্ত্রণ তিস্তাকে একটি মৃত নদীতে পরিণত করেছে। পানি বণ্টনের ব্যাপারে ভারতের একগুয়েমি, অনৈতিক ঢিলেমি ও হটকারিতার ফলে মরে যাওয়া তিস্তার তীরবর্তী ও আশপাশের অঞ্চলের প্রকৃতি ক্রমশই রুক্ষ্ম হয়ে উঠছে, বাজেভাবে নষ্ট হচ্ছে প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র। তলদেশে অজস্র পাথর, নুড়ি, বালি আর পলি পড়ে থাকার কারণে তিস্তার বুকে শুষ্ক মৌসুমে তৈরি হয় উত্তপ্ত বালুর স্তূপ। অন্যদিকে, বর্ষাকালে ভারত থেকে বাঁধ খুলে দিলে অতিরিক্ত পানি প্রবাহের কারণে মূল গতিপথ বদলিয়ে তিস্তা প্রচণ্ডভাবে আছড়ে পড়ে দুই তীরে। যার প্রভাব গিয়ে পড়ে ব্রহ্মপুত্র নদ এবং চলনবিলের ওপর। অতিরিক্ত পানি প্রবাহের দরূণ সৃষ্ট ভাঙনে ফি বছর ২০ হাজার মানুষ বাড়ি-ঘর, গাছপালা, আবাদী জমি হারিয়ে সর্বশান্ত হয়। নদীর প্রবাহপথে বিশাল চর ও উভয় তীরে ভাঙনের তাণ্ডবে তিস্তার বাংলাদেশ অংশে এর প্রস্থ কোনো কোনো জায়গায় ৫ কিলোমিটারেরও বেশি আবার কোনো কোনো জায়গায় ৪০০-৬০০ মিটার।

এখন প্রশ্ন হলো কেন তিন্তা উত্তরবঙ্গের একটি বড় এলাকার মানুষের জীবনে ফোঁড় হয়ে দাঁড়ালো। তিন্তার মৃত্যু প্রাকৃতিকভাবে হয়নি, মানুষই বাংলাদেশ অংশের তিস্তাকে মেরেছে। কিন্তু  এ দেশের রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রকদের যে দায়িত্ব ছিল সমঝোতার মাধ্যমে তিস্তাকে বাঁচিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা, তারা কি সে দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করেছিলেন? তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে যখন থেকেই দুই দেশে আলাপ শুরু হচ্ছিল এবং চলছিল সে সময়গুলোতে যখন যে সরকার ক্ষমতায় ছিল তারা প্রত্যেকেই ভারতের সাথে সমঝোতার চেষ্টা করেছেন। বাস্তবিক অর্থে সে চেষ্টা হোক বা না হোক, আমরা দেখেছি যে চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু কোনো সরকারই একই ধারায় চেষ্টা করেনি। তিস্তার পানি নিয়ে কূটনৈতিক যোগাযোগের চল্লিশ বছরে বাংলাদেশে প্রায় পাঁচবার ক্ষমতা বদল হয়েছে এবং প্রত্যেকবার নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর তারা আগের সরকারের এগিয়ে নিয়ে যাওয়া তিস্তা সমঝোতার কোনো প্রকারের তোয়াক্কা না করেই নিজেদের মত করে নতুনভাবে শুরু করতে গিয়েছেন। যার ফলে তিস্তা নিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বোঝাপড়া কোনো একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে এসে ঠিকঠাক হয়ে ওঠেনি। কিন্তু ভারত নিজে ঠিকই বার বার ক্ষমতা বদল হলেও তিস্তা বিষয়ে তাদের অবস্থানে সব সময়ই অনড় থেকেছে এক রকমের ছিনিয়েই নিয়েছে নিজের ভাগের অতিরিক্ত পানি। অবশ্য দক্ষিণ এশিয়ার সবচাইতে শক্তিধর রাষ্ট্রে যে এখানকার অন্যান্য কম শক্তির রাষ্ট্রের ওপর প্রভাব বিস্তার করবেই, সে আলোচনাও এখানে অনুপস্থিত থাকে না ।

এবার তাহলে আলোচনায় আসা যাক যে, ব্রহ্মপুত্রকে কেন তিন্তার সাথে তুলনা করা হচ্ছে। ২০১০ সালে চীন বাংলাদেশের জন্য প্রচণ্ড রকমের বিপদজ্জনক একটি প্রকল্পের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়। সে সময়ের আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে এ নিয়ে বেশ আলাপ-আলোচনাও চলেছিল। চীনের প্রকল্পটিতে তারা চাচ্ছে হিমালয় পর্বতের মানস সরোবর থেকে বয়ে এসেছে ব্রহ্মপুত্রের যে মূল ধারা সেটির পানিকে তারা তিব্বত থেকে ১০০০ কিলোমিটার লম্বা একটি টানেলের মাধ্যমে নিয়ে যাবে উত্তর চীনের জিনজিয়াং প্রদেশের ‘টাকলামাকান’ মরুভূমিতে। পানি ব্যবহার করা হবে মরুভূমিতে কৃষিকাজ করা ও টানেলের ভেতরের ¯্রােতকে কাজে লাগিয়ে জলবিদ্যুৎ তৈরির কাজে। তারা এ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য সকল ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষাও আরম্ভ করে দিয়েছে।

এই টানেলে কাজ বাস্তবায়ন হলে দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর পশ্চিমাঞ্চল এবং উত্তর পূর্বাঞ্চলের বেশ কিছু এলাকা আক্ষরিক অর্থেই মরুভূমিতে পরিণত হবে। যারা ভূগোল নিয়ে পড়ালেখা করেন বা জানাশোনা আছে তারা হয়তো জানেন যে, দেশের বৃহত্তম এই অঞ্চলের প্রধানতম পানির উৎসই হলো ব্রহ্মপুত্র নদ। যমুনা নদীতেও সব পানিই আসলে ব্রহ্মপুত্র থেকেই আসে। ফলে টানেল নির্মাণ করে পানি সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হলে এই অঞ্চলে পদ্মা নদী ছাড়া আর কোনো প্রধানতম পানির উৎস থাকবে না। ব্রহ্মপুত্রের সাথে যমুনাও পরিণত হবে মৃত নদীতে। আর ওদিকে পদ্মাকে গত কয়েক দশকে মৃতপ্রায় বানিয়ে ফেলার জন্য ভারতের তৈরি ফারাক্কা বাঁধ তো আছেই।

আট বছর আগে চীন এ সিদ্ধান্ত নিলেও এতগুলো বছরেও বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে চীনের সাথে ব্রহ্মপুত্রের পানির ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে কোনো কথা বলতে শোনা যায়নি। বাংলাদেশের বেশ কিছু একটিভিস্ট গ্রুপই শুধু ব্রহ্মপুত্রের পানির ন্যায্য হিস্যার বিষয়ে রাস্তায় প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়েছে, স্লোগান তুলেছে। কিন্তু তাদের সে স্লোগানের শব্দ সম্ভাবত রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রকদের বদ্ধ অফিসরুমে পৌঁছায়নি। এখনো যদি সরকারের পক্ষ থেকে কোনো প্রকারের আলাপ-আলোচনা না করা হয় চীনের সাথে তাহলে ভবিষ্যতে শুধু পানি ইস্যুতেই বাংলাদেশের নদী নির্ভর নাগরিক ও কৃষিজীবী জনগোষ্ঠীকে (যাদের পরিমাণ মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭০ ভাগ) চরম মূল্য দিতে হবে।

গঙ্গা ও তিস্তার উজানে বাঁধ নির্মাণের ফলে এমনিতেই বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ অঞ্চলে প্রায় মরুকরণ ঘটে গেছে। ছোট-বড় অনেক নদী মরে গেছে, লবণাক্ততা বেড়েছে, কৃষি ও মৎস সম্পদে বিপর্যয় ঘটেছে। মেঘনার উজানে তৈরি হওয়া টিপাইমুখ বাঁধ মেঘনার পানি প্রবাহকেও সংকুচিত করেছে, শুধু স্বাধীনভাবে প্রবাহমান ছিল ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা। এখন ব্রহ্মপুত্রের উজানে ড্যাম ও ব্যারেজ নির্মাণ করে বাকি পানিটুকু সরিয়ে নিয়ে যাওয়া মানে হলো গোটা দেশই মরুকরণ ও লবণাক্ততার ঝুঁকিতে পড়া। এ রকম বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প যেভাবে ক্ষমতাশীল রাষ্ট্রগুলোকে লাভবান করছে সে রকম জায়গায় বাংলাদেশ যদি আরো শক্তভাবে জবাব না দেয় এবং নিজের হিস্যাটুকু তুলে না নিয়ে আসে তবে এ প্রকল্পে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব হবে শেয়ালের কাছে মুরগী বর্গা দেবার মতো। অবশ্য ব্রহ্মপুত্রের ওপরে বাঁধ নির্মাণের কঠোর বিরোধিতা ভারত শুরু থেকেই করে আসছে কিন্তু চীন-ভারত-বাংলাদেশ এর মধ্যে কোনো প্রকারের ত্রিদেশীয় পানিবণ্টন চুক্তি না থাকার কারণে চীনের এই স্বেচ্ছাচারিতার ছাই আরো বেশি বাতাস পাচ্ছে।

নদীগুলোতে পানির প্রবাহ যত কমতে থাকবে তত বেশি করে কৃষি উৎপাদন ভূপৃষ্ঠের নিচ থেকে আহরিত পানি নির্ভর হয়ে উঠবে, ফলে পানির স্তর আরো বেশি নিচে চলে যেতে থাকবে। নদীতে পানির স্বল্পতা মাটির ওপরের স্তরে দ্রুতই মরুকরণ ঘটিয়ে ফেলবে, ফলে প্রাণী ও উদ্ভিদ উভয়ই মারাত্মক অস্তিত্ব সংকটের মধ্যে পড়বে। দেখা দেবে সুপেয় পানির সংকট। যার কিছু উদাহরণ আমরা গ্রীষ্মকালে মৃত তিস্তা অববাহিকার তীরবর্তী ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে দেখতে পাই।

তাই এ রকম একটি জটিল আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও আমাদের টিকে থাকার প্রশ্নকে যদি বাংলাদেশের রাজনৈতিক শক্তিগুলো রাজনৈতিক এজেন্ডা হিসেবে ভোটের রাজনীতিতে নিয়ে আসে তবে তা হবে মারাত্মক বোকামি। বরং অন্তত এই প্রশ্নে হলেও সকল রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে একসাথে জোটবদ্ধ হয়ে নিজেদের সবগুলো নদীর পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে আন্তর্জাতিক মহলের সামনে এক কাতারে দাঁড়ানোটাই হবে প্রকৃত রাষ্ট্রসেবা, দেশের সেবা-দশের সেবা।

লেখক: শিক্ষার্থী, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।
 
.

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad