বগুড়া ইয়ূথ কয়্যার, আমার হৃদয়ের তার (৩য় পর্ব)

ঢাকা, সোমবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ | ৬ ফাল্গুন ১৪২৪

বগুড়া ইয়ূথ কয়্যার, আমার হৃদয়ের তার (৩য় পর্ব)

লে. কর্ণেল শহীদ আহমেদ (অব.) ১:৩০ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১১, ২০১৮

print
বগুড়া ইয়ূথ কয়্যার, আমার হৃদয়ের তার (৩য় পর্ব)

অসংখ্য স্মৃতির সুতো আমার মনে জট পাকিয়ে ফেলেছে। স্বাধীনতার আগের কথার সাথে পরের স্মৃতিগুলো মিশিয়ে ফেলছি। আসলে মনের দোষ দেব কী করে? ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১ সালের ঘটনাবলি একে অপরের সাথে এত সম্পর্কযুক্ত যে, আলাদা করাও মুশকিল।

যাই হোক, বগুড়া ইয়ূথ কয়্যারের জন্মকথা নিয়ে লিখতে বসে কিছুটা আগের কথা লিখতেই হচ্ছে। কারণ রাতারাতি এই সংগঠনটি জন্মলাভ করেনি। উদীচীর সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণের গর্ব বুকে নিয়ে এবং বগুড়ার ভাষা ও মাটির গানকে ভিত্তি করেই এই মহতী সংগঠনের জন্ম। প্রথমে ছোট্ট পরিসরে শুরু করে ধীরে ধীরে আমরা সংহত হয়েছি, সমৃদ্ধ হয়েছি এবং সাহস সঞ্চয় করেছি। আপাত দৃষ্টিতে একটি আঞ্চলিক ভাষাভিত্তিক গানের দল মনে হলেও এই সংগঠনের ব্যাপ্তি ও প্রভাব অনেক ব্যাপক। এবং এ কারণেই আমরা সারাদেশে এমনকি বিদেশেও এক নামে পরিচিতি পেয়েছি। 

আমি ইতিহাসবিদ নই। যারা ইতিহাস চর্চা করেন, তারা বিস্তারিত লিখতে পারবেন। আমার ক্ষুদ্র জ্ঞান আর স্মৃতিতে যা আসছে, আমি শুধু তা-ই লিখব। অনেকের নাম, ঘটনার সময় বা তারিখ বা তথ্য ভুল হয়ে যাওয়া স্বাভাবিক বলে এ যাত্রায় আমাকে ক্ষমা করে দিলে বাধিত হবো।

এবার আমার কিছু কথা বলি। কণ্ঠশিল্পী হওয়ার অদম্য ইচ্ছা ছোটবেলা থেকেই আমার। দাদা-দাদীর নেতৃত্বে আমাদের একান্নবর্তী যে বিশাল পরিবার ছিল, সেখানে একমাত্র আমার ছোট চাচা হারমোনিয়াম বাজিয়ে বৎসরে দু-একদিন গলা ছেড়ে গান গাইতেন। তার গানের পুঁজিও খুব সীমিত ছিল। তিনি নিতান্ত শখের বশেই ঐ কাজটি করতেন। এছাড়া আমাদের পরিবারে গান বা কোনরকম সংস্কৃতি চর্চার জায়গা ছিল না। একেবারে পাঁড় ব্যবসায়ী ছিলেন দাদা এবং তার তিন পুত্র। পরিবহন ব্যবসা করলে বোধহয় লোকে কিছুটা কাঠখোট্টা হয়ে যায়! শুধু ব্যবসা, কর্মচারী, লাভ-ক্ষতি নিয়েই বড়দের ব্যস্ত সময় কাটত। তবে আমার এক মামা ওয়াজির হাসান (মোটু) বেশ গানপাগল মানুষ ছিলেন। তিনি যেন ছিলেন আমার সাহারায় মরুদ্যান।

তখন আমার গান সংগ্রহের উৎস ছিল রেডিও ও বিভিন্ন উৎসব বা অনুষ্ঠানে মাইকে বাজানো গান। প্রধানত মুখস্ত বিদ্যা, পরে খাতায় লিখে তা সংরক্ষণ করতাম। সে সময় আরও একটা মজার উৎস ছিল। তা হলো, সিনেমা হলে নতুন ছবি এলে হলের বাইরে সেই ছবির গান ছাপিয়ে ছোট ছোট চটি বই বিক্রি করত কিছু লোক। জনপ্রিয় হলে তা কিনতে লোকে কাড়াকাড়ি লাগিয়ে দিত।

মনে আছে, ক্লাস ফোরে পড়ার সময় উত্তরা হলে সুচিত্রা-উত্তমের ‘সাগরিকা’ মুক্তি পেল। আমার বড়ভাই ফিরোজ আহমেদ সুজা সেই ছবির একটা গানের বই কিনে আনল। এ জন্য মা তাকে খুব বকাবকি করেছিলেন। কিন্তু আমার লাভ হয়েছিল। ওই বই থেকে ‘আমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা থাকে’ গানটার কথাগুলো শিখেছিলাম।

এভাবে স্কুল পেরিয়ে ১৯৬৯ সালে যখন আজিজুল হক কলেজে ঢুকলাম, তখন কিছুটা স্বাধীনতা পেয়ে গান শেখার বাসনা আবার পেয়ে বসল। তখন নিজের হারমোনিয়াম বা শিক্ষক কেউ নেই। নিজে নিজেই হাতড়ে বেড়াই, যেখানে যতটুকু পাই, তাই বুভুক্ষের মতো শিখতে চাই। মঞ্চে গান পরিবেশন করার সুযোগও পেলাম তখনই প্রথমবার। আগে ভাবতাম মঞ্চে গান গাওয়া খুব সহজ। আমার ধারণা কতখানি ভুল ছিল, তা বুঝতে পারলাম মঞ্চে উঠে নিজের হাঁটু ও গায়ের কাঁপুনি দেখে। দর্শকের দিকে মুখ তুলে তাকাতেই দুনিয়ার সংকোচ ও ভয় চেপে ধরল।

যাই হোক প্রথম পরীক্ষা মোটামুটি ভালোভাবেই উতরে গেলাম, সাহস একটু বাড়ল। এর মধ্যে কলেজের কয়েকটি অনুষ্ঠানে গেয়েছি। তখন একবার টিপু ভাইয়ের নেতৃত্বে কলেজে এবং সাতমাথার পাশে জিন্নাহ হলে উদীচীর কয়েকটি অনুষ্ঠান দেখে গণসংগীতের প্রেমে পড়ে গেলাম। আমি সদস্য না হলেও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাদের সাথে সাথে যেতে শুরু করলাম। এভাবেই আস্তে আস্তে কখন যেন দলে ঢুকে গেলাম। আমার বড়ভাই ফিরোজ আহমেদ সুজা তখন ছাত্র ইউনিয়নের মাঝারি নেতা। আর টিপু ভাইয়ের ছোটভাই আতিকুল আলম লেবু আমার স্কুল জীবনের সহপাঠী। এই দুজন আমাকে উদীচীতে অন্তর্ভুক্ত হতে সাহায্য করেছিল।

গণসংগীতের দলের সঙ্গে বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠান করলাম। দেখতে দেখতে ১৯৭০ সাল এসে গেল। আমার পড়াশোনার চাপ যেমন বাড়ছিল, তেমনি বাড়ছিল দেশের রাজনীতির উত্তাপ। চারদিকে এক-একজন মানুষ যেন এক-একটি অগ্নি স্ফুলিঙ্গ! আমরা সারা জেলার বিভিন্ন স্থানে উদীচী থেকে গণসংগীতের আসর শুরু করলাম। পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে বিকেল-সন্ধ্যা হয় রিহার্সাল, নয়ত কোন অনুষ্ঠানে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।

বলাই বাহুল্য যে, এসব অনুষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা ও চালিকাশক্তি ছিলেন টিপু ভাই। আমাদের যন্ত্রপাতি বলতে টিপু ভাইয়ের অনেক পুরনো দুটি হারমোনিয়াম ও দুই জোড়া তবলা। বেশিরভাগ রিহার্সাল হতো জলেশ্বরীতলায় টিপু ভাইদের বাড়ির একটা বড় ঘরে, মাটিতে মাদুর বিছিয়ে। দু-তিন ঘণ্টা রিহার্সাল করে একেবারে নিখুঁত হলেই আমরা ছাড়া পেতাম। নাশতায় মিলত একটা করে সিঙ্গারা বা বিস্কুট, সঙ্গে এক কাপ চা। সামান্য হলেও কিছু খরচ তো হতো! জানি না ওই খরচা কোত্থেকে ম্যানেজ করতেন টিপু ভাই। সবাইকে সময় মেনে আসতে হতো। না হলে টিপু ভাইয়ের মজার মজার গালি শুনতে হতো। তিনি কাউকে বকতেন ‘কাইল্যা’, কাউকে ‘বাঁটু’, আবার কাউকে বলতেন ‘হাবু’! গাইতে ভুল হলেও এগুলো শুনতে হতো।

গানের সাথে সাথে নাচের কোরিওগ্রাফি’সহ নিজে নেচে মেয়েদেরকে শেখাতেন। গণসংগীতের নৃত্যে কয়েকজন ছেলেও অংশগ্রহণ করত। কয়েকটি বড় অনুষ্ঠানে ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’ ও ‘পায়রার পাখনা বারুদের বহ্নিতে জ্বলছে’ গান দুটির সাথে টিপু ভাইয়ের দুর্দান্ত নৃত্য পরিবেশনার ছবি এখনও আমার স্মৃতিতে জীবন্ত হয়ে আছে। শেষে যেদিন স্টেজে চূড়ান্ত অনুষ্ঠান হতো, সেদিন আমরা থাকতাম অনেক আত্মবিশ্বাসী এবং স্বভাবতই পরিবেশনার মানও ভালো হতো। এর মাঝে মাঝে একক গানও হতো কয়েকটি।

নূরুল আলম (লাল ভাই) অনেক জনপ্রিয় ও অভিজ্ঞ শিল্পী ছিলেন। সাধারণত টিপু ভাই ও লাল ভাই আমাদের সমস্ত গণসংগীতে নেতৃত্বে ও লিড ভয়েসে থাকতেন। একক সংগীতে লাল ভাই, মুস্তারী জাহান, তামান্না, আতিকুল আলম লেবু, মুকুল ও মাঝে মাঝে আমি গাইতাম। তখন তবলায় থাকতেন নামকরা তবলচি নিজামুদ্দিন বাটুল ভাই ও কচি ভাই। পরবর্তীতে তবলায় যোগ দিয়েছিল প্রদীপ রায় ও রণজিৎ পাল।

মঞ্চ ব্যবস্থাপনায় থাকতেন ফিরোজ আহমেদ সুজা এবং তার সহযোগীরা। তারা সব অদ্ভুত অদ্ভুত উদ্ভাবনী ক্ষমতা প্রয়োগ করে মঞ্চে আলোক প্রক্ষেপন ও কৃত্রিম শব্দ সৃষ্টি করতেন। কারণ তখন আধুনিক প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি বগুড়ায় ছিল না। দু-একটি পাওয়া গেলেও তা ছিল খুবই ব্যয়বহুল। আমাদের তো টাকা-পয়সা ছিল না। যৎসামান্য চাঁদার টাকায় সব খরচ সামাল দিতে হতো। সব কিছু মিলিয়ে ছিল একটি সমন্বিত টিমওয়ার্ক। এই টিম বগুড়ায় সবচেয়ে সংগঠিত ও শক্তিশালী ছিল।

স্বাধীনতা পূর্ব থেকে বগুড়ায় ‘করতোয়া সাংস্কৃতিক সংঘ’ নামে একটি সংগঠন ছিল। এছাড়াও অর্জুন মোহন্ত, ওস্তাদ দেলোয়ার হোসেন, মুস্তফা নুরুল মহসীন (ছোটি), স্বপন কুণ্ডু (সেতার ও তবলা), লুৎফর (নৃত্য), সুইটি, লাকি, রাখাল দা (পাখোয়াজ), রমজান আলী (বাঁশী)-সহ আরও অনেক গুণী শিল্পী ছিলেন। তারা মাঝে মাঝে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করতেন। তবে ব্যক্তিগত সংগীত চর্চাতেই তারা সীমাবদ্ধ ছিলেন।

কিন্তু উদীচীর লক্ষ্য ছিল সমবেত প্রচেষ্টায় মানুষকে সমাজের অন্যায়-অবিচার ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে জাগিয়ে তোলা। তাই যখন দেশের রাজনৈতিক আবহাওয়া ধীরে ধীরে উত্তপ্ত ও উম্মাতাল হচ্ছিল, তখন উদীচী প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ও প্রতিটি এলাকায় নিয়মিত গণসংগীত, আবৃত্তি, দেশাত্মবোধক গান, বিপ্লবী পথ নাটিকা ইত্যাদির মাধ্যমে জনসাধারণকে উদ্দীপ্ত করতে সক্ষম হয়েছিল। ১৯৭১ এর মার্চ মাস জুড়ে আমরা খোলা ট্রাকে মঞ্চ সাজিয়ে শহরের মোড়ে মোড়ে অনুষ্ঠান করেছি। মানুষের মধ্যে স্বাধীনতার আকাঙ্খা জাগিয়ে তুলেছি। অসংখ্য মানুষ তখন উদীচীর সদস্য না হয়েও আমাদের সাথে কাজ করেছেন।

বিশেষ একজন ব্যক্তির কথা না বললে অন্যায় করা হবে। দৈহিক উচ্চতায় পাঁচ ফুটের কম হলেও চেতনায়, ভাষাজ্ঞান, উচ্চারণ ও কলমের তীক্ষ্ণতায় তিনি ছিলেন পাহাড়ের মতো উঁচু একজন মানুষ। মনোজ দাশগুপ্ত, আমাদের সবার মনোজ দা। আমরা ভারতের সলিল চৌধুরীর বেশ কয়েকটি গণসংগীত করলেও মনোজ দা’র লেখা গণসংগীত গেয়েছি অগুনতি। ঐ ছোটখাট মানুষটির কলম দিয়ে যে কী আগুন বের হতো, আমরা গাইতে গেলে যেন উত্তাপ টের পেতাম। তার প্রায় সব গানেই সুর দিয়েছিলেন টিপু ভাই। অপূর্ব জুটি ছিলেন টিপু–মনোজ। মনোজ দা বেঁচে নেই। তার কথা কখনো ভুলব না।

এই সমমনা শিল্পীরাই স্বাধীনতা পরবর্তীতে পুনরায় দেশ গড়ার কাজে সর্বস্তরের মানুষ ও ছাত্র-ছাত্রীদেরকে উদ্দীপ্ত করেছেন। প্রকৃতপক্ষে এই শিল্পীরাই বগুড়া ইয়ূথ কয়্যারের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন।

(চলবে)
বগুড়া ইয়ূথ কয়্যার, আমার হৃদয়ের তার (২য় পর্ব)
বগুড়া ইয়ূথ কয়্যার, আমার হৃদয়ের তার (১ম পর্ব)

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।
 
.

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad