জীবনসঙ্গী থাকতে মানুষ কেন পরকীয়ায় জড়ায়?

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৩ জানুয়ারি ২০১৮ | ১০ মাঘ ১৪২৪

জীবনসঙ্গী থাকতে মানুষ কেন পরকীয়ায় জড়ায়?

আলী হাসান উসামা ৭:৫২ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৩, ২০১৭

print
জীবনসঙ্গী থাকতে মানুষ কেন পরকীয়ায় জড়ায়?

পরনারীর মাঝে যা আছে, নিজ স্ত্রীর মাঝেও তো ঠিক তাইই আছে। এরপরও কেনো পরনারীর ওপর এতো আকর্ষণ? একই কথা নিজ পুরুষ এবং পরপুরুষের ক্ষেত্রেও। স্বামী ও স্ত্রীর গাফিলতিই এক্ষেত্রে অন্যতম কারণ। বিয়ের পূর্বে তরুণ-তরুণী একে অন্যের প্রতি ভীষণ আকর্ষণ বোধ করে। আবরণ উন্মুক্ত করার পূর্বে এই আকর্ষণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকে। এ কারণে শরীয়ত সহবাসের ক্ষেত্রেও প্রকাশ্যে একে অন্যের সামনে পুরোপুরি উন্মোচিত হতে নিরুৎসাহিত করে।

মোমিনজননী আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, আমি কখনো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের লজ্জাস্থান দেখি নি এবং তিনিও কখনো আমার লজ্জাস্থান দেখেন নি।

প্রকাশ্যে একজন আরেকজনের সামনে উলঙ্গ হয়ে গেলে এর পরিণতিতে ধীরে ধীরে পরস্পরের প্রতি পরস্পরের আকর্ষণ কমে যেতে থাকে। এ যুগে এসে তো স্বামী-স্ত্রীসুলভ আচরণের ক্ষেত্রেও নতুন সব পন্থা আবিষ্কার হয়েছে, যেগুলোকে বিকৃত যৌনচর্চা নামে নামকরণ করা যেতে পারে, আকর্ষণ লোপ পাওয়ার ক্ষেত্রে এসবের ভূমিকাও অনস্বীকার্য।

বিয়ের পূর্বে আপনার প্রতি আপনার স্বামী প্রচণ্ড আকর্ষণ অনুভব করতো, আপনাকে ছাড়া আর কারো দিকে দৃষ্টি মেলেও তাকাতো না। এখন কেন দিনকে দিন তার অবস্থায় পরিবর্তন আসছে? কেনো সে পরনারীর প্রতি অধিক আকর্ষিত হয়ে পড়ছে?

আপনার স্বামীও একজন মানুষ। নারীরা বাইরে বের হলে সাধারণত খুব সেজেগুজে পরীর রূপ ধারণ করে বের হয়। পক্ষান্তরে ঘরে থাকলে সাজগোজ খুব কমই করে। কখনো তো অশুচি অবস্থায়ও থাকে। আপনার স্বামীর মানসপটে যখন আপনার ছবি ভেসে ওঠে, তখন আপনি যে অবস্থাগুলোতে থাকেন, সেই চিত্রগুলোও ভেসে ওঠে। বিয়ের পর স্বামীর সামনে আপনি তো আর পরীর বেশে আবির্ভূত হন না। লোকাল নারীর মতো হয়ে যায় আপনার ঘরের ভেতরকার চিত্র। তাই যখন স্বামীর সামনে পরীর বেশে কেউ আবির্ভূত হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই তিনি তার প্রতি আকর্ষণবোধ করেন। স্বামী যদি মুত্তাকি হন, তাহলে তাকওয়ার কারণে হয়তো গুনাহ থেকে বিরত থাকেন। কিন্তু তার মানসপটে এগুলো ক্রমশ রেখাপাত করতে থাকে। একপর্যায়ে যা আগ্নেয়গিরির তপ্ত লাভার মতো বিস্ফোরণ ঘটে।

স্বামীর সঙ্গে আপনি প্রেম করেন না, মিষ্টি আলাপচারিতা ও রোমান্টিক কথাবার্তা বলেন না, অন্যরা কিন্তু সৌজন্য হিসেবে হলেও এই কাজটি খুব গুরুত্বের সঙ্গেই করে। এ বিষয়গুলোও কিন্তু স্বামী বেচারার মনে ঝড় তোলে। এরপর আপনি যখন অন্য পুরুষের সঙ্গে মিষ্টি করে কথা বলেন, হোক তা সরাসরি কিংবা মেসেজে, তখন এ বিষয়টিও ক্রমশ স্বামীকে আপনার প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তোলে।

স্বামী হিসেবে আপনি আপনার স্ত্রীকে যেভাবে পেতে চান, স্ত্রী হিসেবে তিনিও কিন্তু আপনাকে একইভাবে পেতে চান। ঘরের কর্তা হিসেবে আপনি হয়তো তার ত্রুটিগুলো বলে ফেলেন, কিন্তু তিনি লজ্জা হেতু আপনার ত্রুটিগুলো আপনার সামনে তুলে ধরেন না। পুরুষরা বাইরে খুব ফিটফাট থাকলেও ঘরে গেলে অনেকটা বন মানুষের রূপ ধারণ করে। অনেক সময়ই উদোম গায়ে বসে থাকে, এছাড়াও আরো বিভিন্ন সাধারণ (অসুন্দর) অবস্থায় থাকে। ব্যক্তিগত জীবনে আপনি তা করতেই পারেন। এ বিষয়গুলোও কিন্তু আপনার স্ত্রীর অন্তরে রেখাপাত করে।

আপনার মধ্যে বিয়ের পর আর কোনো রোমান্টিকতা নেই, আপনার বাহ্যিক হালচাল আকর্ষণীয় ও কামনাময় থাকে না—এই বিষয়গুলোই কিন্তু আপনার স্ত্রীকে ক্রমশ পরকীয়ার দিকে ঠেলে দেয়। মানুষের মন কাঁচের মতো। তাছাড়া মনের ওপর মানুষ চাইলেও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে না। এটা সৃষ্টিগত দুর্বলতা। এই জ্বলন্ত বাস্তবতা ভুলে যাওয়ার পরিণতি সুখকর নয়। এসব কারণেই সংসার ভাঙার ঘটনা এখন এতো ব্যাপক। পরকীয়ায় ভাসছে গোটা দেশ।

মনে রাখবেন, আপনার মধ্য থেকে ‘সচেতন প্রেমিক সত্তা’র মৃত্যু ঘটলেই আপনার জীবনসঙ্গী অন্য কোনো ‘সচেতন প্রেমিক সত্তা’র প্রতি ঝুঁকে পড়বে; যে তাকে বুঝবে, যে তাকে ভালোবাসবে, যে প্রতিমুহূর্তে তাকে ফিল করবে। একই কথা স্ত্রীদের ক্ষেত্রেও।

আমরা যেমন আমাদের বাইরের জীবনাচারকে সুশোভিত করে উপস্থাপন করি, পারিবারিক জীবনেও আমাদের প্রয়োজন একইভাবে নিজেকে সুশোভিত রাখা এবং সচেতন প্রেমিক সত্তার নিভু নিভু জীবনকে শক্ত হাতে ধরে রাখার চেষ্টা করা। একজনের কাছে অপরজনের প্রয়োজন কিংবা আকর্ষণ কখনো যেনো না ফুরোয়। কখনো যেনো তাতে ভাটা না পড়ে। আমাদের অসতর্কতাগুলোই আমাদের সংসারের অশান্তির মূল কারণ।

আমাদের সব ভালোবাসা হৃদয়ের মধ্যে তালাবদ্ধ করে রাখলে চলবে না। মানুষ গায়েব জানে না। তাই হৃদয়ের জানালা খুলে রাখতে হবে। ভেতরে সুপ্ত ভালোবাসাকে অপরজনের সামনে প্রকাশ করতে হবে। বৈবাহিক জীবনে যেহেতু সার্বক্ষণিক সহাবস্থান হয়ে থাকে, তাই সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে। প্রথমে একটু ঝক্কি মনে হলেও এটাকে অভ্যাসে পরিণত করে নিলে মোটেও কঠিন হবে না।

আসুন স্বামী-স্ত্রী একেঅপরকে আল্লাহপ্রদত্ত অধিকার প্রদানের ব্যাপারে সচেষ্ট হই। প্রিয়তমী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আলোকিত জীবন থেকে ভালোবাসা বিনিময়ের দীক্ষা অর্জন করি। বিকৃত যৌনচর্চা পরিহার করে সুস্থ সুন্দর জীবন গড়ি। আমি অন্যের থেকে যেমনটা প্রত্যাশা করি, প্রথমে আমি নিজেকে তার সামনে সেভাবে উপস্থাপন করি। আল্লাহ সহায় হোন।

আলী হাসান উসামা : মুফতি, ইসলামিক ফিকহ ইনস্টিটিউট, সিলেট

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।
print
 
.

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad