চুপ থাকানোর রাজনীতি

ঢাকা, শনিবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৭ | ১ পৌষ ১৪২৪

চুপ থাকানোর রাজনীতি

ইয়াসির আরাফাত বর্ণ ৯:২৪ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ১১, ২০১৭

print
চুপ থাকানোর রাজনীতি

১৯৬৮ সাল। আইয়ুববিরোধী আন্দোলন তখন তুঙ্গে, আভাস পাওয়া যাচ্ছে গণঅভ্যুত্থানের জোয়ার। ১৯৪৭ সাল থেকে চলে আসা পাকিস্তানি দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার প্রতিবাদের প্রদীপ তখন ধিক ধিক করে জ্বলে ওঠা শুরু করেছে।

.

পাকিস্তানি সামরিক ও একনায়কতান্ত্রিক শাসকেরাও বেশ ভালোভাবেই সে প্রদীপের উত্তপ্ত আঁচ পাচ্ছিলেন। বুঝতে পেরেছিলেন এ প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরের সর্বাগ্রে যে তরুণ ও শিক্ষার্থী সমাজ- তাদের চিন্তা, চেতনা ও দৈনন্দিন মনোভাবকে অন্য কোনো দিকে সরিয়ে না দিতে পারলে, তাদের প্রাত্যহিক আড্ডার বিষয়বস্তুতে পাকিস্তানি দুঃশাসনের বদলে অন্য কোনো রমরমা বিষয় ঢুকিয়ে দিতে না পারলে, একুশ বছর শোষণের কড়া জবাব পেতে হবে।

এমন চিন্তা থেকেই রাষ্ট্রীভাবে সে সময় পাকিস্তানের সকল সিনেমা হলগুলোতে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য সিনেমার টিকিটের মূল্য অর্ধেক করে দেয়া হয়েছিল। যাতে করে ছাত্র ও তরুণ সমাজ ডুবে থাকে সিনেমায়, আচ্ছন্ন থাকে সেলুলয়েডের জীবনে। পূর্ব বাংলার ওপর জারি থাকা দুরাচার তাদেরকে স্পর্শ করতে না পারে, তারা যেন প্রতিবাদী হয়ে উঠতে না পারে।

১৯৬৮ সালে পাকিস্তান সরকারের প্রতিবাদী তারুণ্য দমনের সেই পরিকল্পনা আলোর মুখ দেখেনি। স্বাধীন বাংলাদেশে আইয়ুব খান বা মোনায়েম খানের মতো শাসন চালু নেই। সরকার ব্যবস্থাও তেমন প্রচণ্ড দমনমূলক নয়।

কিন্তু, পরিকল্পনামাফিক আজও দেশের তরুণ সমাজকে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের ক্রিয়াকলাপ থেকে দূরে রাখা হচ্ছে, বিচ্ছিন্ন রাখা হচ্ছে। এখনকার তরুণ-শিক্ষার্থীরা কোনো দুরাচার দেখলেও তা নিয়ে কথা বলতে বা প্রতিবাদ করতে আগ্রহী হয় না। তারা বিশ্বাস করতে শুরু করেছে, এ দেশে কোনো পরিবর্তন আনা সম্ভব না।

দেশের তরুণ সমাজকে একটি চুপ থাকা প্রজন্মে রূপান্তর করার নকশা বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। উদাহরণ হিসেবে, দেশে নেশাজাত দ্রব্য অত্যন্ত সহজলভ্য। সব ধরনের মাদক খুব সহজেই দেশের যে কোনো প্রান্তে পাওয়া যায়। গণমাধ্যমে উঠে আসে মাদক ব্যবসা ও বিদেশ থেকে মাদক আমদানির সাথে পরিবারসহ কোন সংসদ সদস্য জড়িত।

এক সময় ফেনসিডিল বাজারে ছিল, নিষিদ্ধ হওয়ার পর সাধারণ কাশির সিরাপও এখন নেশাদ্রব্য হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।

যদি ইয়াবা বা হিরোইন না পাওয়া যায়, তবে জুতার আঠা (ড্যান্ডি) দিয়েও নেশা করার চল আছে সমাজে। সামাজিকভাবেই যেন নেশা করাকে একটি স্থান দেয়ার চেষ্টা করানো হচ্ছে। কিশোর বা তরুণ কোনো কাজে ব্যর্থ হয়ে ভেঙ্গে পড়লে তাকে আবারো চেষ্টা করার কথা না বলে উল্টো মানসিক বিপর্যয়ের প্রতিষেধক হিসেবে তার হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে মাদকদ্রব্য। সামাজিকভাবেই তারা এমন শিক্ষা পাচ্ছে যে, কোনো বিষয়ে ব্যর্থতার পর ভালো থাকার সবচাইতে বড় পদ্ধতি সমাজ, রাষ্ট্র ও পরিবার থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা। আর সে বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয় মাদকের মাধ্যমেই।

এমন বিচ্ছিন্নতার ধারকেরা চোখের সামনে যে কোনো রকমের অনাচার হতে দেখলেও তা থেকে গা বাঁচিয়ে চলে। যেখানে রাষ্ট্রের একজন নাগরিক হিসেবে তার প্রতিবাদ করার কথা, সেখানেও চুপ থেকে মাথা নিচু করে চলে আসে। চুপ থাকানোর রাজনীতির শিকার হয়ে তরুণ চুপ হয়ে যাওয়া মানুষে রূপান্তরিত হয়।

এর মাধ্যমে রাষ্ট্র বা সরকারের খুব বেশি লাভ হয় তা কিন্তু না। বৃহৎ পরিসরে গিয়ে শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র, সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোরই ক্ষতি হয়। কিন্তু লাভ হয় মৌসুমি রাজনীতি ও ক্ষমতা চর্চাকারীদের। যারা কিনা সরকার বদলালে দল বদলায়। দল বদলিয়ে মাস্তানি, টেন্ডারবাজি, জনগণের টাকা মেরে খাওয়া, মাদক ব্যবসা, ভূমি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ দখল চালাতেই থাকে।

আবার তরুণদের যে অংশটি মাদকের দ্বারা আসক্ত থাকে না তাদের একটি বড় অংশ আসক্ত হয়ে পড়ে পর্নগ্রাফিতে। পর্নগ্রাফির এ আসক্তি তাদেরকে একটি অবদমিত যৌন জীবনের দিকে ঠেলে দেয়। রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার সবখানে সবকিছুতেই তারা যৌনতা খুঁজে পায়।

জ্ঞান-দর্শন-বিজ্ঞান চর্চা, রাষ্ট্র ও সমাজের ভালো মন্দ নিয়ে কথা বলা ও সমাজ বদলালোর চেষ্টার চেয়ে যৌনতাই তাদের কাছে মূখ্য হয়ে দাঁড়ায়। তারা কর্মক্ষেত্রেও নারী সহকর্মীদের সাথে সঠিকভাবে কাজ করে উঠতে পারেন না । অন্যায়ের প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ তো সেখানে দুঃস্বপ্ন।

অবশ্য অবদমিত যৌনতার এ বিষয়ে সামাজিক দায়ই সবচাইতে বেশি। একজন কিশোর তরুণ হয়ে উঠতেই তাকে সামাজিক ও পারিবারিভাবে যৌনতা বা নারী পুরুষের স্বাভাবিক সম্পর্ককে ট্যাবু হিসেবে দেখানো হয়। নারী-পুরুষের মধ্যে যৌনতার সম্পর্ক থেকেও একসাথে কাঁধ মিলিয়ে সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার যে প্রয়োজনীয়তা সেই বিষয়টিকে সব সময়ই এড়িয়ে যাওয়া হয়। যার ফলে কিশোর থেকে তরুণ/তরুণী হয়ে ওঠার এ সময়কালে প্রচণ্ডভাবে এক ধরনের ‘যৌন ফ্যান্টাসি’ ভর করে তাদের উপর। আর তখনই পর্নগ্রাফির অনুপ্রবেশ অনেক সহজ হয়ে যায়। যার ফলাফল আমরা দেখতে পাই ক্রমাগত চলমান নারী নিপীড়ন ও যৌন সন্ত্রাসের মাধ্যমে। দেখতে পাই যৌন বিকারে বিগড়ে যাওয়া এক একজন চুপ হয়ে যাওয়া মানুষের মাধ্যমে।

এ প্রজন্মেই এখনো পড়ালেখায় মনোযোগী তরুণদের কিছু অংশ টিকে আছে সত্য কিন্তু সে টিকে থাকাটাও প্রশ্নবিদ্ধ। শিক্ষার ক্রমাগত বাণিজ্যিকীকরণ, বেকারত্বের পরিমাণ দিনকে দিন বেড়ে যাওয়া এবং পুঁজিবাদের প্রচণ্ড দাপটের কারণে শিক্ষা হয়ে উঠেছে মূলত অর্থ-ক্ষমতা ও চাকরি লাভের প্রধানতম নিয়ামক। যার ফলে শুদ্ধতম জ্ঞান-দর্শন বা সাহিত্যচর্চা বলতে যা অবশিষ্ট আছে তাকে আর কোনোভাবেই একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের শিক্ষা-দীক্ষার উন্নতির দর্পণ বলা যায় না। একরোখাভাবে সবারই একই রকম শিক্ষাধারায় (অর্থাৎ বিজ্ঞান এর কিছু অথবা আর ব্যবসায় শিক্ষার কিছু ধারা) পড়তে চাওয়া এবং মূল বিদ্যায়তন থেকে বের হয়ে ফলিত বা প্রায়োগিক বিদ্যায়তনে পড়ার যে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে সব ধরনের তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে, তা মূলত ভবিষ্যত রাষ্ট্রের জ্ঞানের চর্চা ও বিকাশে যে প্রবল শূন্যতা ও ফাঁপা অবস্থার তৈরি করবে, সেদিকটাই নির্দেশ করছে। এমন একমুখী পড়ালেখার প্রচলনের সাথে চাকরির ক্ষেত্রেও ন্যূনতম যোগ্যতার পরিমাপও বাড়ছে।

ন্যূনতম যোগ্যতার পরিমাপ বেড়ে যাওয়া দোষের না কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয় যখন এ পরিমাপের বিপরীতে পাল্লা দিয়ে কমতে থাকে শিক্ষার গুণগত মান, শিক্ষার্থীদের জানাশোনার পরিমাপ । আর চাকরি-ক্ষমতা বা অর্থের গোলকধাঁধায় পড়ে যাওয়া তরুণেরা সামাজিক অসংগতি দেখেও না দেখার ভান করেন, নিপীড়িত মানুষের চিৎকার শুনেও এড়িয়ে যান, বিভিন্ন পর্যায়ের সামাজিক নির্যাতন দেখেও অন্য দিকে তাকিয়ে চলে যান, এগিয়ে আসেন না, প্রতিবাদ করেন না, সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন না দুর্নীতির দায়গ্রস্ত রাষ্ট্রের দিকে তাকিয়ে। পাছে চাকরি পেতে বিলম্ব হয় বা ক্ষমতা হাতছাড়া হয়ে যায় এই ভেবে। এতে তারা হয়ে পড়েন একেকজন চুপ হয়ে যাওয়া মানুষ, শিকার হন চুপ করানোর রাজনীতির। একটি দেশের তরুণদের একটি বৃহৎ অংশ শুধুমাত্র চাকরি পাবার জন্য সে দেশ, সমাজ, জাতি বা উপমহাদেশের ইতিহাস, অর্জন, জ্ঞান বিকাশের কাহিনী মুখস্ত করছে- তা ধারণ করার চিন্তা মাথায়ও আনছে না, এর থেকে বড় লজ্জার আর কী হতে পারে?

পুরুষতন্ত্র খুব বাজেভাবে জেঁকে বসা এ সমাজে চুপ থাকানোর রাজনীতির সবচেয়ে প্রাচীন শিকার নারীরা। অভিনব সব পন্থায় তাদেরকে চুপ করিয়ে রাখা হয়েছিল যুগের পর যুগ ধরে। এমন উদাহরণ তো প্রচুর আছে যে, কোনো নারী নিজের কর্মক্ষেত্রে বেশ ভালো করতে আরম্ভ করেছেন, এগিয়ে যাচ্ছেন কিন্তু তার পরিবারের লোক চায় না যে ‘ঘরের মেয়ে বাইরে কাজ করুক’। তাকে বার বার চাপ দেয়া হলো বয়স কম থাকতেই সন্তান নেয়ার জন্য, কম বয়সে জননী হয়ে নিজেকেই ঠিক গুছিয়ে নিতে না পারা নারী আরো বেশি অগোছালো হয়ে পড়লেন। ছিটকে পড়লেন-বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেন নিজের কর্মক্ষেত্রের গতিধারা থেকে।

তবে এখনকার যুগে বেশিরভাগ গৃহী নারীকে সবচাইতে বেশি সমাজ, সংস্কৃতি ও গঠনমূলক আলাপচারিতা থেকে দূরে রেখেছে সন্ধ্যার পর থেকে শুরু হয়ে মধ্যরাত পর্যন্ত চলতে থাকা ভারতীয় টিভি সিরিয়াল।

আগে গৃহে থাকা একজন নারী সারাদিন গৃহে কাজ করার পর সন্ধ্যায় সকলে বসতেন একসাথে। ভালো-মন্দ, সমাজ সভ্যতা কোন দিকে যাচ্ছে তা নিয়ে আলাপ করতেন নিজেদের মধ্যে। আরো বেশি সচেতন হয়ে উঠতেন নিজের সন্তানের বিষয়ে, পরিবারের বিষয়ে। আর সচেতন সন্তান, সুগঠিত পরিবার থেকেই জন্ম নেয় সচেতন সমাজ-সুবিন্যস্ত সভ্যতা।

কিন্তু একালে এসে তাদেরকে যখন তাদের ফাঁকা সময়টুকুতে সিরিয়ালের বটিকা দিয়ে ভুলিয়ে রাখা হয়, আন্তঃযোগাযোগ কমে যায় একে অপরের, খুব সুকৌশলে তাদেরকে যখন চুপ করিয়ে দেয়া হয় তাদেরে সন্তান-পরিবারের বিষয়ে তখন আসলে সে সব পরিবার থেকেই উঠে আসা তরুণেরা যে চুপ না থাকার দীক্ষা পাবেন না এটা ধরে নেয়াটাই স্বাভাবিক।

গৃহে থাকা নারীদের উপর এ চুপ থাকার রাজনীতি প্রকটভাবে কাজ করে, কেন না সমাজে এখন নারীর নিজস্ব জীবন ও কর্মের স্বাধীনতা কিছু ক্ষেত্রে আসলেও বেশিরভাগ নারী এখনো ঘরেই থাকেন গৃহিনী হিসেবে।

এ দেশের, এ সমাজের নারীদেরকে, তরুণ/তরুণীদেরকে চুপ করিয়ে দিতে পারলে, মেরুদণ্ডহীন করে দিতে পারলে, মানবতাবিবর্জিত করে তুলতে পারলে, কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও হুজুগে করে তুলতে পারলে, রাজনৈতিকভাবে অসচেতন বানাতে পারলে লাভটা আসলে কাদের এবং কারা এ কাজের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদ দিচ্ছে তা নিয়ে বিদ্যাজাগতিক আলোচনা ও সমাধান করতে পারাটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে।

কয়েক হাজার বছর ধরে বাহারী সব ঔপনিবেশিক শক্তির উপনিবেশ হিসেবে শোষিত-বঞ্চিত হয়ে, নিজস্ব সাংস্কৃতিক কাঠামো বার বার ক্ষমতার পরাকাষ্ঠের কাছে পরাজিত হয়ে পরিবর্তিত হতে হতে আচমকা গণজাগরণের তোপে ‘৭১ সালে যে দেশ ঘুরে দাঁড়িয়েছে, সে দেশের মানুষের উপর এমন সাংস্কৃতিক ‘স্লো পয়জন’ প্রয়োগের চেষ্টা, তাদেরকে এভাবে মেরুদণ্ডহীন করে দেয়ার চেষ্টা কোনো ভাবেই মেনে নেয়া যায় না।

ইয়াসির আরাফাত বর্ণ
শিক্ষার্থী, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

 

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।
print
 

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad