নোবেল আসুক আর নাই আসুক

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ নভেম্বর ২০১৭ | ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৪

নোবেল আসুক আর নাই আসুক

ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল) ৫:৩৬ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০১৭

print
নোবেল আসুক আর নাই আসুক

কিছুদিন আগে অ্যামারি হোটেলে একাত্তর টিভির মোজাম্মেল বাবু ভাইয়ের এক দাওয়াতে দেখা এটিএন নিউজের প্রিয় মুখ মুন্নি সাহার সাথে। বাবু ভাইয়ের এই দাওয়াতগুলো আমি সাধারণত মিস করতে চাইনা। ভালো খাবার, ভালো সময়, কম বেশি পরিচিতদের সাথে সম্পর্ক আরেকটু ঝালাই আর বাড়তি পাওনা বাবু ভাইয়ের ‘বৈঠকি আড্ডা’।

.

অতএব চেম্বার শেষ করে দেরিতে হলেও হাজির হই ঠিক ঠিক। সেবারও বেশ দেরিতে পৌঁছেছি। বিশেষ করে অ্যামারি হোটেলটা গুলশানে হওয়ায় ল্যাবএইড থেকে যেতে পথে ট্রাফিকে বেশ কিছুটা সময় লেগে গেল। আড্ডা তখন প্রায় ভাঙ্গি ভাঙ্গি। অনেকেই ফিরতি পথ ধরেছেন। একদিকে বরং ভালই হলো। সময় নিয়ে গ্রুপে গ্রুপে ঘনিষ্ট আড্ডার সুযোগ।

মুন্নি সাহা কিছু দিন আগে হাওরের বানভাসি মানুষের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা নিয়ে একটি অনুষ্ঠান করেছেন। কারো কাছে তা ভালো লেগেছে, আর কারো কাছে মন্দ। আমার কাছে এটাই বাংলাদেশ। এটাই বাংলাদেশের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। বাউল আব্দুল করিমরা এই বানভাসা জনপদ থেকেই উঠে আসা। মুন্নি সাহার জন্য আমার পক্ষ থেকে তাই শুধুই প্রশংসা। জানালাম সাধুবাদ।

বাঙ্গালির ইতিহাস বারবার শুধু ঘুরে দাঁড়ানোর ইতিহাস। এই বাঙ্গালি-ই একাত্তরের নয় মাসের ধংসস্তুপের উপর দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। তেহাত্তরের আরব-ইসরাইল যুদ্ধের সময় যুদ্ধরত আরব সেনাদের জন্য জাহাজ বোঝাই চা পাঠানোর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন বঙ্গবন্ধুর সরকার। একাত্তরে আমরা এক কোটি আশ্রয় নিয়েছিলাম প্রতিবেশির ঘরে। ত্রিপুরার জনসংখ্যাকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলাম আমরা শরণার্থীরা। আজ সেই আমরাই আরাকানের ঘর ছাড়া মানুষগুলোকে আশ্রয় দিচ্ছি।

বাঙ্গালির নেতৃত্বের মধ্যেই লুকিয়ে আছে বাঙ্গালির বারবার ঘুরে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা। আমি নিজেকে একজন সৌভাগ্যবান বাঙ্গালি বলে মনে করি। কারণ কর্মসূত্রে আমি মাস শেষে বেতন নেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। আর অন্যদিকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট আমাকে আস্থায় নিয়েছেন শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব মেমোরিয়াল কেপিজে স্পেশালাইজড হাসপাতালে নিয়মিত লিভারের রোগীদের চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য। বঙ্গবন্ধু আর বঙ্গমাতার নামে প্রতিষ্ঠিত দেশের এই দুটি হাসপাতালের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকতে পারা আমার জন্য গৌরবের। পাশাপাশি পারিবারিক ও পেশাগত কারণে দু’একবার সুযোগ হয়েছে বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সান্নিধ্যে আসার।

তেমনি এক ঘনিষ্ট আলাপ-চারিতায় বড় আপার কাছে শোনা তাদের ছোট বেলার উত্থান-পতন আর ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। যুক্তফন্টের মন্ত্রী বঙ্গবন্ধু হঠাৎ-ই মন্ত্রীত্বহীন। মিন্টু রোড থেকে রাতারাতি যেতে হলো নাজিমউদ্দিন রোডের সরু গলিতে। মিউনিসিপালটির ময়লা টানার গাড়ির দুর্গন্ধে মাঝে মাঝে বাসায় টেকাই দায় ছিল। তার পর টি বোর্ডের চেয়ারম্যান বঙ্গবন্ধু। এবার ঠিকানা ইস্কাটনের বড় আঙ্গিনার দোতলা বাসা। কিন্তু হঠাৎ-ই সব ওলট-পালট। বঙ্গবন্ধুর স্বপরিবারে উঠলেন টিনসেডের একটি বাসায়। পারিবারিক ব্যবহার্য অনেক কিছুই জায়গার অভাবে রাখা হয়েছিল দলীয় এক নেতার বাসায়। পরে ফিরে পাননি তার অনেক কিছুই। বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীর পাতায় পাতায় এমনি অনেক উত্থান, তার পর পতন আর তার পর আবার ঘুরে দাঁড়ানোর অনেক উদাহরণ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।

ফেসবুক ঘাটতে গিয়ে দেখছিলাম অক্সফোর্ড নেকওয়ার্ক ফর পিস স্টাডিজ আর পেন্সিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টেমেন্ট অব পিস স্টাডিজের কয়েকজন অধ্যাপক রোহিঙ্গাদের প্রতি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি আর শরণার্থী ব্যবস্থাপনায় অমন দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্যে ইউরোপে সাম্প্রতিক কিছু সেমিনারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এবার শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেয়ার প্রস্তাব করেছেন। একই কথা বলেছেন, অষ্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব ক্যানবেরার পিস এন্ড রিসার্চ ইনস্টিউটের কয়েকজন অধ্যাপকও।

শোনা যায়, নোবেল শান্তি পুরস্কারের মনোনয়নে এরা প্রত্যেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এর আগেও পার্বত্য শান্তিচুক্তির জন্য ১৯৯৯ সালে আর ২০১২-তে জাতিসংঘে বিশ্ব শান্তির জন্য ‘জনগণের ক্ষমতায়নের দর্শন’ উপস্থাপনের জন্য তিনি এই পদকটির জন্য মনোনিত হয়েছিলেন। শিকে অবশ্য ছিড়েছিল এমন একজনের কপালে, নিজের জন্য দেশের স্বার্থবিরোধীতায় যিনি অধিক পরিচিত। ফেসবুকে ঝড় উঠছে নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অন সান সু চির রোহিঙ্গা ইস্যুতে সাম্প্রতিক ভূমিকা নিয়ে। আমার চোখে আমাদের নোবেল জয়ী মিয়ানমারের নোবেল জয়ীর চেয়েও নিকৃষ্টতর। কারণ ওদের নোবেল জয়ী অনৈতিক যা কিছু করছেন, তা করছেন দেশটির বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে খুশি করতে যেয়ে, আর আমাদের উনি সবই করেন নিজের তাগিদে।

আমি জানিনা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবার নোবেল পাবেন কিনা। না পেলেও কিছু এসে যায় না। শেখ হাসিনা নোবেল পেলে নোবেল মহিমান্বিত হবে, শেখ হাসিনা নন। শেখ হাসিনা আর তার পরিবারের গল্প বারবার ঘুরে দাঁড়ানোর, এ জাতির গল্পও তাই। নোবেল আসুক আর নাই আসুক, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে এ জাতি যেমন বারবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে তেমনি তারা বারবার ঘুরে দাঁড়াবে জননেত্রীর নেতৃত্বেও।

লেখক : বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক

এসবি

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।
print
 

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad