‘ড. শফিকের মোটরবোট’ নিয়ে কিছু কথা

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৭ | ৯ কার্তিক ১৪২৪

‘ড. শফিকের মোটরবোট’ নিয়ে কিছু কথা

মাহমুদুর রহমান ৫:০৩ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৫, ২০১৭

print
‘ড. শফিকের মোটরবোট’ নিয়ে কিছু কথা

কথায় বলে 'কবিরা ভবিষ্যৎদর্শী হন'। কবিরা কল্পনা প্রবণ হন, সে তো আমরা জানিই। কিন্তু তাদের কল্পনা আর ভবিষ্যৎ দর্শণ কখনও কি বিজ্ঞানের দিকে হয় না? হলে কবিরা কেন 'সায়েন্স ফিকশন' লেখেন না? আইজ্যাক আসিমভ, আর্থার সি ক্লার্ক, আমাদের হুমায়ূন আহমেদ, জাফর ইকবাল; কেউই কবি নন। বিশ্ব সাহিত্যের কোন কবি বিজ্ঞান কল্পকাহিনী লিখেছেন? সুকুমার রায়ের 'হাঁসজারু', 'বকচ্ছপ'-কে এই ধারায় ফেলা যায় না। কিন্তু তাই বলে কবিরা 'সায়েন্স ফিকশন’ লেখেননি, বা লিখতে পারেন না, এমন না। আমাদেরই এক কবি লিখেছেন সায়েন্স ফিকশন এবং তা অনেক অনেক আগে। কবি খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন ১৯৪৯ সালে লেখেন 'ড. শফিকের মোটরবোট'।

ড. শফিক বাংলাদেশের বিজ্ঞানী। পৃথিবীজোড়া তাঁর খ্যাতি। আপনভোলা এই বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার করেন একটি 'এরো মোটর বোট'। এই যানটির বিশেষত্ব হচ্ছে, যানটি মাটি, পানি এবং আকাশ; তিন পথেই চলতে পারে। অত্যন্ত দ্রুতগামী এই জাহাজটি তৈরি করে তিনি দেশের জন্য বয়ে এনেছেন অনন্য সম্মান। কিন্তু কোন সাফল্যই কণ্টকহীন নয়। ড. শফিকের ক্ষতি করার জন্য মুখিয়ে থাকে অনেকে।

ড. শফিকের ক্ষতি করার জন্য ফন্দি আঁটে দুই জাপানী, বাকুইশি আর ফকুহারা। এমনকি 'এরো মোটর বোট'-এর ফর্মুলা জানার জন্য তারা বন্দী করে ড. শফিকের সহকারী মুর্শিদকে। ঘটনাক্রমে যেখানে মুর্শিদ বন্দী ছিলেন, এরো মোটর বোটে বন্ধু রহমান আর তাঁর স্ত্রী সালমাকে নিয়ে সেখানে উপস্থিত হন ড. শফিক। জানতে পারেন, কি করে ফকুহারা আর বাকুইশি তাঁর আবিষ্কার লুণ্ঠন করতে চায়। তিনি সেখান থেকে মুর্শিদকে উদ্ধার করে আনেন।

ড. শফিক আত্মভোলা বিজ্ঞানী। ভেবেছিলেন, বাকুইশি আর ফকুহারা ওখানইে থেমে যাবে। কিন্তু শয়তান তো এতো সহজে থামে না। তারা লেগে রইলো, কি করে ড. শফিকের আবিষ্কারের ফর্মুলা জোগাড় করা যায়। এ জন্য তারা চলে আসে বাংলাদেশে। এখানে ঘটনাক্রমে রহমান আর সালমা ঘটনায় জড়িয়ে পরে বন্দী হয় ফকুহারার হাতে। তারপর কি করে তারা বন্দীদশা থেকে ছাড়া পান এবং ড. শফিকের আবিষ্কারের সাথে দেশের সম্পদ রক্ষা করেন, তা জানতে হলে পড়তে হবে বইটি।

আইজ্যাক আসিমভ কিংবা আর্থার সি ক্লার্কদের হাত ধরে সায়েন্স ফিকশনের যে জয়যাত্রা, তা আজও অক্ষুণ্ণ। বাংলাদেশে এ ধারাটি খুব পুরনো নয়, বরং নতুন। তবে হুমায়ূন আহমেদ, মুহাম্মদ জাফর ইকবাল বেশ কিছু ভালো সায়েন্স ফিকশন উপহার দিয়েছেন। অন্যরাও লিখছেন। এসব সায়েন্স ফিকশন অনেক অনেক বেশি এগিয়ে যাওয়া সময়ের কথা বলে। সেই হিসেবে 'ড. ফিকের মোটর বোট' অনেক সাধারণ মেনে হবে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আমাদের মনে রাখতে হবে, উপন্যাসটি লেখা হয়েছিল ১৯৪৯ সালে।

আটষট্টি বছরে বিজ্ঞান এগিয়েছে অনেক, সেই সঙ্গে এগিয়েছে সায়েন্স ফিকশন। 'ড. শফিকের মোটর বোট' মুল্যায়ন করতে হলে আমাদের ১৯৪৯ সালের মত চিন্তা করতে হবে। সেই সময়ে হয়ত এদেশের কোন লেখক 'সায়েন্স ফিকশন' লেখার কথা দুবার ভাবতেন। তা ছাড়া বইটি কেবল সায়েন্স ফিকশন হিসেবে নয়, আরও অনেক কারণে মূল্যায়িত হওয়া উচিত। ১৯৪৭ সালে কেবল দেশভাগ হয়েছে, জন্ম হয়েছে নতুন একটি দেশ; যার নাম পাকিস্তান। সে দেশ নিয়ে অনেকের অনেক আশা, সেই স্বপ্নের কথা অর্থাৎ জাতীয়তাবাদের কথা বারবার এসেছে বইয়ে। তখন পাকিস্তান ছিল, তবে লেখক বাঙালি। তিনি যদি বইটি আরও পরে লিখতেন, তবে নিশ্চিত বাংলাদেশ-ই লিখতেন। তাই এই সংস্করণে 'বাংলাদেশে'-ই লেখা হয়েছে।

'ড. শফিকের মোটরবোট' একজন কবির কল্পনা থেকে বাস্তবের কাছাকাছি আসার প্রয়াস। বিজ্ঞানের দিকে গিয়ে ভেবেছেন তিনি। সঙ্গে ভেবেছেন দেশের কথা, জাতীয়তাবাদের কথা। সব যদি ছেড়েও দেই, একটা অ্যাডভেঞ্চার গল্প হিসেবেও বইটি সুখপাঠ্য। ২০১৭ সালে এসে বইটি পুন:প্রকাশ করেছে 'আলহামরা প্রকাশনী'। সকলকে পড়ার আমন্ত্রণ রইলো।

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।
print
 

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad