একটি গণতান্ত্রিক জাতিসংঘ চাই

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৭ | ৯ কার্তিক ১৪২৪

একটি গণতান্ত্রিক জাতিসংঘ চাই

আবুল খায়ের ১০:০১ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৭

print
একটি গণতান্ত্রিক জাতিসংঘ চাই

জাতিসংঘের বার্ষিক সাধারণ সভা শুরু হয়েছে। কয়েকটি সদস্যদেশ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিয়েছে। মঙ্গলবার তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের ভাষণ সরাসরি শুনেছি। তুর্কি ভাষা আমি কিছুটা বুঝি। তবে এরদোয়ানের ভাষণের ইংরেজি অনুবাদ একই সাথে চলছিল। মনযোগ দিয়ে তার ভাষণ শুনছিলাম। জাতিসংঘের যে কোনো পরিষদের মিটিংয়ের চেয়ে এবারের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

এবারের আলোচনার মূল বিষয় মিয়ানমার কর্তৃক দেশটির রোহিঙ্গা নাগরিক নিধন। এটি ইতিহাসে যতগুলো গণহত্যা হয়েছে তার মধ্য জঘন্য এবং নিষ্ঠুরতম একটি জাতিগত নিধন। সমগ্র বিশ্ব মিয়ানমারের নিষ্ঠুর এবং অমানবিক আচরণে হতবাক। আধুনিক যুগে কোনো দেশ তার নাগরিকদের উপর এমন গণহত্যা চালাতে পারে তা বিশ্বাস করতে পারেনি। কিন্তু ঘটনার ভিডিও দেখে সবাই বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়েছে।

এই প্রেক্ষিতে বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের চোখ থাকবে জাতিসংঘের দিকে। বিশ্বনেতারা কী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীদের জীবন বাঁচাতে, তাদেরকে নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে কী সিদ্ধান্ত নেন সবার দৃষ্টি এখন সে দিকেই থাকবে। কারণ বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব জাতিসংঘের উপর ন্যাস্ত রয়েছে। এই উদ্দেশ্য নিয়েই জাতিসংঘের যাত্রা শুরু হয়েছিল।

জাতিসংঘ গঠনের সুনির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্য ছিল। সেই লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যগুলো নিম্নরূপ:

এক. শান্তি ভঙ্গের হুমকি, আক্রমণাত্মক প্রবণতা ও কার্যকলাপ দূর করে বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

দুই. সকলের প্রতি সমান অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমে বিভিন্ন জাতির মধ্যে সহযোগিতা ও বন্ধুত্ব জোরদার করা।

তিন. অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সকল জাতির মধ্যে সহযোগিতা গড়ে তোলা।

চার. জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকারের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তোলা।

পাঁচ. আন্তর্জাতিক আইনের সাহায্যে আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান নিশ্চিত করা।

ছয়. প্রত্যেক জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের স্বীকৃতি এবং তা সমুন্নত রাখা, এবং

সাত. উদ্দেশ্যসমূহ বাস্তবায়নের জন্য জাতিসংঘের কার্যধারা অনুসরণ করা।

জাতিসংঘ তার উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য বিভিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছ। এ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে প্রয়োজনে শক্তিও প্রয়োগ করে থাকে জাতিসংঘ। তবে শক্তি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত হয় নিরাপত্তা পরিষদে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে নিরাপত্তা পরিষদ কোনো ভূমিকা পালন করতে পারবে কিনা তা নিয়ে সন্ধিহান সবাই। কারণ, উদ্দেশ্যগত দিক থেকে জাতিসংঘ খুব মানবিক এবং একটি গণতান্ত্রিক ফোরাম মনে হলেও গঠনগত দিক থেকে এই ফোরাম একটি অগণতান্ত্রিক এবং ফ্যাসিস্ট ফোরাম।

নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচটি স্থায়ী সদস্যের ‘ঐক্যমতের’ উপর সবকিছু নির্ভর করে। ১৯৩টি দেশের সংগঠনের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট এই নিরাপত্তা পরিষদ নির্বাচিত নয়। এখানে গণতন্ত্রের বালাই নেই। ১৯৪৫ সাল থেকে আজো তারাই নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য। এদের চারজন একমত হলেও একজনের ভেটোর (আমি মানি না) কারণে সবকিছু পণ্ড হয়ে যায়। এই পাঁচটি সদস্য যার যার মতাদর্শ আর প্রভাব বলয় নিয়ে বিভক্ত। একজন কোনো বিষয়ে প্রস্তাব আনলে অন্যজন সেখানে ভেটো দেবে এটা এখন তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

মাত্র কয়েকদিন আগেও রোহিঙ্গা ইস্যুতে মায়ানমারের বিরুদ্ধে প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছে মিয়ানমারের বন্ধু রাষ্ট্র চীন। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে জাতিসংঘ আসলেই কিছু করতে পারবে কি না।

গত কয়েকদিন ধরেই এবিষয় নিয়েয়ে বিভিন্নজনের সঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে মনে হল নিরাপত্তা পরিষদই জাতিসংঘের সব থেকে বড় সমস্যা। এটির গণতান্ত্রিক সংস্কার করা ছাড়া এই ফোরামকে কার্যকর করা সম্ভব নয়। তাই ‘একটি গণতান্ত্রিক জাতিসংঘ চাই’ শিরোনামে অনলাইন পত্রিকার জন্য লেখাটি প্রস্তুত করে রেখে সাধারণ পরিষদের আলোচনায় কী হয়, বিশ্ব নেতৃববৃন্দ কী বলেন তা শোনার অপেক্ষায় ছিলাম।

মঙ্গলবার শুরু হওয়া আলোচনা শুনছিলাম। মহাসচিবের উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি রোহিঙ্গা ইস্যুটির সমাধানের উপর গুরুত্ব দিয়েছেন। পরে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের বক্তব্য শুনছিলাম। তার বক্তব্যের পুরোটা জুড়ে ছিল রোহিঙ্গা ইস্যু। বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তিনি মত দেন গঠনতান্ত্রিক দুর্বলতার কারণে জাতিসংঘ অকার্যকর হয়ে আছে। তিনি নিরাপত্তা পরিষদের গণতান্ত্রিক সংস্কার চেয়েছেন।

মি. এরদোয়ানের বক্তব্য শোনার পর মনে হল ‘একটি গণতান্ত্রিক জাতিসংঘ’ চাওয়া আসলেই অমূলক নয়। বরং এই দাবিটা আরো জোরালো হওয়া উচিত। মি. এরদোয়ানের বক্তব্যে উৎসাহিত হয়ে আমার সেই সংস্কার প্রস্তাব তুলে ধরছি।

উদ্দেশ্যগতভাবে জাতিসংঘ অত্যন্ত মানবিক একটি সংস্থা মনে হলেও গঠনগতভাবে এটি একটি অগণতান্ত্রিক ফ্যাসিস্ট প্রতিষ্ঠান। ১৯৩টি সদস্যের সংগঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী দেশ মাত্র পাঁচটি। জাতিসংঘের সব থেকে গলদের জায়গা এটি। কিসের ভিত্তিতে এই পাঁচটি দেশ স্থায়ী সদস্য? অর্থনৈতিক অবদানের জন্য নাকি পারমাণবিক সক্ষমতার কারণে? যদি অর্থনৈতিক বা পারমাণবিক সক্ষমতার কারণে কোনো দেশকে জাতিসংঘের স্থায়ী সদস্যপদ দেওয়া হয়ে থাকে তাহলে জাতিসংঘ একটি বর্ণবাদী সংগঠন। একটি অগণতান্ত্রিক বা বর্ণবাদী সংস্থা কিভাবে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করবে?

ভেটো ক্ষমতা একটি পদ্ধতিগত ভুল
জাতিসংঘের সকল সদস্য রাষ্ট্রকে নিয়ে সাধারণ পরিষদ গঠিত হলেও এটি একটি বিতর্কসভা ছাড়া কিছু নয়। এই পরিষদের হাতে কোনো ক্ষমতা নেই। নিরাপত্তা পরিষদের হাতেই সকল ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত। কিন্তু এই নিরাপত্তা পরিষদকে কেউ নির্বাচন করেনি। এই পরিষদ গণতান্ত্রিকভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেয় না। এই পরিষদের সংস্কার করা এক প্রকার অসম্ভব। পাচ সদস্যের কোন সদস্য ভেটো দিলে যে কোন প্রস্তাব বাতিল হয়ে যায়। এটা একটি দুষ্পরিবর্তনীয় পরিষদ। এর সদস্যদের ভেটো ক্ষমতা আসলে একটি মারাত্মক গঠনগত ভুল। ১৯৩টি রাষ্ট্রের মধ্য থেকে যদি ১৮৮ দেশ কোনো বিষয়ে ঐক্যমতে পৌছে, আর নিরাপত্তা পরিষদ যদি দ্বিমত করে তাহলে ১৮৮টি রাষ্ট্রের প্রস্তাব বাতিল হয়ে যাবে। অথবা সব রাষ্ট্র ঐক্যমতে পৌঁছল আর নিরাপত্তা পরিষদের একটিমাত্র রাষ্ট্রও ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করলে ১৯২টি রাষ্ট্রের ঐকমত্যের প্রস্তাব বাতিল হয়ে যাবে। অবিশ্বাস্য হলেও এটাই বাস্তবতা। প্রতিষ্ঠাতারা যখন নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো ক্ষমতা ধারণা দিয়ে ছিলেন তখন হয়ত এটা খুবই মানবিক মনে হয়েছিল।

প্রয়োজন একটি গণতান্ত্রিক জাতিসংঘ
যেহেতু পদ্ধতিগতভাবে জাতিসংঘ একটি অগণতান্ত্রিক সংগঠন। তাই এই সংগঠনের সংস্কার দরকার। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা করতে গেলে জাতিসংঘের সংস্কার করতেই হবে। সাধারণ পরিষদ থেকে আরো বেশি সদস্যকে নিরাপত্তা পরিষদে স্থান দিতে হবে। স্থায়ী পরিষদের ভেটো ক্ষমতা বাতিল করতে হবে, প্রয়োজনে স্থায়ী পরিষদের ধারণা বাতিল করতে হবে। নিরাপত্তা পরিষদের পরিষদের সদস্য সাধারণ পরিষদের সদস্যদের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হবে।

নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের যোগ্যতা
নিরাপত্তা পরিষদের যোগ্যতা নির্ধারণ হবে ওই রাষ্ট্রের গণতন্ত্র, মানবাধিকার, অর্থনৈতিক সামাজিক উন্নয়ন সূচকের ভিত্তিতে। এর ফলে প্রতিটি রাষ্ট্র প্রধানেরা নিজ রাষ্ট্রে মানবাধিকার লঙ্ঘন থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করবেন, সামাজিক ও রাজনৈতিক সূচকের উন্নয়নে সচেষ্ট হবেন।

সাধারণ পরিষদের সদস্যদের ভোটে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা নির্বাচিত হলো বড় রাষ্ট্রগুলো অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে কিছুটা হলেও ভালো আচরণ করতে বাধ্য থাকবে। কারণ ভোটাভুটির ক্ষেত্রে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মূল্যায়ন গুরুত্ব পাবে।

নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার একটি অসম্ভব ব্যাপার। আগেই বলা হয়েছে ভেটো ক্ষমতা একটি ভুল, অগণতান্ত্রিক এবং ফ্যাসিস্ট ধারণা। প্রতিটি ফ্যাসিস্ট পদ্ধতি সবসময়ই অপরিবর্তনীয় চরিত্র ধারণ করে। নিরাপত্তা পরিষদও একই চরিত্র ধারণ করেছে। তাই এখানে সংস্কার প্রায়ই অসম্ভব একটি ব্যাপার। তবে এই অসম্ভবকে সম্ভব করতে না পারলে নিপীড়িত মানুষের মুক্তিও সম্ভব হবে না।

মতাদর্শগত কারণে বৈশ্বিক রাজনীতি মারাত্মকভাবে প্রভাবিত। পুঁজিবাদী দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রে নেতৃত্বে একটি প্রভাব বলয়, রাশিয়ার নেতৃত্বে একটি প্রভাব বলয় এবং চীনের নেতৃত্বে আরেকটি প্রভাব বলয় তৈরি হয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ সদস্যের মাঝে এই তিনটি সদস্য সবসময়ই পরস্পরের বিরোধিতা করে থাকে, এই বিরোধিতা তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কেউ প্রস্তাব আনলে অন্যজন ভেটো দেবে এটা এখন সবার মুখস্ত হয়ে গেছে। এরা নিজেদের প্রভাব বলয়ের কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো প্রস্তাব পাস করতে দেয় না সেই রাষ্ট্র যতোই অপরাধী হোক না কেন। রোহিঙ্গা গণহত্যার ক্ষেত্রে এর নিকৃষ্টতম উদাহরণ হল চীনের ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ। চীনের মিত্র হবার কারণেই মায়ানমারের বিরুদ্ধে নিরাপত্তাপরিষদ পরিষদ কোন পদক্ষেপ নিতে পারছে না।

তবে আশার কথা হলো কোনো সংস্কারই অসম্ভব নয়। একটি ফ্যাসিস্ট সরকারের মতো নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার করার জন্য প্রয়োজন আন্দোলন। সাধারণ পরিষদের সদস্যদের থেকেই এই সংস্কারের কথা বলতে হবে। সংস্কারের দাবি জোরালো হতে হতে তা একদিন বাস্তবায়িত হবে। কিন্তু এই উদ্যোগ সাধারণ পরিষদের সদস্যের পক্ষ থেকে নিতে হবে।

লেখক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী, চেয়ারপারসন: স্কুল অব অল্টারনেটিভ থটস।

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।
print
 

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad