শিশুটি আসলে কি দেখেছে?

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৭ | ৯ কার্তিক ১৪২৪

শিশুটি আসলে কি দেখেছে?

খাইরুল আমিন তুহিন ৪:৪৫ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৬, ২০১৭

print
শিশুটি আসলে কি দেখেছে?

পথে ঘাটে মানুষ। এখানে মানুষ। ওখানে মানুষ। হাজার হাজার। ছড়িয়ে ছিটিয়ে। বড় বিচিত্র পরিস্থিতি। ওরা অন্যায়ের পাহাড়ে চাপা পড়ে থাকতে থাকতে কেমন যেন হয়ে গেছে। দীর্ঘকাল ভারি কিছুর নিচে চাপা পড়ে থাকলে ঘাসের যে হাল হয়, তাতে কোনো জীবনের রং থাকে না। ওদেরও নেই।

কিন্তু ১৬ থেকে ২০ মাসের ওই শিশুটা ওভাবে আতকে উঠলো কেন? ওর সারাটা মুখজুড়ে কিসের আতঙ্ক? ছোট্ট শরীরটা কোন কোন নির্মম-নৃশংস অবুঝ অভিজ্ঞতায় কাঁপতেই থাকে থরথর? প্রতি মুহূর্তে দুনিয়াটা তার কাছে অনিরাপদ, যেটিকে সে রঙিন কল্পনার জগতে কেবল হাতের মুঠোয় থাকা এক্কেবারে নিজের গ্রাম বলে ভাবতো‍! কি দেখেছে ওই শিশুটা?

প্রায় এক বস্ত্রে এক মুহূর্তে নিজের সবকিছু ছেড়ে শেষ অনিশ্চয়তার পথে পাড়ি দেওয়া। তার আগে শোষিত আর অত্যাচারিত হওয়ার দীর্ঘ ইতিহাস। মৌলিক চাহিদা বলতে কি বোঝায়? সেই অনুভূতি নেই অধিকাংশের। প্রাণহীন মুখ। হেরে যাওয়া মুখ কিংবা কখনো লড়াইয়ে নামতেই না পারার লজ্জা!

বেদনার সাগরে ভাসতে থাকে চোখে কোনো প্রশ্নও বুঝি বেঁচে নেই। সব এই মুহূর্তটির ওপর ছেড়ে দেওয়া। পরের মুহূর্তে কি অপেক্ষায়, জানা নেই। জানতে চাওয়ার তাড়নাও নেই। এই যে বেঁচে থাকা, বেঁচে যাওয়া, এই কি বেশি নয়!

ওখানে কি খুব ভালো ছিলেন? না। এখানে তাহলে আর কি পার্থক্য হতে পারে? এখানেও কি গুলি খেতে হবে? না। আপাতত তো সেই ভয় নেই। এখানে কোনো চালে বা কোনো ঘরে আগুন দেবে কে? আর যে কিছুই অবশিষ্ট নেই! নিঃস্ব, রিক্ত। টিকে আছে কেবল এই নশ্বর শরীরটা।

কিন্তু সেটাও তো এই দুনিয়ার কোনো পরিচয়ের দাবি করতে পারে না, জানে না। নাফ নদীর ওপার তার নয়, এপারও নয়। নেই নাগরিকত্ব। অধিকার। নিজের দেশ। নিজের ভূমি। এতো নেই এই ভীড়ে আসলে কিছুই যে নেই আর বেঁচে, কেবল বেঁচে থাকার চেষ্টা করাই এখন সবচেয়ে বড় সত্য তা তাদের সবাই জানেন। মৃত্যু-বিপদ কোথায় আবার ওৎ পেতে আছে সে নিয়েও নেই কোনো দুর্ভাবনা। এখন তাদের নিজেদের কাছে এই প্রশ্নটাও আসছে না যে আসলে তারা কি? তারা কি মানুষ? নাকি একটা প্রাণী মাত্র। নাকি তারা কোনো জিনিস!

জিনিসই তো। মানুষ নয়, জিনিস। কি কেনাবেচাটাই না হচ্ছে ওদের নিয়ে। উদ্বাস্তুর আবার পরিচয় থাকে নাকি? এই যে লাখ লাখ মানুষ তাদের ভিড়ে ওই যে কিছু মানুষকে নতুন ভূমে সামান্য আশ্রয়ের খোঁজে ছুটে আসা, তাদের মনে প্রশ্ন থাকতে নেই। রিফউজি। উদ্বাস্তু। শরণার্থী। এই তো তাদের পরিচয়। এই পরিচয় নিয়েই জন্ম। আরো বড় পরিচয় ‘রোহিঙ্গা’। যা বহু আগে থেকেই গালি হয়ে গায়ে এসে বিধতে ভুলে গেছে।

রোহিঙ্গা। উদ্বাস্তু। নিজেদের প্রজন্মেরও কোনো পরিচয় ছিল না এ ছাড়া। যে প্রজন্মের জন্ম দিয়েছেন তার তাদেরও সেই একই পরিচয়। উদ্বাস্তু। মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশের উখিয়া, বালুখালী, কুতুপপালন, মরিচ্যা, পানবাজার, মাছবাজার, পোস্ট অফিস, জামে মসজিদ, কক্সবাজার, নাইক্ষংছড়ি বা যে কোথায় হোক, তাদের তো একই পরিচয়। উদ্বাস্তু। ওখানেও যা। এখানেও তা।

হাতের মুঠোয় প্রাণটা ধরে পালানোর সময় যে কটা টাকা বা সোনা গয়না গরু বা কিছু দামি জিনিস আনা গেছে তার যে দাম ওদের চেয়েও বেশি! এই মানুষগুলো তো তাহলে ওইসব পণ্যের চেয়েও কম দামি। জিনিস যখন মূল্যবান মানুষের চেয়ে, তখন তারা প্রাণ নিয়ে আর কতোটা কি দামের বা কাজের? জিনিসের চেয়েও যে কম দাম ওদের। এটাই সত্য আজ।

এই অনুভূতিটা আপনারও হয় কখনো কখনো!

লেখক : ক্রীড়া সম্পাদক, পরিবর্তন ডটকম

ছবি- লেখক।

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।
print
 

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad