তিনি পরম বোন- তিনিই বাংলাদেশ

ঢাকা, শনিবার, ১৯ আগস্ট ২০১৭ | ৪ ভাদ্র ১৪২৪

তিনি পরম বোন- তিনিই বাংলাদেশ

ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল) ১০:০৮ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১১, ২০১৭

print
তিনি পরম বোন- তিনিই বাংলাদেশ

সিঙ্গাপুরে এসে বেশ দাপটে ঘোরাঘুরি করছি। এসেছি সিঙ্গাপুর হেপাটোলজি কনফারেন্সে যোগ দিতে। এটি আমাদের সাবজেক্টের বেশ নামি-দামি কনফারেন্স। লেকচার-আলোচনার পাশাপাশি সারা পৃথিবী থেকে পঞ্চাশটি জটিল লিভার রোগের কেস রিপোর্ট এবারের কনফারেন্সে উপস্থাপিত হচ্ছে। বুক চিতিয়ে ঘোরার কারণ, এর মধ্যে পনেরটিই বাংলাদেশের। তাও আবার বেশির ভাগই আমার সরাসরি ছাত্র-ছাত্রীদের। বোঝাই যাচ্ছে দেশে মাঝে মাঝে মার-টার খেলেও আর হাতে হাতকড়া জুটলেও, কাজে-কামে আমরা আসলে অতটা খারাপ নই। আমরা জটিল রোগী দেখি, ঠিকঠাক মত চিকিৎসাও করি, তা সে ঝুট-ঝামেলা যাই থাক না কেন, এমন কি ডকুমেন্টেশনও করি আর সেগুলো বড় বড় বিদেশি কনফারেন্সে প্রেজেন্টও করি। দেশের মানুষ মাঝে মাঝে ছি-ছিক্কার করতে পারেন তবে আমরা মাঝে মাঝেই দশের বাহবাও কুড়াই- তা সে দেশে না হোক, বিদেশেই সই।

নিজেদের ঢোল পেটানো এই লেখার মূল উদ্দেশ্য না। অবশ্য তাতে দোষেরও নেই কিছুই। ঢোল থাকলে তা পেটানো যেতেই পারে। যাক মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। সিঙ্গাপুরে যতবার এসেছি, প্রায় প্রতিবারই দেখেছি নতুন কোন না কোন কিছু। সিঙ্গাপুরের প্রতি মানুষের আকর্ষণ ধরে রাখায় এই ক্রমাগত প্রয়াস। আর অবাক হয়েছি এই ভেবে যে কিভাবে সম্ভব? যেদেশে দুই ছটাকও খনিজ সম্পদ নেই, যে দেশ নিজেদের খাবার পানি আর এমনকি লিটল ইন্ডিয়ার বিখ্যাত বানানা লিফ রেস্টুরেন্টগুলোর জন্য কলাপাতাও আমদানী করে প্রতিবেশি মালয়েশিয়া থেকে, তাদের এই শনৈ শনৈ উন্নতি চাবি-কাঠিটা কোথায়? “হোয়াট ইজ দ্য সিক্রেট অব দেয়ার উন্নতি?”

দেশটার ইতিহাস বেশ ইন্টারেস্টিং। সিঙ্গাপুর এক সময় ছিল মালয়েশিয়ার গোদের উপর বিষ ফোঁড়া! জঙ্গলাকীর্ণ, জলাভূমিতে ভরা অবহেলিত এই জনপদ একসময়ে ছিল অপরাধীদের অভয়ারণ্য। একদিন যে সিঙ্গাপুরকে স্বাধীনতা দিয়ে হাফ ছেড়ে বেঁচেছিল মালয়েশিয়া, সেই সিঙ্গাপুরের উন্নতিতে আজ আমাদের বিমুগ্ধ নয়ন।

সিঙ্গাপুরের এই উন্নতির নায়ক প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী লি। স্বাধীনতার পর থেকেই তিনি দীর্ঘদিন একহাতে দেশটি শাসন করেছেন। বার্ধক্যে এসে ছেলেকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে হয়েছিলেন সিনিয়র মন্ত্রী। মাঝে অল্প কিছুদিন বাদ দিলে স্বাধীন সিঙ্গাপুরে প্রায় পুরোটা সময়ই ক্ষমতায় তার দল। দেশটি তিনি শাসন করেছেন অদ্ভুত কঠোরতায়। সেখানে মাদক চোরাচালানের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, এমনকি অস্ট্রেলিয়ার নাগরিককেও এই অপরাধে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে দেশটি। মুসলিম প্রধান দেশ না হলেও সিঙ্গাপুরে আছে দররা মারার আইন। অনেক লঘুপাপে গুরু দণ্ডের বিধান চালু আছে দেশটিতে।

না -  সিঙ্গাপুরের শাসকরা শেখ হাসিনার মতন মাতৃ মমতায় দেশ শাসন করেন না। সেখানে ভার্স্কয স্থানান্তরের মিথ্যা অভিযোগে প্রধানমন্ত্রীকে কটাক্ষ করে রাজপথে শ্লোগান দেয়ার দুঃসাহস কেউ দেখায় না। এই সিঙ্গাপুরেই ২০১৩ সালে ওয়ার্ল্ড ভ্যাকসিন কংগ্রেসে লেকচার দিতে এসে দেখেছি মোড় সম্প্রসারণের জন্য সুউচ্চ অট্টালিকা ভাঙ্গার তোড়জোড়। জেনেছি ওটার মালিক বিরোধী দলের সাংসদ। আমাদের দেশেও সুউচ্চ অট্টালিকা পরিণত হয়েছে সুমসৃণ রাজপথে। নিন্দুকেরা সেসময়ে এর পেছনে নানা কার্যকরণ খুঁজে পেয়েছে। জনৈক ক্ষমতাধর উপদেষ্টার ব্যক্তিগত রোষের শিকার ছিল ভবনটি- একথা আজ সবার জানা।

দেশের সর্বোচ্চ বিচারালয়ের সামনে সেরাতের সেই মিছিল আমি দেখিনি। দেখিনি ভাগ্যিস। একটা সময় ছিল যখন জিন্স আর স্নিকার পরে ময়মনসিংয়ের রাস্তায় ধাওয়া খেয়ে আর ধাওয়া দিতে দৌড়িয়েছি অনেক। আজ বয়স আর সামাজিক অবস্থানের বাস্তবতায় তা বেমানান। শুধু ভাবছি এই ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসে একদিন জিয়াউর রহমানের স্বাস্থ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতে জয় বাংলা শ্লোগান দেয়ার অপরাধে ছাত্রদলের ক্যাডারদের হামলায় রক্তাক্ত হয়েছিলেন ছাত্র সংসদের নির্বাচিত জিএস। শুধুমাত্র ছাত্রলীগ করার অপরাধে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে আমাদের ছাত্রজীবন কেটে গেছে ভাড়া বাসায় অথচ বয়েজ হোস্টেলের শূন্য কোঠায় রাতে ছিল বাদুরের বসবাস।   চরপারা মোড়ের লিটনের ছোট্ট চায়ের দোকানকে ঘিরে ছিল আমাদের ক্যান্টিন ক্যান্টিন খেলা। একই অপরাধে বাসায় ছাত্রদলের বন্ধুরা এসে ককটেলও মেরে গেছেন। জাতীয় ও আবাহনী ক্রিকেট দলের সাবেক ক্রিকেটার রামচাদ গোয়ালা কাকা শুধুমাত্র বঙ্গবন্ধুর প্রতি তার শর্তহীন আনুগত্যের তাগিদেই আমাদের মতন ঝামেলাদার ভাড়াটিয়াগুলোকে ঘাড় ধরে বের করে দেননি। অথচ আমি যে সময়টার কথা লিখছি সেটা ছিল নব্বই পরবর্তী বাংলাদেশে তথাকথিত গণতান্ত্রিক শাসনকাল। বুঝুন তাহলে!

তাই অবাক হই “ছিঃ ছিঃ” শ্লোগান শুনে। ছিঃ তাদের - ধিক্কার তাদের জন্য। তারা অনেকেই আমার পূর্ব পরিচিত। তবুও ধিক্কার তাদের জন্য। যারা আজ ছিঃ ছিঃ শ্লোগানে রাজপথ গরম করে, পুলিশকে বাধ্য করে বর্ণিল পানিতে রাজপথ রাঙাতে, আমি যে ইতিহাসের সাক্ষী তা সম্ভবত তাদের অনেকেই জানা, এমনকি জন্মেরও অতীত। তারা সে সময়টার কথা শুনেছেন, কিন্তু বোঝেননি। হয়তো বা বোঝার চেষ্টাও করেননি। থিওরি আর প্রাকটিক্যালের ব্যবধানটা এখানেই। তারা বোঝেন না একজন শেখ হাসিনা আজ ক্ষমতায় বলেই তারা রাজপথে ছিঃ ছিঃ শ্লোগান দিয়ে ফেসবুক ঝড় তোলেন।  এর চেয়েও নগন্য অপরাধে এই শহরেরই একদিন দেলোয়ারদের পিষে দিয়েছিল পুলিশের ট্রাক আর পুলিশের গুলি বিদীর্ণ করেছিল নূর হোসেনের বুক। আজ যদি অন্য কেউ গণভবনে থাকতেন এই মিছিলের প্রশ্নই উঠতোনা। শুধু মিছিল কেন? গ্রিক দেবীকে শাড়ি পরিয়ে বিকৃত করে বিতর্ক উস্কে দেয়ার দুঃস্বপ্নও সম্ভবত দেখতেন না কেউ। 

আমার ছোট ছেলে সূর্য্য। ছোট-বড় সব অভিযোগ তার মা আর আট বছরের বড় বোনের বিরুদ্ধে। আবার যত ভালোবাসা তাও শর্তহীন ভাবে তাদের জন্যই। আমার ভূমিকা সেখানে কচিৎ-কদাচিৎ। মা আর বোনের কাছে তার সব অভিযোগ ভালোবাসায় ধুয়ে যায়।

এই জাতির কাছে শেখ হাসিনা তেমনি এক “পরম বোন”। তেমনি এক স্নেহময়ী “মা”। মার কাছে সন্তানের কোন দোষ নেই, দোষ নেই বড় বোনের কাছে ছোট ভাইটির। বাঙ্গালির কোন দোষ নেই শেখ হাসিনার কাছে। সর্বংসহা হয়ে তিনি সয়ে যান আমাদের শত অযৌক্তিক আব্দার আর কখনো কখনো ঔধত্ব। কারণ তিনিই তো “বাংলাদেশ”।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়।

এসবি

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।
print
 
nilsagor ad

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad