নুজহাতের প্রশ্ন ও কোটি বাঙ্গালির প্রত্যাশা

ঢাকা, শুক্রবার, ২১ জুলাই ২০১৭ | ৬ শ্রাবণ ১৪২৪

নুজহাতের প্রশ্ন ও কোটি বাঙ্গালির প্রত্যাশা

ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল) ৯:২৩ অপরাহ্ণ, জুলাই ১২, ২০১৭

print
নুজহাতের প্রশ্ন ও কোটি বাঙ্গালির প্রত্যাশা

ঈদের ছুটিতে সম্প্রতি কক্সবাজার গিয়েছিলাম। ছিলাম ইনানী বিচের নতুন ঠিকানা রয়েল টিউলিপ রিসোর্টে। পাঁচতারকা মানের দামী হোটেল। ঈদের ছুটিতে তিল ধারণের ঠাই নেই, শতভাগ অকুপেন্সি! কক্সবাজারের লাবনী পয়েন্টে মানুষের ভিড়ে সাগর দেখার জো নেই। ‘শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আজ উন্নয়নের মহাসড়কে বাংলাদেশ’ এর জন্য বোধকরি আর কোনো প্রমাণের প্রয়োজন নেই। বেড়েছে মানুষের আয় আর ক্রয়ক্ষমতা। ঈদের ছুটিতে কক্সবাজারে তাই লাখো মানুষের ঢল। কোথাও তো একজন বিদেশি পর্যটকও চোখে পড়লো না। না হোটেলে, না ঝিনুক মার্কেটে, না কানায় কানায় ভরা রয়েল টিউলিপে। একই সময় বন্ধু হেলাল সপরিবারে ছিল সিলেটে। জানালো একই রকম অভিজ্ঞতার কথা।

৭১ টিভির ঈদ স্পেশাল সংবাদ সংযোগে সহধর্মিনী ডা. নুজহাত বলছিলেন, ‘এই যে আমরা এখন উন্নয়নের মহাসড়কে আর পাশাপাশি অন্যদিকে জেএমবি-হেফাজতের টানাপোড়ন, আমাদের সামনে বিকল্প এখন তিনটি। আমরা হয় সৌদি আরবের মতন কঠোর ধর্মীয় অনুশাসন নির্ভর একটি প্রাচুর্যের প্রলেপ লাগানো সমাজ ব্যবস্থা বেছে নিতে পারি অথবা আফগানিস্তানের মত ধর্মীয় উন্মাদনায় ভরপুর একটি দেশ হয়ে যেতে পারি যেখানে ধর্মের নামে একদল ব্যস্ত আরেক দলকে নির্মূলে। আর তৃতীয় অপশনটি হচ্ছে, আমরা জাপান বা সুইডেনের মত একটি টলারেন্ট সমাজের স্বপ্ন দেখতে পারি যেখানে ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।’ ধর্ম চর্চার স্বাধীনতা সেখানে সবার জন্যে সমান, কিন্তু ধর্ম সেখানে শাসন আর রাজনীতির নিয়ামক নয়। সেখানে আছে গণতন্ত্রের পূর্ণাঙ্গ বিকাশ, কিন্তু নাগরিকরা ভোগ করেন সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার প্রতিটি সুফল। সহ-আলোচক বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. মুনতাসির মামুন অনুষ্ঠানে নুজহাতের এ ধরনের পর্যবেক্ষণের প্রশংসা করলেন সাথে সাথেই।

আমার সাধারণত টকশোগুলো দেখা হয়ে ওঠেনা। কারণ ওই সময়গুলোতে আমি সাধারণত চেম্বারে বসে কলম পেশায় ব্যস্ত থাকি। আর তাই নুজহাতের বলার যা কিছু প্রশংসা, আমার সাধারণত শোনা হয় অন্যের মুখে কিংবা ফেসবুকে। এ নিয়ে একটু দুঃখবোধও আছে। তাই যখনই সুযোগ পাই দেখি এবং প্রায়শই চিন্তার খোরাকও পাই। এই যেমন সেদিনের ঈদ স্পেশাল একাত্তর সংযোগ।

আজকে আমাদের এই অগ্রযাত্রায় যে অস্বস্তিকর উপাদানগুলো গলার কাটার মত বিঁধছে, নুজহাতের মত এত সুন্দর করে সেই জিনিসগুলো এত সহজে তুলে আনতে আমি আগে কাউকে দেখিনি। তলোয়ার নয় বরং সুফিদের দিয়ে যে ভূখণ্ডে একদিন ইসলামের প্রচার ও প্রসার, শাহজালাল-শাহ পরান-আমানত শাহ-বায়জীদ বোস্তামী-শাহ মখদুমের মতন শত আউলিয়ার পদচারণয় পুণ্য যে ভূমি, যে দেশে জন্ম আর বিকাশ লালন শাহ আর হাসন রাজার, সে দেশের বাউল আব্দুল করিমকে কেন গাইতে হয়, “... ... আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম”? বাংলাদেশে ওহাবি-সালাফি ইসলামের আজ যে উত্থান, কথায় কথায় বেদাত, মিলাদ আর শবে-এ-বরাত নিয়ে আজ যে অন্তহীন বিতর্ক - সেই ইসলামের আমদানি এ দেশে একাত্তরে পরাজিত একদল ধর্ম ব্যবসায়ীর হাত ধরে, পঁচাত্তর পরবর্তী শাসক শ্রেণির পৃষ্ঠপোষকতায়। আর ‘কাতার পরিস্থিতি’ পরবর্তী আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের আলোচনা আর ব্রিটেনের সরকারি-বেসরকারি একাধিক প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় একথা এখন দিনের আলোর মত স্পষ্ট যে সৌদি রাজ পরিবার এবং তার সহযোগী সরকারগুলো বিশ্বব্যাপী, অবশ্যই বাংলাদেশে এবং এমনকি ব্রিটেনেও, এসব মতবাদের প্রচার ও প্রসারে হাজার-হাজার, কোটি-কোটি নয়, বরং শত শত কোটি ডলার ব্যয় করে আসছে। এসব কথা নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির চাচাকে বলতে শুনেছি অসংখ্যবার টিভিতে আর বক্তৃতায় আর এখন শুনে হাসি পায় আল জাজিরায় আর বিবিসি-সিএনএন-এ।  আজকে এ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার যে প্রাচুর্য তা যে প্রবাসী শ্রমিক ভাইদের হাত ধরেই এ কথা অনস্বীকার্য। তবে এ কথাও সম্ভবত সত্যি যে দীর্ঘদিন মধ্যপ্রাচ্যে থাকার কারণে ওহাবি-সালাফি জীবনাচারের সাথে তাদের যে পরিচয়, তার প্রেক্ষাপটে তারা কেউ কেউ বুঝে-না বুঝে এ দেশে ওইসব মতবাদের বিকাশে কিছুটা হলেও সহায়ক হয়েছেন। কাজেই নুজহাত যে প্রথম আশঙ্কাটির কথা বলেছেন তা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়ার মতন নয় মোটেও।

নুজহাত টেনে এনেছেন আফগানিস্তানের প্রসঙ্গও। এক সময় বাঙ্গালি মুক্তিযোদ্ধারা প্যালেস্টাইনের মুক্তিসংগ্রামে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেছিলেন। যদি ভুল না জেনে থাকি, ইসরাইল-লেবানন সমঝোতায় লেবানন ছেড়ে যাওয়ার সময় প্রয়াত ইয়াসির আরাফাতের সাথে সর্বশেষ যে পিএলও কন্টিনজেন্টটি লেবানন ত্যাগ করেছিল তা ছিল শতভাগ বাঙ্গালি গেরিলাদের নিয়ে গঠিত। এরই ধারাবাহিকতায় এ দেশের বহু যুবক পরে আফগানিস্তানে গিয়ে মুজাহিদ হয়েছেন, অস্ত্র ধরেছেন কখনো সোভিয়েত বাহিনী আর কখনো বা তালেবানদের হয়ে মার্কিনীদের বিরুদ্ধে। কিন্তু প্যালেস্টাইন আর আফগানিস্তান এক জিনিস নয়। প্যালেস্টাইন যেখানে মধ্যপ্রাচ্যে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র আর ধর্মনিরপেক্ষতার সূতিকাগার, আজো মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারটি যখন প্যালেস্টাইনে মাহমুদ আব্বাসের নেতৃত্বেই অধিষ্ঠিত, আফগানিস্তান সেখানে অবাধ মৌলবাদ চর্চার অভয়ারণ্য। কখনো শুনবেন না কোন সাবেক পিএলও গেরিলা মৌলবাদের খাতায় নাম লিখিয়েছেন, কিন্তু আফগান ফেরত মুজাহিদরা আজ আমাদের গলার কাটা। এদেশে সক্রিয় প্রতিটি মৌলবাদী গোষ্ঠীর সাথে তাদের সংশ্লিষ্টতা আর পৃষ্ঠপোষকতা। কাজেই নুজহাতের দ্বিতীয় শঙ্কাটিও অমূলক নয় মোটেও।

তবে আমার কেন যেন মনে হয়, ‘আমরা যেমন ছিলাম, তেমনই আছি’! বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ আমদানি করা ওহাবি-সালাফি কিংবা মুজাহিদিন ‘বটিকা’ সেবনে আদৌ প্রস্তুত নয়। হতে পারে আমাদের সমাজের একটা অংশ আজ বিভ্রান্ত হচ্ছে, কিন্তু তাই বলে তা মেরামতের অযোগ্য এমনটা আমার কখনোই মনে হয় না। তবে ‘জাপান-সুইডেনের মত বাংলাদেশ’ পেতে হলে আমাদের যার যা করনীয় ঠিক তা-ই করার বোধ হয় এখনই সবচেয়ে প্রকৃষ্ট সময়। আর এর জন্য শুধু সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকলেই চলবে না। সরকার তার কাজটা করার চেষ্টা করে চলেছেন। শুধুমাত্র গত কয়েকটি মাসেই গুড়িয়ে দেয়া হয়েছে দুই ডজনেরও বেশি জঙ্গি আস্তানা, নিহত হয়েছেন প্রায় আশি জন জঙ্গি, যাদের মধ্যে বেশিরভাগই আবার নীতি-নির্ধারনী পর্যায়ের।

হলি আর্টিজানের বর্ষপূর্তিতে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির চাচা ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিক বন্ধুদের প্রশ্নের উত্তরে বলছিলেন আদর্শিক লড়াইয়ের কথা। একই কথার প্রতিধ্বনি দেখেছি পরদিন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামাল চাচার সাক্ষাৎকারেও। সরকার নিশ্চয়ই জঙ্গি দমনে আপাতত সফল। কিন্তু আদর্শিক বিজয় সূচিত হয়নি এখনও। আর তাই এই জায়গাটিতেই আঘাত হানতে হবে এবং আঘাত হানতে হবে এখনই। বিভ্রান্ত প্রজন্মকে সরিয়ে আনতে হবে সংশয়ের জায়গাগুলো থেকে। শুধু ঢালাওভাবে কওমি মাদ্রাসাকে টার্গেট করলেই চলবে না। টার্গেট করতে হবে আপনার আমার সন্তানরা যেখানে পড়ে সেইসব ইংরেজি মিডিয়ামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও। এরা সেই প্রজন্ম যারা আলেকজান্ডারকে চেনে, কিন্তু চেনেনা বীর শ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর কিংবা ‘কে ফোর্সের’ খালেদ মোশাররফকে। এরা আব্রাহাম লিংকনের জীবনী পড়ে, কিন্তু বঙ্গবন্ধু এদের কাছে অনেক অচেনা। আর তাই এদের বিভ্রান্ত করা অনেক সহজ। ভুলে গেলে চলবে না হলি আর্টিজান আর শোলাকিয়ার ওই বিভ্রান্ত যুবকদের অনেকেই ছিল ইংরেজি মিডিয়ামে পড়ুয়া আর মোনাশ ফেরত। টার্গেট করতে হবে পাশ্চাত্যের বাঙ্গালি ডায়াস্পোরাকেও। মনে রাখতে হবে তামিমের মত কানাডা ফেরত বিভ্রান্ত যুবকটি মৌলবাদের তত্ত্বে দীক্ষা নিয়েছিল সেদেশে বসেই। আজকের বাঙ্গালি ডায়াস্পোরা জানেনা একাত্তরে তাদের বাবা-দাদারা কিভাবে মিছিলে মিছিলে কাঁপিয়েছিলেন লন্ডনের ট্রাফেলগার স্কয়ার আর নিউ ইয়র্কের সেন্ট্রাল পার্ককে। বাধ্য করেছিলেন পাকিস্তান প্রেমী সে সময়কার পাশ্চাত্যের সরকারগুলোকে তাদের উগ্র অবস্থান থেকে অনেক ক্ষেত্রেই সরে আসতে।

সরকার আজ পাঠ্যপুস্তকের হেফাজতীকরণ সংশোধনে উদ্যোগী হয়েছেন, পত্রিকার পাতায় এমন খবর আমাদের জন্য স্বস্তি দায়ক। আমরা চাই স্বস্তিদায়ক এমনি আরো অনেক উদ্যোগ। উদ্যোগ নিয়েছে নির্মূল কমিটি। নিচ্ছে বাংলাদেশ স্টাডি ট্রাস্ট কিংবা ট্রেজার ১৯৭১-এর মতন  ছোট ছোট অনেক সংগঠনই। চলমান উদ্যোগে এসব কিছুই সহায়ক। আর এই উদ্যোগগুলোই যখন জাতীয় আন্দোলনে রূপ নেবে, আমি নিশ্চিত নুজহাতের ‘জাপান-সুইডেনের মতন’ টলারেন্ট ও প্রগ্রেসিভ বাংলাদেশের স্বপ্ন সেদিন আর স্বপ্ন থাকবে না। আর কোটি বাঙ্গালির প্রত্যাশাও ঠিক তাই।

জেআই/

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।
print
 

আলোচিত সংবাদ