পরিপ্রেক্ষিত : বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ কর্মসূচি

ঢাকা, বুধবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭ | ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৪

পরিপ্রেক্ষিত : বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ কর্মসূচি

ডা. কামরুল হাসান ১২:৫৯ অপরাহ্ণ, জুলাই ০৮, ২০১৭

print
পরিপ্রেক্ষিত : বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ কর্মসূচি

২১ জুন ২০১৭ তারিখটি সম্ভবত বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ আন্দোলনের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। কারণ ওইদিন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পাবলিক হেলথে অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশে সরকারি উদ্যোগে প্রথমবারের মতো থ্যালাসেমিয়া বিষয়ক আলোচনা সভা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বর্তমান মহাপরিচালক ডা. আবুল কালাম আজাদ থ্যালাসেমিয়া বিষয়ে অত্যন্ত সময়োপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ এ সভার আয়োজন করেন এবং এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। তার অতীত কর্মজীবনের সাফল্যগাথার দিকে তাকিয়ে অনেকেই আশাবাদী হয়েছেন যে, এবার হয়তো থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ আন্দোলন বাস্তবে একটি সফল রূপ নিতে যাচ্ছে।

.

আলোচনা সভায় হেমাটোলজি সোসাইটি অব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশন, আইসিডিডিআরবি, ideSHi, সন্ধানী ও মেডিসিন ক্লাবের প্রতিনিধিরাসহ হেমাটোলজি, ট্রান্সফিউশন মেডিসিন, প্রসূতি বিশেষজ্ঞ এবং অনলাইন এক্টিভিস্টদের অংশগ্রহণ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। সময়ের প্রয়োজনে থ্যালাসেমিয়া নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ আলোচনার প্রাসঙ্গিকতাই এ নিবন্ধের মূল বিষয়।

কেন থ্যালাসেমিয়া বিষয়ক আলোচনা?

অনেকেই হয়ত ভাববেন, হঠাৎ কেন থ্যালাসেমিয়া নিয়ে মাতামাতি। বিষয়টা আসলে হঠাৎ নয়। থ্যালাসেমিয়া বাংলাদেশে অতীতেও ছিল বর্তমানেও আছে। বাংলাদেশ পৃথিবীর থ্যালাসেমিয়া বেল্টে অবস্থিত একটি জনবহুল দেশ। একটি দেশের স্বাস্থ্যবিষয়ক কর্মসূচি নির্ধারিত হয় সে দেশের ডিজিজ প্যাটার্ন ও বার্ডেনের ওপর। মাত্র কিছুদিন আগে পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্যবিষয়ক কর্মসূচি ছিল সংক্রামক ব্যাধিকেন্দ্রিক। কারণ এ দেশে সংক্রামক ব্যাধিতে অসংখ্য শিশু প্রতি বছর মারা যেত। সরকারের বাস্তবমুখী কর্মসূচির কারণে সংক্রামকব্যাধিতে মৃত্যুর হার এখন অনেক কমে গেছে। ফলে আগে থেকে অস্তিত্বশীল অসংক্রামকব্যাধিগুলো এখন ক্রমান্বয়ে দৃশ্যমান হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে গড় আয়ু বৃদ্ধির ফলে অনেক অসংক্রামকব্যাধির প্রকোপ বেড়েছে। এমনকি বর্তমানে এ দেশের মানুষের শতকরা ৫৯ ভাগ মৃত্যুর কারণ অসংক্রামকব্যাধি। থ্যালাসেমিয়া এমনই একটি অসংক্রামকব্যাধি যা বংশ পরম্পরায় প্রবাহিত হয়। অনেকেই শুনে আশ্চর্য হবেন যে, এ দেশে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ থ্যালাসেমিয়ার জিন বহন করে এবং তা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। প্রতি বছর প্রায় ১৫ হাজার শিশু থ্যালাসেমিয়ার জিন নিয়ে জন্ম নিচ্ছে, যার মধ্যে অনুমিত ২৫০০ শিশু থ্যালাসেমিয়া মেজরে আক্রান্ত থাকে। থ্যালাসেমিয়া মেজর অর্থ হলো ওই সমস্ত থ্যালাসেমিয়া রোগী যাদের বেঁচে থাকার জন্য অন্যের রক্ত গ্রহণের প্রয়োজন হয়। এতদসত্ত্বেও এ দেশে নিয়মিত রক্ত গ্রহণকারী থ্যালাসেমিয়া রোগীর সংখ্যা মাত্র ৬০ থেকে ৭০ হাজার।

এরূপ তথ্যে প্রশ্ন জাগে এবং মহাপরিচালক মহোদয়ও যে, প্রশ্নটি রেখেছিলেন তা হলো ১৬ কোটিরও অধিক মানুষের একটি দেশে মাত্র ৭০ হাজার রোগীর চিকিৎসা নিয়ে একটি জাতীয় কর্মসূচি গ্রহণ কতোটা বাস্তবসম্মত। যে দেশে এখনও বেশির ভাগ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও ক্যান্সারের মতো রোগগুলোর প্রকোপ থ্যালাসেমিয়ার তুলনায় অনেক অনেক বেশি। এর উত্তর স্বয়ং মহাপরিচালকসহ আলোচকরা দিয়েছেন। দেশে ডায়াবেটিস বা হৃদরোগের মতো রোগের চিকিৎসায় ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়েছে। এ সমস্ত রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে দেশে ব্যাপক সুবিধা নিশ্চিত হয়েছে এবং খরচও তুলনামূলক কম। নিয়মিত চিকিৎসায় থেকে ডায়াবেটিস বা হৃদরোগ নিয়ে মানুষ দিব্যি স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড করতে পারে, পরিপূর্ণ বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে।

পক্ষান্তরে, অন্যের শরীরের রক্ত গ্রহণই যেখানে থ্যালাসেমিয়া মেজর রোগীর বেঁচে থাকার উপায়, সেখানে রক্ত ও অন্যান্য ওষুধের অভাবে অধিকাংশ শিশুই ৫ বছর বয়সের মধ্যেই মারা যায়। যারা নিয়মিত রক্ত নিয়ে বেঁচে থাকে তারা প্রায় সবাই রক্ত গ্রহণজনিত নানা জটিলতায় ৩০ বছর বয়সের মধ্যে মারা যায়। ফলে থ্যালাসেমিয়া মেজর নিয়ে জন্মগ্রহণকারী রোগীর সংখ্যা শেষ পর্যন্ত দাঁড়ায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার। এ সমস্ত রোগীর জীবন হয়ে পরে দুর্বিষহ। স্বাভাবিক কাজ করার মতো শারীরিক ও মানসিক ফিটনেস তাদের থাকে না। একটি থ্যালাসেমিয়া পরিবারের অবস্থা কী পরিমাণ দুর্বিষহ হয়ে ওঠে তা কেবল ভুক্তভোগীই উপলব্ধি করতে পারে। সর্বক্ষণ রক্ত সংগ্রহের চিন্তা, রোগীকে ব্লাড ব্যাংক বা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, তার খরচ জোগানোর চেষ্টা ইত্যাদি।

চিকিসার খরচ জানতে চান?

এ রোগের চিকিৎসার খরচ নির্ভর করে রোগীর বয়স ও শরীরের ওজন এবং রোগের মাত্রার ওপর। রক্ত বেচাকেনা আইনত নিষিদ্ধ হওয়ার পরও রক্ত সংগ্রহ ও গ্রহণ এবং আনুষঙ্গিক ওষুধের খরচ মিলিয়ে একজন রোগীর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রতি বছর খরচ হয় ১,২৭,০০০ থেকে ৩,০৯,০০০ টাকা। সরকারি হাসপাতালের ফ্রি ডাক্তার আর নার্স সুবিধা না থাকলে খরচ আরো বেশি হতো নিঃসন্দেহে। ফলে বাকি পুরোটাই বহন করতে হতো পরিবারকে। এ দেশের কতটি পরিবার এরূপ ব্যয় বহন করতে পারে? যেখানে এরূপ থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত পরিবারের ৭২ শতাংশের বার্ষিক আয় মাত্র ২,৪০,০০০ থেকে ৪,৮০,০০০ টাকা। এরূপ অবস্থায় একটি থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত পরিবার দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর হওয়াই স্বাভাবিক। ভয়াবহ বিষয় হলো এ দেশে বিভিন্ন ব্লাড ব্যাংকে ও হাসপাতালে বছরে যে পরিমাণ রক্ত সংগ্রহ করা হয় তার ৪০ শতাংশ ব্যয় হয় এই থ্যালাসেমিয়া রোগীদের চিকিৎসায়। কী পরিমাণ অপচয় হয়ে থাকে একটি রাষ্ট্র ও সমাজ অনুমান করা যায় কি? আর্থিক, মানসিক, শারীরিক, কর্মঘণ্টায়? কেবল থ্যালাসেমিয়ার কারণে সমগ্র জনগোষ্ঠীতে সুস্থ বছর হারানোর হার প্রতি হাজারে পুরুষের ক্ষেত্রে ১৪৭.২ ও নারীদের ক্ষেত্রে ২২৬.১ এবং বছর হিসেবে আগাম মৃত্যুজনিত আয়ুষ্কাল হারানোর হার প্রতি হাজারে ৫১.২। সংক্রামকব্যাধি নিয়ন্ত্রিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশু ও জনসংখ্যা প্রতি বছর বেড়ে চলেছে। ক্যান্সারের চিকিৎসাও অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও হতাশাজনক। বেশ কিছু ব্লাড ক্যান্সার ও অতি অল্পসংখ্যক সলিড ক্যান্সার ছাড়া অধিকাংশ ক্যান্সার নিরাময়যোগ্য নয়। তদুপরি দেশে সরকারি পর্যায়ে ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং এসবে সরকারি ব্যবস্থাপনায় স্বল্পমূল্যে বা বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হয়ে থাকে। অথচ থ্যালাসেমিয়া একটি প্রতিরোধযোগ্য ও অনেক ক্ষেত্রে নিরাময়যোগ্য হলেও এ রোগের জন্য এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দ্দিষ্ট সরকারি কর্মসূচি নেই। ফলে এ সংক্রান্ত একটি জাতীয় কর্মসূচি নির্ধারণ জরুরি হয়ে পড়েছে। বিষয়টিকে থ্যালাসেমিয়া সংক্রান্ত আলোচনা সভায় সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়।

কীভাবে প্রতিরোধ করা যেতে পারে থ্যালাসেমিয়া?

জ্ঞাতব্য যে, থ্যালাসেমিয়া জিনের বাহকদের মধ্যে এ রোগের লক্ষণ প্রায় থাকে না বললেই চলে এবং তারা প্রায়ই স্বাভাবিক জীবন যাপন করে থাকে। যখন স্বামী ও স্ত্রী দুজনেই বাহক হয় তখন তাদের প্রতিটা সন্তানের ক্ষেত্রে থ্যালাসেমিয়া হওয়ার আশঙ্কা থাকে ২৫ শতাংশ। আর যদি একজন রোগী ও অপরজন বাহক হয় তাহলে এ আশঙ্কা দাঁড়ায় ৫০ শতাংশ। উভয়েই রোগী হলে তাদের প্রতিটা সন্তানই রোগী হবে। পক্ষান্তরে স্বামী ও স্ত্রীর একজন বাহক ও একজন সুস্থ হলে তাদের সন্তানদের কেউই এই রোগে আক্রান্ত হবে না, যদিও তাদের সন্তানদের বাহক হওয়ার আশঙ্কা থাকে ৫০ শতাংশ যা একটি রাষ্ট্রের জন্য গ্রহণযোগ্য। ফলে থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধের জন্য যে কর্মসুচিই নেওয়া হোক না কেন তার মূল উদ্দেশ্য থাকবে একজন বাহক বা রোগীর সঙ্গে আরেকজন বাহক বা রোগীর বিবাহ প্রতিরোধ করা। এ উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে যে সমস্ত কর্মসূচি নেওয়া যায় বা নেওয়া উচিত তা নিম্নরূপ হতে পারে :

১. ব্যাপক গণসচেতনতা সৃষ্টি : যেকোনো জাতীয় কর্মসূচি সফল করার প্রথম পদক্ষেপ হলো ব্যাপকভাবে জনগণকে সচেতন করা। জনগণকে জানাতে হবে ও বোঝাতে হবে এ রোগের লক্ষণ ও ক্ষতির দিকগুলো এবং একইসঙ্গে তার প্রতিরোধের উপায়। এখানে প্রতিরোধের উপায় বলতে বাহক চিহ্নিত করা ও তাদের মধ্যে বিবাহ না হওয়ায় উদ্বুদ্ধ করা। জনসচেতনতা এমন পর্যায়ে হওয়া উচিত যেভাবে মানুষ তার ব্লাড গ্রুপ জানতে উদ্বুদ্ধ হয়। লিফলেট, বিজ্ঞাপন, বিল বোর্ড, পোস্টার, শর্ট ফিল্ম তৈরি করা যেতে পারে। খবরের কাগজ, টেলিভিশনে আলোচনা নিবন্ধ টকশো করা যেতে পারে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, মসজিদের ইমাম, স্কুল শিক্ষক, স্বাস্থ্যকর্মী এরূপ গণসচেতনতা সৃষ্টিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারেন। অতীতে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন জাতীয় কর্মসূচিতে এসব উপাদান সফল ভূমিকা রেখেছে। বর্তমানে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম বিভিন্ন আন্দোলন ও জনসচেতনতা সৃষ্টিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। ফলে মোবাইল এসএমএসও জনসচেতনতা সৃষ্টিতে বিরাট ভূমিকা রাখতে পারে।

২. থ্যালাসেমিয়া নির্ণয়কেন্দ্র স্থাপন : ইতোমধ্যে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে থ্যালাসেমিয়ার ভয়াবহতা নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা চলছে। এরূপ আলোচনার ফলে কোনো কোনো হাসপাতালে থ্যালাসেমিয়া রোগ নির্ণয়ের জন্য তরুণ-তরুণীরা ভিড় করছে বলে জানা গেছে। অর্থাৎ সচেতনতা সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গেই এ রোগ নির্ণয়ের সুবিধাও নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় গণসচেতনতা সৃষ্টি অর্থহীন হয়ে পড়বে বা এ থেকে আশানুরূপ ফল পাওয়া যাবে না। থ্যালাসেমিয়া নির্ণয়ের জন্য যে পরীক্ষাগুলো বিশেষভাবে প্রয়োজন তা হলো রক্তের রেড সেল ইনডেক্স দেখা, মাইক্রোস্কোপে রক্তের ফিল্ম (পিবিএফ) দেখা এবং সবশেষে হিমোগ্লোবিন ইলেট্রোফোরেসিস পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া। কিন্তু হিমোগ্লোবিন ইলেট্রোফোরেসিসের স্থাপনা ও মেইন্টেনেন্স খরচ বেশি বলে দেশের মাত্র হাতেগোনা কয়েকটি সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এ সার্ভিস রয়েছে। ফলে এ সুবিধা দেশের জনগণের দোরগোড়ায় হয়ত দেওয়া সম্ভব নয় এবং স্ক্রিনিং বা রোগ নির্ণয়ের জন্য সবাইকে এই পরীক্ষা করাটা আমাদের বর্তমান স্বাস্থ্য কাঠামোতে এ মুহূর্তে বাস্তবসম্মত নয়। যেটি করা যায় তা হলো প্রথমে একটি সহজ ও সাশ্রয়ী পরীক্ষার মাধ্যমে সন্দেহজনক বাহক নির্ণয় করতে হবে। তারপর তাদের হিমোগ্লোবিন ইলেট্রোফোরেসিসের আওতায় এনে বাহক নিশ্চিত করা যেতে পারে। এ কাজে যে পরীক্ষাটি সহজলভ্য ও সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তা হলো রেড সেল ইনডেক্স দেখা। রেড সেল ইনডেক্স পরীক্ষা করা হলে স্ক্রিনিং-এর জন্য হিমোগ্লোবিন ইলেক্ট্রোফোরেসিসের প্রয়োজনীয়তা প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব। আর এ জন্য দরকার হেমাটোলজি অটোএনালাইজার বা সিবিসি এনালাইজার। এই সিবিসি এনালাইসিসের সুবিধাটি শুধু থ্যালাসেমিয়া নির্ণয়ের জন্য নয়, যেকোনো রোগের পরীক্ষার ক্ষেত্রে একটি প্রাথমিক ও সাধারণ কিন্তু অত্যন্ত প্রয়োজনীয় পরীক্ষা। কিন্তু এ সাধারণ মেশিনটিই আমাদের দেশের সকল থানা পর্যায়ে নেই। কাজেই আমাদের জনবান্ধব সরকারের পক্ষে দেশের প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালে সিবিসি এনালাইজার সুবিধা নিশ্চিত করা উচিত। শুধু থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধের জন্যই নয়, আমাদের ক্রমাগত উন্নতিশীল স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্যই সিবিসি অটোএনালাইজার সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ পরীক্ষার মাধ্যমে প্রাপ্ত সন্দেহযুক্ত কেসগুলো নিশ্চিত হওয়ার জন্য উচ্চতর হাসপাতাল বা সেন্টারে বা বিশেষজ্ঞ ডাক্তারকে রেফার করা হলে থ্যালাসেমিয়া নির্ণয় প্রক্রিয়া বাস্তবসম্মত হতে পারে। থ্যালাসেমিয়া নির্ণয়ের জন্য পরবর্তী পর্যায় হতে পারে প্রতিটি সরকারি মেডিকেল কলেজে ক্যাপিলারি হিমোগ্লোবিন ইলেক্ট্রোফোরেসিস নামক পরীক্ষার সুবিধা নিশ্চিত করা। ক্যাপিলারি হিমোগ্লোবিন ইলেক্ট্রোফোরেসিস পরীক্ষার মাধ্যমে অধিকাংশ ক্ষেত্রে থ্যালাসেমিয়া নির্ণয় ও তার প্রকার নিশ্চিত করা সম্ভব। অনেক ক্ষেত্রে শরীরে আয়রনের ঘাটতি থাকলে বাহক নির্ণয় কঠিন হয়ে পরে। এজন্য উপজেলা হাসপাতালে সিবিসি এনালাইজার সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আয়রন পরীক্ষার সুবিধাও নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ ক্ষেত্রে এবং গবেষণার প্রয়োজনে থ্যালাসেমিয়ার জেনেটিক পরীক্ষার জন্য একটি কেন্দ্রীয় পরীক্ষাগার স্থাপন করাও জরুরি। অবশ্য সরকারি পর্যায়ে না হলেও মহাখালীর আইসিডিডিআরবিতে সীমিত আকারে থ্যালাসেমিয়ার জেনেটিক পরীক্ষা করা হচ্ছে।

৩. আইন প্রণয়ন : বিয়ের আগে বা বিয়ের সময় পাত্র-পাত্রীর উভয়ের বাধ্যতামূলক থ্যালাসেমিয়ার পরীক্ষা করা ও তা প্রকাশ করার জন্য আইন প্রণয়ন করতে হবে। প্রয়োজনে থ্যালাসেমিয়া বা এ জাতীয় জরুরি অন্য কোনো জেনেটিক রোগ আছে কি না তা লিপিবদ্ধ করার জন্য কাবিন নামায় অতিরিক্ত একটি অনুচ্ছেদ সংযোজন করা ও তাতে একজন রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের স্বাক্ষর থাকার ব্যবস্থা করা উচিত। তবে বাহক বা রোগীদের মধ্যে বিয়ে নিষিদ্ধের আইন সঙ্গত নয়, আইন হতে হবে পাত্র বা পাত্রীর থ্যালাসেমিয়া বা এই জাতীয় গুরুতর কোনো জেনেটিক রোগ আছে কিনা তা প্রকাশ করতে বাধ্য করার আইন। কেবল পাত্র-পাত্রী পরস্পরকে জানার পরই তারা বিয়ে করতে পারবে বলে আইন থাকা দরকার। আইন প্রণয়নের বিকল্প নেই। কারণ বিবাহপূর্ব সংশ্লিষ্ট পাত্র-পাত্রীর থ্যালাসেমিয়ার পরীক্ষা করা এবং তা পরস্পরের কাছে প্রকাশ করা আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে একটি অত্যন্ত সেনসিটিভ ও কঠিন বা জটিল বিষয়। অথচ আলোচ্য কর্মসূচির সব কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে থ্যালাসেমিয়ার বাহক বা রোগীদের মধ্যে বিবাহে বাধা দান বা নিরুৎসাহিত করা। সামাজিক কারণেই পাত্র-পাত্রীর যেকোনো দুর্বলতা প্রকাশ করা হয় না। বরং ব্যতিক্রম ছাড়া বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দুর্বলতা গোপন করা হয়। থ্যালাসেমিয়া বিষয়ক দুর্বলতাও এর ব্যতিক্রম হবে না। কিন্তু আইন প্রণয়ন করে বিবাহের পূর্বে পাত্র-পাত্রীর উভয়ের থ্যালাসেমিয়ার অবস্থা প্রকাশ করতে বাধ্য করা হলে সামাজিক জটিলতাগুলো অনেকাংশেই উত্তরণ করা সম্ভব। বিশ্বের যেসব দেশে সফলভাবে থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে সেসব প্রতিটা দেশেই বাধ্যতামূলক বিবাহপূর্ব থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা করা ও তা প্রকাশ করার আইন রয়েছে। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে আইন আছে, এমনকি উপমহাদেশের পাকিস্তানেও এরূপ আইন সম্প্রতি প্রণয়ন করা হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, আমাদের দেশে অনেক বিষয়েই আইন আছে কিন্তু তার প্রয়োগ নেই, ফলে এ ধরনের আইন প্রণয়ন আরেকটি কেতাবি আইনের জন্ম দেবে। তাদের উদ্দেশ্যে এতটুকু বলাই যথেষ্ট যে, আইন থাকলেই তার অনুশীলনের প্রশ্ন আসে, না থাকলে নয়। এ ধরনের একটি আইন যদি ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রেও অনুশীলন হয় তাহলেও আমাদের উদ্দেশ্য কমপক্ষে ৫০ শতাংশ সাধিত হবে।

প্রতিরোধ কর্মসূচি তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা যেতে পারে। প্রথম বছরে ডায়াগনস্টিক সুবিধা নিশ্চিত করা ও সংশ্লিষ্ট জনবলের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া। দ্বিতীয় বছর থেকে গণসচেতনতামূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা। শেষ পর্যায়ে বিবাহের শর্ত হিসেবে থ্যালাসেমিয়ার পরীক্ষার ফলাফল বাধ্যতামূলক প্রকাশ করার আইন প্রণয়ন করা। এ শেষ পর্যায়ে প্রতিটি পাত্র-পাত্রীর জন্য হিমোগ্লোবিন ইলেক্ট্রোফোরেসিস পরীক্ষার সুবিধা ব্যাপকভাবে নিশ্চিত করতে হবে।

থ্যালাসেমিয়া রোগীদের ক্ষেত্রে করণীয় :

আগেই বলা হয়েছে, থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল, সামাজিক কারণে বিব্রতকর এবং হতাশাজনক। অন্যের রক্ত গ্রহণ করে তাদের বেঁচে থাকতে হয়। ইতোমধ্যে স্বেচ্ছায় রক্তদানের জন্য গণসচেতনতামূলক কার্যক্রম চালু আছে। এ কার্যক্রম আরো জোরদার করা উচিত যাতে থ্যালাসেমিয়ার রোগীদের রক্তগ্রহণ সহজলভ্য হয়। সারাদেশে অনেক ব্লাড ব্যাংক রয়েছে। প্রতিটা ব্লাড ব্যাংকে থ্যালাসেমিয়া রোগীদের রক্ত পরিসঞ্চালনের জন্য আলাদা বেড নিশ্চিত করা জরুরি। একইসাথে রক্ত পরিসঞ্চালনজনিত রোগ প্রতিরোধকল্পে নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন নিশ্চিত করতে হবে।

এ বিষয়ে বিধিমালা প্রণয়ন ও সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন। পুনঃপুনঃ রক্ত গ্রহণের কারণে শরীরে যে ক্ষতিকর অতিরিক্ত আয়রন জমা হয় তার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধের স্বল্পতা রয়েছে দেশে এবং প্রাপ্ত ওষুধের দামও অধিকাংশ রোগীর নাগালের বাইরে। দেশীয় ওষুধ কোম্পানিগুলো যাতে এ সমস্ত ওষুধ তৈরি করে ও তার দাম নাগালের মধ্যে থাকে তার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে। কিংবা সরকারি মালিকানাধীন ইডিসিএল প্রয়োজনীয় ওষুধ তৈরি ও স্বল্পমূল্যে বিপণন করতে পারে অথবা সরকারি হাসপাতালে এসব ওষুধ বিনামূল্যে বিতরণ করার ব্যবস্থা করা উচিত। এ জন্য থ্যালাসেমিয়া রোগীদের একটি সরকারি রেজিস্ট্রি থাকা প্রয়োজন। থ্যালাসেমিয়া রোগীদের পরিপূর্ণ নিরাময়ের জন্য একমাত্র চিকিৎসা হলো বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট। এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল, ঝুঁকিপূর্ণ এবং তা ডোনার থাকা সাপেক্ষে সম্ভব। এর মাধ্যমে থ্যালাসেমিয়ার পরিপূর্ণ নিরাময়ের হার ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ। যদিও এ চিকিৎসায় রোগীর বংশগতি পরিবর্তন হয় না, কিন্তু রোগী পরিপূর্ণ সুস্থ জীবন যাপন করতে পারে। দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ইতোমধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও সিএমএইচে বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু সেগুলোতে সীমিত আকারে কেবল কয়েকটি রোগের জন্য অটোলোগাস ট্রান্সপ্লান্ট করা হচ্ছে। থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় এলোজেনিক ট্রান্সপ্লান্ট এখনও শুরু করা সম্ভব হয়নি। এসব সেন্টারে থ্যালাসেমিয়ার রোগীদের প্রয়োজনীয় ট্রান্সপ্লান্ট শুরু করা উচিত।

তথ্যসূত্র :

-আলোচনা সভায় পরিবেশিত ড. সরোয়ার ও তার দলের গবেষণাপত্র
-সভায় অংশগ্রহণকারীদের আলোচনা থেকে প্রাপ্ত তথ্য
-আইসিডিডিআরবির গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্য
-বিভিন্ন ওয়েবসাইটে প্রাপ্ত তথ্য

লেখক : রক্তরোগ ও ব্লাডক্যান্সার বিশেষজ্ঞ, সহাকারী অধ্যাপক, মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ।

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।
print
 

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad