সৃজনশীল পদ্ধতির বিকল্প নেই

ঢাকা, শনিবার, ২২ জুলাই ২০১৭ | ৭ শ্রাবণ ১৪২৪

সৃজনশীল পদ্ধতির বিকল্প নেই

মো. সফিউল আলম প্রধান ১:২৩ পূর্বাহ্ণ, মে ২০, ২০১৭

print
সৃজনশীল পদ্ধতির বিকল্প নেই

সৃজনশীল পদ্ধতি বলতে মূলত মূল পাঠ্য বই থেকে সরাসরি প্রশ্ন না করে তারই মূলভাবের আলোকে জ্ঞানমূলক, অনুধাবনমূলক, প্রয়োগ ও উচ্চতর দক্ষতা এই চারটি ধাপে প্রশ্ন করাকে বোঝায়। মূলত শিক্ষার্থীদের মুখস্থ বিদ্যায় নিরুৎসাহিত করা, গাইড নির্ভরতা কমানো ও কোচিং দৌরাত্ম বন্ধের লক্ষে আমাদের দেশে সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত চালু করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে মুখস্থ বিদ্যার প্রবণতা কমে আসলেও গাইড নির্ভরতা ও কোচিং দৌরাত্ম বেড়েছে বলেই অনেকের অভিযোগ। অনেক বিশেষজ্ঞগণও এর পক্ষে-বিপক্ষে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মতামত ব্যক্ত করেছেন।

জার্মানভিত্তিক একটি বাংলা অনলাইন পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটস প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যারের একটি মন্তব্য এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। সৃজনশীল পদ্ধতির প্রশ্নপত্রে শিক্ষার্থীদের সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা যাচ্ছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি না সূচক উত্তর দিয়ে বলেন, ‘সৃজনশীল পদ্ধতিটা শিক্ষকরাও তেমন বোঝেন না, ছাত্রদেরও বোঝাতে পারেন না। কী প্রশ্ন করবেন প্রশ্নকর্তা নিজেও তা বোঝেন না। ফলে তিনি গাইডবুক, নোট এগুলোর উপর নির্ভর করেন। সেখান থেকেই তিনি এই প্রশ্নের ধারণা তৈরি করেন। পরীক্ষার সময় এটা একটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করে। প্রশ্ন হওয়া উচিত বই থেকে, ছাত্ররা যা পড়েছে।’

কিন্তু স্যারের এই বক্তব্যের সাথে আমি ব্যক্তিগতভাবে একমত হতে পারছি না। সৃজনশীল পদ্ধতিটা শিক্ষকরা তত ভালো বুঝেন না এটা অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু শিক্ষকদের নিয়মিত ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে এ সমস্যার অনেকটাই সমাধান হচ্ছে। এটা কিন্তু সিস্টেমের দোষ নয়। একটা নতুন সিস্টেম শতভাগ সফলতা পেতে কিছুটা সময় দরকার। আজকে যারা শিক্ষার্থী তারা যখন আগামীতে শিক্ষকতায় আসবেন তখন নিশ্চয় এমন অভিযোগ থাকবে না।

বই থেকে প্রশ্ন হওয়ার ব্যাপারে আমার নিজের একটা অভিজ্ঞতা এখানে শেয়ার করা যেতে পারে। আমি ২০১১তে যখন নটরডেম কলেজে ভর্তি হই, তখন দুইটি পদ্ধতিই ছিল। অর্থাৎ দুইটি বিষয়ে সৃজনশীল পদ্ধতিতে আর বাকি চারটি বিষয়ে সনাতন পদ্ধতিতে পরীক্ষা দিতে হত। সনাতন পদ্ধতির নিয়ম ছিল প্রতিটি বিষয় আটটি বড় প্রশ্ন থাকবে ৪টি উত্তর করতে হবে, প্রতিটি দশ মার্ক করে। অন্যদিকে চারটি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন থাকবে দুইটি উত্তর করতে হবে প্রতিটি ৫ মার্ক করে। এভাবে ৫০ মার্ক রিটেনে ছিল। বললে অত্যুক্তি হবে না, যেসকল বিষয় তখনও সৃজনশীল করা হয়নি সেসব বিষয়ের বোর্ডের প্রশ্ন আমরা দুই বছর আগেই আউট করে করেছিলাম!! আরেকটু পরিষ্কার করে বললে, বোর্ড পরীক্ষা যদি বিজোড় সালে হয় তাহলে আপনি পূর্ববর্তী বিজোড় সালের প্রশ্নটা পড়লেই শতভাগ উত্তর করতে পারবেন! অর্থাৎ ২০১৩ সালের জন্য ২০১১ সালের প্রশ্ন, ২০১৪ সালের জন্য ২০১২ সালের প্রশ্ন পড়লেই শতভাগ উত্তর করার মত প্রশ্ন কমন পেয়ে যাবেন। ফলে পাঠ্যবই পড়া দূরে থাক অনেকেই সেটা কিনতেনও না। বাজার থেকে একটা ভালো গাইড কিনে ১২-১৩ টা প্রশ্ন মুখস্থ করলেই হত।

কিন্তু যে সকল বিষয়ে সৃজনশীল ছিল সেসব বিষয়ে পাঠ্যবইকে ইগনর করার কোনো সুযোগ ছিল না। বইয়ের প্রতিটি লাইন সম্পর্কে সম্যক ধারণা না থাকলে কেউ প্রশ্নের সঠিক উত্তর করতে পারতো না। সৃজনশীলে কোনো গাইড বই স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। গাইড পড়ে বড়জোর প্রশ্ন সম্পর্কে একটা ধারণা নেওয়া যেতে পারে কিন্তু প্রশ্নের সঠিক উত্তরের জন্য পাঠ্যবই এর বিকল্প নাই। তাই সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে আমি মনে করি। এ পদ্ধতি মুখস্থ নির্ভরতা কমিয়ে শিক্ষার্থীকে পাঠ্যমুখী করেছে। সেই সাথে নকল করার প্রবণতাও হ্রাস পেয়েছে বহুলাংশে। এ ধরণের প্রশ্নের উত্তর দিতে শিক্ষার্থীকে ভাবতে হয়, কল্পনা করতে হয়, অনুধাবন করে নতুন-পুরানোর তুলনা করে সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হয়। গতানুগতিক শিক্ষা পদ্ধতির চেয়ে সৃজনশীল পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের লেখার স্বাধীনতা অনেক বেশি। আগে একটা  প্রশ্নের উত্তর সঠিকভাবে হলে নাম্বার পেত, না হলে নাম্বার কাটা যেত, এখন সৃজনশীল পদ্ধতিতে ছেলে-মেয়েরা স্বাধীনভাবে উত্তর দিতে পারে এবং সেখানে সুনির্দিষ্ট উত্তরের বাইরেও যদি তার লেখার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে সেখানেও সে নাম্বার পায়। এজন্য সৃজনশীল পদ্ধতি হওয়ায় পরীক্ষা শিক্ষার্থীবান্ধব হয়েছে।

আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় যে সনাতনী শিক্ষা পদ্ধতি ছিল তাতে পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের ভীতি কাজ করত। মুখস্থ করে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করায় সে প্রশ্ন কমন পড়ে কি না এনিয়ে দুশ্চিন্তা তাদের তাড়া করে বেড়ায়। এছাড়া নিষিদ্ধ গাইড ও নোটবই তাদেরকে পাঠ্যবই বিমুখ করে তুলতো, এসব সমস্যা দূর করতে সৃজনশীল পদ্ধতিতে শিক্ষা কিছুটা হলেও আশার আলো দেখাচ্ছে। একজন ছাত্র, যে হাতি দেখেনি তার কাছে হাতির বর্ণনা দেওয়ার চাইতে তাকে একটি হাতির মডেল সংগ্রহ করে দেখালে বা হাতির চিত্র দেখালে তার কাছে সেটি হৃদয়গ্রাহী, উপভোগ্য এবং আকর্ষণীয় হবে, শিক্ষকের দেওয়া বর্ণনা মুখস্থ করার চাইতে সে নিজেই একটি বর্ণনা তৈরি করে নিতে পারবে, এটিই হল সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি। শিক্ষকের দেওয়া হাতির বর্ণনা দশজন ছাত্রর মধ্যে দু-জন হয়ত মনোযোগ সহকারে শুনবে বাকি আটজনই ধীরে ধীরে অমনোযোগী হয়ে পড়বে এবং তাদের কাছে শিক্ষকের এই পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের মুখস্থ নির্ভরতা থেকে সরিয়ে আনবে।

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।
print
 

আলোচিত সংবাদ