পানির অপর নাম ‘মরণ’- ২

ঢাকা, শনিবার, ২৪ জুন ২০১৭ | ১০ আষাঢ় ১৪২৪

পানির অপর নাম ‘মরণ’- ২

আতিক রহমান পূর্ণিয়া ৯:৪৪ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ২০, ২০১৭

print
পানির অপর নাম ‘মরণ’- ২

পরিবর্তন ডটকমে গত ৭ এপ্রিল প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ৭টি জেলার (সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোণা) ১.৯৯ মিলিয়ন হেক্টর ভূমির ৪৩ শতাংশ অঞ্চল নিয়ে অনন্য এক জনপদ হাওর অঞ্চল। প্রতি বছর বাংলাদেশের প্রায় ২০ শতাংশ ধান এ অঞ্চলে জন্মে। এবার ফসল ওঠার ২-৩ সপ্তাহ আগে সাম্প্রতিক অকালের টানা বর্ষণ ও উজানের পাহাড়ি ঢলের বেগবান পানিপ্রবাহ স্থানে স্থানে দুর্বল ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে ও উপচে হাওর অঞ্চলের ৩০টিরও অধিক উপজেলার দুই লক্ষাধিক হেক্টর জমির কাঁচা ও আধাপাকা ধান তলিয়ে গেছে। যার আর্থিক মূল্য প্রায় ২ হজার কোটি টাকা।

আমি চোখ বন্ধ করে হাওরের এই ছবি স্পষ্ট দেখতে পাই। দেখতে পাই এসব বর্ণনার সঙ্গে মিশে থাকা বুকফাটা কান্না, অনিশ্চিত ভবিষ্যত। রাজধানীর জীবন‍যুদ্ধ ফেলে হাওরে ছুটে যেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু এই এক অবলা সাংবাদিক একা ওখানে গিয়ে কি করবো?

এবার আসি ভূ-প্রাকৃতিক অনেকটা লোকচক্ষুর অন্তরালের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কথায়। সেটিও কোনও গবেষণা থেকে নয়। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা। যতদূর মনে পড়ে ২০১২ এর জুন-জুলাইয়ে বর্ষার কথা। সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জের আলীপুরের হাওর আর ঝাইঞ্জা বিল পার হতে হতে স্থানীয় মানুষ আর মাঝি জেলেরা গল্প করছিলেন এই হাওরে ভরা বর্ষায় পানি আছে কমপক্ষে ২০ ফুট। পানি শুকিয়ে গেলে পাশের ঝাইঞ্জা বিল থেকে যে মাছ ধরা হবে তার অর্থমূল্য কম করে হলেও এক থেকে দেড় কোটি টাকা। ঠিক তিন বছর পর ২০১৬ সালের জুন-জুলাইয়ের কথা। একই পথে যেতে যেতে যখন মাঝিমল্লার সঙ্গে আবারও গল্পছলে বলছিলাম এখানেতো আমার তিনজন সমান মানুষের পানি। মাঝি অবাক হয়ে বললো নাতো। কথায় কথায় ইঞ্জিন নৌকা থামানো হলো। মাঝি বললো, নামেন ভাই, গোসল করেন। নৌকার লগি ভারসাম্য দেখেই বোঝা যাচ্ছিল পানি কম। ভরা বর্ষায় যে জায়গায় মাত্র তিন বছর আগে ২০ ফুট পানির কথা জেনেছিলাম। সেখানে নেমে অবাক। প্রায় কোমর পর্যন্ত দেবে গেছে বালির নিচে। বুক অবধি পানি। স্থানীয় সবাই জানালো, মাত্র তিন বছরে এতো বেশি পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে বালি এসেছে যে এখানে এখন চার পাঁচ ফুটের বেশি পানি হয় না। একই অবস্থা ঝাইঞ্জা বিলে। বালি পড়ে ভরাট হয়ে গেছে। যেখানে এক দেড় কোটি টাকার মাছ মিলতো সেখানে আগের বছর অর্থাৎ ২০১৫তে ৫ লাখ টাকার মাছও হয়নি। যেখানে ১০-১২ কেজি ওজনের বোয়াল, চিতল, আইড়, রুই মিলতো সেখানে বড় মাছের কোনও অস্তিত্বই নেই।

একই অভিজ্ঞতা হয়েছে কিশোরগঞ্জর বাজিতপুরেও। বাজিতপুর আর অষ্টগ্রাম উপজেলার বড় হাওরের এপার থেকে ওপারের দেখা মেলে না। বর্ষায় বিশাল এক দরিয়া। কিন্তু যে হাওর পার হতে উত্তাল ঢেউয়ে স্থানীয় মানুষেরও বুক কাঁপতো সে হাওর এখন বালি পড়তে পড়তে তার সেই শত বছরের ‘অহংকারি‘ রূপ হারিয়েছে। যেখানে অথৈ পানিতে শত শত জেলে নৌকা বাসতো সেখানে মাছ কমেছে, তাই জেলে নৌকা হাতে গোনা।

এবার এই পরিপ্রেক্ষিতেই ভিন্ন এক পর্যালোচনায় আসা যাক। এই দুর্যোগ কি কেবলই প্রকৃতি সৃষ্টি। আবারও অভিজ্ঞতার আলোকেই বলি। গত আট বছরে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে হাওরের মানুষ পেয়েছে ‘অঢেল’। সে পাওয়া কি একটু বেশি হয়ে গেলো? বদহজম? চোখ ফিরিয়ে দেখি। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই রাষ্ট্রযন্ত্রের ক্ষমতাশালী বেশ কয়েকটি চেয়ারে ছিলেন হাওরের মানুষ। দেশের রাষ্ট্রপতি, সেনা প্রধান, স্পীকার, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী, বিচারপতি, বেশ কয়েকজন সচিব ছিলেন হাওরঞ্চল থেকে আসা। এর পাশাপাশি রাষ্ট্রের ও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদেও ছিলেন হাওরের জন্ম নেওয়া মেধাবী নেতা, আমলা, পুলিশ কর্মকর্তা। এখনও রাষ্ট্রপতি, বিচারপতি, সচিবসহ অসংখ্য মানুষ গুরুত্বপূর্ণ পদে। এর বাইরে আওয়ামী লীগের পোড় খাওয়া ডাক সাইটে প্রভাবশালী বেশ কয়েকজন নেতা আছেন হাওর অঞ্চলের যারা দলীয় এবং দেশ পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তারা সবাই মিলে যে যার অবস্থান থেকে নিজ এলাকা ও হাওরের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। রাস্তা-ঘাট, ‍স্কুল-কলেজ বাঁধ নির্মাণের জন্য অনুদান নিচ্ছেন। হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প চলছে হাওরে। সেসব প্রকল্প নিয়ে অনেক বিতর্ক। বিতর্ক শুধু অর্থনৈতিক স্বচ্ছতার দিক থেকে না, বিতর্ক পরিবেশবাদীদের দিক থেকেও।

এসব প্রকল্পে কোনও সমন্বয় নেই। যে যেদিক দিয়ে পারছে রাস্তা নিচ্ছে। হাওরের বুক চিঁড়ে ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার রাস্তা হচ্ছে। যেগুলো হাওরের স্বাভাবিক পানি প্রভাবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে। বালি আর পলি জমাটে সহায়ক হচ্ছে। বালি ও পলির পানির সঙ্গে প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রবাহে নিম্নাঞ্চল হয়ে সাগরে যেতে বাধা পড়ছে, ফলে ভরাট হচ্ছে হাওর।

হাওরের মানুষ এতে খুশি। তারা দেখছে যে জায়গায় নৌকায় যেতে সারা দিন লাগতো সে জায়গা আধা ঘন্টায় পার হওয়া যাচ্ছে। এক সময় অন্তত সাব মার্সিবল (বছরে ছয় মাস পানির নিচে থাকা এবং ছয় মাস শুকনায় থাকা) রাস্তা করার কথা ছিল। কার কথা কে শোনে? জনগণের কাছে বড় আর মহান সাজতে উন্নয়নের এই জোয়ার থামানোর কথা বলাও যেন পাপ। এমনিতেই হাওরাঞ্চলে আবাসন সংকট তীব্র। ফলে যেসব এলকায় গত ১০-১৫ বছরে হাওরের মাঝ বরাবর রাস্তা হয়েছে সেগুলো ধরে গড়ে উঠছে বসতি। জায়গার দাম বেড়ে কয়েকগুণ হয়েছে। আমার চেনাজানা অন্তত ১০টি বড় রাস্তা দেখেছি গত কয়েক বছরে যেসব এলাকায় গেলে এখন বোঝাও যাবে না যে একসময় ঐখানে হাওর ছিলো।

উন্নতি আরও হয়েছে। সারাদেশের সাথে হাওরের শ্রমিকের দৈনিক মজুরি বেড়েছে। ৫-৭ বছর আগে যে শ্রমিকের মজুরি ছিলো দৈনিক দেড় দু’শ টাকা এখন তা ৫-৭’শ টাকা। কিন্তু মুশকিলটা হলো বর্ষায় হাওরের শ্রমিকের তো শ্রম দেওয়ার জায়গাই নেই, শীতে যদি ফসল ডুবে তাহলে একমাত্র শ্রম দেওয়ার জায়গাটিও শেষ।

মোটা দাগে বলতে চাই, সময়ের পরিক্রমায় হাওরের ভূ-প্রাকৃতিক পরিবর্তন কিছু হয়েছে ঠিক, কিন্তু জনসংখ্যা এবং তথাকথিক উন্নয়নের স্রোত বাড়ার কু-প্রভাব পড়তে শুরু হয়েছে হাওরে। অপরিকল্পিত রাস্তা-ঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট পরিকল্পিত ও সমন্বয়হীন নদী খাল খনন, নদী খাল খনন ও বাঁধ নির্মাণে সীমাহীন অনিয়ম দুনীতি কেবল হাওরের অকাল বন্যার কারণই নয় হাওরের অস্তিত্ব বিলীন করতে বসেছে। এভাবে চলতে থাকলে আর বেশিদিন লাগবে না যখন দেশের হাতেগোনা কয়েকটি বড় হাওর ছাড়া বাকিগুলো অস্তিত্বহীন হয়ে পড়বে।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে পাহাড়ে নির্বিচারে গাছ কাটা। এখানেও আছে এক বিশাল জটিলতা। হাওরের পাহাড়ি ঢলের পানি যে পাহাড়গুলো বেয়ে আসে সে পাহাড়গুলোর ৯৯ ভাগই ভারতে পড়েছে। মূলত মেঘালয় সীমান্ত ঘিরে সবগুলো পাহাড় ভারতের ভেতরে। সেখানে গাছ কাটছেন ভারতীয় কাঠ ব্যবসায়ীরা। ভারত সরকারও পাহাড়ি সীমান্তজুড়ে তাদের নগরায়ন জোড়দার করেছে গত কয়েক দশক জুড়ে। পাহাড়ে কাটা গাছ আবার বাংলাদেশে আনেন আমাদেরই কাঠ পাচারকারীরা। কিন্তু বছরের পর বছর জুড়ে পাহাড়ের গাছ কেটে উজাড় করায় সামান্য বৃষ্টিতে পাহাড়ের (ইরোশন) মাটি ক্ষয়ের পরিমাণ এখন সীমা ছাড়িয়ে গেছে। পাহাড় ধোয়া বালি বছরে হাজার হাজার টন বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে এসে ভরাট করছে বাংলাদেশের হাওর নদী।

এই পরিস্থিতির মুখে আরও দুটি অভিজ্ঞতার তুলে ধরে শেষ করতে চাই।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে পানি সম্পদমন্ত্রী ছিলেন রায় রমেশ সেন। সেবারও হাওরে অকাল বন্যায় ফসল তলিয়ে গেলো পরপর তিন বছর। সেবারও অভিযোগের তীর সবচেয়ে বেশি পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন পানি উন্নয়ন বোর্ড পাউবো’র বিরুদ্ধে। রায় রমেশ বাবুকে আমরা কয়েকজন হাওর এলাকার মানুষ ও পরিবেশ কর্মী গিয়ে বললাম- কিছু একটা করেন। সেখানে যান। কৃষকের পাশে দাঁড়ান। বাঁধের টাকা যারা মেরে খাচ্ছে তাদের ধরেন। ভবিষ্যতে যেন এমন না হয় সে ব্যবস্থা নেন। রমেশ বাবু যেন যারপরনাই বিরক্ত হলেন। প্রথমত পউবো’র দুর্নীতির বিষয়টি তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিলেন্। তারপর বললেন, আপনারাতো সব সময় এসব বলেন। বিষয়টা অত গুরুতর না। মন্ত্রী ‘আশ্বাস’ দিলেন তিনি দেখবেন। সেই রমেশ বাবু দেখতে দেখতে তার মন্ত্রিত্বের মেয়াদ ফুরালো, হাওরের মানুষ কোনও সমাধানের মুখ দেখলো না।

এখন আসি এবারের কথায়। হাওরে যেদিন থেকে পানি ঢুকতে শুরু করেছে সেদিন থেকে পানি সম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ সাহেবকে টেলিফোনে চেষ্টা করে যাচ্ছি। এসএমএস করেছি, উনার তথ্য কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। শুধু এক লাইন তার মুখ থেকে শোনার জন্য যে হাওরের মানুষের দুর্যোগ নিয়ে তিনি কী ভাবছেন। একবার ঐসব দূর্গত এলাকা পরিদর্শনে যাবার দরকার মনে করেন কিনা। দুর্ভাগ্য আমার, মন্ত্রীর কণ্ঠ এখনও শুনতে পাইনি। হাওরের মানুষ কি মাননীয় মন্ত্রীর আর তার সেবার দেখা পাবেন কখনও?

আমরা খুদে সাংবাদিক। একাজ করেই পেট চালাই, সংসার বউ বাচ্চার মুখে দু’বেলা ভাত তুলার চেষ্টা করি। হাওরের লাখ লাখ কৃষকের এই দুর্যোগে কি বা করার আছে? দু’কলম লিখা আর ঢাকায় থেকে হাউকাউ করা ছাড়া আর কি বা করতে পারি, যদি কোনও একদিন এই হাউকাউয়ের আওয়াজের কিছুটা নড়েচড়ে রাষ্ট্রযন্ত্র।

শেষ চেষ্টা হিসেবে কথা বলার চেষ্টা করি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) বা আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থাগুলোর সঙ্গে। ইচ্ছে ছিলো তারা অন্তত তাৎক্ষণিক কিছু সহায়তা নিয়ে হাওরের দুর্গত মানুষের জন্য ছুটে যেতে উৎসাহিত হোক। দীর্ঘ দিনের সহযোদ্ধা, পরিবেশ কর্মী বন্ধু বললেন, ভাই-এনজিও আর ডোনার এজেন্সিগুলো হাওরের এই ইস্যুটাকে দুর্যোগ মনে করে না। ছুটে লাভ নেই।

হতাশ হয়ে ভাবি। আসলেও তাই। যার যায় সে বোঝে। সরকার, উজানের মানুষ, আমার দেশের প্রতিবেশী জেলার মানুষইতো আমার কষ্ট বোঝে না। বিদেশিরা বুঝবে? ফসল হারিয়ে, গরু ছাগল ভিটা বেঁচে যখন এনজিওর ঋণ নিয়ে তা শোধ করতে না পেরে দেশেরই কোনও এক শহরে পালিয়ে গিয়ে রেল বা বাসস্ট্যান্ডের বস্তিতে জীবনের শেষ দিনটি গুণবে কৃষক, সেদিনও কেউ বুঝবে না।

আসলে এই সমস্যার কোনও সমাধান আদৌ কি আছে। হাওর জনপদ, জনজীবন, কৃষি, প্রকৃতি হারিয়ে যাওয়াই কি শেষ সমাধান। না হলে আমাদের সরকার এতো উন্নয়নের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করছে, কিন্তু এর চেয়েও কম টাকায় যে সমন্বিত হাওর উন্নয়ন, নদী খনন ও পানি ব্যবস্থাপনা, রাস্তাঘাট নির্মাণ, আবাসন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার প্রকল্প নেওয়া যে সহজ তা কেন নিচ্ছে না। এর পেছনে কি আরও কোনও উদ্দেশ্য আাছে? কেন জীবন, আনন্দ সুখ অহংকারে পানিকে মরণ পানি হিসাবে অভিশাপের বোঝা বলে দিন চলতে হচ্ছে হাওরবাসীর? 

লেখক : সাংবাদিক

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।
print
 

আলোচিত সংবাদ