পানির অপর নাম ‘মরণ’- ১

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৭ আগস্ট ২০১৭ | ২ ভাদ্র ১৪২৪

পানির অপর নাম ‘মরণ’- ১

আতিক রহমান পূর্ণিয়া ৩:১৯ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৯, ২০১৭

print
পানির অপর নাম ‘মরণ’- ১

নিজের চোখে পানি নিয়ে মানুষের ক্ষুদ্র হাহাকারের দুটি ঘটনা মনে পড়ে। একটা খানিক মজার। আর একটা বিভৎস। মনে আছে, তখন ক্লাস সেভেন বা এইটে পড়ি। নানা বাড়িতে বেশ ধুমধামের সঙ্গে, বলতে গেলে বিয়ের আয়োজনে আমাদের দুই ভাইয়ের সুন্নতে খতনার আয়োজন করলেন নানা।

সেই আশির দশকে সেই অজপাড়া গাঁয়ের হাসপাতালে চেতনানাশক ওষুধ যা ছিলো তা আসলে কোনও কাজেরই না। চার হাত-পা চেপে ধরে ডাক্তার আর নানার চেলাপেলারা যা করেছিলেন তার যন্ত্রণা যেমন মনে আছে, তেমনি মনে আছে সেসময় পানি পিপাসায় যে যন্ত্রণা পেয়েছিলাম সে কথাও। এমনকি সুন্নতে খতনার তাণ্ডব আমার উপর শেষ হবার পরও যে পানি পিপাসা ছিলো তাও মেটানো হয়নি। তখন গ্রামে বলা হতো শরীরে কোনও ক্ষত থাকলে পানি কম খেতে হয়। পানি বেশি খেলে ক্ষত শুকায় না। টানা তিনদিনে সামনে শত রকমের হাইফাই খাবার দিলেও সর্বসাকুল্যে এক গ্লাস পানি খেতে দিয়েছিলো কিনা মনে নেই। আজও সেই সময়ের পানি পিপাসার কথা মনে পড়লে গলা শুকিয়ে আসে।

পরের ঘটনাটি সাম্প্রতিক সময়ের। ২০১৩ সালে পেশাগত দায়িত্ব পালনে ছিলাম ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে। দুপুর দিকে হঠাৎ হট্টগোল হৈচৈ। বেশ কয়েকজন আহত নারী-পুরুষ শিশুকে আনা হলো। তাদের মাঝে একজনের অবস্থা বিভৎস। তিনি বাপ্পী। নিউমার্কেট থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক। হাতের কবজির উপর থেকে শুধু হাড়টা বেরিয়ে আছে। তাতে কিছু মাংস ঝুলে আছে। সারা শরীর ঝলসে আছে। কিছুক্ষণ পরপর বমি করছেন আর পানি পানি করে কাতরাচ্ছেন। চোখ দুটি তার শরীর নিংড়ে বেরিয়ে আসছে। পানির জন্য বাপ্পীর আর্তনাদ এখনও কানে বাজে।

এই পানি নিয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে এই দুটি ঘটনা কচলানো পানির জন্য মানুষের কাতরতার ছবি নিয়ে ভূমিকা করা মাত্র। আসি মোদ্দা কথায়। আসলে যে পানির জন্য জীবনের কোনও না কোনও সময় মানুষ এতটা কাতর হয় কোনও এক বিশাল পানির ভাণ্ডার তখন অভিশাপ। বলছিলাম হাওর এলাকার কথা। মূল কথা হলো-এই পানি। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মিঠা পানির আধার বলা হয় হাওরকে। সে হাওর এবার অকালে পানিতে থৈ থৈ। আর অকালে কয়েক লাখ মানুষের জীবনের ছন্দপতনও ঘটিয়েছে এই পানিই।

এই লেখার পেছনে কোনও গবেষণা বা তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণের উদ্দেশ্য নেই। নেই কোনও মুন্সিয়ানা জাহিরের লক্ষ্য। গত প্রায় ২৭ বছর সুনামগঞ্জের হাওর ঘেঁষা মেঘালয় সীমান্ত থেকে ব্রাক্ষণবাড়িয়ার নাসিরনগর, হবিগঞ্জের বিথংগল থেকে কিশোরগঞ্জের বড় হাওর, মৌলভীবাজারের হাকালুকি থেকে সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার বা শনিরহাওর থেকে নেত্রকোণার ডিঙ্গাপুতার এপার ওপার কি শীত কি বর্ষায় ছুটে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা থেকে কিছু সাদা কথা বলাই এই লিখতে বসার উদ্দেশ্য। দিনের এমন কোনো সময় নেই যে সময়ে এইসব হাওরের বুকে পদচারণার সময় হয়নি। ভোর, সকাল বা মধ্য দুপুর। সন্ধ্যা বা গভীর রাত। কনকনে শীতের সকাল বা ভরা বর্ষায় আফাল ঠেলে উত্তাল ঢেউ ছিঁড়ে হাওরের এপার ওপারের স্মৃতি যেকোনও সময় চোখের সামনে ভেসে উঠে আর মন বলে এবার কিছু একটা অন্তত লিখা দরকার।

১. গেল সপ্তাহের ঘটনা। নেত্রকোণার মোহনগঞ্জের দুর্গম প্রত্যন্ত হাওরে  অনুপ দাকে ফোন করেছিলাম। অনুপ দা আমার বাবার দোস্তের ছেলে। দাদা, কেমন আছো? না ভাই, একদম ভালো না।

শুনেছি দাদা, পাহাড়ি ঢলের পানি সব ফসল তলিয়ে দিয়েছে।

সেতো গেছেই রে দাদা। এখন গরু বাছুরগুলা বাঁচাইতে যুদ্ধ করতেছি। এক কাঁচি ধান কাটতে পারে নাই আমাদের গ্রামের মানুষ। এমনকি কাঁচা ধান গাছটিও কাটার সুযোগ দেয় নাই। এক নিমিষে কোথা থাইকা এতো পানি আসলো কেউ বুঝলো না। কাঁচা ধান গাছগুলা কাটতে পারলেও গরু ছাগলরে খাওয়ানো যাইতো। এখন ট্রলার ভরে গরু ছাগল সব উজান দেশে পাঠানো হচ্ছে।

অনুপদা বলে গেলেন, গাঁয়ের মানুষের বছরটা যে কিভাবে যাবে জানি না। বিশ্বাস করবা না। এখন যে পানি তা মনে হয় বর্ষা কাল। আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে এমন পানি থাকে।

২. কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামে কথা হচ্ছিলো সমবয়সী ক্ষুদ্র কৃষক বন্ধু সোয়াবের সঙ্গে। মোবাইল ফোনে তার যে গলা শুনেছি তাতেই রাজ্যের বিরক্তির ছাপ। আর সে বিরক্তির পেছনে চেপে থাকা কষ্টও ফুটে উঠে। সোয়াবের কাছ থেকে জানা হলো- ওই এলাকায় এবার আর কেউ ভালো থাকা তো দূরের কথা তিনবেলা ছেলেমেয়ে নিয়ে খেয়ে বেঁচে থাকার স্বপ্নটাও দেখতে ভয় পাচ্ছেন। হাওর এলাকা ছেড়ে নগরমুখী হওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছেন তারা। সোয়াবের আশপাশের পরিচিতজন এমন কেউ নেই যার একমুঠো ধান এবার গোলায় তুলতে পেরেছে। সবই গেছে আগাম বন্যায়।

গত কিছুদিনের এমন আরও অসংখ্য উদাহরণ দেওয়া যায়। যেমন, সুনামগঞ্জের প্রত্যন্ত সীমান্ত ঘেঁষা হাওর থেকে আমার গৃহপরিচালিকা শাহানার বাবা ফোন দিয়েছেন অন্তত মেয়ের দুই মাসের বেতন অগ্রিম দিতে। তা দিয়ে কিছু একটা ব্যবসা করে দিন চালাবেন। গাঁয়ের পরিচিত বোন শুভ ঢাকায় এসেছে তার ছেলের পড়াশুনা এবার বন্ধ করে দিতে হবে, ঢাকায় যারা যারা পরিচিত আছেন ছেলের জন্য তাদের কাছে চাকরি চাইছেন। ইটনা থেকে তরুণ এডিসন আহমদ ফোন করেই বলেছে- ভাই মার্ডার, ভাই একেবারে মার্ডার। গত ১০ বছরের মধ্যে সাত বছরই ফসল পায়নি কৃষক। এখন কিভাবে চলবে মানুষ, মাথায় ধরে না। ৫ হাজার টাকার একটা চাকরিও মিলে না, তদবির লাগে। কিছু একটা করেন আপনারা সাংবাদিকরা।

কত যে পারিবারিক অনুষ্ঠান বিস্তৃর্ণ হাওরাঞ্চলে এবার অন্তত হাজার হাজার পরিবারে পিছিয়ে যাচ্ছে, কতজনের চিকিৎসা থেমে যাবে- আর বিনোদন বিলাসতো দূরের কথা, সে হিসাব কোনও দিনই হয়তো জানা যাবে না। অভিমানী গৃহিণী সারাটা বছর অপেক্ষায় ছিলো ফসল উঠলে কৃষক তার জন্য এবার একটা নতুন শাড়ি বা রূপার একটা নাক ফুল কিনে আনবে। অভিমানে কৃষাণ কৃষাণীর ঘরে সুখের সুর বাজবে না। ক্ষুধায় কাতর ছোট শিশুর মুখে দু’বেলা ভাতের মাড় তুলে দিতে দিতে মায়ের চোখের পানি মুছবে পুরাতন ছেঁড়া শাড়ির আঁচলে।

লেখক : সাংবাদিক।

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।
print
 
nilsagor ad

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad