আফসোস! তাদের আর্তনাদ কেউ তখন শুনতে পায় না

ঢাকা, বুধবার, ২৩ মে ২০১৮ | ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫

আফসোস! তাদের আর্তনাদ কেউ তখন শুনতে পায় না

রহিম রুমন ১১:০১ অপরাহ্ণ, মে ১০, ২০১৮

print
আফসোস! তাদের আর্তনাদ কেউ তখন শুনতে পায় না

সম্প্রতি দেশের পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল না পেয়ে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঘটনা দিনকে দিন বাড়ছেই। এসএসসি বা এইচএসসিতে খারাপ রেজাল্ট করে অথবা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ না পেয়ে আত্মহত্যার অনেক ঘটনার কথা আমরা শুনেছি। এসএসসির এবারের রেজাল্টের দিনই ৯ জন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবর পাওয়া গেছে, যা শেষ পর্যন্ত ১৯ জনে গিয়ে ঠেকেছে।

সামনে আবার এইচএসসির রেজাল্টের দিন আসছে, কে জানে সেদিনের অপেক্ষায় ক’জন আছেন! বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদে আত্মহত্যার বেশি ঘটনা শোনা যায় এসব পরীক্ষার ঠিক রেজাল্টের দিন থেকে শুরু করে মোটামুটি পাঁচ সাত দিন পর্যন্ত। তারপর অবশ্য খুব একটা শোনা যায় না।

অবস্থা এমন যে গণমাধ্যমকর্মীদের কেউ কেউ এখন পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ হওয়ার আগেই বলে দিতে পারেন আত্মহত্যার খবরগুলো কখন থেকে পাওয়া যাবে। যাই হোক, এর আগে এমন মহামারি আকারে আত্মহত্যার ঘটনা শোনা যেত বড় বড় ফ্লিম স্টাররা মারা গেলে। সেসব ক্ষেত্রে দেখা যেত স্বপ্নের হিরো বা হেরোইনের মৃত্যু মেনে নিতে না পেরে ভক্তকূলের অনেকে আবেগের বসে গোপনে তাদের সাথে যোগ দিত। অথবা কোনো প্রেমিকযুগলের মিলন না হওয়ার বিরহেও অনেকে আত্মহত্যা করত।

দেশের সার্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রেক্ষাপট আর সংবাদমাধ্যমের বদৌলতে প্রায়ই আত্মহত্যার এমন ঘটনা আমাদের শুনতে হয়। তবে পরীক্ষার রেজাল্টের এই সময়টা বাদে তাতে অবশ্য নানা শ্রেণী-পেশার মানুষই থাকে।

আঞ্চলিক পত্রপ্রত্রিকায় সেসব খবর বেশি পাওয়া যায়। স্বামীর নির্যাতনে গৃহবধূর আত্মহত্যা, ঋণের ভার সইতে না পেরে কৃষকের আত্মহত্যাসহ আরও অনেক অনেক শিরোনামের খবর। আত্মহত্যা নামক এই অপমৃত্যুকে স্রেফ আবেগের বসে স্বেচ্ছামৃত্যু ভাবার সুযোগ নেই। কারণ, আত্মহত্যা করতে অনেক সাহস লাগে। যতটা না অন্যকে খুন করতে তার চেয়ে ঢের বেশি নিজের ক্ষেত্রে। সে হিসেবে একজন পুরোদস্তর পাগলেরও ব্যথা পাবার ভয় থাকার কথা, মানে সেও এই পথে যেতে চাইবে না। কে জানে, কি এমন অদৃশ্য চাপ বা কারণ যা আত্মহননকারীর এই পথে ঝাপিয়ে পড়ার সাহস যোগায়।

একজন মানুষের আত্মহত্যার অবশ্যই একটা কারণ থাকে বলেই জানি, নইলে এমন আত্মহুতি তো কেউ দেওয়ার কথা না। অনেক বুদ্ধিমান আত্মহননকারী তো আবার মৃত্যুর কারণগুলোও মেধাবীসূলভ চিরকুটে লিখে যায়। ক’দিন আগেও রাজধানীর উত্তরায় এমন ঘটনা ঘটেছে। মেয়েটা তার বাবাকে দেয়া কথা রাখতে পারেনি তাই সে ভেবেছে তার আর বেঁচে থেকে কাজ নেই! সে তার বাবা-মায়ের জন্য কষ্টে মোড়ানো নীলখামের চিঠি রেখে গেছে যেন তারাও প্রতিদিন মরতে পারে। আত্মহত্যার এই পথে যারা চলে গেছে তারাই কেবল ভালো বলতে পারবে যে, খারাপ রেজাল্টের মত এত ঠুনকো বিষয়ে হতাশ হয়ে অবিবেচকের মত নেয়া তার এই ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্তটা কি ভালো ছিল নাকি খারাপ? হয়তো চিৎকার করে বলতেও চায় কিন্তু আফসোস তখন আর তার কথাগুলো কেউ শুনতে পায় না। বিশ্বাস করি, খুব অল্প ঝাঁকুনিতে এতবড় ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত কেউ নেয় না।

তবে পরীক্ষায় ফেল করে অথবা জিপিএ-৫ না পেয়ে আত্মহত্যা করারও কোনো যৌক্তিকতা খুঁজে পাই না। আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার যে প্রেক্ষাপট তাতে জিপিএ-৫ এর মত রেজাল্টও হাতিঘোড়ার কোনোটাই যে এনে দিতে পারে না তা আমরা জানি। এখানে ভালো রেজাল্ট আর ডিজিটাল জিপিএ-৫ কি এনে দিতে পারছে কারও জীবনের পূর্ণ নিরাপত্তা? অথবা একটা ভালো চাকরির নিশ্চয়তা? সেসব জায়গাও তো দখল করে থাকে কোটা আর মামা-খালুর ভাগ্নেরা। রাস্তায় লক্ষ লক্ষ গোল্ডেন এ প্লাস পাওয়া শিক্ষিত মেধাবীরা তো আন্দোলন করেও তাদের অধিকার পাচ্ছে না। তবে কেন এই নব্য এ প্লাস প্রত্যাশীদের আত্মহত্যাকারীদের মিছিলে যাওয়া? যদি এমন হয় তাদের এই আত্মহত্যা এক ধরনের প্রতিবাদ। তাদের এই আত্মহত্যা শিক্ষা ব্যবস্থার একচোখা নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। যে সমাজের শিক্ষাব্যবস্থায় ফেল করাদের উৎসাহ না দিয়ে হালছেড়ে দেয়া হয় সেই সমাজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। সমাজের অসুস্থ প্রতিযোগিতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। যে শিক্ষা ব্যবস্থায় পরীক্ষার রেজাল্ট খারাপ হওয়ার কারণে কোনো শিক্ষার্থীর হতাশ হয়ে আত্মহত্যার মত ভয়ঙ্কর পথ বেছে নেবার সুযোগ থাকতে অথবা সৃষ্টি হতে পারে সেই শিক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ তবে?

সমাজ বা রাষ্ট্রের দায় আছে বৈকি। চারপাশে অনেক মানুষকে জানি, যারা কয়েকবার পরীক্ষায় ফেল করে হাল ছেড়ে দিয়েছে। ভালো যে এমন ভয়ঙ্কর ভুল সিদ্ধান্ত নেবার মত বোকামি তারা করেনি। সৌভাগ্য এই যে তারা এই হাল ছেড়ে অন্য হাল সঠিকভাবে আকড়ে ধরে বেশ সাফল্যের সাথে উন্নতিও করে যাচ্ছে। আর সেটাই তো হওয়া উচিৎ। আরে ভাই, যারা কোনো দিন লেখাপড়াই করেনি তারাই তো তাহলে ভালো করেছে। যাদের অন্তত শিক্ষা অর্জন করতে গিয়ে হতাশ হয়ে নিজেকে খুন করা লাগেনি। সে হিসেবে তো শিক্ষিত যুবা আত্মহত্যাকারীর চাইতে অশিক্ষিতরাই শিক্ষার পথে না এসে ভালো করেছে। একজন রিক্সাওয়ালা তার শরীরের শ্রম বেচে ভালো আছে মেধা বেচার বাজারে গিয়ে নিজেকে তার হারানো লাগেনি। জানি না এই আত্মহত্যা তাদের কোনো নিরব প্রতিবাদ কিনা? অস্বীকার করার সুযোগ নেই, নির্বোধ ভীতু আর সমাজের অযোগ্যরাই আত্মহত্যা করে। যারা জীবনের কঠিন অংশকে মোকাবেলা করতে ভয় পায় তারাই কেবল এই পথে পা বাড়ায়, তারাই আত্মহত্যা করে।

হয়তো অল্প দিনে আত্মহননকারীর জীবনের স্বপ্নভাণ্ডার ফুরিয়ে যাওয়ায় সে এই ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত নেয়। নয়তো জীবন নিয়ে কেউ যদি অলীক স্বপ্নও কখনো দেখে, সে অন্তত এই ভয়ঙ্কর পথে পা বাড়াবার কথা না। একজন আত্মহননকারী লজ্জা, অভিমান, দুর্বল জ্ঞানচর্চার প্রভাব আর সমাজের ভুল শিক্ষা, ভুল মেসেজ, ভুল সিদ্ধান্তের বলি হয়েও আত্মহত্যা করতে পারে। সমাজের কিছু অজুহাত, ব্যর্থতা আর সুশিক্ষার অভাবও এসব অবুঝ যুবাদের আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেয়। সময় এসেছে বলার আমরা জিপিএ-৫ চাই না, বাঁচতে চাই, বাঁচাতে চাই আগামীর সম্ভাবনা।

পরীক্ষায় রেজাল্ট খারাপ করেও বেঁচে থাক সব বাবা-মা’র আদরের সন্তানেরা। দূর হয়ে যাক শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতা। এবারই যেন শেষবার হয় আত্মহত্যার মিছিলের।

রহিম রুমন
সাবেক শিক্ষার্থী, সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগ, ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়
mrahimrumon@gmail.com

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।
 
.

Best Electronics Products



আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad