কোটা বিরোধীরা উদ্দেশ্যবাজদের খপ্পরে পড়ছে না তো?

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ এপ্রিল ২০১৮ | ১১ বৈশাখ ১৪২৫

কোটা বিরোধীরা উদ্দেশ্যবাজদের খপ্পরে পড়ছে না তো?

এখলাসুর রহমান ৭:৩৮ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ০৯, ২০১৮

print
কোটা বিরোধীরা উদ্দেশ্যবাজদের খপ্পরে পড়ছে না তো?

কোটা সংস্কারের দাবিতে বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। রোববার রাতে আন্দোলনকারীদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। রাজপথের আন্দোলন হবে দিনে, রাতের বেলায় কেন? কোটা সংস্কারের দাবি ন্যায্য।

এ ন্যায্য দাবি আদায়ের সংগ্রামে উদ্দেশ্যবাদীরা নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিলে ইন্ধন জোগাচ্ছে না তো? নইলে এমন একটা যৌক্তিক আন্দোলনে আন্দোলনকারীরা রাতের বেলায় একত্রিত হবে কেন? আর ভিসির বাসভবনে হামলা করবে কেন? ভিসি কি তাদের দাবি মেনে নিতে পারবে? দেশব্যাপী শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কার ও চাকরির বয়স ৩৫-এর দাবিতে আন্দোলনে নেমেছে। এ দাবি অবশ্যই ন্যায্য ও শতভাগ যৌক্তিক। এই ন্যায্য দাবি উদ্দেশ্যবাজদের খপ্পড়ে পড়ে ভুল পথে হাঁটছে না তো? বলা হচ্ছে কোটায় মেধার সুষ্ঠু যাচাই হচ্ছে না। আরও একটি দাবি হলো চাকরির বয়স ৩৫ করতে হবে। পড়াশোনা শেষ করে ৩০ বছর পার হয়ে গেলে কি চাকরি প্রত্যাশী সাধারণ শিক্ষার্থীদের কর্মক্ষমতা হারিয়ে যায় আর কোটাধারীদের কর্মক্ষমতা বহাল থাকে? না হয় তাদের চাকরির বয়স ৩২ কেন? কোটাধারীরা বয়সেও এগিয়ে মূল্যায়নেও এগিয়ে। তাহলে মেধাধারীরা কেন ক্ষুব্ধ হবে না? 

চাকরির বয়স ৩৫ করার দাবিতে শিক্ষার্থীরা রাজপথে অবস্থান, বিক্ষোভ ও অনশন কর্মসূচি পালন করল। সরকারের নীতিনির্ধারকরা কি মূল্যায়ন করল তাদের এ দাবিকে। অথচ যা প্রয়োজন নেই তা করে নিল। ৫টি এলাকার বানান পরিবর্তন করা হলো। এই বানানে দেশের কী ক্ষতি হচ্ছিল ও বদল করাতে কী লাভ হচ্ছে? মন্ত্রিসভার বৈঠকে ৫টি এলাকার নামের বানান বদলে দেয়া হলো। কিন্তু দেশজুড়ে শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনটা কি মন্ত্রিসভার এজেন্ডা হতে পারতো না? বাইরের দেশগুলোর খবর নিলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে চাকরির বয়স ৫৯, কানাডায় ৫৯, সুইডেনে ৪৭, ভারতে ৪০, শ্রীলঙ্কায় ৪৫, ইন্দোনেশিয়ায় ৪৫, কাতারে ৩৫, নরওয়েতে ৩৫, ইতালিতে ৩৫, এঙ্গোলায় ৪৫, ফ্রান্সে ৪০ ও তাইওয়ানে ৩৫। ৪ কোটি ৮০ লাখ বেকারের দেশ এই বাংলাদেশ। এরা রাজপথে উঠলে পরিস্থিতি কি হতে পারে ভাবা যায়? অগুরুত্বপূর্ণ বিষয় মন্ত্রিসভার বৈঠকের এজেন্ডা হতে পারছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কেন হতে পারছে না?

রাতের বেলায় ভিসির ভবন ভাঙচুর, লুটপাট, হামলা এগুলো কিসের ইঙ্গিত। রাজনৈতিক দলগুলোতে কাউয়া ঢোকার মতো কি তবে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনেও কাউয়া ঢুকেছে? কাউয়ারা কি নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য শিক্ষার্থীদের ন্যায্য আন্দোলনে অন্যায্য প্রক্রিয়া আমদানি করছে। রাতের বেলায় সামরিক ক্যু হয়। চুরি, ডাকাতি,  ধর্ষণ কিংবা ব্যাভিচারমূলক অপকর্মগুলোও রাতে হয়ে থাকে। জনসভা, সভা, সেমিনার, বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও অনশন কি কেউ রাতে করে? রাতে ধর্মসভা হলেও তো লাইট জ্বালিয়ে দিনের চেয়ে বেশি আলোকসজ্জা করা হয়। কোটা সংস্কারের ন্যায্য দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে তারা কেন রাতে ভিসির ভবন ভাঙচুর করল? পহেলা বৈশাখের শিল্পকর্ম ভাঙচুর করল চারুকলায় ঢুকে? 

বাহাত্তরের সংবিধানে কাঁচি চালানো হলো কয়েকবার। এসব সংবিধান সংস্কার কেন? এই সংস্কারের কি কেউ দাবি করেছিল? যে ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙারি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে দেশ স্বাধীন হলো নিজ নিজ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য তাও বাদ দেয়া হয়েছে। সংবিধান সংস্কার হয়ে সংবিধানে জায়গা করে নিল রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। সরকার যদি নিজেদের প্রয়োজনে সংবিধান সংস্কার করতে পারে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনে কেন কোটা সংস্কার করতে পারছে না? আগেকার প্রাচীন যুগে ও মধ্যযুগে রাজার ছেলে রাজা হত। কিন্তু তখনও কবির ছেলে কবি হতো না, দার্শনিকের ছেলে দার্শনিক হতো না, বিজ্ঞানীর ছেলে বিজ্ঞানী হতো না। পণ্ডিতের ছেলে পণ্ডিত হতো না। সৎ-এর ছেলে সৎ হতো না। জ্ঞানীর ছেলে জ্ঞানী হতো না। মেধা, আদর্শ ও চেতনা কোথাও কখনও উত্তরাধিকার সূত্রে হয়নি। রাজাকারের পুত্রকেও মুক্তিযোদ্ধা হতে দেখা যায়। আবার মুক্তিযোদ্ধার পুত্রকেও রাজাকার হতে দেখা যায়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষীয় ব্যক্তির পারিবারিক আপনজনকেও দেখা গেছে একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধা কর্তৃক খুন হতে। অভিযোগ  স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান। জয়বাংলা না বলে পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলায় মুক্তিযোদ্ধা ছেলে কর্তৃক বাবা হত্যার ঘটনাও ঘটেছে একাত্তরে। তাহলে চেতনার উত্তরাধিকার রইলো কোথায়?

কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন করছে শিক্ষার্থীরা। শিক্ষামন্ত্রী কি এ বিষয়টা মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করতে পারতেন না? পুলিশের গুলিতে একজন শিক্ষার্থী মারা গেছে এই গুজব ছড়ালো শিক্ষামন্ত্রীর জামাতা ইমরান এইচ সরকার। জামাতার এই গুজব ছড়ানোর কী মূল্যায়ন করবেন মন্ত্রী? কেন এই উত্তাল সময়ে গভীর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের বাইরে বেরুনোর পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হলো? পরদিন ডাকা হলো দেশজুড়ে ধর্মঘট। সরকারের শেষ সময়ে এবং পহেলা বৈশাখের আগে আগে এই উত্তপ্ত সময়ের সুফল কি শিক্ষার্থীরা নেবে নাকি অন্য কেউ? শিক্ষার্থীদের দাবি তাদের বিষয়টা সংসদে তুলে ধরার। চলতি সংসদে কি এটা আলোচনায় আনছেন কোনো সাংসদ?

শিক্ষার্থীদের উপর পুলিশি হামলা ও গুলিতে একজন মারা যাবার ভুয়া খবর প্রচার করার পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্যবাজ অপশক্তি নেই তো? অতীতে দেখা গেছে উদ্দেশ্যবাজদের অপতৎপরতায় অনেক গণমুখী উদ্যোগ ভেস্তে গেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ও যুদ্ধাপরাধী রাজাকারদের বিচারের দাবিতে যে গণজাগরণ মঞ্চ দেশব্যাপী ছড়িয়ে গিয়েছিল। অনেক গান ও কবিতা লেখা হলো শাহবাগকে নিয়ে। শাহবাগ হয়ে উঠেছিল চেতনার উৎসমূল। সেই গণজাগরণ মঞ্চও তছনছ হয়ে গেল তাদের নিজেদের দ্বন্দ্বের কারণে। একসময় তারা বিভক্ত হয়ে সংঘাতে জড়িয়ে যায়। সেই শাহবাগেই এবার শিক্ষার্থীরা রাতে উঠল কেন? তারা তো দিনের বেলায় সংসদ ভবনের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করতে পারতো। তা না করে গভীর রাতে কেন এই বিক্ষোভ? তাদের এই ন্যায্য দাবি উদ্দেশ্যবাজদের খপ্পড়ে পড়েনি তো? 

এখলাসুর রহমান

লেখক ও কলামিস্ট

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।
 
.




আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad