বারেক সাহেবের কুতুপালং যাত্রা

ঢাকা, সোমবার, ২০ আগস্ট ২০১৮ | ৫ ভাদ্র ১৪২৫

বারেক সাহেবের কুতুপালং যাত্রা

ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল) ১:৫৯ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ০৫, ২০১৮

বারেক সাহেবের কুতুপালং যাত্রা

এবারের কক্সবাজার সফরে আগ্রহটা ছিল একটু অন্যরকম। টিভিতে-পত্রিকায় সব খানে রোহিঙ্গা ইস্যুতে সরকারের গুণকীর্তনে চোখ-কান ঝালা-পালা বারেক সাহেবের। রোহিঙ্গাদের জন্য সরকার অমুকটা করছেনতো উড়ে আসছেন তমুক দেশের রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান। মুখে ফোটাচ্ছেন সরকারের প্রশংসার খৈই আর সাথে দিয়ে যাচ্ছেন লম্বা যত সার্টিফিকেট।

আজ উড়ে আসছেন রানী তো কাল আসছেন প্রধানমন্ত্রী-মন্ত্রী। আসছেন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধানরাও। এমনকি বাদ যাচ্ছেন না তাদের স্ত্রীরা। এসব দেখে শুনে বারেক সাহেবের শখ একটু সরজমিনে দেখে আসাবেন আসলে ঘটনাটা কি?

গুলশানে আর নয়াপল্টনে তো ভিন্ন গুঞ্জন। কোনটা ধরবেন আর কোনটা উড়য়ে দিবেন বুঝে উঠতে পারেন না বারেক সাহেব। তাই বন্ধু মামুন তার এনজিও-র সাথে কুতুপালং ঘুরে আসার প্রস্তাবটা দিতেই সেটা লুফে নিতে দেরি করেননি বারেক সাহেব। একটু যে ভয় ভয় লাগেনি তাও নয়। রোহিঙ্গা এলাকাগুলোতে সরকারি প্রশাসনের নজরদারির খুব বাড়াবাড়ি। দেশিতো বটেই এমনকি কয়েকটা বিদেশি এনজিও-কেও ঘাড় ধরে বের করে দিয়েছে সরকার।

দেশ ছাড়া করা হয়েছে এমনকি আন্তর্জাতিক সংস্থার ভিন দেশি বড় কর্তাকেও। অভিযোগ খুব সাধারণ- মৌলবাদী দর্শনের প্রসার আর সরকারের অবাধ্যতা। ভাবা যায়?

আসলেই ভাবা যায় না। এত সামান্য বিষয়কে এত বড় করে দেখার কি আছে মাথায় ঢোকে না বারেক সাহেবের। তাদের সময়তো ঢাকায় একটা বন্ধু রাষ্ট্রের বাণিজ্যিক মিশন খুলতে দেওয়ার অপরাধে অন্য বন্ধুর চাপে চাকুরি গিয়েছিল সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রীর। দেশটার হচ্ছেটা কি?

কক্সবাজার থেকে মেরিন ড্রাইভ ধরে কুতুপালং যেতে যেতে কোথায় যেন হারিয়ে যান বারেক সাহেব। অপার্থিব সৌন্দর্য- এক পাশে বঙ্গোপসাগরের বিশাল বিস্তার, আরেক পাশে সবুজে ঢাকা পাহাড় আর মাঝখানে দাঁত বের করে যেন হাসছে শেখ হাসিনা সরকারের আরেক কীর্তি এই মেরিন ড্রাইভ। কেন যেন কবিতা লিখতে ইচ্ছে করছে বারেক সাহেবের!

মেরিন ড্রাইভ থেকে নেমে বায়ে কুতুপালংয়ের রাস্তা ধরতেই চিন্তায় ছেদ পড়ে বারেক সাহেবের। বুকটা একটু দুরু-দুরু, তাকে চিনে ঘাড় ধরে যদি বের করে দেয় প্রশাসনের লোকজন। আদতে অবশ্য সেরকম কিছুই ঘটল না।

নির্বিঘ্নেই কুতুপালং ক্যাম্পে ঢুকে পড়লো বন্ধু মামুনের এনজিও-র গাড়ি বহর। সোজা গিয়ে থামলো ক্যাম্পের বাজারে চৌরাস্তায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ক্যাম্পটার সামনে। রোগীদের লম্বা লাইন সেখানে। ক্যাম্পে বসে নির্বিকারে প্রেসক্রিপশন আর ওষুধ বিলি করে চলছে একদল ডাক্তার আর মেডিকেল এসিটেন্ট। চার পাশে হাজার হাজার ঘরবাড়ি আর লাখ লাখ মানুষ। জমজমাট বাজার- পাওয়া যাচ্ছে কি-ই না? শীতের জ্যাকেট, ঘড়ি, টর্চলাইট, চানাচুর আর শুটকি, আছে সব কিছুই।

চারিদিকে কেমন যেন উৎসব উৎসব ভাব। পাহাড়ের পর পাহাড় সবাম করে আর মাইলের পর মাইল জঙ্গল উজার করে বসেছে এই বিশাল বসতি। মনে মনে একটু খুশি হন বারেক সাহেব। ভালোই বারোটা বাজছে পরিবেশের। পারলে ঠেলা সামলাক সরকার।

ফুরফুরে মেজাজে বেনসনটা ঠোটে ঝুলিয়ে সুখটানটা দিতেই কানে বাজে অচেনা ভাষায় সুর করে কোরাসের শব্দ। পাশেই একটা বড় ঘর। সেখান থেকেই আসছে এই কোরাস। আগ্রহী হয়ে ভিতরে উকি দিতেই চক্ষু চড়কগাছ বারেক সাহেবের। রোহিঙ্গা শিশুদের একটা স্কুল এটি। সুর করে নিজ ভাষায় মিয়ানমারের জাতীয় সঙ্গীত গাইছে রোহিঙ্গা শিশুরা। অচেনা প্রবাসে নিজ জাতি, জাতিস্বত্তা আর মাতৃভূমি সম্বন্ধে রোহিঙ্গাদের পরের প্রজন্মকে সচেতন করে তোলার অন্যন্য প্রয়াস বাংলাদেশ সরকারের। থত মত খেয়ে যান বারেক সাহেব। কখন যে ঠোট থেকে বেনসনটা খসে পড়েছে খেয়াল করতে পারেন না। সরকারের এমন দুরদৃষ্টির প্রশংসা না করে পারেন না মনে মনে।

মনে পড়ে একাত্তর সালের কথা। বাবার হাত ধরে ত্রিপুরার মেলাঘরের শরণার্থী শিবিরে মাস খানেক কাটিয়ে ছিলেন কিশোর বারেক সাহেব। মনে আছে অনেক স্মৃতিই।

নয়াপল্টনে বসে যতই ভারত বিদ্বেষের বুলি আউড়ান না কেন, মনে মনে তিনি কৃতজ্ঞ একজন ইন্দিরা গান্ধির প্রতি। মহিলা একদিকে সামাল দিয়েছেন এক কোটিরও বেশি বাঙালি শরণার্থীকে, আর অন্যদিকে বাংলাদেশের জন্য সমর্থন খুঁজতে ছুটে বেড়িয়েছেন পৃথিবীর এক মাথা থেকে অন্য মাথা। মহিলা যে শুধু পৃথিবীর বৃহত্তম শরণার্থী সমস্যাই সামাল দিয়েছেন তাই নয়, পাশাপাশি একাত্তরের নয়টি মাস অস্ত্রে সজ্জিত করেছেন বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের। তিনি তার দেশের সংখ্যালঘু মুসলমানের সংখ্যা রাতারাতি দশ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়ার ঝুঁকি নিয়েছেন, পাশাপাশি ঝুঁকি নিয়েছেন নিজ সীমান্তে নয়টি মাস যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ারও। অথচ নিজ ঘরে তখন তিনি জর্জরিত ছিলেন নকশালবাদী আন্দলোন নিয়ে।

মাঝে মাঝে নয়াপল্টনের অফিসের আড্ডায় বসে অনেক কথার ফাঁকে এসব কথা এর আগেও ভেবেছেন তিনি, তবে মুখে আনেননি কখনই।

বারেক সাহেবের মনে হঠাৎ কেন যেন উঁকি দেয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামটাও। মনে করতে চান না, তবুও মনে পড়ছে কেন যেন। আচ্ছা আজকে যে রোহিঙ্গা শিশুরা এখানে কোরাসে জাতীয় সঙ্গীত গাইছে, আজ থেকে ৪৭ বছর পর এরা আরাকানে বসে জখন কুতুপালংয়ের স্মৃতি আউড়াবে তখন তারা কিভাবে মূল্যায়ন করবে এই দিনগুলোকে। বারেক সাহেবের কেন যেন মনে হয় এই শিশুদের স্মৃতিগুলো তার স্মৃতির চেয়ে অনেক মধুর হবে। ক্যাম্পের জীবন জীবন নয় সত্যি, কিন্তু এর চেয়ে ভাল ক্যাম্পের জীবনের অভিজ্ঞতা বোধ করি পৃথিবীতে কোন শরণার্থীর স্মৃতিতে নেই। বলিহারি দিতে হয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। পৃথিবীর দীর্ঘস্থায়ীতম শরণার্থী সমস্যাটি মহিলা কি অদ্ভুত দক্ষতায়ই না সামাল দিলেন!

‘কুতুপালংয়ে না আসাটাই বোধহয় ভালো ছিল’- সগোতোক্তি করেন বারেক সাহেব। না জেনে মিথ্যা বলা সোজা, কিন্তু জেনে বলাটা কঠিন। ঢাকায় ফিরে গুলশানে গুলতালি মারা আর নিজ বৈঠকখানায় বৈঠকি আড্ডা গরম করাটা এখন আরেকটু যে কঠিন হবে!

লেখক: বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।