পাহাড় ধসের কারণ ও প্রতিকার

পুষ্প মোহন চাকমা / ২:৪২ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৩,২০১৭

প্রকৃতিতে বিস্ময়কর পরিবর্তন ঘটে চলছে। প্রাণি জগতের অস্তিত্ব টিকে থাকা হুমকি ও চ্যালেঞ্জিং। তাপমাত্রা এখন শরীরের অসহ্য মাত্রায়। ক্রমাগত বৃষ্টি-বর্ষণেও তাপমাত্রার কমতি নেই। ছড়া-ছড়ি ও ঝিড়িতে কেবল বর্ষা মৌসুম ছাড়া পানির অস্তিত্ব মিলছে না। প্রকৃতির এরই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের জুন মাসে একটি বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত ইতিহাসের পাতায় আশ্রয় নিল। সারা পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা পাহাড়ে দেখা দিল ভয়াবহ পাহাড় ধস। এতে চলে গেল অগণিত মানুষের প্রাণ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাস্তা-ঘাট ঘর-বাড়ি ব্রিজ-কালভার্ট স্কুল ও শিক্ষা উপকরণ সামাজিক প্রতিষ্ঠান, ফসল, ফলদ বাগান, আবাদি জমি, গৃহপালিত প্রাণি ইত্যাদি অগণিত সম্পদের।

এখন যাওয়া যাক ভবিষ্যতের দিকে। প্রকৃতির এ দশা ও অবনতি কেন? কি কারণে এমন হতে চলছে? আর এমন পরিণতি ঘটে থাকলে মানুষ ভবিষ্যতে কিভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখবে। সুতরাং বেঁচে থাকতে হলে এর উত্তরণ ও প্রতিকার কি হতে পারে এখন এ নিয়ে গবেষণা এবং পদক্ষেপ নেওয়াটাই হচ্ছে আমাদের সকলের জন্য জরুরী। যদিও বিভিন্ন গণমাধ্যমে আমরা দেখেছি পাহাড় ধস নিয়ে অনেকে নানা মন্তব্য করেছেন। কেউ বলেছেন জুমচাষ করার জন্য এমন ক্ষতি হচ্ছে, আবার কেউবা বলেন, অতিরিক্ত গাছ-গাছালি নিধন করার কারণে এমন হচ্ছে। কেউ বলেন পাহাড় কাটা এবং বজ্রপাতের কারণে এমন ভূমি ধস হয়েছে। আসলে সবার ধ্যান-ধারণা অমূলক নয়। যদিও পুরোটাই এসবের কারণে নাও হতে পারে তবে অনেকাংশে হলেও ওই কারণগুলোই দায়ী। 

যাই হোক না কেন, পাহাড় ধসের এসবই উপযুক্ত কারণ অথবা এসবের কোনো ভিত্তিতেই নয়, তথাপি সম্প্রতি পাহাড় ধস নিয়ে আমাদের প্রত্যেকেরই নিজের অভিজ্ঞতা থেকে মতামত দেওয়া দরকার। কেননা, এ বিষয়ে আমাদের গবেষণা চালাতে হবে। সংগত কারণেই আমি আমার জন্মলগ্ন বা শিশুকাল থেকে পাহাড়ে বসবাস ও পাহাড়ের মাটি পানি নিয়ে বেড়ে ওঠা তথা শিক্ষা, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা থেকে ভিন্ন আরও কিছু অভিজ্ঞতা যোগ করতে চাই। 

গাছপালা নিধন, পাহাড় কাটা এবং পদ্ধতিহীন জুমচাষ অবশ্যই প্রকৃতির বিরোধাত্মক। বিশেষ করে পাহাড় কাটা আর গাছপালা নিধন এবং বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ নিধন ইহার কারণ। জুমচাষ আর বজ্রপাত ইহার মূল কারণ না হলেও তবে এ দু’টিরও আংশিক কারণ আছে। আংশিক কারণ এ কারণে বলব, জুমচাষ একটি সনাতন চাষ পদ্ধতি। এটি আবহমান কাল হতে চলে আসছে। এর কারণে যদি পাহাড় ধস হতো তাহলে সে অনেক কাল আগেও এমন হতে পারত। যেহেতু ভারী বর্ষণ, অতি বর্ষণ, নিবিড় বর্ষণ এর আগে অর্থাৎ গত জুনের পাহাড় ধসের চেয়েও অনেক বেশি মাত্রায় দেখা গেছে। কিন্তু তখনও এমন হয়নি। এছাড়া বর্তমানে পাহাড়ে যেসব জায়গায় বড় বড় এবং দীর্ঘ সময় ধরে একই বার জুমচাষ করতে দেখা গেছে সেখানে কিন্তু এ দুর্যোগ হতে দেখা যায়নি। অপরদিকে বজ্রপাতও আগের তুলনায় এ বছর তেমন কি হয়েছে? এর আগে এরচেয়ে অনেক বেশি এবং দীর্ঘ সময় ধরে বজ্রপাতের অবস্থা দেখা গেছে। কিন্তু তখন তো এমন ঘটেনি। 

ভূমি ধস রক্ষায় আমরা শুধু গাছ লাগাতে এবং গাছ নিধন না করতে পরামর্শ দিয়ে থাকি। আসলে গাছ মাটি রক্ষা করে ঠিক কিন্তু পুরোপুরি রক্ষা করা বা ধরে রাখার ক্ষমতা গাছের নেই। গাছ এবং মাটি একে অপরকে ধরে রাখে। গাছের দ্বারা মাটি এবং মাটি দ্বারা গাছ ধারণ করে। কিন্তু যখন মাটি কোনোভাবে ধসে যেতে থাকে তখন গাছ আর খাড়া থাকতে পারে না। এ কারণে অনেক গাছ উপরে পড়তে আমরা দেখি। তাছাড়া মাটি ভেদ করে গাছের শেকড় মাটিতে প্রবেশ করে। ফলে গাছের শেকড়ের সরণীর মাটি ফেটে ওঠে মাটি লুজ হয়ে যায়। মাটির লাসা বা আঠালো প্রকৃতি আর থাকে না। ফলে মাটির অস্তিত্ব ও জীবন একেবারেই নাশ হয়ে যায়। তবে গাছের মাটি ধরে রাখার পুরো ক্ষমতা না থাকলেও শীতল আবহাওয়া প্রদান বা তাপমাত্রার ভারসাম্য রক্ষা করা এবং অক্সিজেন প্রদানের ভূমিকা গাছই অধিকাংশ বহন করে। 

মাটির জীবন রক্ষা করে মূলতঃ শন, বাঁশ, কেচ্যে, ঝাড়ুফুল গাছ আর বিভিন্ন প্রজাতির লতা। এই শন, বাঁশ, ঝাড়ুফুল গাছ আর কেচোবনে কোনো মাটি ধস হতে দেখা যায়নি পূর্বে। হয়তো বর্তমান সময়ে বাঁশবনে মাটি ধস দেখা দিতে পারে কারণ এখন নিবিড় বাঁশবন কোথাও নেই। তাছাড়া বছর খনেক আগে বাঁশে ফুল ও ফল হওয়ায় পরিণত বাঁশবন সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে অনেকে বীজ হতে নতুন বাঁশ বাগান সৃজন করেছেন। তাই সে বাগান এখনও পরিপক্ব নয়। 

বাঁশের মাটি ধরে রাখার দু’টি দিক রয়েছে। একটি হলো বাঁশের মূল অপরটি হলো মূলে থাকা শক্ত ধরণের ছোট ছোট কেশ বা শিখর। বাঁশের এ মূল মাটির নিচে শাখা প্রশাখা হয়ে নতুন বাঁশ গজায় বা প্রজন্ম সৃষ্টি করে। এভাবে পুরো বাঁশ বাগানের মাটির অভ্যন্তরে মূলের একটি বৃহৎ সম্পর্ক ও নেটওয়ার্ক তৈরি হয়। আর মূল হতে শক্ত ধরনের কেশ বা ছোট ছোট শেকড় একে অপরের সাথে জালের মত সম্পর্ক গড়ে ওঠায় মাটি একেবারে শক্ত হয়ে যায়। যা মাটি ধসে যাওয়ার কোনও সুযোগ থাকে না আর। সুতরাং মাটি বা পাহাড় ধস রক্ষায় বাঁশ বাগানের কোনো বিকল্প নেই। 

কেচ্যে ও ঝাড়ুফূল গাছ এ দু’টি প্রজাতির উদ্ভিদ প্রায় একই গোত্রীয়ের। কেচ্যে’র পাতা মসৃণ আর ঝাড়ুফুল গাছের পাতা খুবই ধারালো। এ দু’টি উদ্ভিদও মাটি রক্ষায় অনেক ভূমিকা রাখে। এদের শেকড় ঘন ও জালিয়াতিযুক্ত ফলে এরাও মাটি মজবুত করে ধরে রাখে। যার কারণে মাটি ধস হওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না। বর্তমানে ঝাড়ুফুল উদ্ভিদ থাকলেও কেচ্যে প্রজাতির উদ্ভিদ এখন বিলুপ্ত প্রায়। পূর্বে যেখানে বাঁশ বন নেই সেখানে সমস্তই ছিল কেচ্যে বন। কিন্তু তা এখন আর চোখে পড়ে না। 

শন বসত বাড়ির চাল নির্মাণে খুবই প্রসিদ্ধ। শন দিয়ে চাল নির্মাণ করা হলে ঘর খুবই ঠাণ্ডা থাকে। বর্তমানে এ শনের চালঘর আর নজরে পড়ে না। প্রাকৃতিক এ শন মাটি রক্ষায় অধিকাংশ ভূমিকা রাখে। কারণ শন ঘন প্রজাতির একটি উদ্ভিদ। এ উদ্ভিদের শেকড় সারা মাটিতে ছড়িয়ে পড়ে মাটির নিচে জাল তৈরি করে। একটি দালানে রত যেমন কাজ করে মাটিতে ঠিক তেমনই কাজ করে শনের শেকড়। যারফলে মাটি হয়ে ওঠে শক্ত ও মজবুত। শনের বাগানের মাটি এত শক্ত যে, কোদাল দিয়ে কাটলেও কোদাল মাটিতে তেমন পুতে না। এ শন এক সময় পাহাড়ের সমস্ত বুক জুড়ে ছিল। শুধুমাত্র নিবিড় বাঁশবন ছাড়া সকল স্থানে এ শন জন্মাতে দেখা যায়। যার কারণে ইতিপূর্বে কোথাও কোন এ ধরনের বর্ষায়ও মাটি ধসের অবস্থা দেখা যায়নি। 

এসব প্রাকৃতিক সম্পদগুলি বিলুপ্তির পেছনে আমরা নিজেরাই দায়ী। যেমন বর্তমানে চাষাবাদে আগাছা নাশক যে রাসায়নিক শক্তি বা পদার্থ ব্যবহার করা হচ্ছে সেটি আরও অধিক ভয়াবহ। সেটি লতা-গুল্মসহ বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদকে আরও বিলুপ্ত করে দিচ্ছে।পাশাপাশি সকল প্রকার কীটপতঙ্গ ও সরীসৃপ জাতীয় প্রাণি জাতকেও নির্মূল করে দিচ্ছে এবং এ এসিড পানিতে গিয়ে পানিও বিষাক্ত করে তুলছে। ফলে পানিবাসী প্রাণি যেমন মাছ কাকরা চিংড়ি শামুকসহ বহু প্রাণির প্রজন্ম কমে যাচ্ছে। আর এ কারণেই বোধহয় মাছের স্বাদ এখন আগের তুলনায় কম। প্রকৃতি রক্ষা করতে হলে এসব পদার্থকে ব্যবহার প্রশাসনিকভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে আগে। 

মাটির উপরিভাগে সাধারণতঃ কয়েকটি স্তর থাকে। তার মধ্যে সবচেয়ে উপরি অংশ বা স্তর অনেকটা চামড়ার মত একটি আবরণ। এটাকে মাটির চামড়াও বলা যেতে পারে। মাটির এ অংশটি ১ থেকে দেড় ফুট চওড়া বা গভীর হতে পারে। মাটির এ চামড়ার অংশটাকে রক্ষ করতে না পারলে মাটির অস্থিত্ব আর থাকে না। কারণ মাটির এ চামড়ার নিচের অংশ অর্থাৎ গর্ভস্তর খুবই নরম এবং ঝরঝরে। যেখানে পানি ঢুকতে পারলে সম্পূর্ণ মাটি দালান নির্মাণের মসলার মত তরল হয়ে যায়। আর এ মসলা জাতীয় তরল মাটি তখন বসে থাকতে পারে না।সেটা ধ্বসে যেতে বাধ্য হয় সেই মসলার মত তরল হয়ে। 

এখন কথা হলো আমাদের মাটির চামড়ার অস্থিত্ব আর নেই। মাটির চামড়াকে শক্ত করে ধরে রাখার অনেক উদ্ভিদ আমরা ধংস করে ফেলেছি। যেগুলোর অস্থিত্ব এখন আর পাওয়া যাচ্ছে না। এখন মাটির চামড়া কিছুটা শক্ত থাকলেও দীর্ঘ সময় নিবিড় বৃষ্টি বর্ষণে এ চামড়া ভেদ করে নিম্নস্তরের বা গর্ভস্তরের নরম মাটিতে পানি প্রবেশ করতে পারে। ফলে মাটি সম্পূর্ণ মসলা ও তরল হয়ে যায়। তখন আর মাটির ধারণ ক্ষমতা থাকে না। তাই ধসে যেতে বাধ্য হয়।প্রবল বর্ষণে কিন্তু পানি দ্রুত নিষ্কাশন হয়ে যায়। পানি ডাঙায় বা মাটি চামড়ায় থেমে থাকতে পারে না। অপরদিকে প্রবল বর্ষণ দীর্ঘস্থায়ীও হয় না।সেটি হয় এক ফসলা কিন্তু দীর্ঘক্ষণ ধরে নিবিড় ঝরে দ্রুত পানি নিষ্কাশন হতে পারে না।ফলে মাটি ধীরে ধীরে পানি শোষন করে নেয়।বিগত দুর্যোগপূর্ণ জুন মাসের বৃষ্টিকে আমরা সবাই প্রবল বর্ষণ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলাম।আদপে তা প্রবল বৃষ্টি ছিলনা। সেটি ছিল একই ধারায় দীর্ঘ সময়ের নিবিড় বৃষ্টি।যার ফলশ্রতিতে মাটি তার চামড়া ভেদ করে অভ্যন্তরে পানি শোষণ করতে পরেছে এবং চামড়ার নিম্নস্তরের নরম মাটি তখন মসলাযুক্ত ও তরলে পরিণত হতে পেরেছে।এমতাবস্থায় মাটি আর নিম্নস্তরের তরল ডায়রিয়া (মসলাযুক্ত মাটি) কে তার চামড়া দ্বারা আবৃত রাখতে পারে নি।যার পরিণাম হলো ভূমি ধ্বস!

অপর পক্ষে পাহাড় কাটলে ভূমি ধ্বসের কারণ হলো মাটি কাটলে তার আবরণী চামড়া কাটা যায়।যারফলে মাটি ইচ্ছেমত পানি চুষে নেয় বা ঝরঝরে নরম মাটিতে ইচ্ছেমত পানি প্রবেশ করতে পারে।তাই পাহাড় কাটায় ভূমি ধ্বস অবধারিত। 

সুতরাং ভূমি ধ্বস রক্ষায় আমাদের মাটির অস্থিত্ব তথা চামড়ার আবরণীকে রক্ষা করতে হবে।এ ক্ষেত্রে যেসব উদ্ভিদসমূহ ভূমিকা রক্ষা করে সে সব উদ্ভিদগুলোর সংরক্ষণ, প্রজন্ম সৃষ্টি ও বাড়াতে হবে।তার মধ্যে শন ও বাঁশ অগ্রগণ্য।এর পাশাপাশি কেচ্যে ও ঝাড়ুফুল গাছ ইত্যাদি সংরক্ষণে আমাদের সচেষ্ট থাকতে হবে।তবে পূর্বে আর একটি বিষয় সামাজিক ও প্রশাসনিকভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। সেটা হলো আগাছা নাশক এসিড বা পদার্থ। যেটি বর্তমানে কৃষকদের সাড়া জাগিয়েছে এবং যা ছাড়া কোন কৃষক চাষ করছে না।তা বাজার থেকে বিলুপ্ত করতে হবে।প্রশাসনিকভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে।তা না হলে অদূর ভবিষ্যতে ভূ-পৃষ্ঠে আর কোন উদ্ভিদই থাকবে না এবং জন্মাতে পারবে না।তখনকার মানুষের দুর্গতি ও পরিস্থিতি কিরূপ হতে পারে সেটা বলাই বাহুল্য।আর ভবিষ্যতে এবারের চেয়ে আরও অধিক ভয়াবহ দুর্যোগের সম্মুখীন হতে হবে। 

অতএব মানব সভ্যতার কল্যাণে সময়ের কাজ যথা সময়ে সম্পাদন হিসেবে এখনই এ আগাছা নাশক এসিড বা পদার্থকে বাজারে বিক্রয় এবং এর ব্যবহার প্রশাসনিকভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হোক!পাশাপাশি প্রকৃতি সংরক্ষণে সবাইকে এগিয়ে আসার পদক্ষেপ নেয়া হোক।

প্রধান সম্পাদক : মোঃ আহসান হাবীব

Poriborton
Bashati Horizon, Apartment # 9-A, House # 21, Road # 17,Banani, Dhaka 1213 BD
Phone: +88 029821191, +88 01779284699
Website: http://www.poriborton.com
Email: report@poriborton.com
            editor@poriborton.com