ইঞ্জিনিয়ারিং আর সূক্ষ্ণ কারচুপির দোহাই

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৭ আগস্ট ২০১৭ | ২ ভাদ্র ১৪২৪

ইঞ্জিনিয়ারিং আর সূক্ষ্ণ কারচুপির দোহাই

মঞ্জুরুল আলম পান্না ১:৩৩ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২৪, ২০১৬

print
ইঞ্জিনিয়ারিং আর সূক্ষ্ণ কারচুপির দোহাই

অনেক শঙ্কা, অনেক উদ্বেগ, অনেক জল্পনা-কল্পনা, অনেক হিসেব নিকেশ, অনেক সমীকরন। অবশেষে শান্তিপূর্ণ পরিসমাপ্তি। আসছে ২৮ ডিসেম্বরের দেশব্যাপী জেলা পরিষদ নির্বাচনের চেয়ে সারাদেশের মানুষের চোখ আটকে ছিলো নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের দিকে। খোদ সরকারের জন্য এই নির্বাচন ছিলো অ্যাসিড টেস্ট।

একদিকে নারায়নগঞ্জের স্থানীয় রাজনীতির হিসাব, অন্যদিকে জাতীয় রাজনীতির প্রভাব। এ কথা সত্য নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের স্থানীয় রাজনীতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষন করেছে যতোটা না সেলিনা হায়াৎ আইভীর জনপ্রিয়তার কারণে তার চেয়ে ঢের বেশী সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের কারণে, তার নানাবিধ বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য। সবচেয়ে বড় কথা সরকারের আন্তরিকতা থাকলে যে কোন নির্বাচনই যে সুষ্ঠু, অবাধ এবং নিরপেক্ষ করা সম্ভব তা আরও একবার প্রমাণিত হলো নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিয়েছেন, কোথাও সন্ত্রাসী বা প্রতিবন্ধকতার কোন ঘটনা ঘটেনি।

ব্যক্তি শামীম ওসমানের বিরুদ্ধেও নিজদলীয় প্রার্থী আইভীর বিপক্ষে শক্ত অবস্থান নিতে দৃশ্যমান অনাকাঙ্ক্ষিত কোন ঘটনার জন্ম নিতেও দেখা যায়নি। তবে চলমান রাজনীতির অপসংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি বিএনপি। নির্বাচন চলাকালীন সময় অর্থাৎ ওইদিন দুপুরের আগে দলটির পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলনে বলা হলো, ‘আগেরদিন রাত পর্যন্ত নানা ধরনের অনিশ্চয়তা ও শঙ্কা থাকলেও এখন পর্যন্ত নির্বাচনের পরিবেশ শান্তিপূর্ণ ও সন্তোষজনক।’

আর নির্বাচন শেষ হওয়ার ২০ মিনিটের মধ্যে বলা হলো, ‘বাহ্যিকভাবে যা দেখা গেছে, তাতে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। তবে পর্দার অন্তরালে কী হয়, তা আমাদের জানা নেই। সংশয় হচ্ছে শেষ মুহুর্তে কোন ইঞ্জিনিয়ারিং ঘটে কি না।’ কী সেই ইঞ্জিনিয়ারিং, তা স্পষ্ট করে বলেনি দলটি। আর বিএনপি’র প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেন অভিযোগ তুলেছেন সূক্ষ্ণ কারচুপির।

প্রথমেই বলেছি এটি ছিলো সরকারের জন্য অ্যাসিড টেস্ট। জনপ্রিয়তা কোনদিকে রয়েছে তা বুঝতে এবং ২০১৩ থেকে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোকে কেন্দ্র করে সরকারের অগণতান্ত্রিক চরিত্রের বদনাম কিছুটা হলেও ঘোচাতে এই নির্বাচন নিরপেক্ষ করতে সরকার অনেকটা চ্যালেঞ্জ হিসেবেই গ্রহণ করে। সরকারও চাইছে তার গায়ে লেগে থাকা কাদাগুলো ধুয়ে মুছে ফেলতে, যেহেতু জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে দলটি এখন থেকেই ভাবছে আর তা খুব বেশী দূরেও নয়।

বর্তমান সরকারের প্রথম মেয়াদের শেষ সময়ে দেশের সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনগুলোতে ভরাডুবি ঘটে আওয়ামী লীগের। তবে গণমানুষের এই রায় ছিলো আওয়ামী লীগের বিরদ্ধে, বিএনপি’র পক্ষে নয়। বরিশাল, খুলনা, সিলেট, গাজীপুর, রাজশাহীতে বিপুল ভোটের ব্যবধানের বিএনপি দলীয় প্রার্থীর কাছে শোচনীয়ভাবে হারে সরকারদলীয় প্রার্থীরা। বরিশালের শওকত হোসেন হিরন, সিলেটের বদরউদ্দীন আহমেদ কামরান, গাজীপুরের আজমতউল্লাহর মতো তুমুল জনপ্রিয় নেতারা ধরাশায়ী হন বিএনপিদলীয় প্রার্থীদের কাছে।

কিন্তু সরকারের চরম অগণতান্ত্রিক মানসিকতার কারণে বিএনপি থেকে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদেরকে কাজ করতে দেয়া হয়নি। বরং তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা দিয়ে আটক রাখা হয় কারাগারে, অনেকে ছিলেন আত্মগোপনে। নির্বাচিত সব মেয়রকে অপসারণ করা হয় বিভিন্ন আইনী মারপ্যাচে, বসানো হয় দলীয় প্রশাসক। পরে তাদেরই অনেকে আবার আইনী লড়াইয়ের মাধ্যমে ফিরে পেয়েছেন নিজ নিজ পদ। সিটি কর্পোরেশনগুলোতে সেই ভরাডুবির তিক্ত অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারেনি আওয়ামী লীগ।

জন আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে না পারায় ২০১৪’র ৫ জানুয়ারীর বিতর্কিত নির্বাচনের পর অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদের নির্বাচনেও মানুষের রায় আসতে থাকে আওয়ামী লীগের বিপক্ষে। ছয় ধাপে অনুষ্ঠিত সেই নির্বাচনের তৃতীয় ধাপ থেকে শুরু হয় কারচুপি, ব্যালট বাক্স ছিনতাই আর সন্ত্রাসের মাধ্যমে ফলাফল সরকারীদলের পক্ষে টানার, যা অব্যহত থাকে পরবর্তীতে অনুষ্ঠিত পৌরসভা এবং ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনগুলোতেও।

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন থেকেই দেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক বরাদ্ধের নতুন নিয়ম চালু হয়। মাত্র ক’দিন আগে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে যে দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে তা কোনভাবেই নির্বাচনকেন্দ্রীক গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে না। এর আগের নির্বাচনগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে বিএনপি নেতা-কর্মীদের মাঝে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দিতার মনোবল হারিয়ে যায় পুরোপুরি। বিপরীতে প্রশাসন নির্লজ্জভাবে সম্পূর্ণ পক্ষে থাকায় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের মাঝে সেই মনোবল এতোটাই চাঙা হয় যে কোনরকমে দলীয় প্রতীক পেলেই বিজয় সুনিশ্চিত বলে ধরে নেয় তারা।

বিশ্বাস জন্মে- জনগণের দোরগোড়ায় কষ্ট করে আর যেতে হবে না, প্রয়োজন নেই নির্বাচনী কোন প্রচারণার। হয়েছেও তাই। তাই দলীয় প্রতীক নৌকা পেতে মনোনয়ন প্রত্যাশীদেরকে মরিয়া হয়ে ছুটোছুটি করতে হয়েছে নেতাদের পেছনে। কেন্দ্রীয় এবং স্থানীয় নেতাদেরকে লাখ লাখ টাকা ঘুষ দেয়ার গুরুতর অভিযোগও ওঠে তখন। সব মিলিয়ে ‘নির্বাচন’ নামক গণতান্ত্রিক এই ব্যবস্থাটির প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ নেমে আসে তখন একেবারে শূন্যের কোটায়। নির্বাচন কমিশন পরিণত হয় একটি হাস্যকর প্রতিষ্ঠানে, অনেকটা বিএনপি’র সেই আজিজ কমিশনের মতো।

সুতরাং নারাণয়গঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনটি সরকারের জন্য যেমন, তেমনি বিএনপি’র জন্য ছিলো চ্যালেঞ্জ। নীরব চ্যালেঞ্জ ছিলো স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগের ঘরোয়া রাজনীতিতে সেলিনা হায়াৎ আইভী এবং শামীম ওসমানের জন্যও। নির্বাচন সুষ্ঠু করতে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের নির্দেশনা ছিলো নির্বাচন কমিশনের প্রতি। শামীম ওসমান শেষমেষ নৌকার পক্ষে অবস্থান নেবে কী-না তা নিয়ে সংশয় ছিলো আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মাঝেও।

সেই হিসেবে নারায়ণগঞ্জ সিটির আগের নির্বাচনে তার প্রাপ্ত প্রায় আশি হাজার ভোটের হিসাব মেলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছিলো বিশ্লেষকদের। তাই একদিকে বর্তমান সরকারের সময়ে সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোতে বিএনপি প্রার্থীদের বিজয়ের তিক্ত অভিজ্ঞতা অন্যদিকে ঘরোয়া রাজনীতিতে শামীম ওসমানকে নিয়ে ভয়, এই দুইয়ের সমন্বয়ে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নৌকাকে বের করে নিয়ে আসার কাজটা আওয়ামী লীগের জন্য ছিলো সত্যিই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সরকার সেই চ্যালেঞ্জে আপাতত সফল, হয়েছে মুখ রক্ষা।।

তবে সরকার যতোটা সফল, তার চেয়ে অনেক বেশী সফল নারায়ণগঞ্জের সাধারন ভোটাররা। নির্বিঘ্নে ভোট দিয়ে তাদের মনের ভাষাটা অন্তত: ব্যক্ত করতে পেরেছেন স্বচ্ছভাবে। পাশাপাশি পরাজয় ঘটেছে সন্ত্রাসের। এ জন্য অবশ্যই সাধুবাদ সরকারকে।

তবে একটি কথা- নারায়ণগঞ্জের নির্বাচনে নৌকার চেয়ে শক্তিশালী ছিলো ডা. আইভীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা। তার প্রমাণ কিন্তু ২০১১-এর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে নিজ দলের মধ্যেই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এক লাখ ভোটের ব্যবধানে ক্লিন ইমেজের এই নারীর বিজয়ী হওয়া। তাই এবারের এই নির্বাচনই সরকারের জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের শেষ পরীক্ষা হিসেবে ধরে নেয়া ঠিক হবে না নিশ্চয়।

মঞ্জুরুল আলম পান্না : সাংবাদিক, কলাম লেখক।
monjurpanna777@gmail.com

print
 
nilsagor ad

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad