ফুরোচ্ছে উপেক্ষার দিন

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৭ | ৮ কার্তিক ১৪২৪

ফুরোচ্ছে উপেক্ষার দিন

তুষার আবদুল্লাহ ৬:৩৯ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২০, ২০১৬

print
ফুরোচ্ছে উপেক্ষার দিন

রাজনীতিবিদরা গণ্যমাধ্যমকে ভয় করেন, ভালবাসেন না। গণমাধ্যমের মানুষদের সঙ্গে তারা যে সখ্যতা তৈরি করেন, সেটা স্বার্থের। রাজনীতিবিদরা পরম্পরায় বিশ্বাস করে আসছেন, গণমাধ্যমের মানুষদের সামলে রাখতে পারলে, নিজেদের অপকর্ম অনেকটাই ঢেকে রাখা সম্ভব। এই কাজটিতে রাজনীতিবিদরা প্রায় সফল হয়ে আসছেন বলা যায়।

 

অন্তত তাৎক্ষনিক অনেক অপ্রিয় বিষয়কে তারা আড়াল করে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। কোন কোন ক্ষেত্রে নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও তারা ব্যবহার করেছেন গণমাধ্যমকে।বিনিময়মূল্য ছাড়া কাজটি হয়নি। বিনিময়ে গণমাধ্যম এবং গণমাধ্যমের মানুষদের স্বার্থের দিকটা দেখতে হয়েছে। কখনও কখনও কেনা-বেচার কাজটি হয়েছে নগদ মূল্যে। এই কেনাবেচায় সফল হওয়া গেছে মূলধারার গণমাধ্যমে। মূলধারার গণমাধ্যমের একটি দৃশ্যমান কাঠামো আছে। সেই কাঠামোটিকে বশে আনতে পারলেই কেল্লাফতে।

পুরো গণমাধ্যমটিই তখন কোন একটি রাজনৈতিক দল বা রাজনীতিবিদের হয়ে কথা বলতে শুরু করে। ব্যক্তি হিসেবে কোন একজন সংবাদকর্মীকে ম্যানেজ করে এখন আর বড় ধরনের ফায়দা পাওয়া যায় না। এটি সংবাদপত্র যুগে সম্ভব ছিল। টেলিভিশন যুগে বড়জোর একটি সাক্ষাৎকার বা কোন একটি ইভেন্টের কভারেজ আদায় করা সম্ভব।

কিন্তু জাতীয়ভাবে আলোচিত বা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার বেলাতে এখন আর টেলিভিশন বা তার সংবাদকর্মীকে কিনে  হজম করা সম্ভব হয়ে উঠে না। কারণ প্রতিযোগিতার বাজারে কোন একটি টেলিভিশন যদি কোন ঘটনা আড়াল করে, অন্য টেলিভিশন গুলোও সেই সংবাদের মৃত্যু ঘটাবে তার কোন গ্যারান্টি নেই।

তখন আড়াল করা টেলিভিশন ভোক্তা বা দর্শক হারাবে। হয়তো কিছু সময়ের জন্য টেলিভিশনটি নিরবতা পালন করতে পারে, কিন্তু একটি পর্যায়ে তাকে খবরটি দর্শককে জানাতেই হয়। কারন সবশেষে টেলিভিশন বা গণমাধ্যমের দায়বদ্ধতা কিন্তু তার ভোক্তার কাছেই।

এখানে জবাবদিহিতা এড়িয়ে যেতে পারে না গণমাধ্যম। কিন্তু রাজনীতিবিদরা তার ভোক্তা বা ভোটারকে অবজ্ঞা করে ঠিকই ক্ষমতার স্বাদ নিতে পারছেন। প্রভাব বজায় রাখছেন তার রাজনীতিতে।

টেলিভিশন, পত্রিকা বা বেতারের সাংবাদিকরা যে এখনও ক্রয়সীমার বাইরে তা নয়। তাদের ক্রয়ের নানা উদ্যোগ, কৌশল দেখা যায়। সেই কৌশলের ফাঁদে টপাটপ পড়তেও দেখি সংবাদ কর্মীদের। কিন্তু যারা একেবারেই এই ক্রয় সীমার বাইরে, তারা হচ্ছেন সিটিজেন জার্নালিস্ট বা নাগরিক সাংবাদিক।

সর্বত্র ছড়িয়ে  বা বিরাজমান তারা। সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মতো কে কখন কোথা থেকে জেগে উঠবেন বলা মুশকিল। কার নজরে যে কখন কি পড়ে যায়, তা আগাম বলে রাখা বা ধারনা করা সম্ভব নয়। এই নাগরিক সাংবাদিকদের কাজের জমিন হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। এই মাধ্যমটিতে তারা যে কোনো জায়গা থেকে নিজে্র সম্পাদকীয় নীতি বা বিচার বুদ্ধিতে ঘটনা বা খবরের প্রকাশ করতে পারছেন।

আমরা এরই মধ্যে কয়েকটি সামাজিক ঘটনা বা সংকটের খবর এই মাধ্যমেই প্রকাশ হতে দেখেছি। একই ভাবে অনেক রাজনীতিবিদদের স্বেচ্ছাচারিতা, দুর্নীতির খবরও পেয়েছি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। রাজনীতিবিদ বা রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ভোক্তা বা ভোটারদের যে উপেক্ষা করে চলছেন, সেই উপেক্ষার দিন ফুরোতে শুরু করেছে।

কারণ, তাদের উপেক্ষিত সেই ভোটাররাই কিন্তু আবির্ভূত হচ্ছেন, হয়েছেন নাগরিক সাংবাদিক হিসেবে। নজর রাখছেন তাদের কাজের দিকে। অতীতে আমাদের রাজনীতিবিদরা মিডিয়াকে যেভাবে মোকাবেলা করে আসছিলেন, এখন কিন্তু তাদের মিডিয়াকে বহুমাত্রিকতায় মোকাবেলা করতে হবে।

ভোটের মাঠে যারা যাচ্ছেন। তাদের নির্বাচন কমিশনের চেয়ে এই নাগরিক সাংবাদিকদের প্রতি ভীত হয়েই প্রচারনায় বা ভোটের মাঠে থাকতে হবে। যে কোন অসংলগ্ন ও নীতিমালা বর্হিভূত কাজ বা অতীতের অপ্রিয় কাজের ফিরিস্তি কিন্তু মূলধারার সাংবাদিকের চেয়ে এখন নাগরিক সাংবাদিকের তুলে ধরার সুযোগ বেশি।

হয়তো কেউ কেউ কারো বিরুদ্ধে ভুল তথ্য তুলে ধরতে পারেন এই সুযোগে। কিন্তু এখানে ভুল তথ্য যে টেকসই হয় না, মুহুর্তেই ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেয়া হয় তাও প্রমাণ হয়ে গেছে। এর সঙ্গে তো আবার তথ্য প্রযুক্তি আইনের চোখ রাঙানী রইলোই।

তাই ভোটকে সামনে রেখে বা রাজনীতির আগামী দিনগুলোতে গণমাধ্যমকে কেনার চেয়ে রাজনীতিবিদদের নাগরিক সাংবাদিক সামাল দিতে নিজেদেরকেই নিজের সামাল দিয়ে চলতে হবে। এতে রাজনীতি ও ভোটের মাঠের সন্ত্রাস, অনিয়ম নেমে আসতে থাকবে শুন্যের দিকে।

তুষার আবদুল্লাহ : বার্তা প্রধান, সময় টিভি।

print
 
মতান্তরে প্রকাশিত তুষার আবদুল্লাহ এর সব লেখা
 

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad