জানেন তো কাকে বিয়ে করছেন?

ঢাকা, রবিবার, ২৫ জুন ২০১৭ | ১১ আষাঢ় ১৪২৪

জানেন তো কাকে বিয়ে করছেন?

দিলরুবা শরমিন ৮:১৮ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৭, ২০১৬

print
জানেন তো কাকে বিয়ে করছেন?

সমস্যা চলমান, বিশেষ করে মুসলিম মেয়ে বা ছেলেদের ক্ষেত্রে সেটা খুব বেশি। তাই আজকাল আর বিস্মিত হইনা। একদিন হঠাৎ আমার পরিচিত এক ছেলে একটি মেয়েকে সাথে নিয়ে আমার চেম্বারে হাজির। শুনলাম তারা বিয়ে করবে ‘আদালতে’, তাই আমার কাছে আসা।

কিন্তু হুট করে বিয়ে করতে আসা? এ কেমন আবদার? খানিক চিন্তা করে হিজাব পরা মেয়েটিকে একা নিয়ে বসলাম। আপত্তি না থাকলে ঘোমটা খুলতে বললাম। যা সন্দেহ করেছিলাম তাই। একটি অপূর্ব কিশোরী! কেবল এইচএসসি প্রথম বর্ষে পড়ছে। আমি তাকে বোঝাবার চেষ্টা করলাম যে এখনো তার বিয়ের বয়স হয়নি আর তার ভবিষ্যতের জন্য লেখাপড়া করা উচিত। অনেক বুঝালাম, যা উচিত বা উচিত নয়। কিন্তু কিশোরী মেয়েটি তার সিদ্ধান্তে অটল।

এরপর ছেলেটিকে নিয়ে একা বসলাম। অনেক বোঝাতে চাইলাম যে, সে তো নিজের সর্বনাশ তো করছেই পাশাপাশি একটি মেয়ের জীবনও নষ্ট করছে। দুটি পরিবার খামোখাই ভুগবে কিন্তু প্রেমে আকুল ছেলেটিও আমাকে তার প্রতিপক্ষই ভাবলো। এরপর আমার সঙ্গে বুদ্ধি করে সেই ছেলেটি কিশোরীকে নিয়ে চলে গেল। আতঙ্কে ছিলাম। কিছু যে তারা ঘটাবে এবং সেটা যে ভুল কিছুই ঘটবে এটাও নিশ্চিত ছিলাম।

সম্প্রতি মেয়ের মা-নানী এমনকি মেয়েটি আমাকে ক্রমাগত ফোন দিয়েই যাচ্ছে। শেষে বাধ্য হয়ে দেখা করার অনুমতি দিলাম এবং জানলাম যে তারা বিয়ে করেছিল কোন এক কাজীর অফিসে গিয়ে মাত্র একলাখ টাকা দেনমোহরানা ধার্যে। তারপরই মেয়েটি জানতে পারে যে ছেলেটি কিছুই করে না। ড্রাগ সেবক এই ছেলেটি মেয়েটিকে বেধড়ক মারধর করে। মেয়েটির লেখাপড়া বন্ধ। এখন আর ঘর-সংসার করবে না।

কিন্তু আমার কাছে কেন? এই প্রশ্নের কোনই উত্তর নাই। কারণ কোথায় তারা বিয়ে করেছে সেটা মেয়েটি, তার মা বা নানী জানেন না। কাবিন নাই তাই তালাক দিতে পারছে না এমনকি ছেলেটিকে যে তারা পুলিশের হাতেও তুলে দিবে সেটাও পারছে না কারণ ছেলের সঠিক ঠিকানা মেয়েটিও জানে না। তাই আমার কাছে ছুটে আসা। কারণ বিয়ের পর মেয়েটি জেনেছে যে, ছেলেটির প্রথম স্ত্রী ও শিশু সন্তান রয়েছে।

জানি না ঘটনা কোথায় গিয়ে শেষ হবে। তবে আবেগের বশবর্তী হয়ে একটি কিশোরীর স্বপ্ন চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। এখন মা-নানী ও মেয়েটি ছেলেটির পরিবারকে খুঁজতে শুরু করেছে। কারণ মেয়েটি সেটাও জানে না!

গতকাল এক প্রথিতযশা সাংবাদিক ফোন দিয়েছেন। আমার সঙ্গে দেখা করতে চান। সময়মতই এলেন। সাথে তার চাচাতো ভাই ও তার মেয়ে। ঘটনার বিবরণ এই যে, গত এক বছর যাবত একটি পরিবার তাদের বড় ছেলে (যিনি প্রবাসী ) তার সাথে এই মেয়েটির  বিয়ে দিতে চান এবং দীর্ঘ এক বছর যাবত নানা প্রকার পারিবারিক সুসম্পর্ক গড়ে তুলে শেষে ছেলেটি দেশে আসার পর তারা বিয়ে দিলেন। বিয়েতে তেমন আড়ম্বর না করে পরে অনুষ্ঠান করা হবে এই শর্তে বউ ঘরে তুলে নিয়ে গেলেন। মেয়েটি একটি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে অনার্স পড়ুয়া গরীবের মেয়ে। ‘পার হয়ে গেল নির্বিঘ্নে’ এই হলো বাবা মায়ের শান্তি। বিয়ের দুই দিন পর ছেলেটি হঠাৎ কোথায় উধাও হয়ে গেল তা আর পরিবারের কেউ জানলো না। তারপর দীর্ঘ একমাস মেয়েটির উপর শাশুড়ি মা আর ননদের “প্রথাগত ঝাল”। “তুই কি করেছিস যে আমার ছেলে তোকে রেখে পালালো?” শত গঞ্জনা শুনে তাও শ্বশুর বাড়ীর মাটি কামড়ে ধরে থাকার চেষ্টা করে অবশেষে ব্যর্থ মেয়েটি আবার বাবার বাড়ি ফিরে এল। ফিরে আসাটাও অনেকটা জেলখানা থেকে মুক্তির মতই। দিনের পর দিন ঘরে বন্দি মেয়েটি একটু সুযোগ পেয়েই বাবাকে সব জানালে বাবা লোকজন নিয়ে মেয়েটিকে উদ্ধার করেন। মেয়েটি প্রায় তখন আধমরা।

না , তাকে কেউ হাতে মারেনি, ভাতে মেরেছে। মেয়েটি তার কাবিনসহ আমার কাছে হাজির বাবা ও ফুপুর সঙ্গে। কাবিনটা দেখেই আমার কেমন যেন সন্দেহ হল। আর সেই সন্দেহই প্রমাণিত হলো যখন মেয়েটির শাশুড়িকে ফোন দিলাম। সে তো আকাশ থেকে পড়ল- বিয়ে দিয়েছি? আমার ছেলে সুমনকে? কার সঙ্গে? কবে? এরপর আয়েশা খাতুনের কাছ থেকে ফোন কেড়ে নিল তার আরেক ছেলে শাওন (যে কিনা নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে)। আরো ঝাঁঝালো স্বরে জানান দিল যে আমি তাদেরকে ব্ল্যাক মেইলিং করছি। এমন কোন ঘটনাই তাদের বাড়িতে ঘটেনি।

এত স্বাভাবিক ও সাবলীলভাবে বলে গেল যে আমি কেন স্বয়ং বিধাতাই মনে হয় স্তব্ধ হয়ে গেলেন। শুধু তাই না এই শাওন জানালো যে, এই মেয়ের সঙ্গে তার ভাইয়ের বিয়ে হয়েছে তার প্রমাণ কি? তার ভাইয়ের তো বউ-বাচ্চা সবই আছে। কাবিনের কথা বলাতে বিদ্রূপ করে হেসে ওঠা শাওন জানালো কাবিন? সে তো মাত্র কয়টা টাকা দিলেই যেকেউ যে কারো সঙ্গে বিয়ের দাবী করতে পারে!

আমার কাছে আসা মেয়েটি ও তার বাবা ও ফুপু সামনেই বসে ছিল। তারাও সব শুনলো। তাদেরকে বললাম কাজীকে খুঁজে বের করুন, এখানে ঠিকানা দেওয়া আছে। তারা কাজীকে খুঁজতে গিয়ে পড়লো আরো বিপদে। বিয়ের মূল বালাম বইতে বিয়ের কোনো চিহ্ন নাই। যে কাজী বিয়ে দিয়েছে তার টিকিটাও খুঁজে পায়নি। আর কাবিনে স্বামীর যে নাম দেওয়া আছে – সুমন, পিতা. ফজলুল হক মাতা. আয়েশা সাং ---। সেই সবই ভুল। মেয়েটি জানালো তার শ্বশুরের নাম মমতাজ উদ্দীন আর কাবিনে তাদের গ্রামের বাড়ির যে ঠিকানা দেওয়া আছে সেটাও তো তাদের ঠিকানা না।

পুলিশের কাছে সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছিল তার প্রেক্ষিতেই সব বের হয়ে এসেছে। বিয়েতে একটা ছবিও তোলা হয়নি। মেয়েটির বাড়ি থেকে মোবাইলে যে ছবি তোলা হয়েছিল সেই মোবাইল তার শাশুড়ি, ননদ আর দেবর শাওন কেড়ে রেখেছে। বর্তমান যে ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে সেখানেই তারা আছে কিন্তু প্রতিবেশীরা বলছে যে, ‘কই সুমন বলে তো তাদের কোনো ছেলেই নাই। আর এই মেয়েটিকে তারা দেখেছে সেই বাসায় কিন্তু তারা জানে কাজের মেয়ে। গ্রাম থেকে এসেছে।’ তাহলে কি দাঁড়ালো বিষয়টি?

মেয়েটিকে এখন আমি কোন আইনে ন্যায় বিচার পাওয়ার ব্যবস্থা করে দিব? কারণ ইতোমধ্যে এই শ্বশুর বাড়ির লোকজন মেয়েটির নামে কাজের মেয়ের পরিচয় দিয়ে চুরির অভিযোগ এনে সাধারণ ডায়েরি করে বসে আছে। আর অনার্স পড়ুয়া এই মেয়েটি? কী প্রমাণ আছে তার কাছে যে কে তার স্বামী? কোথায় তার বাড়ি? কী তার আসল শ্বশুর বাবার নাম? অদ্ভুত এক দেশে বাস করি আমরা। মেয়েকে পার করতে পারলেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি বা মেয়েটিও কোনোমতে পার হতে পারলেই যেন বাঁচে! কিন্তু পাঠাচ্ছি কোথায় বা পার হয়ে যাচ্ছি কোথায় সেটা কি একবারও আমরা কেউ ভেবে দেখি? পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিশ্চিত হই?

আদালতে কি নিয়মে বিয়ে হয় বা কাজী আসলেই লাইসেন্সপ্রাপ্ত কাজী কিনা, বালাম বইতে শূন্য ঘরগুলি যথারীতি পূরণ করা হচ্ছে কিনা, কাবিনে কি লেখা হচ্ছে, সাক্ষীদের নাম ঠিকানা সঠিক কিনা আর যার সাথে জীবন কাটাবো বলে এই চুক্তি করছি (মুসলিম বিয়ে আইনত একটি দেওয়ানী চুক্তি নামা) সেই উভয়পক্ষ সঠিক কিনা। এই সবকিছু কি যাচাই বাছাই করার দরকার নাই? তাহলে “জাতীয় পরিচয় পত্রের’ প্রয়োজনটা কি? বা জন্ম নিবন্ধন? অথবা নকল কাজীর পিছনে টাকা ঢালা?

জেনে নিন, কাকে বিয়ে করছেন। কিভাবে বিয়ে করতে হয়? আমাদের দেশে তো আর কিছু পরীক্ষা করার সুযোগ নাই তাই অন্তত এই টুকু জেনে নিন- বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালের একটি বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন আইন আছে। যাকে বিয়ে করছেন তাকে ও তার পরিবারকে জানুন। এই অনুরোধ কেবল নারীর ক্ষেত্রেই নয় পুরুষের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য!

লেখক : আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী

আরও পড়ুন

পিতা-মাতার ভরণপোষণ প্রসঙ্গে
এযে এক দুর্নিবার আকর্ষণ!

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।
print
 

আলোচিত সংবাদ