আগামী বছরেই ডিজিটাল বিটিভির উদ্বোধন: ডিজি

ঢাকা, সোমবার, ১৬ জুলাই ২০১৮ | ১ শ্রাবণ ১৪২৫

আগামী বছরেই ডিজিটাল বিটিভির উদ্বোধন: ডিজি

আহমেদ জামান শিমুল ৭:৪৬ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ০১, ২০১৮

print
আগামী বছরেই ডিজিটাল বিটিভির উদ্বোধন: ডিজি

নব্বইয়ের দশকে যাদের জন্ম, তাদের সবাই বাংলাদেশ টেলিভিশনকে (বিটিভি) ঘিরে একধরনের স্মৃতিকাতরতায় ভুগি। শৈশব ও কৈশোরের বিশাল অংশজুড়ে রয়েছে এই চ্যানেলটি। শুধু আমাদের স্মৃতিতে নয়, এ জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্য অনেক কিছু বিনির্মাণের পেছনে নীরব ভূমিকা পালন করে গেছে চ্যানেলটি।

একটা সময় যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের মানুষের সান্ধ্য বিনোদনের মাধ্যম ছিল বিটিভি। বিটিভিতে প্রচারিত ‘সংশপ্তক’, ‘বহুব্রীহি’ ও ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকগুলো কিংবা ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘যদি কিছু মনে না করেন’, ‘ইত্যাদি’, শিশুদের গান শেখার অনুষ্ঠান ‘এসো গান শিখি’ এবং প্রভিভা বের করে আনার অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’ একে এনে দিয়েছিল অন্যমাত্রা।

এদেশে যখন স্যালেটাইট টেলিভিশন এলো, যখন উন্মুক্ত হলো বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের লাইসেন্স, তখন কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লো প্রিয় এই চ্যানেলটি।

নাট্যকার, অভিনেতা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হারুন-অর-রশিদ বাংলাদেশ টেলিভিশনের বর্তমান মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন। সরকারের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে তিনি বিভিন্ন সময় দায়িত্ব পালন করেছেন এফডিসির এমডি হিসেবে এবং চলচ্চিত্র বিষয়ক বিভিন্ন কমিটির চেয়ারম্যান ও সদস্য হিসেবে।

১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর ডিআইটি ভবন থেকে যাত্রা শুরু করা বিটিভির বর্তমান মহাপরিচালক চ্যানেলটি নিয়ে নানা আশার বাণী শোনালেন। শোনালেন নানা পরিকল্পনা ও উন্নয়নের কথা। অকপটে স্বীকার করে নিলেন সীমাবদ্ধতার কথা। নতুন কিছু অনুষ্ঠান আনা হচ্ছে যেগুলো এলে অন্য চ্যানেলগুলো কিছুটা হলেও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

সাক্ষাতকার নিয়েছেন আহমেদ জামান শিমুল। ছবি তুলেছেন রাফিয়া আহমেদ।


২০১৬ সালের ১৪ জানুয়ারি আপনি দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। এখন পর্যন্ত কী কী উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়েছে?

পরিবর্তন অনেক হয়েছে। কিন্তু বিটিভির ডিজি হিসেবে এটা আমার বলা সমীচীন হবে না। এটা দর্শকরা বলবে। তবে আমি কিছু জিনিস পরিবর্তন করার চেষ্টা করেছি। কিছু আর্থিক শৃঙ্খলা এনেছি, আবকাঠামোগত পরিবর্তন এনেছি। আমাদের এখানে রিপোর্টার ও ভিডিও এডিটরের পোস্ট নেই, এগুলো সৃষ্টি করা হয়েছে। এখনো নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এগুলো ছাড়া তো চ্যানেল চলবে না। বাংলাদেশ টেলিভিশনে মাত্র একজন গ্রাফিক্স ডিজাইনার। সেখানে আমরা ১৪ জন গ্রাফিক্স ডিজাইনার পেতে যাচ্ছি। আমরা ১৬ জন রিপোর্টার পেতে যাচ্ছি। এগুলো হচ্ছে প্রশাসনিক কাজ। অনেক কিছুই ফরমাললি হতো না, সেটাকে আমরা ফরমাল করেছি। পাশাপাশি পুরনো হোক বা নতুন হোক শিল্পীদের যথাযথ সম্মান দিয়ে আনা শুরু করেছি। এ কাজটা আমি করার চেষ্টা করেছি।

দর্শকদের জানানো প্রয়োজন ছিল বিটিভিতে এখন কী কী অনুষ্ঠান হচ্ছে। সেটার জন্য আমরা তিন মাসের ফিক্সড চার্ট মেইনটেইন করা শুরু করেছি। যেটা আগে নানা কারণে করা যেতো না।

অনুষ্ঠানমালা কী বিটিভির ওয়েবসাইটে দেয়া হবে?

হ্যাঁ, ওয়েবসাইটে দেয়া হবে। যেমন ধরুন, আজকে জানুয়ারির ১ তারিখ। ফেব্রুয়ারি ও মার্চে কী কী অনুষ্ঠান সাধারণ স্লটে চলবে তা দিয়ে দেব ওয়েবসাইটে। বিশেষ দিনের কথা আলাদা। তার মানে দর্শক আগে থেকে জেনে গেলো কোন কোন দিনে বিটিভিতে কী কী অনুষ্ঠান হবে।

এছাড়া বিটিভির জেনারেশন পরিবর্তন হয়েছে। টেকনোলজিক্যাললি আমরা পুরনো প্রযুক্তিতেই পড়ে আছি। আমরা বাংলাদেশের একমাত্র টেরিস্ট্রিয়াল চ্যানেল। এতে ঝকঝকে ছবি দেখতে হলে ইনডোর এন্টেনা লাগে। মানুষ এখন আর এ পরিশ্রমটা করতে চায় না। সে ডিশই দেখতে চায়। (তখন তার রুমে থাকা দুটি টিভি সেটের দিকে দেখিয়ে) বিটিভি ওয়ার্ল্ড মোটামুটি পরিষ্কার। তবে বিটিভি ন্যাশনাল চ্যানেলটি কিভাবে টেরিস্ট্রিয়ালের মতো ডিশেও পরিষ্কার আনা যায়, তা নিয়ে ক্যাবল অপারেটরদের সাথে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি।

এবার আসি অনুষ্ঠানের ডাইমেনশন নিয়ে। সময়ের সাথে সাথে তো মানুষের রুচি ও চাহিদার পরিবর্তন ঘটে। তখন টেলিভিশন ছিল মানুষের কাছে তামাশা, এখন কিন্তু তা নয়। এখন হচ্ছে টেলিভিশন তার প্রয়োজন মেটাতে পারে কি না। এক চ্যানেল ভালো না লাগলে, অন্য চ্যানেলে যাবে। অন্য চ্যানেল ভালো না লাগলে বিটিভিতে আসবে। এ জায়গাটা মাথায় রেখে আমরা অনুষ্ঠান বিন্যাস করার চেষ্টা করেছি। নতুন-প্রবীণদের দিয়ে অনুষ্ঠান করিয়েছি। আমাদের অনুষ্ঠানের কিছু নীতি আছে। যেমন আমরা সংবাদে কোনো টুইস্টিং করি না। আমরা যা ঘটে তাই বলি।


সরকারবিরোধী কোনো সংবাদ প্রচার করা হয় না- এরকম একটি কথা প্রচলিত আছে।

সরকারবিরোধী সংবাদ দেওয়া যাবে। কেউ যদি মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কথা বলে, আলটিমেটলি তার কথা টার্গেটেড টু মুক্তিযুদ্ধ— তার ব্যাপারে তো নাগরিক হিসেবে আমার রিজারভেশন থাকবে। কিন্তু একটা জায়গায় একটা জনদুর্ভোগ হয়েছে, একটা দুর্ঘটনা হয়েছে— বিটিভি কি তার সংবাদ দেবে না? দেবে। অন্য চ্যানেল কী করে। এ সংবাদ দিয়ে বলে- হচ্ছেটা কী? আর আমরা একটু মানুষকে আশস্ত করতে চাই। আমরা মানুষকে প্যানিক করতে পারি না। এ ধরনের একটা ঘটনা ঘটেছে, জনদুর্ভোগ ঘটছে। পাশাপাশি জনগণকে আশস্ত করতে চাই— এটা লাঘব করতে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না। ওটা না দেওয়া পর্যন্ত মানুষকে নেগেটিভ জিনিসটা দিতে চাই না।

আমাদের আলোচনাঅনুষ্ঠাননিয়ে ছিল

অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে আমরা কি গানের চ্যানেল? নাটকের, সংবাদের কিংবা ডকুমেন্টারির? না, আমরা সব কাজই করি। আমাদের মূল ফোকাস হচ্ছে বিনোদন। কিন্তু আমরা তথ্য দেব ইনফোটেইনমেন্টের মাধ্যমে। আমরা শিক্ষা দেব এডুটেইনমেন্টের মাধ্যমে। সাথে জনগণকে মোটিভেট করার চেষ্টা করছি। কার পক্ষে? সরকারের পক্ষে? না। আমরা মোটিভেট করি স্বাধীনতার পক্ষে, সত্য ও শিল্পের পক্ষে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে, সৃজনশীলতার পক্ষে। কী জন্য? দেশ তো এগোচ্ছে। সবকিছু মিলে তো সত্যি যে আমাদের দেশ ডিজিটাল হচ্ছে। আর মানুষের মন তো কারিগরি মন নয়, সৃজনশীল মন। কারিগরি মন আমরা তৈরি করতে চাই না। আমাদের মিডিয়ার কাজ হচ্ছে তার মধ্যে ডিজিটাল সৃজনশীলতা তৈরি করা। আমাদের এরকম কিছু কিছু সিগনেচার অনুষ্ঠান আছে। যেমন আমরা বলছি, সুবচন আবার ফেরত আনতে হবে সমাজে। ‘সত্য বল সুপথে চল’ ক্যাম্পেইন শুরু করেছি। ‘গল্প নয় সত্যি’- এটির মাধ্যমে মানুষের সফলতার গল্প বলছি। কারণ কষ্টের কথা মানুষ শুনতে চায়। সফলতার কথাও মানুষ শুনতে চায়। সে সফলতা হচ্ছে তার নিজের। একজন পেয়ারা চাষি, একজন মেয়ে সার্ফার, মেয়ে ট্রেন ড্রাইভার, শীতল পাটির কারিগর, ছোট ছোট উদ্যোক্তার গল্প শোনানো হয় অনুষ্ঠানটিতে। তারপর আমরা ‘এটুআই’-য়ের সাথে কাজ করি ‘উদ্ভাবকের দেশে’। কারণ বিটিভির মূল কাজ হচ্ছে সামাজিক দায়বদ্ধতা। আমরা সরকারের হয়ে এটি পালন করি। এটা আধুনিকভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করি। কোনদিনই বলা হয় না এটা পরিপূর্ণ হয়েছে। এটি চলমান প্রক্রিয়া।

এ ধরনের অনুষ্ঠান তো অতীতেও কম-বেশি হয়েছে। আলাদা কিছু কি আছে নতুন বছরে?

‘জেদ্দা জেনারেশন’ নামে একটি ডেইলি সোপ নিয়ে আসছি। জানুয়ারি থেকে শুটিং শুরু হবে। প্রথম অবস্থায় তিন দিন করে প্রচার হবে। এরপর প্রতিদিন। এটি নির্মাণ করবেন সাগর সেন। বাজেট আনলিমিটেড। আমরা সুবর্ণা মোস্তফাকে দিয়ে প্রথমবারের মতো উপস্থাপনা করিয়েছি একটি অনুষ্ঠান। এরকম আরো আনুষ্ঠান আসছে।

৫৪ বছরে পা রাখলো বিটিভি, এখনো কেন ডিজিটালইজড হলো না?

আমাদের দুটো স্টুডিও আছে ডিজিটাল। আমরা আউটডোর অনুষ্ঠান করি ডিজিটাল। কিন্তু আমরা ডিজিটাল ট্রান্সমিশন দিই না কেন? বাংলাদেশের এখনো ৩৫ শতাংশ এলাকা স্যাটেলাইট কভার করতে পারে না। সেখানে টেরিস্ট্রিয়াল যায়। আমার কভারিং এরিয়া কমে যায়। সব অনুষ্ঠান ডিজিটাল নয়। যার জন্য আমাদের পুরো বিটিভির অভ্যন্তীরণ সবকিছু ডিজিটালাইজড করা দরকার ছিল। গত দুই বছর আমরা ব্রেইনস্ট্রমিং করে একটা প্রজেক্ট দাঁড় করিয়েছি। খুব শিগগিরই সেটা অনুমোদন হয়ে যাবে বলে আশা করছি।

কবে নাগাদ এবং কত টাকার প্রজেক্ট?

অভ্যন্তরীণ ডিজিটালাইজেশন অর্থাৎ প্রোডাকশন, ইউনিট সব এ বছরের মধ্যেই হয়ে যাবে। স্যাটেলাইট ডিজিটাল ট্রান্সমিশনে আমরা যেকোনো সময়ে যেতে পারি। কিন্তু আমরা টেরিস্ট্রিয়ালে ডিজিটাল ট্রান্সমিশন করতে চাই। এটাও একনেকে অনুমোদন আগামী দুই মাসের মধ্যে হয়ে যাবে। আমাদের টার্গেট হচ্ছে ২০১৯ সালের ১ বৈশাখ ডিজিটাল বিটিভির উদ্বোধন করা। সঠিক মনে নেই, তবে যতদূর মনে পড়ে ৪৫০ কোটি টাকার প্রজেক্ট।

সরকারের পক্ষ থেকে আপনারা সবধরনের হায়তা পাচ্ছেন, তাহলে সঙ্ক কোথায়?

এ সঙ্কটটা আমাদের একার নয়। প্রথমত, বিটিভি তখন তামাশা ছিল যা দেখার লোকের অভাব ছিলো না। দ্বিতীয়ত, আগে অনুষ্ঠান ভালো হতো। তখন অবশ্য প্রতিযোগিতা ছিল না। দর্শক যা পেতো, তাই লুফে নিতো। তৃতীয়ত, যারা টিভি অনুষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন, তারা সবাই বিটিভিতে এসে এক হতেন। এখন অপশন অনেক (অনেক চ্যানেল) হওয়াতে এ লোকগুলো ভাগ হয়ে গেছেন।

এখানে মেধাবী লোক কমেছে নাকি বেড়েছে, সেটা নিয়ে বলবো না। কিন্তু তারা তো শুধু বিটিভিতে মেধা দিচ্ছে না। আমাদের এখানে সবচেয়ে বড় সংকট হচ্ছে সৃজনশীল ভাবনা। আমাদের এখানে অনেকে অনুষ্ঠান করতে আসেন। কিন্তু আমাদের দর্শক চাহিদা ও সৃজনশীলতার কথা ভাবতে হয়। আমি চাইলে স্থূল একটা নাটক চালাতে পারি না। আমাদেরও ভালো-খারাপ অনুষ্ঠান আছে। আমাদের চেয়ে পেমেন্ট কেউ এখনো বেশি দিতে পারবে না। যে কেউ একটা আলোচনা সভায় অংশ নিলে ৩ হাজার ৬০০ টাকা পায়। আমরা ৫০-৬০ জন শিল্পীর নাটকের খরচ বহন করতে পারি। আমাদের বাজেট কিন্তু সমস্যা নয়।

হ্যাঁ, আমরা একজনকে ১ লাখ টাকা দিতে পারি না। যেটা হয়তো প্রাইভেট প্রোডাকশন হাউজ দু-একজন শিল্পীকে অনেক বেশি দিতে পারে। আমাদের এখানে সমতা আছে। একজন তার গ্রেডিং অনুযায়ী সম্মানী পান। টাকা সমস্যা নয়, সমস্যা আইডিয়ার। শুধুমাত্র টেকনোলজিক্যাল উন্নয়ন দিয়ে তো আমি মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারব না। আমাদের সিনেমার কথা যদি বলি, ষাট-সত্তরের দশকের ছবিগুলোর তুলনায় এখনকার ছবিগুলো কি টেকনোলজিক্যাললি খারাপ? না। কিন্তু সে ছবিগুলো কেন ভালো লাগে? কারণ সুন্দর গল্প ছিল। অভিনয়টা ভালো ছিল, স্ক্রিপ্টটা ভালো ছিল। আমাদের আরেক সংকট হচ্ছে স্ক্রিপ্ট।

একটা সময়ে এক বিটিভি ছিল। অনুষ্ঠান প্রযোজক ছিলেন আবদুল্লাহ আল মামুন, মোস্তাফিজুর রহমান, আল মনসুর, নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু। এরা প্রত্যকেই একেকজন একেকটা প্রতিষ্ঠান। এখন এরকম আইকনিক লোকজন তো এখানে নেই। আবার যারা আছেন, তারা সেই আশির দশকের বিটিভিকেই স্ট্যান্ডার্ড ধরে বসে আছেন। নতুন ছেলে-মেয়ে যারা আছে, তারা সেভাবে গ্রুমিং হয়নি। ২৫ বছর এ প্রতিষ্ঠানে কোনো লোক নিয়োগ হয়নি। যার ফলে মিড লেভেলের পজিশনগুলো ফাঁকা। এখন আমাকে প্রয়োজনীয় জনবল দেওয়া হচ্ছে। সেটা প্রায় চূড়ান্ত। মূল প্রক্রিয়া শেষ। সব মিলিয়ে এক-দেড় বছর লাগবে। আমি হয়তো দেখে যেতে পারবো না।

এখানে আরেকটা সমস্যা। বিটিভি যখন গঠন করা হয়, তখন এটি একটি কোম্পানি ছিল। সরকারি প্রজেক্ট ছিল। এখন তো চাকরি করতে হলে আগের মতো সহজভাবে ঢোকা যায় না। পিএসসি ফেইস করে আসতে হয়।


কিন্তু একজন সৃজনশীল মানুষ এ প্রক্রিয়ায় কতটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন? কিংবা সবসময় সঠিক মানুষটি এ প্রক্রিয়ায় রে আসতে পারবে কি না?

এটা আসলে অনেক বড় প্রশ্ন। হয়তো অনেকেই উতরে আসতে পারবেন না। অনেকে এ প্রক্রিয়ায় পরীক্ষা দিতে আগ্রহীই হবেন না। কিন্তু এখনকার সরকারি নিয়মে এর বাইরে যাওয়া সম্ভব না। তারপরও আমরা চেষ্টা করছি নাটক ও অনুষ্ঠান নির্মাণে ফ্রিল্যান্স পরিচালকদের সুযোগ বাড়াতে।

তবে টেলিভিশনের ক্ষেত্রে সারা পৃথিবীতেই এখন একটা সংকট। টেলিভিশনকে বলা হয় বিশ শতকের মাধ্যম। একবিংশ শতাব্দীর মাধ্যম নিউ মিডিয়া ইউটিউব, ফেসবুক ও টুইটার।

আপনারা নিউ মিডিয়ার সাথে যুক্ত হওয়ার জন্য কোনো পদক্ষেপ নিয়েছেন কি?

শুক্র-শনিবারে ‘সুপ্রভাত বাংলাদেশ’ নামে অনুষ্ঠানটি আমরা একই সাথে বিটিভি, বিটিভি ওয়ার্ল্ড, বাংলাদেশ বেতার, এফএম চ্যানেল ৮৮.৮, রেডিও ভূমি, ফেসবুক, টুইটার ও ইউটিউবে সম্প্রচার করে থাকি। ২৫ ডিসেম্বর, ২০১৭ থেকে প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ইউটিউবে লাইভ স্ট্রিমিং করা হয়। একটা সময় আসবে সব অনুষ্ঠানই সোশ্যাল মিডিয়া ও ইউটিউবে পাওয়া যাবে।  এ মুহূর্তে পুরনো জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটক ও অনুষ্ঠানগুলো আপলোডের কাজ চলছে। প্রতিদিনই দশর্করা কিছু না কিছু পাবেন।


মোবাইল অ্যাপে যাওয়ার ইচ্ছ আছে কি না?

আছে। কিন্তু এনালগে তা পারবো না। এটার জন্য আমাকে পুরোপুরি ডিজিটাল হতে হবে।

বিটিভিতে অনুষ্ঠান প্রচারে তদবির সংস্কৃতির প্রচলন রয়েছে বলে শোনা যায়?

এখানে প্রচুর লোক স্ক্রিপ্ট দেয়। বিটিভিকে সবাই মনে করে আমিই মালিক। আমি গান করি না করি, সেটা বড় কথা নয়। বিটিভিতে গান করতে হবে। কিন্তু এটা তো জাতীয় চ্যানেল। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যানেল এবং সবচেয়ে সমৃদ্ধ চ্যানেল, এটা আবার সবাই বুঝতে চায় না। তদবির করে, কিন্তু সেটা আমার জন্য খুব একটা সমস্যা না। তদবির না শুনলে আমার খুব অসুবিধা হবে এরকম অবস্থা গেত দেড় বছরে তৈরি হয়নি।

এখন তো তিনটি চ্যানেল, দুটো স্টেশন। সামনে কী আরো চ্যানেল ও স্টেশন বাড়ানোর পরিকল্পনা আছে?

সরকারের একটা পরিকল্পনা রয়েছে আরো ছয়টি আঞ্চলিক স্টেশন করার। রংপুর, রাজশাহী, সিলেট, ময়মনসিংহ, বরিশাল ও খুলনায়। সেটা এখনো পরিকল্পনা পর্যায়ে রয়েছে।


চট্টগ্রামে তো ছয় ঘণ্টা নিজস্ব অনুষ্ঠান চলছে?

ওখানেও আমাদের জনবল সংকট আছে এবং অনুষ্ঠানের সংকট আছে। আমরা শুধু কেনা অনুষ্ঠানের উপর নির্ভর করতে পারি না। কেনা অনুষ্ঠানে সমস্যা হয় কী— ওই যে বললাম সবাই মনে করে আমি এটার মালিক। প্রাইভেট চ্যানেলকে ওটা মনে করে না। এখন আমরা ঈদের নাটকে বললাম আপনারা নাটক দেন। সেখানে বেসরকারি নির্মাতাদের পাঁচটা নাটক চালাবো, পাঁচটায় হয় তো প্রেমের নাটক। আমি তো বৈচিত্যময়তা দিতে পারি না। আমি তো নির্মাতাকে বাধ্য করতে পারি না ঈদের হাসির নাটক দেন। কিন্তু এটা তার সেন্স। আমাদের এখানে সবধরনের দর্শকের কথা ভাবতে হয়, সববয়সী দর্শকের কথা ভাবতে হয়। শহুরে দর্শকের কথা ভাবতে হয়, একদম প্রান্তিক দর্শকের কথাও ভাবতে হয়। সে ভাবনার ফলে হয় কী— আমাদেরকে অনুষ্ঠান বাছাইয়ে খুবই সতর্ক হতে হয়। আমরা যে খুব সতর্ক সবসময় হতে পারি, তা না। এটা আমাদের বিভিন্ন কারণে হওয়া সম্ভব হয় না। তারপরও আমরা হওয়ার চেষ্টা করছি।

প্রতিষ্ঠানটির আর্থিকভাবে আয় আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে বলা হয়। আসলে কী?

আমাদের তো আর্থিক লাভ-ক্ষতির হিসাব করতে হয় না। সরকার আমাদের সে দায়িত্ব দেয়নি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম টেলিভিশনে ছয় ঘণ্টা সম্প্রচার উদ্বোধনের সময় বলেছিলেন, ‘লাভ-ক্ষতির হিসাব বিটিভি করে না। মানুষকে কতটা উদ্বুদ্ধ করতে পেরেছে, কতটা সচেতন করতে পেরেছে।’ তারপরও যদি বলি আমরা বছরে একশ কোটি টাকার উপরে আয় করি। এখন কেন কমে গেল? ওই একই কারণে, আগে বিজ্ঞাপনওয়ালাদের বিটিভি ছাড়া উপায় ছিল না। এখন তাদেরও অপশন বেড়ে গেছে। প্রতিটা টেলিভিশন সেটের জন্য বছরে ৫০০ টাকা করে বিটিভিকে দিতে হতো। সরকার সেটা তুলে দিয়েছে। তুলে না নিলে বিটিভি পাঁচ কোটি টিভি সেট থেকে পাঁচশ কোটি টাকা আয় করতো। কিন্তু সরকার তো বিটিভি আয়ের জন্য তৈরি করেনি। আমরা কৃষকের জন্য অনুষ্ঠান করি। আমরা যত সামাজিক সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান করি, অন্য কেউ করে না। আমরা তো বাণিজ্যিক না। ডায়রিয়ার ক্যাম্পেইন ‘ঘোটা’ এটা বিটিভিই জনপ্রিয় করেছে। মিনাকে দিয়ে বিভিন্ন বিষয় জনপ্রিয় করেছে। জাতীয় হাত ধোয়া, পরিবার পরিকল্পনা, ভিটামিন, বজ্রপাত থেকে কিভাবে মুক্ত থাকা যায়, এসব ক্যাম্পেইন আমরাই করি। জঙ্গিবাদ বিরোধী অনুষ্ঠান বিটিভিই করে। আমরা কিন্তু বেসরকারি টেলিভিশনকে সার্ভিস দেই বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সরাসরি সম্প্রচারের ফিড দিয়ে।

এ ফিডের জন্য কোনো ফি দেয় না তারা?

না, বিটিভি তাদের বিনা খরচে এ সার্ভিস দেয়। এমনকি প্রতিদিন একবার সংবাদ সম্প্রচার কিংবা কোন ফুটেজ ব্যবহারের জন্যও কোনো ফি নিই না আমরা।

আপনি বলছেন সরকারি বিভিন্ন ক্যাম্পেইন আপনারাশুধু করে থাকেন। কিন্তু অনেক বড় বড় প্রজেক্ট তো বেসরকারি চ্যানেলে চলে যাচ্ছে কিংবা তাদের সাথে যৌথভাবে করতে হচ্ছে, কেন?

এটাকে আমি খারাপভাবে দেখি না। প্রত্যেকে প্রত্যেকের অংশীদারিত্ব অনুযায়ী কাজ করবে। আমার মতো করে আমরা কাজ করি। এ মুহূর্তে ছয়টা টেলিভিশন চ্যানেলের সাথে পার্টনারশিপে আমরা কাজ করি। তাদের কনটেন্ট আমরা প্রচার করি এবং আমাদের কনটেন্ট তারা প্রচার করে।

‘যৌথ প্রযোজনায় চলচ্চিত্র নির্মাণ নীতিমালা-২০১৭’ প্রকাশিত হয়েছে। আপনি ওই খসড়া নীতিমালা প্রণয়ন কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। প্রণীত নীতিমালা নিয়ে আপনার মন্তব্য কী? 

কোনো নীতিমালা দিয়ে কাউকেই সম্পূর্ণরূপে সন্তুষ্ট করা যাবে না। যৌথ প্রযোজনার নীতমালার প্রধান উদ্দেশ্য কী? আমি মনে করি দুটো। একটা হচ্ছে, চলচ্চিত্রে বিনিয়োগ। যৌথ প্রযোজনা মানে দুই দেশের প্রযোজনা নয়, এটা আট দেশের প্রযোজনাও হতে পারে। ২০ দেশেরও হতে পারে। দুই নম্বর হচ্ছে, আমাদের শিল্পী ও কলাকুশলীরা এটা দ্বারা উপকৃত হতে পারেন। সার্বিকভাবে আমাদের ইন্ডাস্ট্রি যেন দাঁড়ায়। সেটার জন্য যে নীতিমালা হয়েছে আমি মনে করি, ভালো হয়েছে। আগের নীতিমালাও যে খারাপ ছিল, তা নয়। নীতিমালা প্রয়োগের উপর নির্ভর করে সেটা কতটা ভালো। সবাই দেখে-শুনে এটা ঠিক করে দিয়েছি। তারপরও অনেকে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করবে, এটা স্বাভাবিক। প্রত্যেকে নিজের লাভটা খুঁজে। আর আমরা খুঁজেছি চলচ্চিত্রের লাভ। আমরা কোনো সেগমেন্টের লাভ খুঁজিনি। আমি ফাইনাল করার সাথে অবশ্য সম্পৃক্ত ছিলাম না।

নীতিমালার চেয়ে বড় হচ্ছে ‘চলচ্চিত্র পরিবেশ’। ধরা যাক বাংলাদেশ-ভারত-শ্রীলঙ্কা মিলে একটা যৌথ প্রযোজনা হবে। সেটা পরিচালনা করবে ফ্রান্সের একজন। নীতিমালায় সেটার সুযোগ দেওয়া আছে। দুই দেশের পরিচালক থাকার অপশনও আছে। আবার ধরা যাক স্টিফেন স্পিলবার্গ, তার সাথে বাংলাদেশের একজন পরিচালককে বলা হলো ছবি করো, সে বললো আমি করবো না। আবার কামার আহমদ সাইমনকে বলা হলো গৌতম ঘোষের সাথে ছবি করো। সে বললো, আমি করবো না। আমার তরিকা একরকম, ওনার আরেক রকম। একইভাবে একটা গ্রামের দৃশ্য দেখানোর জন্য শুধু শুধু তিন দেশে শুটিং করতে হবে না। এ সুযোগগুলো রাখা হয়েছে। এটা আমি মনে করি সিনেমার জন্য ভালো।

এখন শাহরুখ খানকে নিয়ে সিনেমা করলে যদি সে বলে আমি দীপিকাকে ছাড়া করবো না। ওর সাথে আমার ক্যামিস্ট্রি ভালো, জয়ার সাথে ভালো হবে না। এগুলো নীতামালায় আছে। কারণ এতো বিধিনিষেধ দিয়ে সিনেমা হয় না। কোনো ক্রিয়েটিভ কাজই হয় না। এখন সিনেমায় পয়সা বিনিয়োগ করতে হয় বলে এতো নীতিমালা। এখন আমি এখানে বসে বসে যদি কিছু লিখি, আমার জন্য কি কোনো নিয়মনীতি আছে? আমি লিখব, মনের মাধুরী মিশিয়ে লিখবো। চলচ্চিত্র যেহেতু মানুষের কাছে যাবে সেহেতু নীতিমালা দেওয়া আছে। আর সরকার যেহেতু চায়, আমাদের দেশের চলচ্চিত্র দাঁড়াক এবং আমাদের দেশের চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরাও চলচ্চিত্র দ্বারা উপকৃত হোক। এখানে টিকে থাকুক। সেজন্যই নীতিমালাটা করে তাদের অধিকার যাতে সংরক্ষিত হয়, সেটা দেখা হয়েছে। তবে নীতিমালা দিয়ে চলচ্চিত্র হবে না, চলচ্চিত্র হবে সৃজনশীলতা দিয়ে।

নাট্যকার, অভিনেতা হিসেবে আপনার আলাদা পরিচয় আছে। আপনার নতুন কী নাটক পাচ্ছি?

টেলিভিশন নাটক খুব একটা লিখি না। কেন জানি এখন আর টানে না। খুব অল্প বয়স থেকে লেখালেখি করেছি। আমি পপুলার লাইনে লেখালেখি করি না। আগে টেলিভিশনে একটা নাটক লিখলে স্মরণীয় হয়ে থাকা যেতো। এখন তো নাটক লেখার পর এসএমএস করতে হয়। আগে একটা আর্থিক ব্যাপারও ছিল। চাকরি-বাকরি এতদিন করার পর সেটা নেই। আরেকটা কারণ হচ্ছে মঞ্চের নাটকটা সিরিয়াসলি লিখছি। মঞ্চে আমার লেখা নাটকের মধ্যে নিয়মিত মঞ্চায়ন হচ্ছে অরণ্যকের ‘স্বপ্নপথিক’, ঢাকা পদাতিকের ‘হেফাজত’, ঢাকা থিয়েটারের ‘পঞ্চনারী আখ্যান’। আরো একটা মঞ্চ নাটক ও বই লিখছি। এছাড়া সাইফুল ইসলাম মাননু পরিচালিত ‘পুত্র’ ছবিটির স্ক্রিপ্ট আমার করা।

এগুলো বই মেলায় আসবে?

না, চাকরি করে আসলে কোনো কিছুকে টার্গেট করে বই বের করা যায় না। যেমন আমি ‘জলদাস’ নাটক লিখেছিলাম ১২ বছর ধরে। টেলিভিশন নাটক লিখেছি সর্বশেষ ‘রূপকথা নয়’।

সাক্ষাতকার পর্ব এখানেই শেষ হয়। এরপর তিনি বিটিভির নির্মিত বেশকিছু নতুন অনুষ্ঠান এ প্রতিবেদককে দেখান। একই সাথে ‘টেলিভিশন মিউজিয়াম’ ঘুরে দেখার আমন্ত্রণ জানান সবাইকে। জানালেন বিটিভির অভ্যন্তরে অবস্থিত মিউজিয়ামটিতে যে কেউ টেলিভিশন সম্পর্কিত কোনো কিছু সংগ্রহে থাকলে বিটিভির সদর দপ্তরে যোগাযোগ করে জমা দিতে পারবেন।

এজেডএস/এএল

 
.



আলোচিত সংবাদ