সুনামগঞ্জের ডলুরায় ৪৮ শহীদ মুক্তিযোদ্ধার পাশে শায়িত মধু মিয়া

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৩ জানুয়ারি ২০১৮ | ১০ মাঘ ১৪২৪

সুনামগঞ্জের ডলুরায় ৪৮ শহীদ মুক্তিযোদ্ধার পাশে শায়িত মধু মিয়া

শাহজাহান চৌধুরী, সুনামগঞ্জ ৩:২০ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৬, ২০১৭

print
সুনামগঞ্জের ডলুরায় ৪৮ শহীদ মুক্তিযোদ্ধার পাশে শায়িত মধু মিয়া

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। পাক হায়েনাদের চোখ রাঙ্গানি খেয়ে লাল সূর্য উঠে বাংলাদেশের পূর্ব আকাশে। অস্ত যায় বিষাদের কালো ছায়া বুকে এঁকে। দুঃস্বপ্ন আর ভীতির অপর নাম হয়ে উঠে ৫৫ হাজার বর্গমাইলে আয়তনের দেশটির। সাড়ে ৭ কোটি বাঙ্গালীর জীবনে নেমে আসে হায়েনাদের কালো থাবা। লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে যায় স্বপ্ন রঙ্গিন দিন গুলি। ভয় মাখা আর্তনাদ-চারিদিকে বিকট শব্দ, কামানের ছোঁড়া গুলি কিংবা বোমা বিষ্ফোরণ। ঘুম ভেঙ্গেই শুরু হয় দিগবিদিক ছুটোছুটি। যুদ্ধ চলছে, বাংলার মুক্তিযোদ্ধারা কেউ কেউ পাক হানাদার বাহিনী হাতে আহত হন বা বিসর্জন দেন প্রাণ। পথে ঘাটে পড়ে থাকে নিস্প্রাণ দেহ। এই হতাহতদের দেখভাল কিংবা দাফনের ব্যবস্থা কোথায় হবে, কে করবে? এমন প্রশ্ন অনেকের মনে ঘুরপাক খায়, কিন্তু সমাধান কোথায় ?

দেশের আর সব অঞ্চলের মতো সুনামগঞ্জের জাহাঙ্গীর নগর ইউনিয়নের দৃশ্য অনেকটা এরকমই ছিলো। সমাধানের পথ খুঁজতে থাকেন একজন-ডুলুরার মধু মিয়া। তিনি সে সময়ে আনসার কমান্ডার ছিলেন। অস্ত্র চালনার প্রাথমিক ধারনা ছিলো তার। এ সামান্য জ্ঞান আর আধুনিক অস্ত্র থেকেই গুলির সামনে মোকাবেলা করতে থাকে পাক হানাদারদের। স্বজনদের মায়ার বাঁধন এড়িয়ে মধু মিয়া ঝাঁপিয়ে পড়েন দেশ রক্ষায়। পরিবার পরিজন রেখে আসেন ভারতের মেঘালয় রাজ্যের বালাটে। চলতে থাকে তার শত্রু নিধনের মিশন। পাশাপাশি আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা সেবায় নিজে এগিয়ে আসেন। এর মধ্যে পাকবাহিনী নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালায়। প্রাণ হারাতে থাকেন মুক্তিযোদ্ধারা। তাদের দাফনের ব্যবস্থাও করেন মধু মিয়া। নিজ গ্রাম ডলুরায় শহীদদের দাফন করেন। কোন প্রসংশা কুড়ানো কিংবা নাম ছড়ানোর মোহ ছিল না তার। ডলুরায় সরকারী ১ একর ৬০ শতক জমিতে তাদেরকে সমাহিত করেন। তার কারণে ৪৮জন মুক্তিযোদ্ধা শেষে ঘুমের জন্য ঠিকানা পেয়েছেন। পথে ঘাটে পড়ে থাকতে হয়নি। এমন সংগ্রামী আর সাহসী বীর মুক্তিযোদ্ধার বদৌলতে মেঘালয় পাহাড় ঘেঁষা বাংরাদেশের সীমান্ত এলাকা ডলুরা গ্রামে আজ ঘুমিয়ে আছেন বাংলার ৪৮ জন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা।

মধূ মিয়ার মেয়ে মমতা বেগম পরিবর্তন ডটকমকে জানান, তার বাবা মধু মিয়ার কাছ থেকে গল্প শোনা অভিজ্ঞতা থেকে জানান, যুদ্ধ শেষে বিজয় পতাকা উড়ে বাংলার মাটিতে, আনাচে- কানাচে। বিজয় উল্লাস করেন মধু মিয়াও। এরপর পরিবারকে ফিরিয়ে আনেন ভারতের বালাট থেকে।

২০০৪ সালের ১৬ মার্চ মুক্তিযোদ্ধা মধু মিয়া প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তাকেও ৪৮ শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে সমাহিত করা হয়। তিনি রেখে গেছেন স্ত্রী হেলেনা আক্তার, ছেলে রফিক মিয়া ও মেয়ে মমতা বেগমসহ অসংখ্য আত্মীয় স্বজন। প্রায় ১০ বছর আগে একমাত্র ছেলে আকস্মিকভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। মুক্তিযোদ্ধা মধু মিয়ার স্ত্রী ও মেয়ে বর্তমানে বসবাস করছেন সুনামগঞ্জ পৌর শহরস্থ ধুপাখালী আবাসিক এলাকায়।

সুনামগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার আবু সুফিয়ান পরিবর্তন ডটকমকে জানান, মুক্তিযুদ্ধা চলাকালীন আনসার কমান্ডার মধু মিয়া যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের ডলুরায় রেডক্রসের চিকিৎসা কেন্দ্রে নিয়ে যেতেন। আর যারা শহীদ হতেন তাদের ডলুরায় সমাহিত করতেন । মুসলমান মুক্তিযোদ্ধাদের দাফনের ব্যবস্থা করতে স্থানীয় মৌলভী দিয়ে। তিনি আরো জানান, সে সময়ে ওই এলাকায় কোন হিন্দু পুরোহিত ছিলেন না। নেপু ঠাকুর নামের এক ভদ্র লোককে দিয়ে হিন্দু মুক্তিযোদ্ধাদের দাহ কার্য সম্পন্ন করতেন মধু মিয়া। দেশ স্বাধীনের পর নেপু ঠাকুর ভারত চলে যান। আবু সুফিয়ান আরো বলেন, যুদ্ধ চলাকালীন মধু মিয়ার অবদান চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

এসসি/আরজি

print
 
.

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad