যে বাঙালিরা গল্পকেও হার মানিয়েছেন: পর্ব ৫

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৭ | ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৪

যে বাঙালিরা গল্পকেও হার মানিয়েছেন: পর্ব ৫

খালিদ বিন আনিস ৩:০১ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৪, ২০১৭

print
যে বাঙালিরা গল্পকেও হার মানিয়েছেন: পর্ব ৫

পৃথিবীর পূর্ব থেকে পশ্চিম কিংবা উত্তর থেকে দক্ষিণ, আকাশ কিংবা মহাকাশ, জল কিংবা স্থল এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যেখানে বাঙালির অবদান নেই। বিশ্বের বুকে বাঙালির অবদান কোনো অংশেই কম নয়। অনেক ক্ষেত্রেই বাঙালিরা তাদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ রেখেছেন। কিন্তু এদের অনেকেই আছেন যাদের সম্পর্কে বাঙালিরা জানেনই না কিংবা জানলেও পুরো তথ্য জানেন না, আর জানলেও প্রচারের অভাবে তা ধীরে ধীরে স্মৃতির আড়ালে চলে যাচ্ছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখা এমন কিছু বাঙালির তথ্য নিয়ে পরিবর্তন ডটকমের বিশেষ আয়োজন- যে বাঙালিরা গল্পকেও হার মানিয়েছেন! এবারের পর্বে থাকছে বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের আত্মত্যাগের দুর্ধর্ষ কাহিনী।

.

দেশ মাতৃকার টানে যে যারা নিজেদের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন বীর শ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান অবশ্যই তাদের মধ্যে প্রথম সারিতে রয়েছেন। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে চরম সাহসিকতা আর অসামান্য বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ যে ৭ জন বীরকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান “বীরশ্রেষ্ঠ” উপাধিতে ভূষিত করা হয় তিনি তাদের মধ্যে অন্যতম।

মতিউর রহমান ১৯৪১ সালের ২৯ অক্টোবর পুরান ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈতৃক নিবাস নরসিংদী জেলার রায়পুরা থানার রামনগর গ্রামে। যা এখন মতিনগর নামে পরিচিত। বাবার নাম মৌলভী আবদুস সামাদ এবং মা সৈয়দা মোবারকুন্নেসা খাতুন।

শৈশবে তিনি ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল থেকে ষষ্ঠ শ্রেণী পাস করার পর সারগোদায় পাকিস্তান বিমান বাহিনী পাবলিক স্কুলে ভর্তি হন। ডিস্টিংকশনসহ মেট্রিক পরীক্ষায় সাফল্যের সাথে তিনি প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন।

এরপর তিনি ১৯৬১ সালে পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৬৩ সালে রিসালপুর পি,এ,এফ কলেজ থেকে পাইলট অফিসার হিসেবে কমিশন লাভ করেন। এরপর তিনি করাচির মাসরুর বিমান ঘাঁটির ২ নম্বর স্কোয়ার্ডন এ জেনারেল ডিউটি পাইলট হিসাবে নিযুক্ত হন।

এখানেই তিনি টি-৩৩ জেট বিমানের উপর কনভার্সন কোর্স সম্পন্ন করেন এবং ৭৫.৬৬% নম্বর পেয়ে উর্ত্তীর্ণ হন। এরপর মতিউর রহমান এফ-৮৬ স্যাবর জেট এর উপরেও কনভার্সন কোর্স করেন এবং ৮১% নম্বর পেয়ে উর্ত্তীর্ণ হন। বৈমানিক কনভার্সন কোর্সে ভালো ফলাফলের ভিত্তিতে তাকে পেশোয়ারে ১৯ নং স্কোয়ার্ডনে পাঠানো হয়।

১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় তিনি ফ্লাইং অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এরপর মিগ কনভার্সন কোর্সের জন্য পুনরায় সারগোদায় যান। সেখানে ১৯৬৭ সালের ২১ জুলাই তারিখে একটি মিগ-১৯ বিমান চালানোর সময় আকাশে সেটি হঠাৎ বিকল হয়ে গেলে দক্ষতার সাথে প্যারাসুট নিয়ে মাটিতে অবতরণ করেন।

ওই বছরই তিনি ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট পদে পদোন্নতি লাভ করেন। ইরানের রাণী ফারাহ দিবার সম্মানে পেশোয়ারে অনুষ্ঠিত বিমান মহড়ায় তিনি ছিলেন একমাত্র বাঙালি পাইলট। রিসালপুরে দু'বছর ফ্লাইং ইন্সট্রাক্টর হিসাবে কাজ করার পর ১৯৭০ এ বদলি হয়ে আসেন জেট ফ্লাইং ইন্সট্রাক্টর হয়ে।

১৯৭১ সালের শুরুতে অর্থাৎ জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে মতিউর রহমান সপরিবারে ঢাকায় দুই মাসের ছুটিতে আসেন। ২৫ মার্চের কালরাতে তিনি ছিলেন রায়পুরের রামনগর গ্রামে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে, পাকিস্তান বিমান বাহিনীর একজন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট হয়েও অসীম ঝুঁকি ও সাহসিকতার সাথে ভৈরবে একটি ট্রেনিং ক্যাম্প খোলেন৷ সেখানে যুদ্ধ করতে আসা বাঙালি যুবকদের তিনি প্রশিক্ষণ দেন। এছাড়া তিনি দৌলতকান্দিতে জনসভা করেন এবং বিরাট মিছিল নিয়ে ভৈরব বাজারে যান। মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা অস্ত্র দিয়ে গড়ে তোলেন প্রতিরোধ বাহিনী। পাকিস্তানী সৈন্যরা ভৈরব আক্রমণ করলে বেঙ্গল রেজিমেন্টে তিনি ই,পি,আর’এর সঙ্গে থেকে প্রতিরোধ বুহ্য তৈরি করেন।

১৯৭১ সালের ১৪ এপ্রিল পাকিস্তানি বিমান বাহিনী এফ-৮৬ স্যাবর জেট থেকে তাদের ঘাঁটির উপর বোমাবর্ষণ করে। মতিউর রহমান এমনটি আশঙ্কা করেছিলেন৷ তাই আগেই ঘাঁটি পরিবর্তন করায় মতিউর রহমানসহ তার বাহিনী জানমালের ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পায়।

এরপর ১৯৭১ সালের ২৩ এপ্রিল তিনি ঢাকা আসেন এবং ৯ মে সপরিবারে করাচি ফিরে যান। তার উদ্দেশ্য ছিল কর্মস্থলে ফিরে গিয়ে জঙ্গি বিমান দখল করে তা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া।

কর্মস্থলে মতিউর রহমানকে তখন বিমানের সেফটি অফিসারের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো। তিনি বিমান দখলের জন্য ১৯৭১ সালের ২০ আগস্ট তারিখকে বেছে নেন। সেদিন রাশেদ মিনহা্জ নামে ২১ বছর বয়সী একজন শিক্ষানবীশ পাইলটের প্রশিক্ষণের কথা ছিল। মহান এই বীর বাঙালির পরিকল্পনা ছিল, কন্ট্রোল টাওয়ারের অনুমতি পেয়ে গেলে তিনি মিনহাজের কাছ থেকে বিমানটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেবেন।

পরিকল্পনা অনুসারে অফিসে এসে শিডিউল টাইমে গাড়ি নিয়ে চলে যান রানওয়ের পূর্ব পাশে। সামনে দুই সিটের সেই প্রশিক্ষণ বিমান। পাইলট রাশেদ মিনহাজ বিমানটি নিয়ে দ্বিতীয় বারের মত একক উড্ডয়নের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কন্ট্রোল টাওয়ার ক্লিয়ারেন্সের পর মিনহাজ বিমানটি নিয়ে রানওয়েতে উড্ডয়নের প্রস্তুতি নিলে মতিউর রহমান সেফটি অফিসারের ক্ষমতাবলে বিমানটি থামাতে বলেন।

মিনহাজ বিমানটি থামান এবং জঙ্গি বিমানের বৈমানিকদের বসার স্থানের উপরের স্বচ্ছ আবরণ খুলে বিমান থামানোর কারণ জানতে চান। এসময় মতিউর রহমান বিমানের ককপিটে চড়ে বসেন এবং রাশেদ মিনহাজকে ক্লোরোফর্ম দিয়ে অচেতন করে ফেলেন।

কিন্তু জ্ঞান হারানোর আগে রাশেদ মিনহাজ কন্ট্রোল রুমকে জানিয়ে দেন যে তাকেসহ বিমানটি ছিনতাই হয়েছে। বিমানটি ছোট পাহাড়ের আড়ালে থাকায় কেউ দেখতে না পেলেও কন্ট্রোল টাওয়ার মিনহাজের বার্তা ঠিকই শুনতে পায়।

ফলে রাডারে অবস্থান দেখে ৪টি জঙ্গি বিমান মতিউর রহমানের বিমানকে ধাওয়া করে। মৃত্যু আসন্ন জেনেও মতিউর রহমান বিমানটি নির্ধারিত সীমার নিচে চালিয়ে রাডারকে ফাঁকি দিয়ে বাংলাদেশে আসার চেষ্টা করেন।

কিন্তু ভারতের সীমান্তের প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া অবস্থায় রাশেদ মিনহাজের জ্ঞান ফিরে আসে। বিমানটির নিয়ন্ত্রণ সে নিতে চেষ্টা করে। এ সময় রাশেদের সাথে মতিউরের ধ্বস্তাধস্তি চলতে থাকে এবং এক পর্যায়ে রাশেদ ইজেক্ট সুইচ চাপলে মতিউর বিমান থেকে ছিটকে পড়েন।

কম উচ্চতায় থাকার ফলে রাশেদকে নিয়ে বিমানটি ভারতের সীমান্ত থেকে মাত্র ৩৫ মাইল দূরে থাট্টা এলাকায় বিধ্বস্ত হয়। আর ছিটকে যাওয়া মতিউর রহমানের সঙ্গে কোনো প্যারাসুট না থাকায় তিনি নিহত হন। তার মরদেহ ঘটনাস্থল হতে প্রায় আধা মাইল দূরে পাওয়া যায়।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকার মতিউর রহমানকে তার সাহসী ভূমিকার জন্য বীরশ্রেষ্ঠ উপাধিতে ভূষিত করে। পাকিস্তান সরকার মতিউর রহমানের মরদেহ সেসময় করাচির মাসরুর বেসের চতুর্থ শ্রেণীর কবরস্থানে সমাহিত করেছিল। পরবর্তীতে ২০০৬ সালের ২৪ জুন বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের দেহাবশেষ পাকিস্তান থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে ফিরিয়ে আনা হয়। তাকে পূর্ণ মর্যাদায় পরদিন শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হয়।

বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর যশোর ঘাঁটি তার নামে নামকরণ করা হয়েছে। বিমান বাহিনী তার নামে একটি ট্রফি চালু করেছে। বিমান প্রশিক্ষণে সেরা কৃতিত্ব প্রদর্শনকারীকে এই পুরস্কার প্রদাণ করা হয়।

কেবিএ

print
 

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad