যে বাঙালিরা গল্পকেও হার মানিয়েছেন: পর্ব ৩

ঢাকা, বুধবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭ | ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৪

যে বাঙালিরা গল্পকেও হার মানিয়েছেন: পর্ব ৩

খালিদ বিন আনিস ৫:৫০ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১২, ২০১৭

print
যে বাঙালিরা গল্পকেও হার মানিয়েছেন: পর্ব ৩

পৃথিবীর পূর্ব থেকে পশ্চিম কিংবা উত্তর থেকে দক্ষিণ, আকাশ কিংবা মহাকাশ, জল কিংবা স্থল এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যেখানে বাঙালির অবদান নেই। বিশ্বের বুকে বাঙালির অবদান কোনো অংশেই কম নয়। অনেক ক্ষেত্রেই বাঙালিরা তাদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ রেখেছেন। কিন্তু এদের অনেকেই আছেন যাদের সম্পর্কে বাঙালিরা জানেনই না কিংবা জানলেও পুরো তথ্য জানেন না, আর জানলেও প্রচারের অভাবে তা ধীরে ধীরে স্মৃতির আড়ালে চলে যাচ্ছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখা এমন কিছু বাঙালির তথ্য নিয়ে পরিবর্তন ডটকমের বিশেষ আয়োজন- যে বাঙালিরা গল্পকেও হার মানিয়েছেন! এবারের পর্বে থাকছেন আপনার শিশুকে টিকা দিনকর্মসূচির প্রণেতা ড: এ, কে, এম লুতফর রহমান তালুকদার।

.

শুধু বাংলাদেশেই নয়, টিকাদান কর্মসূচির কারণে এশিয়ার অনেক দেশেই শিশুদের মধ্যে হাম, পোলিও কিংবা ধনুস্টংকারের মতো রোগ আর হতে দেখা যায় না। বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচীর এই সাফল্যের পেছনে যার নাম জড়িয়ে রয়েছে তা ক’জন মানুষ জানেন?

ড: এ, কে, এম লুতফর রহমান তালুকদার বাংলাদেশে যুগান্তকারী “আপনার শিশুকে টিকা দিন” প্রকল্পটি শুরু করেছিলেন। যে সাফল্যে অনুপ্রাণীত হয়ে অনেক দেশই এমন কর্মসূচী চালু করে।

ইমুনাইজেশানের অবিশ্বাস্য সাফল্যের কারণে চিকিৎসা শ্রাস্ত্রে বাংলাদেশকে পৃথিবীর বিস্ময় হিসেবে ধরা হয়। টিকাদান কর্মসূচির এই সাফল্যের পেছনে এই বাঙালি অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন। বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশুকে টিকা দেয়ার বিষয়টি কোনো প্রতিষ্ঠান কিংবা সরকারের মাথায় আগে আসেনি। যার মাথায় এসেছিল তিনি লুতফর রহমান।

তিনিই সবার আগে বুঝেছিলেন এবং অন্যদের বুঝিয়েছিলেন যে সুস্থ্য শিশু একটি কিংবা দু’টিই যথেষ্ট। শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন এই কথাটাই যে, পরিবারের শিশুদের মধ্যে ২ থেকে ৩ জন সংক্রামক রোগে মারা যাবে এমন আশঙ্কায় বেশি সন্তান নেবার প্রয়োজন নেই।

কেননা, সঠিক সময়ে সঠিক টিকা গ্রহণ করলে শিশুদের সংক্রামক রোগে মৃত্যুর হার শূন্যে নেমে আসবে। একজন সরকারি কর্মচারী হয়েও তিনি যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তহবিল ভিত্তিক অনেক সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানই তা নিতে চায়নি।

মানবদেহে কোনো জ্বীবাণু প্রবেশ করলে তা প্রতিরোধের জন্য কৃত্রিমভাবে যে উপাদান প্রয়োগ করা হয় তাই ভ্যাক্সিন বা টিকা। পুরো পৃথিবীতে স্মল পক্স রোগ সম্পূর্ণ নির্মূল করা সম্ভব হয়েছে এই টিকাদানের মাধ্যমেই। এমনকি পোলিও, হাম এবং ধনুষ্টংকারের মতো কঠিন রোগও আজ নির্মূল করা সম্ভব হচ্ছে এই টিকাদানের মাধ্যমেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে এমন ২৫টি রোগ রয়েছে যা ভ্যাক্সিনেশনের মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব।  

ড. লুতফর রহমান ভ্যাক্সিনেশন বা টিকাদান কর্মসূচির গুরুত্ব তুলে ধরতে সফল হওয়ায় ১৯৭৯ সালের ৭ এপ্রিল দেশে প্রথমবারের মতো যাত্রা শুরু করে ইপিআই প্রকল্প। ‘আপনার শিশুকে টিকা দিন’ নামের যুগান্তকারী প্রকল্পটি তিনিই শুরু করেছিলেন।

বর্তমানে বিভিন্ন সরকারী ও বেসরকারী সংস্থার অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে বাংলাদেশে ৯০ শতাংশের বেশি শিশুকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে।  প্রকল্পটির সাফল্যের কারণে ১৯৯০ সাল থেকে এই প্রকল্পে ভিটামিন এ ক্যাপসুল যুক্ত করা হয়। ১৯৯৩ সাল থেকে মায়েদের ৫ ডোজের ধনুষ্টংকার ভ্যাক্সিন এবং ২০০৩ সালে হেপাটাইটিস’এর টিকা দেয়া শুরু হয়।

ভ্যাক্সিনেশনের সাফল্যের বিচারে এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ অনেকটাই এগিয়ে। যে সাফল্যের পথ তৈরি করে দিয়েছিলেন নিভৃতচারী ও ধর্মভীরু ড: এ, কে, এম লুতফর রহমান তালুকদার।

স্মল পক্স নির্মূলে এমন টিকাদান প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বিজ্ঞানী ফ্রাঙ্ক ফেনার অস্ট্রেলিয়ায় ব্যাপক সম্মান পেয়ে থাকেন। একসময় তিনি পৃথিবীব্যাপী স্মল পক্স ইরাডিকেশান প্রকল্পের প্রধানও হয়েছিলেন। তার মৃত্যুতে রাষ্ট্রীয়ভাবে শোক প্রকাশ করা হয়। ফ্রাঙ্ক ফেনারের সম্মানে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের নামকরণ ছাড়াও বিভিন্ন সোসাইটি পরিচালিত হয়।

আর যে মানুষটির উদ্যোগের কারণে এযাবৎ দেশের কোটি কোটি মানব সন্তান সংক্রামক রোগের হাত থেকে রেহাই পেল, পৃথিবীর আলো বাতাস পাওয়ার সৌভাগ্য হল, তাকে অনেকেই চেনেন না।

বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে ড: তালুকদারের “আপনার শিশুকে টিকা দিন”এর সাফল্য কিংবদন্তীর মতো। দু:খজনক হলেও সত্য যে তার সম্পর্কে তেমন একটা তথ্যও পাওয়া যায় না। শুধু জানা যায়, ২০১৪ সালের ২৩ মে বাংলাদেশের যুগান্তকারী "আপনার শিশুকে টিকা দিন" প্রকল্পটির জনক মৃত্যুবরণ করেন।

প্রকৃত দেশপ্রেমিক সম্মানের আশায় কাজ করেন না! এই নিভৃতচারী মানুষটিও কোনো স্বীকৃতির আশায় এই মহান কাজটি শুরু করেননি, করেছিলেন এই দেশটাকে ভালোবেসে। ড. লুতফর রহমান এবং তার উদ্যোগের প্রতি পরিবর্তন পরিবারের পক্ষ থেকে রইল সীমাহীন শ্রদ্ধা।

কেবিএ

print
 

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad