ঠাকুরগাঁওয়ে আ’লীগের কোন্দলের সুবিধা নিতে চায় বিএনপি

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ আগস্ট ২০১৭ | ৬ ভাদ্র ১৪২৪

ঠাকুরগাঁওয়ে আ’লীগের কোন্দলের সুবিধা নিতে চায় বিএনপি

বদরুল ইসলাম বিপ্লব, ঠাকুরগাঁও ৫:২৭ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১২, ২০১৭

print
ঠাকুরগাঁওয়ে আ’লীগের কোন্দলের সুবিধা নিতে চায় বিএনপি

ঠাকুরগাঁও জেলার পাঁচটি উপজেলাকে নিয়ে তিনটি সংসদীয় আসন। তিনটি আসনেই আওয়ামী লীগের শক্ত অবস্থান। তবে অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জর্জরিত আওয়ামী লীগের দুর্বলতার সুবিধা নিতে চায় বিএনপি।

ঠাকুরগাঁওয়ে আছেন বিএনপি মহাসচিবের মতো হেভিওয়েট প্রার্থী। স্থানীয় নির্বাচনেও বিএনপির অর্জন মন্দ নয়। সব কিছু মিলিয়ে এসব আসন উদ্ধারে বদ্ধপরিকর বিএনপি।

ঠাকুরগাঁও-১ (সদর)
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত ঠাকুরগাঁও-১ আসন। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭৩ সাল থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত এ আসনে আওয়ামী লীগের এমপি নির্বাচিত হন। নির্বাচনের এক বছরের মাথায় এমপি খাদেমুল ইসলামের মৃত্যুতে ১৯৯৭ সালে উপ-নির্বাচনে রমেশ চন্দ্র সেন এমপি নির্বাচিত হন।

দলীয় নেতাকর্মীরা অবমূল্যায়নের শিকার হওয়ায় ২০০১ সালে রমেশ চন্দ্র সেন পরাজিত হলে আসনটি চলে যায় বিএনপির ঘরে। এবারও অবস্থা একই। কোন্দলের কারণে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে পরাজিত হন সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অরুনাংসু দত্ত টিটো। সেই থেকে শুরু হয় জেলা আওয়ামী লীগের অন্তর্দ্বন্দ্ব ও গ্রুপিং।

সাবেক পানিসম্পদ মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ থেকে ছিটকে পড়েন। সে পদ দখল করে নেন ঠাকুরগাঁও-২ আসনের এমপি দবিরুল ইসলাম।

পরবর্তীতে রমেশ চন্দ্র সেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য পদে আসীন হলে জেলা আওয়ামী লীগ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন রমেশ চন্দ্র সেন। অপর অংশটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন দবিরুল ইসলাম।

বয়সের কারণে রমেশ চন্দ্র সেনের বিদায়ের কথা শোনা গেলেও তিনি এবারও মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে। এছাড়াও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাদেক কুরাইশি, সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট মকবুল হোসেন বাবু, সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অরুনাংশু দত্ত টিটো, যুব মহিলা লীগের সভাপতি তহমিনা আকতার মোল্লাহ, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের নেতা রাজিউর রাজি খোকন মনোনয়নের জন্য লবিং চালিয়ে যাচ্ছেন।

জেলা শহরে শক্ত অবস্থান এবং কোন্দল না থাকায় সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে বিএনপি। সে কারণে সদর উপজেলা ও পৌরসভা নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করেছে বলে মনে করেন তাদের প্রবীণ নেতারা। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের একক ও পারিবারিক প্রভাব ধরে রাখতে জেলা বিএনপিতে বহুদিন ধরে একক আধিপত্য চলে আসছে। অনেকের যোগ্যতা থাকলেও তাদেরকে গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখা হয় না বলে মনে করেন কেউ কেউ।

এখানে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একমাত্র দলীয় প্রার্থী। তারপরও নবনির্বাচিত জেলা সভাপতি তৈমুর রহমান ডামি প্রার্থী হিসেবে প্রস্তুত রয়েছেন। মির্জা ফখরুল কোনো কারণে প্রার্থী হতে না পারলে তৈমুর রহমান নির্বাচনী মাঠে লড়বেন।

জাতীয় পার্টির রাজিউর রাজি স্বপন প্রেসিডেন্ট এরশাদের একান্ত আস্থাভাজন হিসেবে জাপার মনোনয়নে নির্বাচন করতে চান। সিপিবির মনোনয়নে কমরেড ইয়াকুব আলী এবং জাসদের মনোনয়নে সাংবাদিক মনসুর আলী নির্বাচন করার কথা জানিয়েছেন।

ঠাকুরগাঁও-২ (বালিয়াডাঙ্গী, হরিপুর ও রাণীশংকৈল আংশিক)
বালিয়াডাঙ্গী, হরিপুর উপজেলা ও রাণীশংকৈল উপজেলার দুটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত ঠাকুরগাঁও-২ আসন। এ আসনে ১৯৮৬ সালের নির্বাচনের পর থেকে ৩০ বছর ধরে এমপি নির্বাচিত হয়ে আসছেন জেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান সভাপতি মো. দবিরুল ইসলাম।

দীর্ঘদিন ধরে এমপি থাকায় আওয়ামী লীগকে পরিবারতন্ত্র হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার জন্য তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদ কৌশলে নিজের পরিবারে রেখে দিয়েছেন। তার ছোটভাই মোহাম্মদ আলী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং আরেক ভাই শফিকুল ইসলাম আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান। বড়ছেলে মাজহারুল ইসলাম সুজন উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সাধারণ সম্পাদক, ভাতিজা আকরাম আলী বড়বাড়ি ইউপি চেয়ারম্যান ও যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। আরেক ভাতিজা আসলাম জুয়েল উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং ছোটছেলে মমিরুল ইসলাম সুমন উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি পদে আসীন রয়েছেন।

এমপি দবিরুল নিজেকে ছয়বারের সফল এমপি দাবি করে এবারও মনোনয়ন পাওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় পর্যায়ে জোর লবিং চালাচ্ছেন। পাশপাশি তার ছেলে মাজহারুল ইসলাম সুজন ও ভাই মোহাম্মদ আলী মনোনয়ন পাওয়ার জন্য লবিং চালাচ্ছেন।

মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে আছেন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক প্রবীর কুমার রায়। জনসংযোগ চালিয়ে আসছেন ডাকসুর সাবেক নেতা ও জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাক আলম টুলু। এছাড়াও হরিপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান শামীম ফেরদৌস টগর গণসংযোগ অব্যাহত রেখেছেন।

এ আসনে বিএনপির প্রার্থী ঢাকা কলেজের সাবেক ভিপি জেড মর্তুজা চৌধুরী তুলা। এছাড়াও ড্যাবের কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি ডা. আবদুস সালাম বিএনপির মনোনয়নে নির্বাচন করতে চান। তবে এখানকার বিএনপির নেতাকর্মীরা চান বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল তার বাবার উত্তরসূরি হিসেবে এ আসনে নির্বাচন করুক।

জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা আবদুল হাকিম ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে জামায়াতের মনোনয়নে নির্বাচন করেন। ২০০১ ও ২০০৮ সালে ৪ দলীয় জোটের শরিক হিসেবে নির্বাচন করে অল্প ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন।

এখানে জাতীয় পার্টির মনোনয়নে নির্বাচন করবেন জেলা জাতীয় পার্টির সাবেক সভাপতি মহিলা জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাহী সদস্য নুরুন নাহার বেগম।

ঠাকুরগাঁও-৩ (পীরগঞ্জ ও রাণীশংকৈল আংশিক)
পীরগঞ্জ উপজেলার ১০টি ও রাণীশংকৈল উপজেলার ছয়টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভা নিয়ে ঠাকুরগাঁও-৩ আসন। এ আসনটি আওয়ামী লীগের দুর্গ হিসেবে পরিচিত। ১৯৭৯ থেকে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী এমপি নির্বাচিত হন। তবে ২০০১ সালে আওয়ামী লীগের ইমদাদুল হককে হারিয়ে নির্বাচিত হন জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য হাফিজ উদ্দীন আহম্মদ।

এরপর ২০১৪ সালে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে ওয়ার্কার্স পার্টির জেলা সভাপতি ইয়াসিন আলী এমপি নির্বাচিত হন। বর্তমানে তার কার্যকলাপে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ। এখানকার আওয়ামী লীগের কর্মীরা চান আর জোট নয়, এবার নৌকা প্রতীকে দলীয় প্রার্থী নির্বাচন করতে।

এই আসনটি পুনরুদ্ধারে জোর চেষ্টা চালাচ্ছেন সাবেক এমপি ইমদাদুল হক ও সংরক্ষিত আসনের এমপি সেলিনা জাহান লিটা। সুযোগ নিতে চান ঢাকায় বসবাসকারী রবিউল ইসলাম রবি। তিনি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্য জনসংযোগ চালিয়ে আসছেন।

এছাড়াও বঙ্গবন্ধু জয়বাংলা লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সেক্রেটারি সুজাউল করিম চৌধুরী মনোনয়ন পেতে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে লবিং চালিয়ে আসছেন।

এ আসনে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে কোনো নির্বাচনে বিএনপির কেউ জয়ী হতে পারেনি। তারপরও কিন্তু ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ান বিএনপির প্রার্থী জাহিদুর রহমান। হাফিজ উদ্দীনের কাছে হারলেও সেবার ছয় গুণ ভোট বেশি পান। আসন্ন নির্বাচনে উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুর রহমান বিএনপির চূড়ান্ত প্রার্থী।

এরপরও জেলা বিএনপির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল্লাহ মাসুদও এ আসনে মনোনয়ন পেতে লবিং শুরু করেছেন। ঢাকা মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি কামাল আনোয়ার আহমেদও মনোনয়ন চাইবেন।

জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি হাফিজ উদ্দিন আসন্ন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে মাঠে কাজ করে যাচ্ছেন। নেতাকর্মীদের নিয়ে নির্বাচনী মাঠ ঠিক রাখতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।

বিআইবি/এমএসআই

print
 
nilsagor ad

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad