বিএনপির কর্মীসভায় পিছু ছাড়ছে না মারামারি

ঢাকা, সোমবার, ২৯ মে ২০১৭ | ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪

বিএনপির কর্মীসভায় পিছু ছাড়ছে না মারামারি

মাহমুদুল হাসান ১১:২৫ অপরাহ্ণ, মে ১৯, ২০১৭

print
বিএনপির কর্মীসভায় পিছু ছাড়ছে না মারামারি

আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করতে সারাদেশে ‘কর্মীসভা’ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বিএনপি। এ কর্মীসভাকে কেন্দ্র করে দলের নেতা-কর্মীরা অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জড়িয়ে পড়ছেন। নিজেদের প্রভাব বিস্তার কখনো বা ঠুনকো বিষয় নিয়ে দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সামনে মারামারিতে লিপ্ত হচ্ছেন প্রায় ১০ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটির নেতা-কর্মীরা। তবে রমজানের আগেই বিএনপির কর্মী সভাগুলো শেষ করা হবে বলে জানান দলটির নেতারা।

বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা বলছেন, নিজেদের মধ্যে একটু-আধটু মারামারি করে বিএনপির যে নেতাকর্মী আছে তার জানান দেওয়া হচ্ছে। আবার কেউ বলছেন, বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কিছু মত-পার্থক্য থাকতে পারে, এটা তেমন কিছু নয়। অনেকে বলছেন, এখানে সরকার উসকানি আছে কারণ বিভিন্নভাবে বিএনপিকে ধ্বংস করতে চায় সরকার। যে কারণে গণতান্ত্রিক কর্মসূচিতেও বাধা দেওয়া হচ্ছে। দলের কর্মীসভায় ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে বাধার অভিযোগ থাকলেও অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, নিজেদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিএনপি নেতা-কর্মীরা দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ছেন। এরজন্যে কোনো কোনো নেতাকে দল থেকে সাময়িক বহিষ্কারও করা হয়েছে।

দলের কর্মীসভাকে কেন্দ্র করে বিএনপি নেতা-কর্মীরা মারামারিতে লিপ্ত হচ্ছেন এমন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘বড় দলগুলোর মধ্যে এমনটা হয়েই থাকে। যা হচ্ছে এতে বোঝা যায় বিএনপির নেতা-কর্মী আছে। তাছাড়া নেতৃত্বে দ্বন্দ্ব থাকতেই পারে। এসবের মধ্যে সাংগঠনিক কাজ চালিয়ে যেতে হবে।’

দলের ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আহমদ আজম খান পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে চরমভাবে স্বৈরাচারী শাসন চলছে। যে দলটি ৫ বার রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিল এমন একটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলকে তাদের সাংগঠনিক দলীয় কার্যক্রমে বাধা দেওয়া হয়, মামলা-হামলা দেওয়া হয়। এই জন্য নির্দিষ্ট সময় বেধে দিয়ে কাজ শেষ করা যায় না।’

তিনি বলেন, ‘দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম একটি চলমান প্রক্রিয়া। কর্মীসভা শেষ হয়ে গেলে আবারও নেতাদের জেলা সফরে যেতে হতে পারে। আশাকরি আগামী রমজানের আগেই কর্মীসভাগুলো শেষ হয়ে যাবে।’

অভ্যন্তরীণ কোন্দল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বড় বড় রাজনৈতিক দলে কিছু মতপার্থক্য থাকতেই পারে। সরকারের উসকানিতে মারামারি হচ্ছে।  সরকার মনে করে বিএনপিকে ধ্বংস করতে পারলেই তারা ক্ষমতায় থাকতে পারবে। এসব বাস্তবতা মেনেই আমাদের কাজ করে যেতে হবে। দলীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে ‘মারামারি বড় কোনো বিষয় নয়’ বলেও মনে করেন বিএনপির এই নেতা।

বিএনপিকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করাসহ আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে সারাদেশে এ ‘কর্মী সভা’ কর্মসূচি হাতে নেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। এরই অংশ হিসেবে গত ২২ এপ্রিল থেকে ৭ মে এই সময়ের মধ্যে দেশের ৭৭টি সাংগঠনিক জেলায় কর্মী সভা করার জন্যে কেন্দ্রীয় নেতাদের নেতৃত্বে ৫১টি দল গঠন করে বিএনপি। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কর্মী সভাগুলো শেষ করতে পারেনি দলটি।

কর্মীসভা সম্পর্কে জানতে চাইলে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘ইতোমধ্যে সারাদেশে প্রায় ৭০ শতাংশ জেলায় বিএনপির কর্মীসভা সম্পূর্ণ হয়েছে।  আমাদের টার্গেট আগামী রমজানের আগেই এ সভাগুলো শেষ করা।’

তিনি বলেন, ‘নেত্রকোনা জেলায় আগামী ২৫ মে বিএনপির কর্মীসভা অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া ময়মনসিংহ জেলায় নতুন কমিটি গঠন করার পর কর্মীসভা করা হবে।’

কর্মসূচি ঘোষণার পর গত ২৮ এপ্রিল প্রথম কর্মীসভা হয় কিশোরগঞ্জে। এরপর পর্যায়ক্রমে ঠাকুরগাঁও, ঝিনাইদহ, পিরোজপুর, ঢাকা জেলা, চট্টগ্রাম উত্তর জেলা, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা, চট্টগ্রাম মহানগর ও যশোরে কর্মীসভা হয়েছে। তবে অধিকাংশ জেলায় নিজেদের মধ্যে মারামারি করে বিএনপি নেতা-কর্মীরা। এছাড়া পুলিশের অনুমতি না পাওয়ায় নাটোরসহ দুই এক জেলায় বিএনপি কর্মীসভা করতে পারেনি বলে দলটির দফতর সূত্রে জানা গেছে।

গত ২ মে চট্টগ্রাম উত্তর এবং ৩ মে দক্ষিণের কর্মীসভা দলীয় কোন্দলের কারণে মারামারিতে পণ্ড হয়ে যায়। পরে ৪ মে মহানগর বিএনপির কর্মী সভা অনুষ্ঠিত হয়। চট্টগ্রাম উত্তর, দক্ষিণ ও মহানগরের দায়িত্বে ছিলেন বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তবে চট্টগ্রামের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে বুধবার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দলীয় শৃঙ্খলা বিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার সুস্পষ্ট অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক গাজী শাহজাহান জুয়েল এবং চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সদস্য সচিব কাজী আব্দুল্লাহ আল হাসানকে বিএনপির সব পর্যায়ের পদ থেকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। এছাড়া বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক (চট্টগ্রাম বিভাগ) মাহবুবুর রহমান শামীমকে তার দায়িত্ব যথাযথভাবে ও সতর্কতার সঙ্গে পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এর আগে ১৫ মে রাতে গুলশান কার্যালয়ে চট্টগ্রামে দলীয় কোন্দলে মারামারিতে কর্মীসভা পণ্ড হয়ে যাওয়ার ঘটনায় নেতাদের ঢাকায় ডেকে এনে ‘সতর্ক’ করেছিলেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া।

গত ৩ মে ঝিনাইদহে বিএনপির নতুন কমিটির কর্মীসভায় দুই পক্ষের সংঘর্ষে অন্তত ১৫ জন আহত হয়। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ফেনীর সাবেক সাংসদ জয়নাল আবেদিনের (ভিপি জয়নাল) উপস্থিতিতে শহরের পৌর কমিউনিটি সেন্টারে এ ঘটনা ঘটে। এরপর গত ৯ মে বিএনপির দু’পক্ষের সংঘর্ষে জয়পুরহাট জেলা বিএনপির কর্মীসভা পণ্ড হয়ে যায়। জয়পুরহাট জেলা টাউন হলে বিএনপির কর্মীসভা শুরু হওয়ার পরপরই দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। সংঘর্ষ চলাকালে বিএনপির চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা সাবেক চীফ হুইপ জয়নুল আবেদীন ফারুক হল রুম থেকে বেরিয়ে যান।

১৩ মে পিরোজপুরে জেলা বিএনপির কর্মীসভা পুলিশের বাধায় পণ্ড হয়েছে। এ সময় পুলিশের লাঠিচার্জে পাঁচ জন আহত হয়েছে। কর্মী সভায় নেতা-কর্মীদের প্রবেশ নিয়ে বাক-বিতণ্ডার এক পর্যায়ে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে সভার অতিথি বিএনপির বিশেষ সম্পাদক আসাদুজ্জামান রিপন, সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট বিলকিস জাহান শিরিন, সহ-সাংগঠনিক আকন কুদ্দুস রহমান পুলিশের বাড়াবাড়িকে দোষারোপ করে সভাস্থল ত্যাগ করেন।

১৪ মে ঢাকা জেলা বিএনপির কর্মী সভায় নেতা-কর্মীদের দুই গ্রুপে হাতাহাতি ও মারামারির কারণে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে প্রধান অতিথির বক্তব্য না দিয়ে হল ছাড়তে হয়। রাজধানীর কাকরাইলে অবস্থিত ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশনের আইইবি মিলনায়তনে সভার আয়োজন করা হয়েছিল।

সর্বশেষ গত ১৬ মে রাজশাহী মহানগরীর পাঠানপাড়া এলাকায় একটি কমিউনিটি সেন্টারে জেলা বিএনপির আয়োজনে সম্মেলন শুরু হয়। সম্মেলনস্থলে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে জেলা বিএনপির দু'গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। চেয়ার ছুড়ে মারার ঘটনায় কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হন। মহানগর বিএনপির সম্মেলন শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে বিএনপির নেতাকর্মীদের মাঝে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বক্তব্য দেওয়ার একপর্যায়ে নেতা-কর্মীদের মিনু ও বুলবুল গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। তাদের সম্মেলনস্থল থেকে বের করে দিলে বাইরে নেতা-কর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন।

ওই সভায় প্রধান বক্তা ছিলেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।

এমএইচ/জেআই/এমডি

print
 

আলোচিত সংবাদ