যে খালে লঞ্চ চলত এখন নৌকাও চলে না!

ঢাকা, সোমবার, ২৯ মে ২০১৭ | ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪

যে খালে লঞ্চ চলত এখন নৌকাও চলে না!

এম জসিম উদ্দিন, বরিশাল  ১১:৪০ পূর্বাহ্ণ, মে ১৯, ২০১৭

print
যে খালে লঞ্চ চলত এখন নৌকাও চলে না!

নদী শাসন আর দখলে আজ তিস্তাও পানিশূন্য প্রমত্তা তিস্তার সেই ভরা যৌবন আর নেই যৌবনহারা তিস্তার বুকে পড়েছে বড় বড় চর যতদূর চোখ যায়, ধু-ধু বালুচর তিস্তার এই অবস্থায় সহজেই অনুমেয় দেশের অন্য নদ-নদী-খালগুলোর কী অবস্থা?

সম্প্রতি পরিবর্তন ডটকম এর প্রতিনিধিগণ দেশের নদ-নদী-খালগুলোর বর্তমান অবস্থা সচিত্র প্রতিবেদনে তুলে ধরেছেন সেই সব প্রতিবেদনে দেখা গেছে- ফারাক্কা বাঁধ, তিস্তা চুক্তি না হওয়া, তিস্তা নদীতে ভারতের গজলডোবা ব্যারেজ এবং নদী শাসন- আর দখলের কারণে বাংলাদেশে অধিকাংশ নদ-নদী-খালগুলো আজ পানিশূন্য

নদ-নদী-খালগুলোর বর্তমান অবস্থার কারণে প্রকৃতিতে, মানুষের জীবনযাত্রায় এবং চাষাবাদ কী বিরুপ প্রভাব পড়েছে তার চিত্রও ফুটে উঠছে এসব সচিত্র প্রতিবেদনে আজ পড়ুন বরিশালের নদী-খালের খবর।

প্রবাদ আছে ধান-নদী-খাল এই তিনে বরিশাল। নদী বেষ্টিত এই বরিশাল নগরীর বুক চিরে বয়ে গেছে ২৩টি খাল। শহরের প্রধান নদী কীর্তনখোলা থেকে উঠে আসা এসব খাল অল্প-বিস্তর গতিপথ পরিবর্তন করে বহু শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত হয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতা আর দখলবাজদের কারণে, নব্যতা হারানোর পাশাপাশি একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে এখানকার কয়েকটি খাল। ওইসব খালের বুকে এখন চলাচল করছে নৌকার পরিবর্তে সড়কযান। শুধু তাই নয় সেখানে গড়ে উঠেছে বড় বড় অট্টালিকা। এতে প্রকৃতির ধারা বাধাগ্রস্ত হওয়ায় নগরীর পরিবেশ ও জন-জীবন ক্রমেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। সেইসঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে খালখ্যাত বরিশালের ঐতিহ্য ও প্রাকৃতিক স্নিগ্ধতা।

স্থানীয় নগরবাসীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, নগরীর বেশ কয়েকটি খাল দিয়ে একসময় যাত্রীবাহী একতলা লঞ্চ, গয়নার নৌকা, পণ্যবাহী ছোট-বড় নৌযান অনায়াসে চলাচল করত। এসব নৌযান চলাচল করায় দূরের অঞ্চল থেকে কম খরচে পণ্যসামগ্রী আনা-নেওয়া সহজ হত। এসব সুবিধার কারণে খালকেন্দ্রিক গড়ে উঠেছে বিভিন্ন হাট-বাজার। নগরবাসী খালের পানি দিয়েই গৃহস্থালির দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কাজ সারতেন। আহরণ করতেন বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। কিশোর-কিশোরী সাঁতার খেলায় মেতে উঠতো বৈচিত্র্যময় এই খালগুলোতে।

অথচ কালক্রমে খালগুলো দখলবাজদের কবলে পড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। মূলত খাল সংরক্ষণের দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা ও কর্তব্য অবহেলায় কতিপয় লোভী ব্যক্তিরা খালের দু’পাড় আত্মসাৎ করতে থাকে। তারা ময়লা-আবর্জনা ও বালি-মাটি দিয়ে ভরাট করে সীমানা বাড়িয়ে নানান স্থাপনা নির্মাণ করায়, ক্রমেই খালগুলোর প্রসস্থতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি হ্রাস পেতে থাকে এর নব্যতা। দখল করা ওই খালগুলো ড্রেনে রূপ নেওয়ায় একবারেই ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে।

সম্প্রতি নগর উন্নয়নের নামে বটতলা এলাকার নবগ্রাম খাল এবং ভাটার খাল ভরাট করে রাস্তাসহ বড় বড় অট্টালিকা নির্মাণ করা হয়েছে। অনেক খালে পানির প্রবাহ নেই বললেই চলে। এতে সামান্য বৃষ্টি হলেই নগরজুড়ে দেখা দেয় জলাবদ্ধতা। শিগগির খালগুলো খনন, সংস্কার ও সংরক্ষণের উদ্যোগ না নিলে এ সমস্যা দূর হবে না বলে মনে করছেন নগরবাসী।

বটতলা এলাকার বাসিন্দা মো. লিটু বলেন, বটতলা বাজারটি গড়ে উঠেছিল নবগ্রাম খালের কারণে। এই খাল দিয়ে ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন কাঁচামাল আনতো। অথচ খালটি ভরাট করে এখন রাস্তা ও ভবন নির্মাণ করায় বাজারটি তার ঐতিহ্য হারিয়েছে, বৃষ্টি হলেই সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা।বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) তথ্যমতে, বরিশাল নগরীতে সরকারের খাস খালের সংখ্যা ২৩টি থাকলেও তাদের জরিপে ৩০টি খাল উল্লেখ রয়েছে। তবে নগরীর জেল খাল এবং লাকুটিয়ার খালের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং খালগুলোর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে ২০১০ সালে স্থানীয় আদালত এবং ২০১৫ সালে উচ্চ আদালতে দুটি মামলা করা হয়। জেলা প্রশাসন, বিসিসি, বরিশাল নৌ-বন্দর ও পরিবেশ অধিদপ্তরকে ওই মামলায় বিবাদী করা হয়। বেলার জরিপে বর্তমানে নবগ্রাম খাল ৩.৫ কি.মি, চাঁদমারি খালটির দৈর্ঘ্য দাঁড়িয়েছে ০.৬ কি.মি,  ভাটার খাল ০.২ কি.মি,  নাপিতের খাল ০.৮ কি.মি,  নথুল্লাবাদ খাল ১.৫ কি.মি এবং টিয়াখালী খাল ৩.৫ কিলোমিটারে।

বেলার বরিশাল জেলা সমন্বয়কারী লিংকন বায়েন পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, নগরীর খালগুলো হলো জনগণের সম্পত্তি। এর দেখাশোনার দায়ভার রাষ্ট্রের। পরিবেশ রক্ষায় সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর অব্যবস্থাপনার প্রেক্ষিতে বেলার পক্ষ থেকে জনগণের কল্যাণে আইনগত চেষ্টা করা হয়ে থাকে।

তিনি বলেন, খালগুলোকে খনন করে অতীতের চেহারায় ফিরিয়ে আনলে বরিশাল একটি বৈচিত্র্যময় নগরী রূপ নেবে। আর পরিবেশ রক্ষায় এই খালগুলো পুনরুদ্ধারে বেলার পক্ষ থেকে চলমান আইনগত যাবতীয় কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

এদিকে বরিশাল সিটি করপোরেশন এবং জেলা প্রশাসন তথ্যমতে, বরিশাল নগরীতে রয়েছে ২৩টি খাল। এগুলোর মধ্যে কয়েকটি খাল বরিশাল শহরের প্রধান নদী কীর্তনখোলা থেকে উঠে নগরীর নানা স্থানে অল্প-বিস্তর গতিপথ পরিবর্তন করে বহু শাখা প্রশাখায় বিভক্ত হয়েছে।

খালগুলো হলো— নগরীর জেল খাল, ভাটার খাল, লাকুটিয়া খাল, হরিণাফুলিয়া খাল, তাজকাঠি খাল, নবগ্রাম খাল, নথুল্লাবাদ খাল, ভেদুরিয়া খাল, সোলনা খাল, টিয়াখালী খাল, জাগুয়া খাল, চাঁদমারি খাল, সাফানিয়া খাল, চৌপাশা খাল, পশ্চিম হরিণাফুলিয়া খাল, কৃষ্ণচুড়া খাল, উত্তর সাগরদি খাল, আমানতগঞ্জ খাল, চর বদনা খাল, নাপিতের খাল এবং সাগরদি খাল।

দখলদারমুক্ত করতে সরকারি খাস খতিয়ানে থাকা এই খালগুলো চিহ্নিত করা হয়। এরপর প্রশাসনের পক্ষ থেকে খালের পাড়ে ব্যানার ও সীমানা পিলার স্থাপন করা হয়। পরে জেলা প্রশাসন, বরিশাল সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ মিলিতভাবে নগরীর জেল খাল অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ কাজ শুরু করে। তবে খাল পুনরুদ্ধারে বাধা হয়ে দাঁড়ায় সহস্রাধিক অবৈধ স্থাপনা। একপর্যায়ে কিছুটা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ও দখলদার মুক্ত করা হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ওহেদুজ্জামান পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, নগরীর কয়েকটি খাল শ্রেণী পরিবর্তন হয়ে গেছে। তবে বিসিসি ও জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে জেল খালের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। টিকে থাকা খালগুলোতে পর্যায়ক্রমে উদ্ধার কার্যক্রম চলবে।

তিনি আরও জানান, জেল খাল খনন ও দু’পাড়ে ওয়াকওয়ে নির্মাণ এবং এর সৌন্দর্যবর্ধনে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রস্তাব রাখা হয়েছিল। এরপর তারা নগরীতে থাকা ২৩টি খালের স্টাডি করে পাঠানোর নির্দেশ দেন। সে অনুযায়ী খালগুলোর স্টাডির কাজ সমাপ্তির পথে। এসব তথ্যাদি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।

পরিবেশবাদী ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, নগরীর সবগুলো খালের দু’পাড় দখলবাজদের কবলে পড়ে নাব্যতা হারিয়েছে। গত বছর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে জেল খালের কিছুটা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ হয়েছে। এটা থেকে আমরা বলতে পারিনা খালটি শতভাগ উদ্ধার করা গেছে। কারণ এই খাল দিয়ে এক সময় যাত্রীবাহী লঞ্চ এবং পণ্যবাহী নৌ-যান চলাচল করত। নগরীর খাল উদ্ধারে রাজনৈতিক দলগুলো কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেনি, এমন কি এ সংক্রান্ত কোন বিবৃতিও দেয়নি তারা।

রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে স্থানীয় নেতারা এগিয়ে আসলেই খাল উদ্ধারের পূর্ণ বাস্তবায়ন সম্ভব। এমন মত ব্যক্ত করে এই পরিবেশবাদী আরও বলেন, নগরীর পরিবেশ দূষণ রোধে খালগুলো স্থায়ীভাবে রক্ষা করতে হলে খাল খননের পাশাপাশি দু’পাড়ে ওয়াকওয়ে করতে হবে। তা না হলে বর্তমানে কোন রকম টিকে থাকা অন্য খালগুলোও দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে এবং বর্তমানে যে খাল উদ্ধারে প্রচেষ্টা চলছে তা ব্যর্থ হতে পারে।

এমন আশঙ্কার প্রেক্ষিতে কথা বললে জেলা প্রশাসক ড. গাজী মো. সাইফুজ্জামান পরিবর্তনকে বলেন, নগরীর জেল খাল অনেকটা দখলমুক্ত করা গেছে। পুরোপুরি উচ্ছেদে আমাদের আরো সচেতন হয়ে কাজ করতে হবে। স্থানীয় গণমানুষের সহযোগিতা এবং বিভিন্ন সংস্থার সহায়তায় এই উদ্ধার কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। খালগুলো সংরক্ষণে খনন ও দু’পাড়ে ওয়াকওয়েসহ সৌন্দর্যবর্ধনের প্রস্তাবনা সংশ্লিষ্ট দফতরে পাঠিয়েছে বিসিসি। এটি আগামী বাজেটে পাস হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বরাদ্দ পেলে খালের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার কার্যক্রম পুরোদমে চলতে থাকবে।

জেইউ/এসএফ/এসবি

print
 

আলোচিত সংবাদ