উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তরা কী আর্থিক ক্ষতিপূরণ পাবেন?

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৭ জুলাই ২০১৮ | ১ শ্রাবণ ১৪২৫

উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তরা কী আর্থিক ক্ষতিপূরণ পাবেন?

আশিক মাহমুদ ৩:৩২ অপরাহ্ণ, মার্চ ১৭, ২০১৮

print
উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তরা কী আর্থিক ক্ষতিপূরণ পাবেন?

নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজ দুর্ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় উড়োজাহাজ দুর্ঘটনা বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। ১৯৮৪ সালের পর বাংলাদেশের ইতিহাসে এতো বড় উড়োজাহাজ দুর্ঘটনা হয়নি বলেও অনেকে দাবি করছেন।

ইউএস-বাংলা উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৫১ জন নিহত হয়েছেন। আর বাকি ২০ জন ভাগ্যবান প্রাণে বেঁচে গেছেন, তাদের অধিকাংশই মারাত্মক আহত অবস্থায় নেপাল, বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

উড়োজাহাজ দুর্ঘটনার তদন্ত স্বভাবতই জটিল প্রক্রিয়া এবং ঠিক কী কারণে এ দুর্ঘটনা সংঘটিত হল তা যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত সম্পন্ন হওয়ার আগ পর্যন্ত বলা যাবে না।

তবে, এই উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় নিহত বা আহতরা কী কোনো ধরনের অর্থিক ক্ষতিপূরণ পাবেন?

যদিও ঘটনার ৬দিন পেরিয়ে গেলেও ইউএস-বাংলা কর্তৃপক্ষ উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক ক্ষতিপূরণের বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। এমনকি সরকারের পক্ষ থেকেও এখনও পর্যন্ত ক্ষতিপূরণের বিষয়ে কোনো ঘোষণা আসেনি।

তবে ইউএস-বাংলা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তরা বীমা কোম্পানি থেকে বেশ কিছু ক্ষতিপূরণ পাবেন। তবে তার পরিমাণ কেমন তা জানাতে পারেননি।

এদিকে, উড়োজাহাজ দুর্ঘটনার পরপরই বীমা দাবি করে সেনা কল্যাণ ইন্স্যুরেন্স কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয়া হয়েছে বলে পরিবর্তন ডটকমকে জানিয়েছেন ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ।

ইউএস-বাংলা কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এভিয়েশন বীমার আওতায় ইউএস-বাংলার যাত্রীসহ সম্পদের সব ঝুঁকি গ্রহণ করেছে সেনা কল্যাণ ইন্স্যুরেন্স। এছাড়াও আন্তর্জাতিক এভিয়েশন বীমা করা হয়েছে ‘কে এম দাস্তুর’ নামের একটি ব্রিটিশ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে।

দুর্ঘটনার পরই এই দুটি ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির পক্ষ থেকে তদন্ত শুরু হয়েছে। তাদের মূল্যায়ন প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিহত যাত্রীদের স্বজন ও আহতরা ক্ষতিপূরণ পাবেন।

একইসঙ্গে ক্ষতিপূরণ পাবে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষও।

জানা গেছে, দাবি নিষ্পত্তির কাজে আশানুরূপ অগ্রগতি হচ্ছে। ইতোমধ্যে দুটি লস এডজাস্টার দল (সার্ভে টিম) ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে। তারা ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করছে। তাদের প্রতিবেদন হাতে পেলেই বোঝা যাবে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব সে অনুসারে দাবি পরিশোধ করা হবে। তবে আমরা আশা করছি এক মাসের মধ্যেই দাবি পরিশোধের প্রক্রিয়া শুরু করতে পারব।

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের দুর্ঘটনা কবলিত বিএস ২১১ ফ্লাইটের জন্য কমপ্রিহেনসিভ ইন্স্যুরেন্স কাভারেজ নেয়া হয়েছে। মোট লায়াবিলিটি ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে প্লেনের জন্য কাভারেজ ৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর বিমানের টিকিট কাটলেই যাত্রীরা বীমার আওতায় চলে আসে।

জানা গেছে, নিয়ম অনুযায়ী উড়োজাহাজের ক্ষেত্রে ইন্স্যুরেন্স ছাড়া চলাচলের সুযোগ নেই। ইন্স্যুরেন্সের আওতায় বিমান, যাত্রী ওপাইলটদের আলাদা মূল্য নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পাইলটদের ১ থেকে ২ লাখ ডলার আর যাত্রীদের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৫০ হাজার ডলার ইন্স্যুরেন্স সুবিধা থাকে। এই হিসাবে নিহত প্রত্যেক যাত্রীর স্বজনরা ন্যূনতম ৫০ হাজার মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কথা।

উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের বিষেয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে কী না জানতে চাইলে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক কামরুল ইসলাম (গণসংযোগ) পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, আর্থিক ক্ষতিপূরণের কোনো বিষয়ে আমাদের সিদ্ধান্ত নেয়ার কিছু নেই। ইন্সুরেন্স কোম্পানি তদন্ত করছে। তদন্ত শেষে তারা কে কত পাবেন তার একটি তালিকা করবেন। আমাদের পক্ষ থেকে আহতদের চিকিৎসা, তাদের দেশে নিয়ে আসা, স্বজনদের নেপালে নিয়ে যাওয়া, তাদের সেখানে থাকা খাওয়া এগুলো কিন্তু অব্যাহত রয়েছে।

বীমা দাবি হিসাবে নিহতরা বা আহতরা কী পরিমাণ টাকা পাবেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা তো এখনই বলা সম্ভব না। এটা নির্ভর করছে সার্ভে রিপোর্টের ওপর। সার্ভে রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত বীমা দাবির টাকা নির্ধারণ করা সম্ভব না। তবে যে পরিমাণই হোক তারা ক্ষতিপূরণ পাবে এটা আমি নিশ্চিত করতে পারি।

তিনি আরো বলেন, বীমা প্রতিষ্ঠান দুটিকে এ ব্যাপারে চিঠি দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠান দুটি ইতোমধ্যে তাদের তদন্ত শুরু করেছে।

তবে বীমার টাকা পেতে কত সময় লাগবে সে সম্পর্কে কোনও ধারণা দিতে পারেননি তিনি।

১৯৯৯ সালের উড়োজাহাজ দুর্ঘটনা সম্পর্কিত মন্ট্রিল কনভেনশন অনুযায়ী বিমান বিধ্বস্তে নিহতদের স্বজনদের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কথা। এই ক্ষতিপূরণের পুরোটাই দুর্ঘটনা সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্স বহন করে। অবশ্য ২০০৩ সালে বাংলাদেশ এই কনভেনশনে সই করলেও চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়নি। এদিকে নেপাল ওই কনভেনশনে স্বাক্ষরই করেনি।

মন্ট্রিল কনভেনশনের অধীনে দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত প্রত্যেক বাংলাদেশি বা তার পরিবার সর্বোচ্চ ১,৭৪,০০০ মার্কিন ডলার (যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১ কোটি টাকারও বেশি) পেতে পারেন; যদিও জীবনের মূল্য টাকার অংকে হিসাব করা কারও দ্বারাই সম্ভব নয়।

প্রসঙ্গত, গত সোমবার (১২ মার্চ) নেপালের ত্রিভুবন বিমানবন্দরে অবতরণ করতে গিয়ে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি উড়োজাহাজের একপাশে আগুন ধরে যায়। এরপর পাশের একটি ফুটবল মাঠে বিধ্বস্ত হয় উড়োজাহাজটি। ঢাকা থেকে ৬৭ জন যাত্রী আর ৪ ক্রু মোট ৭১ জন আরোহী নিয়ে নেপালের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল উড়োজাহাজটি। এ ঘটনায় ২৬ জন বাংলাদেশিসহ নিহত হয়েছেন ৫১ জন।

এএম/এসবি

 

 
.



আলোচিত সংবাদ