দর্শনার্থীমুখর নাটোরের হালতি বিল (ভিডিও)

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৭ | ৮ কার্তিক ১৪২৪

দর্শনার্থীমুখর নাটোরের হালতি বিল (ভিডিও)

বাপ্পী লাহিড়ী, নাটোর ৩:৫৮ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১২, ২০১৭

print
দর্শনার্থীমুখর নাটোরের হালতি বিল (ভিডিও)

নাগরিক কোলাহলে অতিষ্ঠ শহরবাসী খুঁজে ফেরেন একটু নির্মল আনন্দ। আর সেই আনন্দ পেতেই প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের ঢল নামছে নাটোরের অথৈই জলরাশির বিশাল হালতি বিলে। এখানে দুপুরের পর থেকে মানুষ আসতে শুরু করে আর সৌন্দর্য উপভোগ করে সন্ধ্যা পর্যন্ত। সব বয়সী মানুষ আসে মিনি কক্সবাজার খ্যাত প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য।

হালতি বিলের মধ্য দিয়ে নির্মিত রাস্তায় হাঁটলে কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতের আমেজ পাওয়া যায়। রাস্তার দু’পাশে শুধু পানি আর পানি। মাঝে মাঝে রাস্তায় ছোট-বড় ঢেউ আছড়ে পড়ে। আর তাতে দর্শনার্থীদের পা থেকে শরীরের কিছু অংশ ভিজে যায়। বর্ষাকালের হালতি বিল অথৈই সমুদ্রের মতো।

দূর থেকে বিলের মাঝখানে ছোট ছোট গ্রামগুলোকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো দেখতে মনে হয়। পাড়ে বড় বড় ঢেউ আছড়ে পড়ে। আগে ঝড়ের সময় কত যে নৌকাডুবি হয়েছে এখানে। ছোটখাটো দুর্ঘটনাও ঘটেছে এই বিলে। রাস্তা নির্মাণের ফলে এখন যেন পুরোপুরি বদলে গেছে দৃশ্যপট।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) তৎকালীন মন্ত্রী এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর প্রচেষ্টায় ২০০৪ সালে রাস্তাটি পাকা করার কাজ শুরু করে। পাটুলহাট থেকে খাজুরাহাট পর্যন্ত সাত কিলোমিটার দীর্ঘ রাস্তা নির্মাণে ব্যয় করা হয় প্রায় ৯ কোটি টাকা। রাস্তা নির্মাণের পর থেকেই হালতি বিল যেন হয়ে উঠে সুন্দরের লীলাভূমি। তাইতো হাজার হাজার মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসে রাস্তা আর বিল দেখতে। পানির ওপর অর্ধ-ভাসমান রাস্তায় হাঁটছে মানুষ। কেউ কেউ দলবেঁধে বা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নৌকায় চেপে ঘুরে বেড়াচ্ছে বিলের মধ্যে। আনন্দ ভ্রমণের এমন সুযোগ এর আগে মেলেনি এ অঞ্চলের মানুষের।

হালতি বিলে ঘুরতে আসা নাটোরের কলেজশিক্ষক দেবাশীষ কুমার সরকার বলেন, শহরের জীবন রুটিন বাঁধা। একঘেয়েমিতে ক্লান্তি আসে। হালতি বিলে এসে মনটা অনেকখানি প্রফুল্ল হয়েছে। মানব জীবনে এমন আনন্দঘন মুহূর্তে মাঝে মাঝে উপলব্ধি করা প্রয়োজন। সন্তানদের এখানে নিয়ে এসে প্রকৃতি দর্শন করালে তাদের মন উৎফুল্ল হবে।

বগুড়া থেকে করিম মিয়া নতুন বউ সাথীকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন হালতি বিলে বেড়াতে। দারুণ ভালো লাগছে বলে জানালেন তারা।

নাটোর শহরের স্বর্ণ ব্যবসায়ী বিপ্লব দেবনাথ জানান, বিয়ের পর থেকে গত কয়েক বছর ধরে তার স্ত্রী হালতি বিলে ঘুরতে যাওয়ার জন্য বায়না ধরেন। সময়ের অভাবে এতদিন আসা হয়নি।

এ বছর বউয়ের ইচ্ছা পূরণ করতে এখানে এসেছেন তারা।

‘অনেক ভালো সময় কাটিয়েছি। মনে হয় যেন কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতে এসেছি। সময় পেলে ছুটির দিনগুলো এখানে বেড়াতে আসবো।’ বলেন বিপ্লব দেবনাথ।    

আরেক দর্শনার্থী দেবাশীষ সাহা জানান, এর আগেও তিনি স্ত্রীকে নিয়ে বেশ কয়েকবার এখানে এসেছেন। শহরের যানযট ছেড়ে কিছু সময় এই হালতি বিলে এসে বেড়াতে তাদের খুব ভালো লাগে। কক্সবাজারের চাইতে কোনো অংশে কম নয় হালতি বিলের সৌন্দর্য।

‘প্রতিদিন এখানে হাজারো দর্শনার্থীর আগমন ঘটে। এতকিছুর পরও এখানে কিন্তু পয়ঃনিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা নেই। নেই ভালো একটা রেস্টুরেন্ট। বসার তেমন কোনো ভালো ব্যবস্থাও করা হয়নি।’ উল্লেখ করেন তিনি।

স্থানীয় ভ্যানচালক ইয়াছিন আলী খুব খুশি। কারণ তার আয় বেড়েছে কয়েকগুণ। প্রতিদিন হালতি বিলে শহর থেকে হাজারো মানুষ আসে এখানকার সৌন্দর্য উপভোগ করতে। শুধু দুপুর একটা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত তার আয় হয় ৫/৬’শ টাকা। এটা তার বাড়তি একটা আয়।

নৌকার মাঝি তমিজ উদ্দিন এখন প্রতিদিন আয় করছেন গড়ে ৮০০ থেকে ১০০০টাকা।

তিনি বলেন, এই বিলে রাস্তা হওয়ার আগে কোনো মানুষ আসত না। শুধু আশপাশের গ্রামের মানুষজন যাতায়াত করত আর তাতে প্রতিদিন তার আয় হত দেড় থেকে ২’শ টাকা। এখন এখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ শহর থেকে বেড়াতে আসে। নৌকায় চড়ে ঘুরে বেড়ায়। তাদের সঙ্গে ঘুরে বেড়াতে বেশ ভালোই লাগে।

এছাড়াও এই হালতি বিলে লোক সমাগম হওয়ায় কর্মসংস্থান হয়েছে গ্রামের বেকার মানুষের। হাজারো মানুষের ঢল নামায় এখানে হকারের ভিড়ও বেড়েছে। মুড়ি, বাদাম, চানাচুর, ফল, বিস্কুট, লজেন্স, চকলেট, পান-সিগারেট, চা এমনকি চুড়ি-মালা-কসমেটিকসের পসরা সাজিয়ে বসেছে অনেকে। বিক্রি হচ্ছে বেশ।

নাটোরের নলডাঙ্গা থানার সেকেন্ড অফিসার কৃষ্ণ কুমার জানান, এই হালতি বিলে বর্ষার সময় হাজারো মানুষের সমাগম হয় প্রতিদিন। যেহেতু দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষজন এখানে বেড়াতে আসে সেহেতু তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি তাদের দেখতে হয়। সেকারণে বর্ষার সময় ওই এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। 

নাটোর শহর থেকে হালতি বিলের দূরত্ব ৮ কিলোমিটার। রিকশায় চড়ে যেতে ৫০ টাকা এবং ৬/৭জনে একটি অটোরিকশা রিজার্ভ নিলে লাগে প্রায় দুই’শত টাকা। হাজারো মানুষের আগমনে হালতি বিল এখন মুখরিত।

বিএল/বিএইচ/

print
 

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad