তুরস্কের নির্বাসিত ‘মাফিয়া’ নেতা ফেতথুল্লাহ গুলেন

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৭ | ২ কার্তিক ১৪২৪

তুরস্কের নির্বাসিত ‘মাফিয়া’ নেতা ফেতথুল্লাহ গুলেন

পরিবর্তন ডেস্ক ৫:৪৮ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৬, ২০১৭

print
তুরস্কের নির্বাসিত ‘মাফিয়া’ নেতা ফেতথুল্লাহ গুলেন

তুরস্কে শনিবার ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানের এক বছর পূর্তি পালন করলো রিসেপ তায়িপ সরকার। নানা আয়োজনে পালিত দিনটিতে রাজধানী ইস্তানবুলে সমাবেশও হয়। যেখানে দেশের মানুষকে অভুত্থান রুখে দেয়ার জন্য তুর্কি প্রধান ধন্যবাদ জানান। অবশ্য দেশটির জনগণের একটি অংশ এখনও রিসেপ সরকারের ঘোর বিরোধী।

তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ নিজেও জানেন যে তার পেছনে নানা ব্যক্তি ও মহল পিছু লেগে রয়েছে। যাদের মধ্যে অন্যতম তুরস্কের ইসলামপন্থী সুফি নেতা ফেতথুল্লাহ গুলেন। যাকে অনেকে ফেতুল্লাহ গুলেন নামেও ডেকে থাকেন।

দুঃখজনক হলেও সত্য যে প্রাথমিক জীবনে ইসলামের কারণে জনপ্রিয়তা অর্জনকারী এই ব্যক্তিই সময়ের ব্যবধানে ইহুদি এবং পশ্চিমাদের এজেন্ট হিসেবে গোটা দুনিয়ায় মুসলমানদের স্বার্থের বিপরীতে কাজ করতে এতটুকুও দ্বিধা করেননি।

ফেতথুল্লা গুলেন ১৯৪১ সালের ২৭ এপ্রিল তুরস্কের এরজুরুম শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪৫ সালে তিনি কোরআন শিক্ষা শুরু করেন। এরপর তিনি ১৯৪৬ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৪৯ সালে তার বাবা অন্য একটা শহরে বদলি হওয়ায় সেখানে চলে যেতে বাধ্য হন। ১৯৫১ সালে তিনি কুরআনে হাফিজ হন।

এরপর বিভিন্ন পন্ডিতদের কাছ থেকে ফেতথুল্লাহ শিক্ষা নেন ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সমাপ্তি ঘটান। পরবর্তীতে তিনি সমজিদের ইমাম হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু করেন। আবেগঘন ওয়াজ নাসিহতের মাধ্যমে তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই তুরস্কের তৃতীয় বৃহত্তম শহর ইজমিরে খুবই জনপ্রিয়তা লাভ করেন।

জনপ্রিয়তাকে ধরে রাখতে সাইদ নুরসির লেখা তাফসির ‘রিসালায়ই নূর’কে অনুসরণ করে তার ওয়াজ চালিয়ে যেতে থাকেন। মূলত সেই সময়েই রাজনৈতিক ব্যাপারে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরতে শুরু করেন ফেতথুল্লাহ। সেনা অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধেও নিজের মত তুলে ধরেন তিনি। বলা হয়, এসব কারণেই তিনি জনগণের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেন।

ফেতহুল্লাহ গুলেনের নেতৃত্বেই ১৯৬০ সালের দিকে তুরস্কে আন্দোলন শুরু হয়। যা হিজমেত বা স্বেচ্ছাসেবী আন্দোলন নামে পরিচিত। শিক্ষা, গণমাধ্যম, আন্তঃধর্মীয় সংলাপ ইত্যাদি নানা ধরনের সামাজিক কার্যক্রম তারা পরিচালনা করতে থাকেন।

তার সেই সেক্যুলার কারিকুলাম অনুসারেই তুরস্কে ৩ শতাধিক স্কুল পরিচালিত হচ্ছিল। বিশ্বের ১৮০টি দেশেও সহস্রাধিক স্কুল পরিচালিত হচ্ছে তার প্রদত্ত মতবাদের আলোকে। ৯০এর দশকে গুলেনের ‘আন্তঃধর্মীয় সংলাপ’ এই আন্দোলনকে বেশ জনপ্রিয় করে তোলে। ১৯৯৮ সালে ফেতুল্লা গুলেনের আয়োজনে দেশের সেক্যুলার ও ইসলামপন্থী বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে একটি সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। যা দেশে-বিদেশে সবার নজর কাড়ে। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তার ওয়াজ নসিহত ইসলামের আলোকে হওয়ায় তিনি জনগণের ভালোবাসা ও সহানুভূতি অর্জন করেন।

ধর্ম প্রচারের আড়ালে ফেতথুল্লাহ গুলেন তুরস্কে তো বটেই, গোটা বিশ্বেই বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরি করেছেন। যাকে অনেকে ‘মাফিয়া’র সঙ্গে তুলনা করে থাকেন। ১৯৯৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি রেফাহ পার্টির নেতা নাজিমুদ্দিন এরবাকানকে তুরস্কের ক্ষমতা ত্যাগে তিনি বাধ্য করেন।

৯০এর দশকের শেষদিকে তুরস্কের বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের হিজাব পরার ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। জনগণ এই সিদ্ধান্তের বিপক্ষে অবস্থান নেয়, নতুন করে আন্দোলন গড়ে ওঠে। গুলেন কিন্তু সেই সময় মুসলমানদের বিপক্ষেই অবস্থান নেন। এমনকি তার সংগঠনের নারীদেরকে হিজাব খুলে ক্লাস করার নির্দেশ দেন।

রেফাহ পার্টি যাতে ক্ষমতায় থাকতে না পারে সে জন্য ইহুদিদের সাথেও ফেতথুল্লাহ সন্ধি করেন। এরপর ১৯৯৯ সালের নির্বাচনে গণতান্ত্রিক বাম আন্দোলনের নেতা বুলেন্ত এযেভিতকে সমর্থন করে তার দল। সেই বছরই তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান।

২০০০ সালে রেফাহ পার্টিকে নিষিদ্ধ করার পর ‘ফাযিলেত পার্টি’ গঠন করা হয়। সেখানে কমবয়সী নেতা হিসেবে পরিচিত আবদুল্লাহ গুল, রিজেপ তায়িপ এরদোগান, বুলেন্ত আরিঞ্ছদের সাথে তিনি ভালো সম্পর্ক গড়ে তোলেন। ২০০১ সালে একে পার্টি নামে দল গঠনের সময় এরদোগান কৌশলগত কারণে ফেতুল্লাহ গুলেন ও তার সংগঠন ‘হিযমেত’ এর সহযোগিতা নেন। এরদোগানও তার প্রথম ৯ বছরের শাসনামলে তাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেন।

বলতে গেলে তুরস্কের সব জায়গা গুলেনের দল দখল করে নেয়। যেন সরকারের ভেতরে সরকার গঠন করা। ফলে নানা কারণে ফেতথুল্লাহ গুলেনের সাথে এরদোগানের একে পার্টির সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে। ২০১৩ সালে একেপি ও ফাযিলেত দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে রূপ নেয়।

সবশেষ গেজে পার্কের আন্দোলনকালে এরদোগানকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য নীল নকশা তৈরি করেন গুলেন। প্রশাসনে তার সমর্থক এবং বামপন্থীদের ঐক্যবদ্ধ করেন গুলেন। যদিও এরদোগান সফলতার সঙ্গেই সে সমস্যা কাটিয়ে ওঠেন।

ফেতথুল্লাহ আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের আকিদার বিপরীতে নিজস্ব মতাদর্শ গড়ে তোলার প্রচেষ্টা লক্ষণীয়। তার রচিত ফাসিল থেকে ফাসিলা বইয়ের ৩ নম্বর খন্ডের ১৪৪ নম্বর পৃষ্ঠায় লেখা আছে যে সব মুসলিম নবী করিম রাসুলুল্লাহ্‌ (সা:)কে বাদ দিয়ে কালেমা পড়বে তারাও আল্লাহ্‌র কাছে বিশেষ সম্মান পাবেন।

বিশেষ করে কালেমায়ে শাহাদাত সম্পর্কে তিনি মুসলমানদের দৃষ্টিভঙ্গিকে নতুন করে বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন। তার দাবি, কালেমা তাইয়্যেবা’র অর্ধেক অর্থাৎ ‘মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ যারা বলবেন না তারাও আল্লাহ্‌র কাছে রহমতের দৃষ্টি লাভের যোগ্যতা লাভ করবেন।

হাদিসের উদাহরণ তুলে তার যুক্তি হচ্ছে, “আল্লাহ তার বিশাল রহমতের দ্বারা আখেরাতকে এমনভাবে নূরান্নিত করবেন যে শয়তান পর্যন্ত বলবে, ‘আমিও যদি ফিরে আসি তাহলে কি মুক্তি পাবো?’ এই কথা বলে শয়তানও আশা পোষণ করতে থাকবে।”

ফেতথুল্লাহর দাবি, এমন এক দয়াবান রবের দয়ার বিপরীতে আমাদের কৃপণতা এবং সেই কৃপণতার প্রতিনিধিত্ব আমরা কেন করব? কেনই বা প্রয়োজন? সমগ্র সৃষ্টি জগৎ আল্লাহ্‌র, সব সম্পদের মালিক যেমন তিনি সব বান্দার রবও তিনি। তাই আমাদের সকলেরই আমাদের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে জানা থাকা উচিত।

এমনকি ইহুদি আর খ্রিষ্টানদের সম্পর্কে কোরআনের আয়াতের গুরুত্ব নিয়েও তিনি মতবাদ দিয়েছেন। তার কুরেসেল বারিশা দরু (খুজাদান কেলেবেগে-৩) নামক বইয়ে উল্লেখ করেছেন, “ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের সম্পর্কে নাজিলকৃত আয়াতসমূহ কিংবা হযরত মুহাম্মাদ (সা:)এর সময়ে কিংবা তাদের নিজেদের নবীদের সময়ে বসবাসরত ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের সম্পর্কে সেই আয়াতগুলো এখন আর প্রযোজ্য নয়।”

সারা দুনিয়ার প্রায় ১৮০টি দেশে গুলেনের স্কুল রয়েছে। আর সেসব স্কুল থেকে প্রতিবছর ১৬ বছরের যুবতী মেয়েদেরকে নিয়ে তার্কিশ অলিম্পিয়াডের নামে নাচগানের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়ে থাকে। এই আয়োজন সম্পর্কে তার দাবি, সেখানে নাকি রাসূলুল্লাহ (সা:) স্বয়ং উপস্থিত থাকেন (নাউজুবিল্লাহ)। আর সেই অনুষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করা নাকি ওহুদের ময়দানে জিহাদ করার সমতুল্য।

আন্দোলনের নামে গুলেন ব্যবসার সর্বনিম্ন কারবার হলো বিভিন্ন মেস, কোচিং সেন্টার, প্রাইভেট স্কুল, হোস্টেল ও তাদের পরিচালিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল। এসব মেসে ও বাসার ছাত্রদেরকে দলীয় মন মানসিকতার আলোকে গড়ে তোলা হয়। সেসব বাসা ও মেসে থাকা অধিকাংশ ছাত্র নিজেদের পরিচয় গোপন করে চলে। এতটায় গোপনীয় যে একই ভবনে বাস করলেও কেউ কারও সম্পর্কে কিছু্ই জানতে পারে না। তাদের এমনভাবে তৈরি করা হয় যে দলের পরিকল্পনা অনুযায়ী কেউ সেনাবাহিনীতে, কেউ আবার সরকারি প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ পদ নিয়ে অবস্থান করে থাকে। এবং শর্তস্বাপেক্ষে তাদের উপার্জিত অর্থের একটি অংশ দলের কোষাগারে জমা দিতে হয়।

বিভিন্ন গণমাধ্যমের হিসেবে, দলের পক্ষ থেকে এমনভাবে কর্মীদের তৈরি করা হয়েছে যেন প্রয়োজনে যে কোনো সময় তারা নিজ দেশে অভূত্থান কিংবা বহির্বিশ্বে সংকট তৈরি করতে পারে। বলা হয়, তাদের জানা অজানা সকল সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় তুরস্কের সরকারি বাজেটের কাছাকাছি।

গণমাধ্যমেও গুলেনের রয়েছে শক্তিশালী অবস্থান। তাদের প্রচারিত দলীয় পত্রিকার গ্রাহক প্রায় ১০ লাখ। এছাড়া ইলেক্ট্রলিক্স মিডিয়াতেও ফাযিলেত পার্টির রয়েছে ব্যাপক প্রভাব। নিজস্ব টিভি মিডিয়া থাকার পাশাপাশি তাদের ৩৯টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানও রয়েছে।

সিআইএ এবং এফবিআইয়ের সাথে গুলেনের গভীর সম্পর্কের কথা সেই ৯০ দশক থেকেই ওপেন সিক্রেট। ২০০৫ সালে এফবিআই নিজেদের ওয়েবসাইটে তাদের সহযোগী সংস্থাদের নাম প্রকাশ করে যার চতুর্থ অবস্থানে ছিল ‘দি গুলেন ইনস্টিটিউট’ তথা গুলেন মুভমেন্ট।

প্রথমদিকে রিসেপ তায়িপ এরদোগানের ক্ষমতায় আসার জন্য একটি বড় গোষ্ঠীর ভোটের প্রয়োজন ছিল। কারণ তুর্কিদের বিশাল একটি অংশে গুলেনের প্রভাব রয়েছে। তাই গুলেন মুভমেন্টের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলে এরদোগান ও তার দল মাত্র এক বছরের মাথায় ক্ষমতায় আসেন। কিন্তু ক্ষমতায় আসলেও ফেতুল্লাহ গুলেন’ই যেন অদৃশ্য প্রধানমন্ত্রী বনে যান। তিনি আমেরিকার পেনসিলভানিয়াতে বসে যাকে যে পদে বসতে সুপারিশ করতেন, তাকে সেটাই দেয়া হত। এক পর্যায়ে দেখা গেল পুলিশ, সেনাবাহিনী থেকে শুরু করে অফিস, আদালত পর্যন্ত সব জায়গায় বসে রয়েছে গুলেন মুভমেন্টের লোক।

বিশেষজ্ঞরা বিষয়টি নিয়ে এরদোগানকে সাবধান করলেও প্রথমদিকে তিনি তা পাত্তা দেননি। যার ভয়ানক পরিণতি তুরস্ককে দেখতে হয় গত বছরের জুলাই মাসে।  

কেবিএ/এমডি

print
 

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad