স্বপ্ন আছে পদ্মা চরের শিশুদের, নেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান
Back to Top

ঢাকা, শনিবার, ৪ এপ্রিল ২০২০ | ২০ চৈত্র ১৪২৬

স্বপ্ন আছে পদ্মা চরের শিশুদের, নেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

মেহেদী হাসান মাসুদ, রাজবাড়ী ৫:২৩ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৪, ২০১৯

স্বপ্ন আছে পদ্মা চরের শিশুদের, নেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

তিন বেলা ভাতের নিশ্চয়তা নেই যাদের তারাও স্বপ্ন দেখে সন্তানকে মানুষের মত মানুষ করার। স্বপ্ন সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে সুন্দর একটি ভবিষ্যত করে দেয়ার। সেই স্বপ্ন যেন মরিচিকা দুর্গম চরের মানুষের। এমনই এলাকা পদ্মার বুকে জেগে ওঠা গোয়ালন্দ উপজেলা থেকে বিচ্ছিন্ন এক দ্বীপের নাম কুশাহাটা চর।

চারদিকে পদ্মা ও যমুনা নদী দ্বারা বেষ্টিত চরটি। এ চরের বাসিন্দাদের নেই নূন্যতম নাগরিক সুযোগ-সুবিধা, শিশুরা বঞ্চিত শিক্ষার অধিকার থেকে। চরটিতে নেই কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ফলে ওই চরের শিশুরা শিক্ষা বঞ্চিত হয়ে দিন দিন নিরক্ষর জনগোষ্ঠিতে পরিনত হচ্ছে। তাই এখানকার শিশুদের ভবিষ্যৎ ঘন অন্ধকারে নিমজ্জিত।

গোয়ালন্দ উপজেলার পদ্মার চরের বিচ্ছিন্ন দ্বীপ কুশাহাটার বাসিন্দা আলেয়া বেগম বলেন, ‘তিন বেলা প্যাট ভইর‌্যা খাওনই পাই না, সুংসারে খালি নাই আর নাই। মাইয়াগো ইশকুলের বেতন দিমু ক্যামনেরে বাবা। স্বপ্ন তো আছে, কিন্তু সাধ্য নাই। হ্যার পরও নিজেরা এক বেলা খাইয়া দুই মাইয়ার স্কুলের বেতন দ্যাওনের চিষ্টা করি। দুই মাইয়া আবার দুই ক্যালাসে ফাস্ট। হগলে কয় ওড়া নেহা-পড়ায় ভাল। হ্যার জন্নি কষ্ট হইলেও যদ্দুর পারি ওগো নেহা-পাড়া করাইতে চাই।’

কুশাহাটা চরে ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা প্রি-প্রাইমারি স্কুলের শিশু শ্রেণি ও প্রথম শ্রেণিতে পড়ে তার মেয়ে অন্তরা এবং চাঁদনী। সেখানে সরকারী কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না থাকায় প্রতি মাসে জন প্রতি ১৫০ টাকা বেতন দিতে হয় তাকে। আলেয়া ১৫০ টাকা দিতে পারলেও অনেক অভিভাবকের সেই সক্ষমতা নেই। ফলে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এসব চরের শিশুরা।

চরবাসীর সাথে কথা বলে জানা যায়, ৬ থেকে ৭ বছর আগে পদ্মার বুকে জেগে ওঠা বিশাল এই চরে বসতি শুরু হয়। বর্তমানে সেখানে অন্তত ২০০ পরিবার বসবাস করছে। এখানে বসবাসকারীদের নিজস্ব কোন জমি না থাকলেও চাষাবাদ করার জমির কোন অভাব নেই। তাই এ চরে বসবাসকারীরা পদ্মায় মাছ শিকারের পাশাপাশি কৃষি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। দৌলতদিয়া ফেরিঘাট থেকে ৬/৭ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে পদ্মার চরে কুশাহাটা এলাকা। ঝড়-বৃষ্টি ও নদীর সাথে যুদ্ধ করেই চলে এদের জীবন জীবিকা।

ব্যাক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা প্রি-প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক মো. ওয়াজ উদ্দিন সরদার। তার শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসি পাশ। তিনি জানান, দুই বছর আগে একজনের একটি ছাপড়া ঘর মাসে ৫০০ টাকায় ভাড়া নিয়ে তিনি স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন।  বর্তমানে তার স্কুলে ৭১ জন শিক্ষার্থী আছে। শুধু শিশু শ্রেণি দিয়ে শুরু করলেও আগের বছরের শিশু শ্রেণির শিক্ষার্থীরা প্রথম শ্রেণিতে উঠেছে। তিনি একাই অন্য শিক্ষার্থীদের সহযোগিতায় দুটি ক্লাসে পড়ান।

জরাজীর্ণ ওই ছাপড়া ঘরে যখন একটি শ্রেণির ক্লাস নেয়া হয় তখন অপর শ্রেণির শিক্ষার্থীরা বাইরে অপেক্ষা করে। শিক্ষার্থীদের দেয়া বেতন থেকেই তিনি বেতন নেন। এসময় তিনি দুঃখ করে বলেন, ‘স্কুলে ৭১ জন শিক্ষার্থী থাকলেও প্রতি মাসে ১০ জন শিক্ষার্থীও বেতন পরিশোধ করতে পারে না। এখানকার সবাই অত্যন্ত গরীব। তাই তাদেরকে কোন চাপও দেয়া যায় না।’

তিনি আরও জানান, তার স্কুল পরিচালনার ক্ষেত্রে বই-খাতাসহ বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে সহযোগিতা করছে বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) পায়াক্ট বাংলাদেশ।

এনজিও পায়াক্ট বাংলাদেশ এর স্থানীয় কর্মকর্তা শেখ রাজীব জানান, কুশাহাটা চরের এ স্কুল পরিচালনার জন্য তাদের এনজিও’র আপাতত কোন প্রকল্প নেই। ওই চরের শিশুদের শিক্ষা নুন্যতম কোন সুযোগ না থাকায় তারা উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পরামর্শ করে সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে খাতা-কলমসহ কিছু উপকরণ দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।

কুশাহাটা চরের বাসিন্দা মো. মহিউদ্দিন জানান, এই চরে বসবাস করা সহস্রাধিক মানুষ এই দেশের নাগরিক হলেও তাদের শিক্ষাসহ নূন্যতম কোন নাগরিক সুবিধা নেই। ইতিমধ্যে তাদের ভোটার তালিকায় নাম উঠলেও হাতে পাননি জাতীয় পরিচয়পত্র।

এ প্রসঙ্গে গোয়ালন্দ উপজেলা শিক্ষা অফিসার মো. আব্দুল মালেক জানান, কুশাহাটা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় নামে যে স্কুলটি রয়েছে অন্তত দুই যুগ আগে নদী ভাঙনের শিকার হয়ে দেবগ্রাম ইউনিয়নে তা পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বর্তমানে সেখানে পাঁকা ভবনসহ বিভিন্ন স্থাপনা স্থাপন করা হয়েছে। এ কারণে ওই স্কুল আর স্থানান্তরের সুযোগ নেই।

তিনি জানান, তবে কোন শিশুর শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করার সুযোগ নেই। কুশাহাটা চরবাসী যদি লিখিত আবেদন করেন, তবে আমি একটি স্কুল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবনা পাঠাতে পারব। সেক্ষেত্রে কমপক্ষে দুই হাজার জনগণের জন্য একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের আইন রয়েছে।

এমএইচএম/এসএস

 

সমগ্রবাংলা: আরও পড়ুন

আরও