‘আব্বা বলতেন, ওরা তো আমার ছেলের মতো, আমাকে কে মারবে’

ঢাকা, বুধবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৭ | ৩ কার্তিক ১৪২৪

‘আব্বা বলতেন, ওরা তো আমার ছেলের মতো, আমাকে কে মারবে’

পরিবর্তন প্রতিবেদক ৭:০৫ অপরাহ্ণ, মে ১৭, ২০১৭

print
‘আব্বা বলতেন, ওরা তো আমার ছেলের মতো, আমাকে কে মারবে’

দেশের জনগণের উপর বিশ্বাস থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কখনও হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার কথা ভাবতে পারেননি বলে জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, “অনেকেই তাকে সাবধান করেছিলেন; এ রকম একটা ঘটনা ঘটতে পারে। তিনি বিশ্বাসই করেন নাই। আব্বা বলতেন, ‘না, ওরা তো আমার ছেলের মতো, আমাকে কে মারবে?”

নিজের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে বুধবার গণভবনে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের সময় এ কথা বলেন।

শেখ হাসিনা বলেন, যিনি বাংলাদেশের জনগণকে এতটা ভালোবাসা দিয়েছিলেন তাদের একটা বিক্ষিপ্ত অংশের গুলিতে জীবন দিতে হলো বঙ্গবন্ধুকে।

তিনি বলেন, আমার এখনো মনে হয়, তাঁকে গুলি করেছে তারই দেশের লোক, তার হাতে গড়া ঐ সেনাবাহিনীর সদস্য। তার হাতে গড়া মানুষ। জানি না তার মনে তখন কি প্রশ্ন জেগেছিলো? কিছু জানারও উপায় নেই, কারণ ঐ বাড়িতে তো কেউ বেঁচে ছিলো না।

প্রধানমন্ত্রী এ সময় তাঁর পরিবারের নিহত সকল সদস্যের বিবরণ তুলে ধরেন।

১৫ আগস্টের পর অপপ্রচার চালানো হয়েছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একাত্তরে পরাজিত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর যারা দোসর ছিলো, তাদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে এ হত্যাকান্ড ঘটানো হয়েছিলো। যারা এদেশের স্বাধীনতাই চায়নি। মূলত তারাই এ হত্যাকান্ড ঘটায়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আসলে ঘরের শত্রু বিভীষণ। ঘরের ভেতর থেকে শত্রুতা না করলে বাইরের শত্রু সুযোগ পায় না। যারা এর সঙ্গে জড়িত তাদের অনেকে আমাদের বাসায় আসা যাওয়া করতো। তিনি বলেন, ডালিম, ডালিমের শাশুড়ি, ডালিমের বউ, ডালিমের শালি, ২৪ ঘণ্টা আমাদের বাসায় পড়ে থাকতো। উঠা বসা, খাওয়া, দাওয়া সবই।

বঙ্গবন্ধুর হত্যার ষড়যন্ত্রকারীদের সম্পর্কে তিনি আরো বলেন, মেজর নূর মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জেনারেল ওসমানির এডিসি হিসেবে কর্মরত ছিলো। তখন কামালও ওসমানীর এডিসি ছিলো। দুই জন এক সঙ্গে কর্মরত ছিলো। এরাতো অত্যন্ত চেনা মুখ।

তিনি বলেন, কর্নেল ফারুক কেবিনেটের অর্থমন্ত্রী মল্লিক সাহেবের শালির ছেলে। এভাবে যদি দেখি এরা কেউ দূরের না, এরাই যড়যন্ত্র করলো।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জিয়া জড়িত ছিলো। জিয়ার যে পারিবারিক সমস্যা ছিলো সেটা সমাধানের জন্য সেনাবাহিনীতে এক পদ সৃষ্টি করে সেখানে তাকে দায়িত্ব দিয়ে রাখা হয়েছিলো। তার পারিবারিক সমস্যা সমাধান করে দেয়া হয়েছিলো। তিনি জানান, জিয়াউর রহমান প্রায়ই, প্রতি সপ্তাহে একবার তার স্ত্রীকে নিয়ে ঐ ৩২ নম্বর বাড়িতে যেতো। ‘আন্তরিকতা নয়, এদের লক্ষ্য ছিল চক্রান্ত করা। সত্যিকথা বলতে কি সেটা কেউ বুঝতে পারিনি। আমরা খোলামেলাভাবে মানুষের সঙ্গে মিশতাম, সকলের জন্য অবারিত দ্বার’, যোগ করেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ হত্যাকান্ডটা হয়েছে ইতিহাসকে সম্পূর্ণ পরিবর্তন করা, মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলা, স্বাধীনতার যে মূল লক্ষ্য সেটা থেকে বিচ্যুত করা এবং বিজয়কে একেবারে অর্থহীন করে দেয়ার জন্য।

মোস্তাক তিন মাসও ক্ষমতায় থাকতে পারেনি উল্লেখ করে তিনি বলেন, যারা এভাবে বেঈমানি করে, তারা থাকতে পারে না।.. মীর জাফরও তিন মাসও ক্ষমতায় থাকতে পারেনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, মোস্তাক রাষ্ট্রপতি হওয়ার সাথে সাথে জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধান করা হয়। এতে স্পষ্ট যে তাদের মধ্যে একটা যোগসূত্র ছিলো এবং ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলো।

জার্মানির বনে বসে ১৫ আগস্টে পরিবারের সব সদস্য নিহত হবার সংবাদ প্রাপ্তির দুর্বিসহ সময়টার কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যখন শুনলাম সহ্য করাটা কঠিন ছিলো। ১৬ তারিখে ড. কামাল হোসেন আসলেন হুমায়ুন রশিদ সাহেবের বাসায়। রেহানা ছোট, সে বললো চাচা আপনি মোস্তাকের মন্ত্রিত্ব নেবেন না। আপনি প্রেস কনফারেন্স করেন, আপনি এ হত্যার প্রতিবাদ করেন। হুমায়ুন রশিদ সাহেব প্রেস কনফারেন্সের ব্যবস্থা নিলেন কিন্তু উনি কোনো কথা বলতে রাজি হলেন না।

প্রধানমন্ত্রী এ সময় দেশবাসীর প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, গ্রামে গঞ্জে যখন ঘুরেছি তখন দেখেছি সাধারণ মানুষের ভালবাসা। সে ভালবাসাই কিন্তু আমাদের আরো প্রেরণা দিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তখন চরক্লার্কের একটি ঘটনার উল্লেখ করে বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড়ের রিলিফ দিতে আমরা সেখানে গিয়েছিলাম। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছি, রাস্তায় পানি, তখন একজন বুড়ো মতন মহিলা তাঁর ঘরে ডেকে নিয়ে খেজুরপাতার পাটিতে বসতে দিলেন- বাড়ির উঠোনে নারকেল গাছ, সেখান থেকে ডাব পেড়ে এনে বললেন মা খাও। মাথায় হাত বুলিয়ে তিনি বললেন, বাবাতো আমাদের জন্য তাঁর জীবনটাই দিয়ে গেছে, তুমিও মা নামছো এই কাজে! তুমিও এমন চেষ্টা করে যাচ্ছো!’

শেখ হাসিনা বলেন, পর্ণ কুটিরের একজন মানুষের এই যে অনুভূতি, এটুকুইতো আমার পাওনা। যাদের জন্য আমার বাবা সারাজীবন কষ্ট করেছেন তাদের জন্য কিছু করতে পারলেইতো সবথেকে বড়ো স্বার্থকতা।

প্রধানমন্ত্রী বাষ্পরুদ্ধ কন্ঠে বলেন, যেখানেই গিয়েছি গাড়ি আগলে দাঁড়িয়েছে সাধারণ মানুষ, নামতে হবে। তারপর একটু কলা, পানি বা তাদের যে আন্তরিকতা, গায়ে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলা বাপ নাই, মা নাই, এতো কষ্ট করতেছো! তাদের সেই স্নেহের পরশ পেয়েই বুঝতে পারি যে, কেন আমার আব্বা এতটা ত্যাগ স্বীকার করতে পেরেছেন। এত কাজ করতে পেরেছেন। কারণ তিনিতো (জাতির পিতা) মানুষের সেই ভালবাসার ছোঁয়া পেয়েছিলেন। সাধারণ মানুষগুলোর এই ভালবাসার ছোঁয়াটা আমি পেয়েছি। যেটা আমার আব্বাও পেয়েছিলেন। সেটাই তাঁর সব থেকে বড়ো শক্তি বলেও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন।

দীর্ঘ পথ পরিক্রমা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সভাপতি হিসেবে আজকে ৩৫ বছর পার হয়ে ৩৬-এ পা দিলাম। এ দীর্ঘ সময় কিন্তু কেউ দায়িত্বে থাকে না। প্রধানমন্ত্রী এ সময় ভবিষ্যতের জন্য নতুন নেতৃত্ব খোঁজার কথা বললে সমবেত সকলে ‘না’ ‘না’ বলে প্রতিবাদ করে ওঠেন।

শেখ হাসিনা বলেন, জীবন-মৃত্যু আমি পরোয়া করি না এটা ঠিক। কিন্তু মৃত্যুকেতো আমি বারবার সামনে থেকে দেখেছি। কিন্তু কখনই ভয় পাইনি, ঘাবড়ায়নি, কারণ আমার একটা বিশ্বাসই ছিলো সৃষ্টিকর্তা আমাকে এই জীবনটা দিয়েছেন, আমাকে দিয়ে কিছু কাজ করাবেন বলে। আর এটা হয়তো আমার আব্বা-আম্মারই আকাঙ্ক্ষা এবং আশির্বাদ। নইলে তাঁর পক্ষে এতকিছু করা সম্ভব ছিল না বলেও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন।

এমএইচ/এমডি

print
 

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad