বিএনপিতে বুলির বাস্তবতা!

ঢাকা, রবিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ | ১৩ ফাল্গুন ১৪২৪

বিএনপিতে বুলির বাস্তবতা!

মাহমুদুল হাসান ১০:৫৪ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০১৮

print
বিএনপিতে বুলির বাস্তবতা!

দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দুর্নীতির মামলায় জেলে। তার পরেই বিএনপির হাল যার ধরার কথা, সেই তারেক রহমান দীর্ঘদিন ‘নির্বাসনে’। মায়ের সঙ্গে তারও ১০ বছরের কারাদণ্ড হয়েছে, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায়।টানা ১২ বছর ক্ষমতার বাইরে বিএনপি। মামলা-হামলা আর গ্রেফতারে জর্জরিত তৃণমূল। ওয়ার্ড থেকে ইউনিয়ন, উপজেলা থেকে উপশহর, শহর, জেলা- বেশিরভাগ ইউনিটের সভাপতি-সম্পাদক পর্যায়ের নেতারা হয় জেলে, না হয় ঘরে মাথা পেতে ঘুমাতে পারছেন না। বলা চলে, স্মরণকালের সবচেয়ে সংকটের মধ্যে দিন পার করছে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে তিনবার ক্ষমতার স্বাদ পাওয়া বিএনপি।

প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান নিহতের পরে বিএনপির সবচেয়ে সংকটকালীন সময় বলা হয়ে থাকে আলোচিত ওয়ান-ইলেভেন। সে সময়ে দলীয় প্রধান খালেদা জিয়া গ্রেফতার হয়ে জেলে যাওয়ার পর রাষ্ট্রীয় ইন্ধনে বিএনপি ভাঙার চেষ্টা হয়েছিল। তবে দলটির বাড়তি পাওনা, তাদের সঙ্গে যে আচরণ, তা দেশের আরেকটি বৃহৎ দল আওয়ামী লীগের সঙ্গেও করা হয়েছিল। ফলে রাজপথের লড়াইয়ে সেনাসমর্থিত সরকারের বিরুদ্ধে দল দুটি তাদের নেতাকর্মীদের এক করতে সক্ষম হয়েছিল।

কিন্তু, ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপট হাজির হয় বিএনপির সামনে। ওয়ান-ইলেভেন প্রেক্ষাপটে দুই নেত্রী- শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে যেসব মামলা হয়, ক্ষমতাসীন হওয়ার পর আওয়ামী লীগ নিজ দলীয় নেত্রীর মামলাগুলো বিশেষ ব্যবস্থায় প্রত্যাহার করে।

বিপরীতে খালেদা জিয়া এবং দলটির নেতাদের বিরুদ্ধে দায়ের মামলাগুলো সক্রিয় হয়। এমন-ই একটি মামলায় গত ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াকে ৫ এবং তারেক রহমানকে ১০ বছরের কারাদণ্ড হয়েছে।

২০০৮ সালের নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর বিএনপির নেতাকর্মীরা সরকারি কৌশলের কাছে কোণঠাসা হয়ে পড়েন। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে দলটি নিরপেক্ষ সরকারের দাবি আদায়ে আন্দোলন করেও ব্যর্থ হয়। এক পর্যায়ে তারা নির্বাচন বর্জন করলে জাতীয় পার্টিকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচন করে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ।

এবার একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে বিএনপি শুরু থেকেই নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে আসছে। তবে সেই নির্বাচন সামনে রেখেই আরেক দফা সংকটের মুখে পড়েছে দলটি। কারণ, দলটির প্রধান খালেদা জিয়া কারান্তরীণ। আগামী জাতীয় নির্বাচনে তার অংশ নেয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

তবে বিএনপির নেতাদের দাবি, খালেদা জিয়াকে ছাড়া তারা আগামী নির্বাচনে অংশ নেবে না। তাদের বিশ্বাস, বিএনপির ওপর যত নির্যাতন হচ্ছে, জনপ্রিয়তা ততই বাড়ছে। ‘নির্যাতনকারী’ আওয়ামী লীগ জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।

বিশ্লেষকদের ভাষ্যে, ২০০১ সালের ১ অক্টোবর ক্ষমতায় গিয়ে জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদ, অবাধ লুটপাটসহ নানা অভিযোগের পর ২০০৬ সালে ক্ষমতা হারায় বিএনপি। ১/১১-এর পালাবদলের পর বিএনপিকে প্রবল প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়।

তৎকালীন মহাসচিব মান্নান ভূইয়ার নেতৃত্বে ভাঙনের মুখে পড়ে দলটি। ওইসময় কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন খালেদা জিয়া ও তার ছেলে তারেক রহমান। পরে দুই ছেলেকে ‘নির্বাসনে’ পাঠানো হয়। এরপর ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির ভরাডুবি হয়। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে।

এরপর থেকেই নেতাকর্মীদের ওপর হামলা-মামলা নির্যাতনের খড়গ নেমে আসে। দলীয় প্রধান খালেদা জিয়াকে দীর্ঘ ৪০ বছরের বেশি বসবাস করা ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি ছাড়তে হয়। সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে আওয়ামী লীগ বিএনপিকে ব্যাকফুটে ঠেলে দেয়। যার ফলে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বয়কট করেও আন্দোলনে সফল হতে পারেনি বিএনপি।

এরপর থেকেই বিএনপি সরকারেও নেই, বিরোধী দলেও নেই। বারবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও তারা সরকারের ‘কৌশলের’ কাছে ব্যর্থ হয়ে রাজনীতির মাঠ থেকেই এক রকম ছিটকে পড়েছে। শুধু খালেদা জিয়াই কারাগারে আছেন এমন নয়, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়সহ আরও অনেক সিনিয়র নেতা এখন কারাবন্দি। এ অবস্থার মধ্যেও নিজেদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি ও সন্দেহ-অবিশ্বাসের কারণে সাংগঠনিকভাবে অনেকটাই বিপর্যস্ত বিএনপি।

তবে দলটির নেতারা বলছেন, খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর দল ইস্পাত কঠিন ঐক্য ধারণ করেছে। দলীয় চেয়ারপারসনের মুক্তি দাবিতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।

এ বিষয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘বিএনপি অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি ঐক্যবদ্ধ আছে। যেকোনো রাজনৈতিক দলের সামনেই সংকট-সম্ভাবনা থাকে। আমাদের জন্যও এসব নতুন কিছু না। বরাবরই তা কাটিয়ে গণমানুষের দলে পরিণত হয়েছি আমরা। এবারও সাময়িক এই সংকট কাটিয়ে পূর্ণ শক্তিতে আমরা হাজির হব।’

তার ভাষ্যে, ফাসিস্ট আওয়ামী লীগের মুখোশ জনগণের সামনে উন্মোচিত হয়েছে। তারা এখন অন্ধকার পথে হাঁটছে। মিথ্যা, অনৈতিক ভিত্তিহীন মামলায় দেশনেত্রীকে সাজা দিয়ে যে সুখের বাদ্য তারা বাজাতে চাইছে, তা সফল হবে না।

মির্জা ফখরুল আরও বলেন, ‘সরকার ভেবেছিল, খালেদা জিয়াকে জেলে নিলে বিএনপি ধ্বংসাত্মক কর্মসূচিতে যাবে। সে সুযোগ নিয়ে মামলা দিয়ে বিএনপিকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখাতে পারবে। কিন্তু, তাদের সেই ফাঁদে আমরা পা দেইনি। এটাও সত্য খালেদা জিয়াকে বাইরে রেখে এদেশে কোনো নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘অন্যায়ভাবে সাজা দেয়ায় খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা আগে চেয়ে অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। দলগতভাবে আমরা ঐক্যবদ্ধ আছি। নেত্রীর মুক্তির দাবিতে কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছি।’

কর্মসূচি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমরা শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক কর্মসূচি পালন করছি। এই নির্দেশনা দেশনেত্রী আমাদের দিয়ে গেছেন। চলমান কর্মসূচি শেষে সিনিয়র নেতারা বসবেন। তারপর নতুন কর্মসূচির বিষয় সিদ্ধান্ত হবে।’

গত ৮ ফেব্রুয়ারি পুরনো ঢাকার বকশীবাজারে আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে স্থাপিত বিশেষ জজ আদালতের বিচারক ড. আখতারুজ্জামান জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়াকে ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন।

একই মামলায় বিএনপি প্রধানের ছেলে তারেক রহমানসহ বাকি আসামিদের ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

রায়ের পরপরই খালেদা জিয়াকে নাজিম উদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে নেয়া হয়। নির্জন এই কারাগারে একমাত্র বন্দি হিসেবে আছেন তিনি।

ইতোমধ্যে চার দিন অতিবাহিত হলেও রায়ের সার্টিফাইড কপি না পাওয়ায় রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারেননি খালেদা জিয়া।

এরই মধ্যে গতকাল সোমবার কুমিল্লায় নাশকতার ঘটনায় দায়ের তিন মামলায় তাকে ‘শ্যোন অ্যারেস্ট’ দেখানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন আইজি প্রিজন্স ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দীন।

এমএইচ/আইএম
বিএনপির ফাঁদে সরকার

 
.

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad