নড়াইলে ভেজাল জিরা চাষে প্রতারিত কয়েকশ কৃষক

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ আগস্ট ২০১৭ | ৯ ভাদ্র ১৪২৪

নড়াইলে ভেজাল জিরা চাষে প্রতারিত কয়েকশ কৃষক

পরিবর্তন প্রতিবেদক ৩:৫৮ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১০, ২০১৬

print
নড়াইলে ভেজাল জিরা চাষে প্রতারিত কয়েকশ কৃষক
নড়াইলের মাঠে মাঠে এখন হাওয়ায় দুলছে জিরা গাছের ক্ষেত। কোথাওবা ফসল কেটে তা মাড়াই এর কাজ চলছে। চাষীরা অনেক আশা নিয়ে বুনেছেন বিদেশি দামি মসলা জিরা। পাঁচ শতক থেকে শুরু করে দেড় একর পর্যন্ত জমিতে কৃষকেরা আসল জিরা মনে করে এই বীজ বপন করেছিলেন। এখন ফল পেকে যাবার পরে বুঝতে পারছেন এটা আসলে জিরা নয়। এভাবে আসল জিরা মনে করে জিরার মতো দেখতে ‘শলুক’ চাষ করে ঠকেছেন জেলার অন্তত দুইশ কৃষক। অনেকে এখনও আশা করে আছেন লাগানো ক্ষেতে জিরা হবে আর তার বীজ বিক্রি করবেন চড়া দামে। কিন্তু কৃষি বিভাগ বলছেন এটা জিরা নয়, জিরা জাতীয় অন্য একটি মসলা, যার নাম শলুক।

নড়াইলের মাঠে মাঠে এখন হাওয়ায় দুলছে জিরা গাছের ক্ষেত। কোথাওবা ফসল কেটে তা মাড়াই এর কাজ চলছে। চাষীরা অনেক আশা নিয়ে বুনেছেন বিদেশি দামি মসলা জিরা। পাঁচ শতক থেকে শুরু করে দেড় একর পর্যন্ত জমিতে কৃষকেরা আসল জিরা মনে করে এই বীজ বপন করেছিলেন। এখন ফল পেকে যাবার পরে বুঝতে পারছেন এটা আসলে জিরা নয়। এভাবে আসল জিরা মনে করে জিরার মতো দেখতে ‘শলুক’ চাষ করে ঠকেছেন জেলার অন্তত দুইশ কৃষক। অনেকে এখনও আশা করে আছেন লাগানো ক্ষেতে জিরা হবে আর তার বীজ বিক্রি করবেন চড়া দামে। কিন্তু কৃষি বিভাগ বলছেন এটা জিরা নয়, জিরা জাতীয় অন্য একটি মসলা, যার নাম শলুক।

কৃষি বিভাগের সূত্রমতে, এ বছর নড়াইল জেলায় জিরার মতো দেখতে শলুক চাষ হয়েছে প্রায় ১২ একর জমিতে এবং কৃষিবিভাগ ইতোমধ্যে শলুক চাষীদের তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে। তবে কৃষকদের তথ্য অনুযায়ী জেলায় অন্তত ২০ একর জমিতে এই ভেজাল জিরার চাষ হয়েছে। এর মধ্যে জিয়াউর রহমানের কাছ থেকে প্রায় দুইশ কৃষক এবং পার্শ্ববর্তী ফরিদপুর থেকে শলুকের বীজ সংগ্রহ করেছেন প্রায় পঞ্চাশ জন কৃষক।

গত বছর নড়াইল শহরের ভাটিয়া গ্রামের কৃষক জিয়াউর রহমান তার এক আত্মীয়ের মাধ্যমে ইরান থেকে বীজ এনে জিরা চাষ করেছেন বলে ঘোষণা দেন। সেই ক্ষেতে জিরা বড় হলে তা দেখতে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ভীড় করে। মেলা জমে যায় মাঠের মধ্যে। একপর্যায়ে ভীড় সামাল দিতে ঐ ক্ষেতে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এ খবর পেয়ে কৃষি বিভাগ মাঠ পরিদর্শন করেন। স্থানীয় বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় এবং টেলিভিশন চ্যানেলে জিরা চাষের সাফল্যের খবর প্রচারিত হলে তা সরেজমিন পরীক্ষা করতে আসেন বগুড়া মসলা গবেষণা কেন্দ্রের দুই কৃষিবিজ্ঞানী।

স্থানীয় কৃষি বিভাগ এবং বগুড়ার মসলা গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে এই ফসলকে শলুক হিসেবে চিহ্নিত করেন। তবে সে সময় জিরাচাষী জিয়াউর রহমান কৃষি বিভাগের তথ্যকে ভুল বলে উড়িয়ে দেন এবং ফসলটিকে জিরা হিসেবেই প্রচার করতে থাকেন।

জিয়াউর রহমানের সাফল্য দেখে এলাকার এবং পার্শ্ববর্তী কৃষকেরা জিরা মনে করে তার কাছ থেকে দশ হাজার টাকা কেজি দরে বীজ সংগ্রহ করেন। উৎপাদিত জিরা নামের শলুক বীজ কেজি প্রতি ১০ হাজার টাকায় বিক্রি করে তিনি প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টাকা বাণিজ্য করেছেন বলে জানা গেছে। জিরা চাষের খবর নড়াইলের পার্শ্ববর্তী মাগুরা ও যশোর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে সেখারকার চাষীরাও জিয়াউর রহমানের কাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করেন। এভাবে জেলায় অন্তত দুইশ কৃষক এবং জেলার বাইরে প্রায় পঞ্চাশ জন কৃষক জিয়াউর রহমানের কাছ থেকে বীজ কিনে ঠকেছেন বলে স্থানীয়দের দাবি।

নড়াইল সদরের নাকশী গ্রামের সৌখিন কৃষক সেলিম মল্লিক অর্ডার দিয়ে ভাটিয়া গ্রামের জিয়াউর রহমানের কাছ থেকে এক কেজি জিরার বীজ কিনেছিলেন ১০ হাজার টাকায়। অনেক আশা করে বুনেছিলেন প্রায় এক একর জমিতে। ৪ বার চাষ এবং ৪ বার সেচ দিয়ে ফসল তৈরি করেছেন। কিন্তু গাছে ফল আসার পর থেকে তার মনের সন্দেহ বাড়তে থাকে। এলাকার নানাজন নানা কথা বলতে থাকে। একসময়ে নিজে ভালো করে ফসল দেখে এবং গন্ধে বুঝতে পারেন এটা আসলে জিরা নয়।

আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘ফসল পেকে এ পর্যন্ত আসতে তার খরচ হয়েছে প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা। এই ফসল করতে ট্রাক্টরের কিস্তিও মার খেয়েছি, কাকে অভিযোগ করবো। এখন সবই মার গেলো। জিয়াউর রহমানের ক্ষেতে যে রকম মানুষ ভীড় করেছিল তাতে মনে হয়েছে ওটা আসল জিরা। তাছাড়া কৃষি বিভাগও কোনো ঘোষণা দেয়নি, আমাদের কিই বা করার আছে।’

ভান্ডারীপাড়া গ্রামের প্রবীণ কৃষক নওশের কাজী ভাটিয়ার জিয়াউর রহমানের কাছ থেকে ২০০ গ্রাম বীজ কিনেছিলেন ১ হাজার ৯০০ টাকা দিয়ে। সবচাইতে উঁচু জমিতে আশা করে বুনেছিলেন জিরার বীজ। ফসল কেটে মাড়াইয়ের সময় তিনি বুঝতে পারলেন এটা জিরা নয়। এখন জিরা না পেয়ে তিনি হতাশ এবং ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন। কৃষি বিভাগের লোকেরা মাঠে এসেও তাকে কোনোদিন সতর্ক করেনি। তার দাবি, তাকে জিরার বীজ দিয়ে ঠকিয়েছেন ভাটিয়ার জিয়াউর রহমান। তিনি ও পার্শ্ববর্তী আরো সাতজন কৃষক প্রতারণার জন্য জিয়াউর রহমানের নামে মামলা করতে চান।

নওশের কাজী বলেন, ‘বিশ শতক জমিতে এই ৪ মাসে আমি প্রায় ১৫ হাজার টাকার মুশুরি পেতাম। এখন কৃষকের টাকাসহ আরো ২০ হাজার টাকার লোকসান গুনতে হচ্ছে।’

একইভাবে মুলিয়ার ননীক্ষীর গ্রামের প্রদোৎ বিশ্বাস, দিলীপ রায়, বাগডাঙ্গা গ্রামের হোসাইন কবীর, শাহাদত, আকব্বর লোহাগড়া উপজেলার শালনগরের যাদু আলী, ওসমান মুন্সীসহ কৃষকেরা আশা করে জিরার বীজ বপন করে ঠকার আশঙ্কায় রয়েছেন। জিয়াউর রহমান ছাড়াও ফরিদপুরের কোনো এক এলাকা থেকে জিরা এনে বুনেছেন অনেকে। এদের অধিকাংশের দাবি যদি জিরা না হয়ে শলুক হবে তাহলে কৃষিবিভাগ থেকে কেন এই ঘোষণা দিচ্ছে না।

কৃষকদের অভিযোগের ব্যাপারে কৃষক জিয়াউর রহমানের দাবি তিনি কাউকেই জিরার বীজ হিসেবে এটা দেননি। তিনি বলেন, ‘আমি সবাইকে বলেছি এটা জিরা, তবে সরকারিভাবে তারা এটাকে স্বীকৃতি দেয়নি। তাছাড়া সব বীজ তো আর ১০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়নি। ৮ হাজার বা তার কমেও বিক্রি হয়েছে।’

এবছরও জিরা বীজ বেচার আশায় আছেন তিনি।

জিরা মনে করে শলুক চাষ করে কৃষকদের সঙ্গে এই প্রতারণার জন্য কৃষি বিভাগের উদাসীনতাকেই দায়ী করলেন স্থানীয় কৃষক নেতা ও ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্ট লোকেরা। 

জাতীয় কৃষক সমিতি নড়াইল জেলার নেতা কাজী খায়রুজ্জামান বলেন, ‘কৃষকেরা জিরার বীজ মনে করেই তা বপন করেছেন। আর কৃষি বিভাগ বলছেন এটা জিরাসদৃশ শলুক নামের একটি মসলা। এটা আদৌ  মসলা কিনা এবং এতে আমাদের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি আছে কিনা তা পরিষ্কার করেনি। এটা প্রচলিত ফসল নয়, তাই কৃষি বিভাগের উদ্যোগেই কৃষকরা সঠিক পথে যেতে পারবে।’

সমাজকর্মী মো. রেজাউল করীম বলেন, ‘আমাদের দেশে জিরা প্রধানত ইরান থেকে আসে। তবে ভারতে ব্যাপক চাষ হয় এই শলুকের। তা আবার জিরার মধ্যে ভেজাল দিয়ে বিক্রি হয়। ফলে আমাদের দেশে এই ভেজাল জিরার চাষ বাড়লে তা এক ধরনের ধড়িবাজ লোকের জন্য সুবিধা হবে। সাধারণ মানুষ ও কৃষক ক্ষতিগ্রস্থ হবে।’

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ কমিটির নড়াইলের সাধারণ সম্পাদক কাজী হাফিজুর রহমান বলেন, ‘শলুক এখনো চাষের পর্যায়ে আছে। এখন কৃষকেরা দাম দিয়ে জিরা মনে করে একদিকে যেমন ঠকছে, অন্যদিকে এটি বাজারে আসলে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীরা এটি জিরায় ভেজাল দিয়ে ভোক্তাদের ঠকাবে। এখনই এই ভেজাল জিরার চাষ বন্ধ করতে হবে।’

এ ব্যাপারে কৃষি বিভাগ কৃষকের অভিযোগের অপেক্ষায় আছে বলে জানা গেছে।

নড়াইল কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘গত বছরই জিয়াউর রহমানের ক্ষেত পরীক্ষা করে আমরা নিশ্চিত হয়েছি এটা জিরা নয় শলুক। জিরা এবং শলুক একই গোত্রের তবে আলাদা ফসল, জিরার বৈজ্ঞানিক নাম কিউমিনাম সাইমিনাম আর শলুকের বৈজ্ঞানিক নাম এনেথাম সোয়া ইংরেজিতে একে বলে ‘ডিল’। তবে শলুক ভারতে ব্যাপক চাষ হয়। একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীরা এটিকে জিরার সঙ্গে ভেজাল দিয়ে অধিক মুনাফা অর্জন করে।’

কৃষি বিভাগের উদাসীনতার কারণেই চাষীরা জিরা মনে করে শলুক চাষ করে ঠকছেন- এমন প্রশ্নের জবাবে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের অগোচরে জিয়াউর রহমান জিরা বলে এটাকে চালাচ্ছেন। তবে তাকে বলা হয়েছে এটা শলুক হিসেবেই বিক্রি করতে। এছাড়া কোনো কৃষক তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এসআই/আরআর/এসজে

 

print
 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

nilsagor ad

আলোচিত সংবাদ

nilsagor ad